খড়গপুরের খেরোখাতা - ১

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

কলকাতার সাথে সম্পর্কটা রয়েই গেল । পালটে গেল আমাদের আপাত ঠিকানা । সালটা ছিল ২০০৯ ; আমরা আস্তানা বাঁধলাম মেদিনীপুর জেলার অন্যতম প্রেস্টিজিয়াস শহর খড়গপুরে । ভারতবর্ষের রেলশহর। যা বিখ্যাত বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম রূপে আর বিখ্যাত নামী ইন্সটিটিউট আইআইটির জন্য । এখন যে আই-আই-টি খড়গপুরকে আমরা দেখি প্রাক স্বাধীনতার যুগে সেখানে ছিল হিজলী জেল । ব্রিটিশ শাসক এই জেলখানায় প্রধানত: রাজনৈতিক বন্দীদের রাখত । সেখানে বাংলার দুই স্বাধীনতা সংগ্রামী সন্তোষ মিত্র এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্ত বীরত্বের সাথে শহীদ হয়েছিলেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই জেলখানাটি ইউ এস এয়ারফোর্স এর ভেরি হেভি বম্বার কমান্ডের হেড কোয়ার্টার ছিল ।

পৃথ্বীশের বহুদিনের ইচ্ছে ছিল নিজের কলেজে অধ্যাপনা করার । কর্পোরেট সেক্টরে চাকরী করতে করতে ইন্টারভিউ নিতে আসতে, লেকচার দিতে আর পার্ট-টাইম পড়াতে আসতে গিয়ে মনে হয়েছিল সব ছেড়েছুড়ে খড়গপুর আমাদের পার্মানেন্ট আস্তানা হলে মন্দ হবেনা । জায়গাটার বট্যানিকাল মোহময়তা আছে । ভালো জলহাওয়া, অবিরাম পাখীর ডাক আর সবুজ গাছগাছালি বেষ্টিত বিশাল ক্যাম্পাস । কোলকাতা থেকে টানা গাড়িতে মাত্র দু থেকে আড়াই ঘন্টা সময় লাগে যাওয়া-আসায় । মধ্যজীবনের শুরুতে দক্ষিণবঙ্গে পাততাড়ি গোটানোয় অনেক ঝক্কিঝামেলা ছিল ।
পৃথ্বীশের নতুন কর্মজীবন শুরু হল ভারতবর্ষের নামী ইনস্টিটিউটে । যার বিশ্বব্যাপি ব্র্যান্ডে থরহরি কম্প অন্যান্য কলেজরা । প্রোফেসর পদে অধ্যাপনা শুরু হল । না জানি তার কত মান, কত খ্যাতি ! আমাদের খড়গপুরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই আরেকটি পাকা ঘুঁটি কাঁচা হ'ল । আমাদের ছেলে রাহুল ঐ বছরেই সেন্ট জেভিয়ারস স্কুল থেকে বারোক্লাস পাস করে আই আইটি জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ৪৬৮০ rank পেল । ঈশ্বরকে মনে মনে নমস্কার জানিয়েছিলাম । একসাথে আমাদের নতুন পথচলা হবে সেই ভেবে ।

কাউন্সেলিং হল । ছেলে যা পড়তে চায় তা পায়না খড়গপুরে । কিন্ত নতুন আইআইটিগুলোতে যা চাইছে তাই পাচ্ছে অথচ সেখানে ভর্তি করতে নারাজ তার বাবা । আগের বছরের কাউন্সেলিং অনুযায়ী অপশান দিল । সকলে বললেন ইন্টিগ্রেটেড এমএসসি অবধারিত পাবে সে । অতএব মোটামুটি নিশ্চিত হলাম ছেলের কেরিয়ার নিয়ে । কিন্তু যেদিন ফাইনাল লিস্ট বেরুলো সেদিন দেখা গেল রাহুলের নাম সেখানে নেই । কেন নেই, কিজন্য নেই তা ভাবার সময়ও নেই তখন আমাদের । আর নতুন প্রোফেসর হিসেবে তার বাবা জয়েন করছে অতএব সে বিষয়ে উনিও কোনো নাক গলাতে চান না । কেউ যদি ভাবে উনি এসেই স্বজনপোষণ করছেন ।

AIEEEতে rank অনুযায়ী ততদিনে সুরাটকলে মেক্যানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংএ ভর্তি হয়ে গেছে সে ।

ওয়েস্টবেঙ্গল জয়েন্ট এন্ট্রান্সে সে 77 rank করেছে অতএব যাদবপুরেই ভর্তি হবে স্থির করলাম । কিন্তু আমরা থাকব খড়গপুরে, সে কোলকাতায় ? আবার যাদবপুরের অবস্থা সম্পর্কে সংবাদপত্র মারফত যথেষ্ট ওয়াকিবহাল আমরা । ততদিনে BITS, Pilaniতে ভর্তি শুরু । সেখানেই ম্যাথস আর কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে ডুয়াল ডিগ্রিতে ভর্তি হল রাহুল।

