ব্লগার কাঁদুনি

সরোজ দরবার

 

আপনি জানেন ও চোর। চোর নিজেও জানে সে চোর। তবু দুয়ে দুয়ে চোর হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমন সহজ সমীকরণে পড়বেই না। প্রথমে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে কী কী কারণে আপনি তাকে চোর বলতে চাইছেন। অতঃপর চোর স্বয়ং বলবে,কী কী কারণে চুরি করা সত্ত্বেও সে চোর হতে পারে না। তারও পরে যদি চোর চিহ্নিতকারী কর্তৃপক্ষ মনে করেন যে, চোর আসলে সত্যিই চোর, তবে গিয়ে চোর চোর হয়ে উঠবে। তার আগে অবধি চোরকে চোর বলা আর যাই হোক ন্যায়সঙ্গত কখনই নয়।
ন্যায়সঙ্গত যে নয় তা আপনি-আমি সকলেই জানি। তবু একটা সোজা কথাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এতক্ষণ বলার পিছনে একটাই কারণ- খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস। বিগত বেশ কয়েকদিনের কাগজ পড়ে প্রত্যেকদিনই আমার কাছে উপরের অনুচ্ছেদটি সারমর্ম হয়ে ফিরে ফিরে আসে। আশা করি, পরেরদিন সকালে নিশ্চয়ই অন্য কিছু উপলব্ধি হবে। কিন্তু আশায় যে চাষা চিরকালই মরে সে কথা আর কে না জানে।
অতএব জানা একটা ভজনই প্রতিদিন মনে করি। মীরার ভজন। ‘মাইয়া মোরি ম্যায় নেহি মাখন খায়ো’। ব্যাপারটা হল বালক কৃষ্ণ মাখন চুরি করে খেয়েছেন। এবং মা যশোদা তাঁকে হাতেনাতে ধরেছেন। এবার যশোদা যখন চুরির প্রমাণগুলো দিয়ে বলছেন, তুমিই চোর, তখন বালক কৃষ্ণ প্রথমে অস্বীকার করলেন। শেষে মাকে সেন্টিমেন্টাল করে তুললেন, এই বলে যে, কৃষ্ণকে মা নিজের বলে মনেই করেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষমেশ যশোদাই বলতে লাগলেন, না বাবা তুমি মাখন খাওনি। এবং সেই সুযোগে শব্দের ব্যবহারকে কাজে লাগিয়ে কৃষ্ণ দোষ স্বীকার করে নেবেন। অর্থাৎ ‘ম্যায় নেহি মাখন খায়ো’ থেকে চোখ টিপে হয়ে গেলেন ‘ম্যায়নে হি মাখন খায়ো’। এই শেষ অংশটুকু গাওয়ার আগে গায়ক বলেন, দেখুন অবস্থা, দুজনেই জানে কৃষ্ণ মাখন খেয়েছে, কিন্তু দুজনেই বলছে, কৃষ্ণ মাখন খায়নি। পুজোআচ্চায় আমার ভক্তির দৌড় ওই নারকেল নাড়ু অবধি, তাই আধ্যাত্মিক কারণে নয়, নিছক এই শেষ অংশটুকুর জন্য এই ভজনটি আমার মাথায় বারবার ঘুরে ফিরে আসে।
এটুকু যেন সময়ের ছাঁচের মতো। এক একটা ঘটনা তাতে ফেললেই আসল রূপটি ফুটে উঠে। এই যেমন ধরুন যদি একটা সুস্থ সবল লোক হঠাৎ হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাহলে কী হবে? ডাক্তারও পরীক্ষা করে জানবেন উনি অসুস্থ নন, উনি নিজেও জানেন উনি অসুস্থ নন। কিন্তু তবু দুজনেই অন্তত একবার বলবেন উনি অসুস্থ। আবার ধরুন, এক উটকো ক্রেতা এক শিল্পীর ছবি কিনলেন। এবার কী হবে?উনিও জানেন তিনি চিত্রকলার ভক্ত নন, তিনিও জানেন তিনি চিত্রকলার ভক্ত নন। কিন্তু দুজনেই বলছেন, তিনি চিত্রকলা পছন্দকারী একজন ক্রেতা। তারপর ধরুন একটা কেলেংকারিয়াস ইস্যুতে আপনার অভিযোগের তির ক্রমশ একজনের দিকে ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে। আপনিও জানেন উনি সব জানতেন, উনিও জানেন উনি সব জানতেন, কিন্তু কই একবার প্রমাণ করুন দেখি। বালক কৃষ্ণের হাতে যেমন মাকে আবেগপ্রবণ করে তোলার অস্ত্র ছিল, এখানেও তেমনি রাজনৈতিক চক্রান্ত আছে। মুখে মাখন লেগে থাকলেই মাখনচোর বলবেন, একি বাটার বিস্কুটের বিজ্ঞাপন নাকি!! প্রতিদিন কাগজ পড়ি, আর এরকম ভুরি ভুরি সামঞ্জস্য এসে আমাকে ভজনটির রচয়িতা সুরদাসের সামনে প্রণত করে তোলে। কী জিনিসটাই না লিখে গেছেন। মীরার আমলেও অর্থবহ। এ আমলেও সমার্থবহ। নিশ্চয়ই ইন্দিরা গান্ধির আমলেও তাইই ছিল। তখন জন্মালে না হয় পরীক্ষা করে দেখা যেত।
