যাত্রা শুরু

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

 

জীবন তো আসলে একগুচ্ছ মুহূর্ত। বা বলা চলে একটা এ্যালবাম, যাতে কতগুলো ছবি সাজানো রয়েছে। আর ঠিক যেমন করে আমরা এ্যালবামে
পুরনো প্রিয় ছবিগুলো বারবার ফিরে ফিরে দেখি, এই ব্লগও আসলে আমার সেই আরশিনগর— ফেলে আসা মুহূর্ত, যা মনে থেকে গেছে কোনও কারণে, বা অকারণেই, তাদেরকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখা। আর যারা আমার চোখে সেই মুহূর্তগুলি একবার দেখতে চায়, তাদের সাথে সেগুলি ভাগ করে নেওয়া। আবার কখনও একা একা কথা ব’লে যাওয়া। আমার ছোট্ট ঘুলঘুলি দিয়ে যতটা আকাশ দেখা যায়, যতটা গাছ-গাছালির ভিড়, মেঘ-রোদ্দুরের খেলা, পাখি, রাস্তার ব্যস্ত মানুষ, যত গান-কবিতা-ছবিদের সাথে দেখা হয়ে যায় হঠাৎ, তারা সবাই আমার প্রাণের বন্ধু হয়ে ওঠে। মুহূর্ত হয়ে ওঠে। বড় মুহূর্তপ্রবণ এই বেঁচে থাকা। ফলতঃ যা স্মৃতি শুধু তাই নয়, সত্তা ও ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে থাকা বহু বহু ঘটনাই বন্ধুতার দাবি নিয়ে কড়া নেড়ে যায়। তারাই আমার কবিতার গায়ে লেগে থাকে। কতগুলি আপাতভাবে তাৎপর্যহীন ঘটনাও যে কী গভীর ছাপ রেখে যায় তার তুলনা নেই। আবার হয়ত সেই অর্থে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনও ঘটনা কাহিনী হয়ে ওঠেনা। কবিতা-তো না-ই। জীবনের খুব সুক্ষ সুক্ষ ধুলোবালিতে কবিতা ঘুমিয়ে থাকে।

কত গান, কবিতা, চলচ্চিত্র, ছবি যে আমার এ্যালবামে সযত্নে সাজানো রয়েছে। রয়েছে এমন কতগুলি দৃশ্য, মুহূর্ত যা ভাবলে আজও মন আনন্দে ভ’রে যায়। আবার কখনও বিষাদের স্বাদ অনুভব করি। কারুণ্যের রসে আর্দ্র হয়ে উঠি। সেগুলি একান্ত-ই আমার নিজস্ব। পাঠককে বিশ্বাস করানোর দায় আমার নেই। তাঁদের মতামতও ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু আমার পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ে যা ধরা পড়ে তা স্বগতোক্তির মতো বলে যাব, তার কারণ আগেই বলেছি, আবার সেই মুহূর্তগুলির শিয়রে গিয়ে বসা। কপালে হাত রাখা। নিজের মতো করে যে কবিতা, গানকে পেয়েছি ঝরনাতলার নির্জনে, তাদের সাথে দেখা হবে আবার। যে মুহূর্তদের সাথে কখনও দেখা হয়নি, তাদের সাথেও দেখা হয়ে যেতে পারে হঠাৎ কোনও রাস্তার মোড়ে।
এছাড়াও হবে মজা, মজা আর মজা। শামিল হবেন নাকি?
এই যাত্রায় আমার সাথে যারা যাবার, তারা-ই যাবেন। এবার তবে যাত্রা শুরু হোক—




