আমার পূর্ণচ্ছেদ ব্যবহার, এবং মৌলিনাথ বিশ্বাস

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 



সম্প্রতি একটি অনলাইন পত্রিকায় আমার এই কবিতাটি প্রকাশিত হয়।

কর্ণ ২০১৪ : একটি পুনরাধুনিক কবিতা
অনুপম মুখোপাধ্যায়


অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলাব্জ চক্রবর্তী, রমিত দে-কে নিবেদিত



পেশ হচ্ছে। শ্রেষ্ঠত্বের অনেক বাহিরে
অনেকের সম্ভাবনায় ১-এর কবিতা। বাংলা ভাষার
দেবোত্তর
ছোট্ট
কবিতা। এখান থেকে ঠিক ২২ বছর পরে
এই ঘটনার বয়স হচ্ছে
এখানকার ২৬। পাঠিকার
অঙ্গটির কল্যাণ হোক। পাঠকের জিনিসটির


গৌরব হোক হে

না
না
এখানে প্রলাপগুলো সংলাপ হয়ে উঠছে। পাঠক আর কবির চোখের
সরকারি মিলন হচ্ছে না। হেমন্তে কাঁদছে
হেমন্তের পয়মন্ত ধান। ঘরের কোণে আটকে থাকা
ধানমন্ডী নয়। শব্দগুলোর ফাঁকে কোনো
হাসি থাকছে না। কান্না থাকছে না। জীবনের
স্তব্ধতায়
রব
পুড়ে যাচ্ছেন

পুড়ছে
তো
পুড়ছে
তো
পুড়ছে
নায়ক
যেখানে চমকে উঠে ম্লান হচ্ছেন না। ‘শর’
বললে লোভ হচ্ছে। তাঁর। বাণ
দিলে নাভি জাগছে। তাঁর। আর
কলম থেকে
উঁকি দিচ্ছে প্রাণ। মৃত্যু অবধি লাফিয়ে ওঠা
অঞ্জলিক
চাঁদের অজুহাতে পৃথিবীর আগুন পেতে চাইছে। এখানে
প্রার্থনা। শান শওকত। এই

৩-এর দশকের কবিতার মতো নয়। ঘরের চালে কথা বলছে
বাসরাস্তার রোদ। ধুলো মেখে শুয়ে থাকছে
রুপো। মানতাসা। ভাতকাপড়নোয়াপুতুলগরু

এখানে
আকর্ণ প্রয়াস হচ্ছে হে

রোদে- আর -ছায়ায় -আস্ত- আস্ত- পেঁপেগাছ- নির্বিকার- সৈন্য- যথা- দাঁড়িয়ে- থাকছে -এখানে

যেহেতু
রাঢ়ভূমি আমেরিকায় নেই, আর
কলকাতা
ভারতবর্ষে নেই, যেখানে
আপনি চুপ থাকছেন
আপনার মানচিত্র ঠিক আমার মতো হচ্ছে। আমি
খইয়ের উপরে মুড়কির রঙ দেখছি। আপনার মতো
হতে চাইছি না। দুধ যেখানে গরম হচ্ছে
দৌড়ে যাচ্ছে খালিপোঁদ পোলাপানের দল। যে লোকটা
কথা বলছে
বন্ধ চোখের উল্টোপিঠে
নিজের কথাই শুনছে। আপনি আমাকে
ভয় পাচ্ছেন না

এই
যে
ইতিহাসের ইচ্ছেকথা শুরু করছি এখানে, সে আমার স্বপ্ন
বলছে কি ? অনেক পাখির অনেক ডাক শুনে
আমি ১-এর ধর্মযুদ্ধ


বয়ান করছি
এখানে







(চিত্রঋণ : ১। প্রাচীন মন্দিরচিত্র ২। আমার নিজের তোলা একটি ছবি ৩। জম্মু-কাশ্মীরের অনামা শিল্পী, উইকিপিডিয়ার সৌজন্যে)