পরীক্ষা করে দেখেছি, এই ‘ম্যায় নেহি’ আর ‘ম্যায়নে হি’-র অন্তর্বর্তী পরিসরটুকুর মধ্যে বেশ এক ধরনের গা-ঢাকা দিয়ে বাজিমাতের বিমলানন্দ লাভ করা যায়। এই ধরুন এ বঙ্গের এক স্বয়ং-প্রতিষ্ঠান কবি-লেখকের প্রয়াণ হল। আমিও ক্যাফেটেরিয়া ঘষটানো কবি দেঁড়েকষে কটা বাছা খিস্তি দুম করে আউড়ে দিয়ে ভাবলুম, দেখ পাবলিক, আমি এঁর কেমন ভক্ত। তারপর যে প্রয়োজন না পড়লে তাঁর পদাঙ্ক আমি ভুলেও মাড়াব না, সে শুধু আমি কেন, পদাঙ্কর যদি প্রাণ থাকত সে নিজেও জানত। কিন্তু আসল ব্যাপারটা অন্য, পৃথিবীশুদ্ধ চাউর হল, এভাবেই বিপ্লব আর বিরোধিতার ঝাঁঝ পূর্বসূরী থেকে উত্তরসূরীর চোখে জল এনে দেয়। বিমলানন্দের ব্যাপারটা এক্ষেত্রে অবশ্য উলটো পথে হল, অর্থাৎ ‘ম্যায়নে হি’ থেকে ‘ম্যায় নেহি’।
এই দুজনেই জানি, অথচ দুজনেই জানি না এ আসলে এক মজারু। এই ধরুন, যিনি লিখছেন, তিনি নিজেও জানেন, আসলে তিনি ধোঁয়া ছাড়া কিছু লিখছেন না। যিনি পড়ছেন তিনিও জানেন ধোঁয়াশা ছাড়া আর কিচ্ছু মিলবে না। কিন্তু আখেরে কেউ কাউকে কিছুই বলবেন না। তারপর ধরুন, রাস্তায় কারও সঙ্গে দেখা হলে, সচরাচর যা কথা হয়- ‘ভালো তো? ভালো। আপনি? চলে যাচ্ছে। চলি তাহলে? আসুন, আমিও এগোই একটু দরকার আছে।’ এই ‘ভালো’ কিংবা ‘চলে যাচ্ছে’ বলার নিতিনিতি অভ্যাসে দুজনেই জানে, কেউ ভালো নেই। কিন্তু দুজনেই বাহ্যত জানল, দুজনেই ভালো আছে। অথচ আর একটু প্রশ্ন করলেই হয়তো আগল খুলত। কিন্তু তা আর হয় কই। সাত বছর রাণাঘাটে বেচু চক্কোত্তির হোটেলে কাজ করার পর গ্রামের লোকেদের কথা শুনে বিভূতিভূষণের হাজারি ঠাকুরের মনে হয়েছিল,এরা বড় বেশি প্রশ্ন করে। এত প্রশ্ন মানায় না। আমরাও তো রাতারাতি ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ থেকে ‘ওয়ান নাইট অ্যাট কলসেন্টার’ হয়ে গেছি। আমরাও জানি এত প্রশ্ন মানায় না। অতএব আমরা দুজনেই সব জানব, অথচ দুজনেই কিচ্ছুটি জানব না।
এদিকে জানা আর না জানার ফান্দে পড়িয়া প্রতিবারই কিছু বগা(ব্লগা হলেও মন্দ না) কেঁদে ককিয়ে মরে। কেউ বলে, ওরে চোখে আঙুল দাদাও যে এবার শ্রান্ত হয়ে পড়ল, আর কতদিন লুকোচুরি খেলে দিন কাটবে। একদিন অন্তত ভোরে কাগজ আসুক বেশ সোজাসাপটা হয়ে। একবার অন্তত কবি চূড়ামণিরা রসকলি মুছে বিভোরতা কাটিয়ে দেখুক বেঁচে থাকাটা কেমন দিন দিন বিচ্ছিরি হয়ে উঠছে। একপলের জন্য আমরা অন্তত নিজেদের কাছে সৎ হই, আর পাশের লোকটাকে বলি, আমিও ভালো নেই। কিন্তু বগার কান্না শুনতে আর কোনও আব্বাসউদ্দিন আসেন না।
ক্রমে ক্রমে ওই ব্যাটা বগা তথা ব্লগাও সুরদাসের শ্রীচরণে হাজির হয়। বুঝে যায় ‘ম্যায় নেহি’ আর ‘ম্যায়নে হি’-র মধ্যিখানের ছলনাটুকুই একমাত্র সত্যি। সারভাইবাল ফর দ্য ফিটেস্ট থিওরির একমাত্র বর্তমান আশ্রয়। ওটুকু আসলে ক্ল্যাসিক।
আর ক্ল্যাসিক কে না পছন্দ করে- সে সঙ্গীত হোক বা সিগারেট, অথবা এই ছলনা।