এতদিনে খড়গপুরের প্রতি আমাদের আচ্ছন্ন ঘোরটা উধাও । একেই বলে Man proposes, God disposes ! ঘৃণা করতে শুরু করলাম খড়গপুরকে । প্রথম প্রথম ক্যাম্পাসে ঢোকবার মুখে চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসত । মনে হত কি কুলুক্ষণে এখানে এলাম ! বেশ তো ছিলাম কোলকাতায় । যে কলেজে আমার ছেলে সুযোগ পেয়েও কোনো অলিখিত কারণে প্রবেশ করার অধিকার পেলনা, সেখানে আবার কেন? অথচ উপায়ও নেই । অধ্যাপক স্বামীর ততদিনে সম্বচ্ছরের কোর্স স্ট্রাকচার তৈরী হয়ে গেছে, শেডিউল অনুযায়ী পড়াতে হবে ওনাকে । ঠিক করলাম প্রতি সপ্তাহে কোলকাতায় যাব । তেমন করেই চলল কিছুদিন ।

হয়ত ভালো ছিল সেই জায়গাটা । কিন্তু আমরা ভালো লাগাতে পারলাম ক‌ই ? হয়ত ভালো ছিল মানুষগুলো কিন্তু আমাদের কাছে ধরা দিয়েও দিল না যেন । কেমন সুন্দর নির্জনতা ছিল সেই জায়গার পথঘাটে । কেমন আবেশ জড়ানো ভালোলাগাও ছিল তার গাছপালাতে, পাখিদের ডাকে। আষ্টেপৃষ্টে কতরকম ফলের গন্ধ জড়িয়ে থাকত নাকে । কত রকমের বিচিত্র পাখির ডাক লেপটে থাকত দুকানে । প্রথম প্রথম মনে হত মহানগরের ভীড় ছেড়ে দুদন্ড শান্তির আশ্রমে এসেছি । কোলাহল নেই । ক্লান্তি নেই । সে এক সব পেয়েছির দেশে । হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতাম ফলন্ত আমগাছ । নিজের আলতো হাতে পেয়ারা তুলে নিতাম কত কত । বসন্তের বিদায়ে লেবুফুলের গন্ধে ম-ম করত আমার বেডরুম । দোলনচাঁপা, কুর্চি, কদম, গুলঞ্চ ভেসে থাকত আমার ড্র‌ইংরুমের স্ফটিকপাত্রে । প্রকৃতির ঋতু বৈচিত্র্যের আস্বাদ বুঝি পেয়েছিল আমাদের যৌবন । বুনোফুলের যৌবনগন্ধ নিতে নিতে সকাল শুরু হত টগর বনে । তারপর তুলসীতলায় জল ঢেলে প্রাতঃভ্রমণে । কত রকমের রাংচিতের বেড়া পেরিয়ে আমরা পথ হাঁটতাম ..খেয়ালী পথ ধরে হেঁটে যেতাম যেদিকে দুচোখ যায় । পাখী শিস্‌ দিত সেই পথে । চেনা চেনা রোদ্দুরকে অচেনা মনে হত যেন । ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাখতাম শ্রাবণে । শিশিরভেজা পথ হাঁটতাম খালিপায়ে ।

চেনাপথের অচেনা মানুষগুলো কেমন যেন আড়ষ্ট এখানে । নিষ্পন্দ ওদের জীবনগুলো । খেয়ে ঘুমিয়ে খাসা জীবন কাটত ওদের । আমাদের অসুবিধে হত । ওদের ভালোবাসায় ওম্‌ ছিলনা । ভালোলাগার অভিব্যক্তিগুলো ছিল কৃত্রিম । দম বন্ধ হয়ে আসত আমাদের । তবুও প্রকৃতির পরিবর্তনগুলো নিয়ে আর আমাদের জীবনের পথচলার খুঁটিনাটি গুলোকে নিয়ে ছিলাম আনন্দে ।