আমি পত্রিকার লিংক কিছু কবি এবং সম্পাদককে পাঠাই। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ‘কালকথা’ পত্রিকার সম্পাদক কবি শ্রী মৌলিনাথ বিশ্বাস। উনি আমাকে ই-মেলে লেখেন :


priya anupam,
chhabiguli ki kabitar texter angsa?
kichhu pangti BESH VALO. if there is any philosophical thought behind the WRITING, it is not yet clear after 1 reading. ekti kabita kon dasaker mato ba mato nay, ta text-e ullekh kara atmabiswasheentar parichay, pthak k chhoto kara.
ei vangi nirmaner ekmatra parichay hole bujhte habe, kabir khamti achhe. 2/4 bar niriksha chole. AMI APACHHANDA KARCHHI. tabe e take gurutwa na deoar sampurna ADHIKAR apnar achhe, bahulya jeneo, bole rakhlam.
SAMPADAK hisebe amar patrikay ami apnar kabita prokash korbo ei samay-e anya ki vabe bangla kabita lakhar chesta hachhe tar proman hisebe. itihaser kachhe SAT thakte. kintu PATHAK HISEBE apnar kabita amar kachhe ekebarei samadar pabe na, antata apatata.

suvechha.
moulinath biswas.



আমি উত্তর দিই


ছবিগুলো টেক্সটের অংশ। যদি কবিতার ইলাস্টিসিটিতে আস্থা রাখি। ছবিগুলো বাদ দিলেও পড়া যায়। যদি কবিতার ইলাস্টিসিটিতে আস্থা রাখি। আমি সেই কবিতা লিখতে চাই, যেখানে কোনোকিছুই অপরিহার্য নয়, পরিহার্যও নয়। কিছু লাইন অনায়াসে বাদ দিতে পারবেন। আবার বেশ কিছু লাইন পরে ঢুকেও আসতে পারবে।


৩-এর দশকের মতো নয়, এই অর্থেই বলা যে হাতে নিয়ে দেখিনি কি চাষার লাঙ্গল, বা বালতিতে টানিনি কি জল... এখানেই আটকে যায়না সামান্য জীবন, বা তার সঙ্গে এক হওয়ার পিপাসা। লোকজীবন নিয়ে কিছু বলতে গেলে তা আভাসিত হতে বাধ্য, এবং একজন মধ্যবিত্ত 'শিক্ষিত' শিকড়হীন কবির পক্ষে সম্ভব নয় তার সঙ্গে এক হওয়া। চিন্তাটাই অবান্তর। ৩-এর কবিতার মতো যেটা নয়, সেটা আমার কবিতা নয়, সেটা জীবন, যে ছবিটা দেওয়া হয়েছে সেই বাড়িটার ভিতর ও বাইরের জীবন, সেখানে কোনো বিপন্ন বিস্ময় বোধ করে না কেউ, কেউ এক গাছি দড়ি নিয়ে অকারণে যায় না মাঝরাতে কোনো গাছের দিকে। গেলে ঋণ বা জীবনে পেরে না ওঠার জন্য যায়। বোধের কারণে যায় না। ওই আক্রমণটা জীবনানন্দীয় আবহাওয়ার উপরে। হয়তো দৃষ্টিকটূ। তবু না করে পারিনি।


এই ভঙ্গি আমি নির্মাণ করেছি এটা যেমন ঠিক, এটাও খাঁটি কথা যে, এই ভঙ্গিও কিন্তু আমাকে নির্মাণ করে নিচ্ছে।

কথা চলুক।



মৌলিনাথ বিশ্বাস এরপর উত্তর দেন

ANEK ANEK ANTARIK SUVECHHA O VALOBASA. KATHA HOTE THAKBE.