সরোজ দরবার

সরোজ দরবার


কথা ছিল আদরে বাঁদর হবার, হয়ে গেল ব্লগ লেখক। কিন্তু বাঁদরামি কমল কই? ভাগ্যিস বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা প্রবাদটি সত্যি। সেই জোরেই আদরে এবার তিতা পানের খয়ের। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উঠোনে হোঁচট খেয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে অবশেষে পেশায় সাংবাদিক। বেশিক্যালি না ঘরকা না ঘাটকা। জন্ম-হাওড়ায়। চরে বেড়ায়-কলকাতায়। না ভুলতে পেরেছে গ্রাম, না হয়েছে খাঁটি কোলকাতান। ফাঁটা বাঁশে আটকে ত্রাহি ত্রাহি রব। পেশা আর নেশাতেও একই সংকট। একদিকে তিতা হজম, অন্যদিকে তিতা উগরানো। সকলেই কলম ধরেন, কেউ কেউ কী-বোর্ড। অন্য কোনও ইজমে থাকার মতো মস্তিষ্ক নেই, কোনও বাদি নয় তাই, বিশুদ্ধ কী-বোর্ডি। এই করেই ধর্মে-জিরাফে-পদ্যে-গদ্ যে-গল্পে-আলাপে-প্রলাপে সর্বত্র গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। পানপাত্রে হাত দেওয়ার রেস্ত নেই, তাই পান পত্র নিয়েই হেস্ত নেস্তর আশায়। কী করতে চায়, ঈশ্বর খবরও রাখেন না। চোখে দৃষ্টি কম, গায়ে গত্তি নেই, ঘরে রোদ নেই, মিঠা পানকে খয়ের বেশি দিয়ে তিতো করে ফেলা ছাড়া আর কোন মুরোদ নেই। নেহাত বাঁদর-মুক্তো মালা প্রবাদটি ছিল বলেই, এ যাত্রায়...

আপনার মতামত জানান