জানালা
ধরা যাক, কোনও এক নাম-না-জানা ছেলে দূরে কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক অনামি স্টেশনের স্টেশনমাস্টার। সেই স্টেশন দিয়ে সারাদিনে কটা ট্রেন যায় তা হাতে গুনে বলা যায়। ছেলেটি তার ছোট্ট কোয়ার্টারে একাই থাকে। একাই দুটো ফুটিয়ে খায়। সাথে শুধু রবীন্দ্রনাথ আর তার গান। আর একটা জানালা। একমাত্র জানালা। সকালে উঠে সাততাড়াতাড়ি ভাত বসাতে হয়। আলুসেদ্ধ, ডাল। পাশের পুকুরটায় তখন কচুরিপানাদের সবে ঘুম ভেঙ্গেছে দত্তদের নতুন বউয়ের হাতের ছোঁয়ায়। পরকীয়ায় পাছে নিন্দে রটে তাই নতুন বউ তাদের সরিয়ে দিচ্ছে দুহাতে, দূরে। কত দূরে? যত দূরে ছেলেটির ঘর? কুয়াশা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে, আর একটু করে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে নতুন বউয়ের ধনে খালির পাড়, কাল রাতের ভালবাসার দাগ। এখনই কোথা থেকে সব ছোট ছোট ছেলেমেয়ের দল ছুটতে ছুটতে চলে যাচ্ছে ইশকুলবাড়ির দিকে। ক্রিং ক্রিং শব্দে ভেসে যাচ্ছে শালবনের ভেতর হেঁটে যাওয়া মেঠোপথ। আর এ সবই ছেলেটিকে দেরি করিয়ে দিচ্ছে ষ্টেশনে যেতে। তার ভাত উথলে উঠছে। ডাল পুড়ে যাচ্ছে। ছেলেটি তাকিয়ে থাকছে জানালা দিয়ে। একমাত্র জানালা। যা তাকে দেখাচ্ছে এইসব, উজাড় করে। দূর কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রামে পড়ে থাকা, বাপমরা, মা-কে প্রথম বার ছেড়ে থাকা, বন্ধুহীন মনখারাপ ছেলেটিকে জানালাটি যেন ভৈরবী শোনাচ্ছে। “যারা বিহানবেলায় গান এনেছিল”। ছেলেটি শুনচ্ছে। আর ভেতরে ভেতরে কবি হয়ে উঠছে একটু একটু করে। আর ওদিকে একলা ষ্টেশন অপেক্ষা করে থাকছে তার। সাথে একটি নাম-না-জানা ট্রেন চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকছে তার জন্য। ছেলেটির বাড়ি ছেলেটিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ছেলেটি কি পারবে সাড়া দিতে?পারবে তার পুরনো পাড়ায় ফিরে গিয়ে কলতলার পাশ দিয়ে, রতন স্যারের বাড়ির পেছনের সেই অন্ধকার গলি’টা পেরিয়ে যেতে, যেখানে সে প্রথমবার চুমু খেয়েছিল, ছুঁয়েছিল তার নিজের মেয়েটির বুক? গলি’টা এখন অন্য কারও। মেয়েটির দূর কোনও গ্রামে বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেটি জানালা দিয়ে এখন দেখতে পায় তাকে। ওই দিগন্তে যেন কেউ সিঁদুর-কৌটো উল্টে দিয়েছে আলগোছে।

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী


নাম- শুভদীপ দত্ত চৌধুরী
ধাম- পশ্চিম মেদিনীপুর
জন্ম- ০৯/০৬/১৯৮৯ (জন্মেই নয় ছয়!)
মৃত্যু- মতান্তর বিস্তর।
শখ- গান শোনা, ঘুরে বেড়ানো, চিঠি লেখা, ক্রিকেট, আড্ডা, প্রেম…
শিক্ষা- ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. । এছাড়াও স্প্যানিশ সাহিত্য, ফরাসী সাহিত্য, জাপানী সাহিত্য, পর্তুগীজ সাহিত্য, ব্রাজিলিয়ান সাহিত্য (সদ্য বিশ্বকাপ ফুটবল হল বলে কথা!) সম্পর্কে অগাধ অজ্ঞতা।
কবিতা লেখা শুরু- প্রেমে ল্যাং খেয়ে ২০০৬ সালে। সে সব ডায়েরি-বন্দী মনখারাপ। কলেজ ম্যাগাজিনের পর প্রথম লেখা পাঠানো একসাথে “উনিশ কুড়ি” ও “দেশ”-এ ২০১১ সালে। কবিতাগুলি ওই বছরেই প্রকাশিত। এরপর বহু বড়, মেজো, সেজো, ফুল, রাঙা, ও ন’ ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশিত।

কবিতার বই- “ব্যথার বন্দিশ”(২০১৪), প্রকাশক- যাপনচিত্র
না, এই বইয়ের সাথে কোন স্ক্র্যাচ কুপন ফ্রী নেই। ফলে নেই অল্টো গাড়ি জেতার সুযোগ। তবে আছে সময় নষ্ট করার জন্য ২৭টি কবিতা।

ধর্ম- রবীন্দ্রনাথ, বর্ণ- মোটামুটি ফর্সা।
রূপ- আহা! রস- ডাহা!
শব্দ- দিস্তে দিস্তে।
গন্ধ- ডিওডেরান্টের উপর নির্ভর করে!
স্পর্শ- হাই-ভল্টেজ স্পার্ক!


আপনার মতামত জানান