অবান্তর ছাতিমের প্রলাপ

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

শরতের এইসব দুপুরগামী সকালগুলোকে কী নামে ডাকবে বলতে পারো? যখন আকাশে নায়িকা ও পার্শ্বনায়িকার মতো পাশাপাশি অবস্থান করে রোদ আর বৃষ্টি! ট্রেনের জানলা দিয়ে তুমি দূরে হেঁটে যেতে দেখ অঙ্ক স্যারের সাইকেল, তাহলে কী আজ কেয়ার মনখারাপ? ভাবতে ভাবতেই ‘কাআআটট’ বলে জোরে চিৎকার করে ওঠে ইন্দ্রদার গম্ভীর গলা। আমরা ফিরে আসি আমাদের হলুদ ট্যাক্সি আর সবুজ অটোর রঙিন শহরে। নীল সাদা বর্ডারের এই শহরে এখনও শরত-হেমন্তের সন্ধ্যেয় ছাতিম ফোটে কেন, এই প্রশ্নের উত্তর কেউই দিতে পারল না। এমনকী মিষ্টু মাসিও না, যদিও এতোদিনে সবার জানা হয়ে গেছে যে বাবাই দা শেষবারের মতো কলকাতা ছেড়ে যাবার আগে মিষ্টুমাসিকে একটা ছাতিমের গুচ্ছ দিয়ে গিয়েছিল।---এই এতটা পর্যন্ত লিখতে লিখতেই দেখ মনে হচ্ছে কার লেখার যেন নকল করে চলেছি! তোমাদেরও মনে হচ্ছে তো? ছোটোবেলায় দাদাভাই যেমন শ্লেট ভর্তি করে ‘ঈ’ লিখে নকল করতে দিয়ে বলত “বুলোও দিদু, ভালো করে বুলোও”। সেই থেকে আজ অবধি কার কার যে লেখায় আঙ্গুল বুলিয়ে চলেছি!

যেরকম মাটির কাদা কাদা বাদামী-লাল রাস্তায় পায়ের আঙুল বুলোতে বুলোতে কীভাবে ছোটোবেলার অঙ্গনওয়াড়ীর গ্রাম ছেড়ে চলে এলাম নদীতীরের এক মায়াময় মফঃস্বলে, সেখান থেকে আবার জিটি রোড ধরে পায়ের আঙ্গুল বুলোতে বুলোতে ঘষটাতে ঘষটাতে এখন আমার শোবার ঘরের জানলা দিয়ে বাইপাসের আলো ঝলমলে শপিং মল দেখা যায়। লাল আলো। আমিও রাতে ফেরার সময় ফুট ওভারব্রীজের ওপরে লাল আলোর মেয়েদের দেখি। দেখি তাদের সঙ্গে দরাদরি করা ক্লান্ত-ক্ষুধার্ত পুরুষদের। তাদের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে যে ঘাম সেই ঘাম খানিক বাদে মিশে যাবে ব্রীজের আড়ালে দাঁড়ানো সস্তার নাইলন শাড়ীদের গায়ে। এইভাবে স্পর্শ বিক্রীত হতে দেখি, আর ত্রিফলার আলোয় সব ঘাম কেমন ধুয়ে যায়। দেখি।

তারপরেও গণেশ টকীজ থেকে অটো ধরে যখন সন্ধ্যে শেষের ফেলা ছড়ানো বাজারের ভিতর দিয়ে আসবে, তুমিও ছাতিমের গন্ধ পাবে কেন? কেমন যেন মায়া মায়া, নেশা নেশা, কান্না কান্না গন্ধ! ওদের পাতার নাম সপ্তপর্ণী কিন্তু ফুলের নাম ছাতিম। একটা স্কুল-কলেজের ভালো নাম, অন্যটা ডাক নাম, যেমন পিউ-এর ভালো নাম বাসবদত্তা, খানিকটা সেইরকম, না? মনে আছে? ইংলিশ কোচিং ক্লাসের সময়ে ওর মুখে কেমন একটা রেণু রেণু জ্যোতি বেরত লোডশেডিং হয়ে গেলে? লোড শেডিং আর হয়না বলেই কি ও হারিয়ে গেল? নাকি অন্য কোনো লোডশেডিং-র ঘরে মোম জ্বালিয়েছে? আর তাই ভেবে তোমার দরজাও আজ সকাল থেকে বন্ধ? বন্ধ দরজার ওপার থেকে শুনতে পাই আজ ট্রাফিক সিগন্যালে “বাজলো তোমার আলোর বেণু” বাজছে, কিন্তু মহালয়ার এখনও এক সপ্তাহ দেরী, আর পাড়ার পুজোয় এবারের বাজেট আগেরবারের থেকেও কম। তবুও ট্রেনের জানলায় কাশফুলের উপত্যকা। তারা পুজোর বাজেট জানেনা, ছাত্রবিক্ষোভ জানেনা, শ্রমিক অসন্তোষ জানেনা, জানেনা তোমার মনখারাপও। ওরা উৎসব জানে। যদিও উৎসবের রঙ নীল-সাদা নয়, কিন্তু উতসব আসে, শহরের রঙেই, হাত পা মুখ মিলিয়ে। জোরে না হাঁটলেই তো পিছিয়ে পড়বে। যদিও এই লেখাটা শুধু ছাতিম নিয়েই লেখার কথা ছিল।


কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে
কিঙ্কিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কিণীর কবিতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলে।ব্লগার হিসেবে আদরের নৌকায় কিঙ্কিণীর যাত্রা শুরু হল আজ থেকে।পড়ুন এবং জানান কেমন লাগল কিঙ্কিণীর ব্লগ...


আপনার মতামত জানান