পলাশ কুড়োতে যেতাম বসন্তের বিকেলে । সবুজটিয়ার সাথে কমলারঙের পলাশ আর বাদামী ভেলভেটের বোঁটায় টিয়ার লাল টুকটুকে ঠোঁট দেখে মনে হত পাগল হয়ে যাব! এখানে না এলে বুঝি জীবনের অনেক কিছু অদেখা থেকে যেত । সূর্যমুখির বনে সবুজ টিয়ার ঝাঁক বন্দী হত ডিজিটাল এক ক্লিকে । আমাদের গাড়িঘরের পাশে ছিল মস্ত উইঢিপি । আর তার নীচে ছিল বিশাল এক ঢ্যামনা সরীসৃপের সংসার । বৃষ্টির জল ওর গর্তে ঢুকে গেলে সেই দাঁড়াশ সরীসৃপ বেরিয়ে আসত আর বাগানের টগর ফুলগাছের বেড়ার পাশ দিয়ে খেলা করে বেড়াত নিজের মনে । কখনো মুখে ব্যাঙ পুরে চুপচাপ গোল্ডেনহেজের মধ্যে বহুরূপী হয়ে আত্মগোপন করত । আমি চুপিচুপি দাঁড়িয়ে পড়তাম সেই দৃশ্য দেখে দুরুদুরু বুকে । ওর ভয়ে কচিকাঁচা ব্যাঙেদের সাতভাই প্রায়শঃই দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ত ঘরের মধ্যে । কোণায় কোণায় ব্যাঙেদের ডানপিটেমির সাক্ষী হয়ে দুপুরগুলো পার করতাম । এতকিছুর মধ্যেই মনের কোণে থিতিয়ে ছিল এক অতৃপ্তি। এক ইচ্ছে পূরণের ঘাটতি ।

প্রতিদিনের মর্নিংওয়াকে প্রকৃতির সাথে আমার নতুন করে আলাপ হত যেন। শহরে থেকে এই প্রকৃতিকে পাইনি কখনো । সান্ধ্যভ্রমণেও সেই নির্জনতা, ধূলো-ধোঁয়া মুক্ত গাঢ় সবুজতা আর হাওয়ার সজীবতা । প্রচুর লেখার খোরাক জোগাত এই শহর । নতুন নতুন গল্পের আর কবিতার আইডিয়া পেতাম মর্নিং ওয়াকের সময় । এখানে এসে অবধি সেটাই আমাকে পেয়ে বসেছিল ।

ভোর ভরলাম দুচোখ ভরে, সুর সাধলাম স্বরে
ইচ্ছেডানা বিছিয়ে দিলাম, বাংলামায়ের তরে ।

অনেকগুলো চৈতালী ভোর পেরিয়েও এমন সর্বনাশের ইশারা পাইনি । আজ ছাইরঙা কুয়াশার ভোরে হাঁটতে হাঁটতে পিচের পাকা রাস্তায় । দুপাশের শিমূল পলাশের সঙ্গী মহুয়া । মহুয়া সুখী ফুল । ফুল থেকে সবজে হলুদ ফলটুকুনিও ঝরে পড়ে মনের সুখে । সেই মহুয়া সরণী ধরে পথ চলায় যে মাদকতা, তা পেয়েছি আজকের ভোরে । হলুদ ফরাস পাতা মহুয়া সরণী বেয়ে চলেছি আর পাশের গাঁয়ের আবালবৃদ্ধবণিতার কোঁচোড় ভরে সেই মহুয়া ফল কুড়িয়ে নেওয়া দেখে মন পৌঁছে গেল সেই লালপাহাড়ির দেশে...

সেবার পুজোতে বোলপুরে একদল মাদল নাচিয়ের সাথে আলাপ জমেছিল । ওরা শ্যামলা গাঁয়ের শ্যামলা একদল মেয়ে । সাথে কয়েকজনের মরদ। ওদের চিকন কালো চুল, খোঁপায় বাঁধা বকের পালক, হলুদ গাঁদার ফুল, রূপোর শুলগা । লম্বাটে চোঙাকৃতির "মাদল" তালযন্ত্রটিকে আর গোলাকার তবলার মত "লাগড়া' বাদ্যযন্ত্রটিকে নিয়ে ওরা নাচে আর গান তৈরী করে । আর ওদের গান সৃষ্টির মূলে হল চৈত্রমাসের মহুয়া উত্সব । মহুয়ার মৌ জমে ওঠে ওদের ঘরে ঘরে আর ওরা নাচে, গান করে । সেদিনের মহুয়া কুড়োনোর সেই ছবিটা দেখে বুকে সেই মাদল বাজার শব্দ পেলাম ।
আর মনে মনে বলে উঠলাম
ও মেয়ে তুই কুথা যাস রাঙামাটির পরে
ধামসা মাদল, মহুয়া ফুল কুথায় আছে ঘরে ?

সেদিনের সেই চৈতী ভোর উসকে দিল আমার বসন্তকে আরো একবার! ...
(ক্রমশ)

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে ভালবাসেন, ভালবাসেন নতুন নতুন রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে। গদ্যে পদ্যে সমান সাবলীল ইন্দিরার ব্লগ পড়ুন আদরে...

আপনার মতামত জানান