এর পরে আমি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিই :

: অনেকে বলছেন,'ওরকমভাবে পূর্ণচ্ছেদ দিলেই বুঝি পুনরাধুনিক কবিতা লেখা যাবে, আপনি যেমন দিচ্ছেন?' আমার উত্তর, সেটা একেবারেই না। 'আমার মতো' ওরকমভাবে পূর্ণচ্ছেদ দিলে আপনি অধুনান্তিকের চক্করে পড়ে যাবেন। অধুনান্তিক ... কবি আর আরেক কবির ফারাক মুছে দিতে চায়। চায় সবার ভাষাকে এক ছাঁচে ঢেলে দিতে, যাতে সকলেই কবি হতে পারে। আমি সাফ বলছি,আমার মতো লিখলে আপনি পুনরাধুনিক নন। নিজের লেখা আবিষ্কার করলে আপনি পুনরাধুনিক, যে লেখায় আপনি আর আপনাকে চিনে নেওয়া যাবে।... আর, এই পূর্ণচ্ছেদগুলো ওভাবে কেন দিচ্ছি এই প্রশ্ন শুনে শুনে সত্যিই ঝালাপালা হয়ে গেলাম। সেটার উত্তর দেব 'আদরের নৌকা'-এ আমার ব্লগে। সম্ভবত আসন্ন শনিবার।


এরপরে মৌলিনাথ বিশ্বাস আমাকে একটি ই-মেল করেন :


priya anupam,
apnar 'purnachhed' niye ami vebechhilam, amar patrikay apnar kabita chhapar aage. amar mone 2/1 rakam vabna esechhilo:
1) chhed kakhono purna hay na, tai niche alada kore likhe seta bojhano.
2) ekta stanza ke next stanza/ line/ even sabda er sange linking korte.
3) vabnar (thought/ theme) prabohamanata indicate korte.
4) visual effect ante.
5) space ke kabitay different dimension dite.

samasya jakhan seta prothamei thakchhe.
jai hok, apni to next week kothay bodhay ei niye bistarita likhben.
amar vabnagulo SAMPURNA VUL hote pare. abar angsik ba sampurna thik o hote pare.
THIK, angsik ba sampurna jai hok, hole, ei mail er kono sabdai prokash korben na.
VUL hole apni echhe hole prokash korte paren, amar kono asubidha nei.
valobasa, abaro.
moulinath biswas.



আমি উত্তর দিই :


মৌলিনাথদা,

একমাত্র চতুর্থ কারনটা বাদ দিয়ে সবগুলোই ঠিক। আমি কিন্তু আগের মেল (আংশিক) এবং এই মেলটা আমার উত্তর সহ (আংশিক) প্রকাশ করার অনুমতি সত্যিই চাইছি। এই কথোপকথন হয়তো কোথাও খুব মূল্যবান হয়ে উঠছে।


মৌলিনাথ বিশ্বাস উত্তর দিলেন -


প্রিয় অনুপম,
আপনার নিরাপত্তা ও আমার সম্মান ২টোই বজায় রেখে , ছাপতে পারেন। ছাপা হবে এ ভেবে তো লিখিনি, তাই ভাষাটা অশিক্ষিতের মতো হয়ে আছে!! থাক, কিছু করার তো আর নেই।
অসম্পাদিত ছাপাই ভালো, তাই না?
ভালোবাসা।
মৌলিনাথ বিশ্বাস।



আমার ওঁকে শুধু এটুকু বলা বাকি রয়ে গেছে, বলতে ভুলে গেছি, কবিতায় একটা ভিস্যুয়াল এফেক্ট এমনিতেই থাকে, যে কোনো কবিতায়। ওটার জন্য দাঁড়ির এই ব্যবহার নয়। কবিতার প্রথমের পূর্ণচ্ছেদ আসছে কারণ আগের কবিতাটার সঙ্গে যোগ বোঝাতে চাইছি। আর, পূর্ণচ্ছেদ কেন, যে কোনো ছেদ ও যতিচিহ্নই আমাদের ভাষায় এসেছে ইংরেজি ভাষাকে অনুসরণ এমনকি অনুকরণ করে। আজ থেকে ২০০ বছর আগেও আমরা কবিতায় কমা, সেমিকোলন, ড্যাশ, হাইফেন, কোলন ব্যবহার করতাম কি? পূর্ণচ্ছেদ ব্যবহৃত হত, কিন্তু সেটা আজকের মতো করে নয়। আজ আমাদের কবিতায় ছেদ-যতিকে আমরা গদ্যের মতোই ব্যবহার করি, উচ্চারণের বিশ্রামের ব্যাপারটা গৌন হয়ে গেছে। সর্বোপরি, ছেদ-যতির মনঃস্তাত্বিক ভূমিকাটাকে খারিজ করা হচ্ছে। আমি এই ব্যাপারটা মানতে পারি না। ছেদ-যতির গতানুগতিক এবং ঔপনিবেশিক এই ব্যবহার আমাদের কবিতাকে অনেকখানি জীর্ণ করছে। বাসি করছে।
কেউ কেউ ছেদ-যতি ছাড়াই কবিতা লিখছেন, আমিও লিখেছি, আমার অসংখ্য কবিতায় কোনো ছেদ-যতি ছিল না। অনেক সময় শুধু লিডর চিহ্ন দিয়েই কবিতা লিখেছি।
কিন্তু ছেদ যতি ব্যবহার না করলে আমাদের সমসাময়িক ভাষা থেকে পালানো হয় বলে মনে হচ্ছিল। কেউ স্রোতে গা ভাসাচ্ছেন, কেউ স্রোত থেকে উঠে পালাচ্ছেন।
আমি সাঁতার দিতে চাইছি। এটুকুই।
কিন্তু এটা পুনরাধুনিক কবিতার কোনো অবশ্যমান্য শর্ত নয়। আমি এভাবে ছেদ-যতির সঙ্গে একটা ফয়সালায় আসতে চাইছি। এটা শুধু আমার পথ। অন্য কবির নয়। আরেক পুনরাধুনিক তাঁর যুদ্ধটা তাঁর নিজের নিয়মে করবেন।



অনুপম মুখোপাধ্যায়

অনুপম মুখোপাধ্যায়


জন্ম ১৯৭৯। শূন্য দশকের কবি ও গদ্যকার। একমাত্র পেশা : বিতর্কের বাইরে থাকা।
অধুনান্তিক পরিসরে লেখালেখি শুরু করে একটা সময় অনুপম বুঝতে পারেন, এই পরিসরে সংশয় এবং ক্লান্তি ছাড়া একজন কবির কিছু দেওয়ার নেই তাঁর পাঠককে। বুঝতে পারেন সংলাপের স্থান ক্রমেই নিয়ে চলেছে প্রলাপ। কাব্যগ্রন্থগুলোর নামকরণ থেকে শুরু হয়ে দুই মলাটের ভিতরে ও বাইরে অসংলগ্নতাকে ব্যঞ্জনা হিসেবে ভুল করছেন কবি, সমালোচক এবং পাঠকেরা। চারদিকে তাকিয়ে দেখতে পান, বাংলা সাহিত্যের কোনো বাজার না থাকলেও বাজারিয়ানার রাজত্ব চলছে। যে বইগুলো আধুনিকের স্বর্ণযুগে বটতলায় বিকোত, সেগুলোই হয়ে উঠেছে মূলধারা, এবং সিরিয়াস সাহিত্য চলে গেছে প্রান্তে, প্রায় বিনাশের কিনারায়। এই পরিসরে কবিতাচর্চার এবং জীবনযাপনের অর্থকে যদি পুনরুদ্ধার করতেই হয় তবে একলা চলতে হবে, অনেকের পাশে। গোষ্টী এখানে সংঘের মুখোশ পরেছে। সেই মুখোশের আড়ালে মুখ লুকোতে চাননি অনুপম। ব্যক্তিগতভাবে একটি বিপ্লবের সূচণা করতে চেয়েছেন।সম্পূর্ণতার দিকে যাত্রা, যা কদাপি ফুরোবে না। তার নাম পুনরাধুনিক। না, re-modern নয়। বলতে পারেন neo-modern। নতুন আধুনিক। এই শতাব্দীর নিজস্ব আধুনিক। সময় এবং স্থানের আদল ও আদরকে স্বীকার করেই।

আপনার মতামত জানান