প্রার্থনা - নিভৃতে যত ফিস্‌ফিস্‌

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 

রবিবারের সকালে, কাছাকাছি কোনও চ্যাপেল থেকে প্রার্থনার ধ্বনি ভেসে আসে। ঠিক কি শব্দ, কি সেই প্রার্থনার বক্তব্য... তা ঠিক করে বুঝতে পারি না। শুধু সমবেত কণ্ঠস্বর আর অর্গানের সুর ভেসে আসে। আসলে তো অর্গ্যান নয়... হয়ত বড়জোর খুব দামী পিয়ানো অথবা সিন্থেসাইজার। আমি এত দূর থেকে তো একবর্ণও বুঝতে পারলুম না ঐ প্রার্থনার, যার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা, তিনি নিয়মিত শুনছেন, সেই কোন কাল থেকে.. হয়ত বোঝেন। আমি ঠিক বুঝি না, প্রার্থনা কে একপ্রকার স্মরণ এবং প্রাপ্তি-স্বীকার বলেই মনে হয়। মানে, মন হয় সেরকমই হওয়া উচিৎ। কিন্তু তাই কি শুধু হয়? নাকি এই প্রার্থনার অনেকটা জুড়েই আসলে শুধু অসীমের কাছে দু’হাত পেতে ভিক্ষা করা? সে যেন কোনও দিকে না এগোনো মহাস্থবির অনিশ্চয়তা এবং অপূর্ণতাগুলোর কথা একে একে নির্গত করার একটা জায়গা। সেই কয়েক ধাপ উঁচু নির্ভরযোগ্য একটা আসন যা আমাদের সাধারণ চেতনা এবং সীমিত সহ্যশক্তির প্রাণগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য খুব খুব জরুরি হয়ে ওঠে। ত্যাগ, আধ্যাত্ববোধ, আশেপাশের সব কিছু কে জড়বস্তু এবং মায়া বলে সব কিছুর ঊর্দ্ধে অন্য কোনও সত্ত্বাকে অন্বেষণ করা শুধু কঠিনই নয়... সত্যি বলতে, সর্ব ক্ষেত্রে সকলের পাথেয়ই হবে না। ঠিক যেই ভাবে রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে বলেছেন “উপবাস ক'রে, আকাশের দিকে তাকিয়ে, অনিদ্র থেকে, সর্বদা মনে মনে বিতর্ক ক'রে পৃথিবীকে এবং মনুষ্যহৃদয়কে কথায় কথায় বঞ্চিত ক'রে স্বেচ্ছারচিত দুর্ভিক্ষে এই দুর্লভ জীবন ত্যাগ করতে চাই নে। পৃথিবী যে সৃষ্টিকর্তার একটা ফাঁকি এবং শয়তানের একটা ফাঁদ তা না মনে ক'রে একে বিশ্বাস ক'রে, ভালোবেসে, ভালোবাসা পেয়ে, মানুষের মতো বেঁচে এবং মানুষের মতো মরে গেলেই যথেষ্ট - দেবতার মতো হাওয়া হয়ে যাবার চেষ্টা করা আমার কাজ নয়।” (শিলাইদহ, অক্টোবর ১৮৯১ [ছিন্নপত্র]) সেই প্রবলভাবে জীবনে মানুষের মত বাঁচার ইচ্ছেটা শুধু কোনও ব্যক্তির একার নয়... সকলের। আর সেই কারণেই গুরু-গম্ভীর দর্শন, অসীমের আশ্রয়ে মোক্ষ অথবা নির্বানলাভের আড়ালে... সেই ছোট ছোট আপাত তুচ্ছ প্রার্থনাগুলো ফিসফিস করে। যার আসলে প্রার্থনা নয়... চাওয়া, নিবিড় ভাবে অনন্তের কাছে বেঁচে থাকার জন্য চেয়ে যাওয়া।

আর এই চ্যাপেল থেকে ভেসে আসা সমবেত কণ্ঠস্বরই কত কিছু একসঙ্গে মনে করিয়ে দেয়... হঠাৎ মনে করিয়ে দেয় বেথ্‌লহেম। বেথ্‌লহেম কিন্তু অধুনা প্যালেস্তাইনেরই একটা অংশ, যা গাজা ভূখণ্ড থেকেও খুব একটা দূরে নয়। সে দেশের প্রার্থনা কেমন? গাজায় আছড়ে পড়া শেলগুলোর গর্জনে কি কেঁপে ওঠে বেথ্‌লহেম? গোটা শনিবার রাত জুড়ে বিস্ফোরণের শব্দে বার বার শিউরে ওঠার পর, কেমন শুনতে লাগে রবিবারের সকালে সমবেত প্রার্থনার ধ্বনি? ঠিক সেইরকমই কিছু প্রার্থনার ধ্বনি ভেসে আসে হয়ত সিনাগগ্‌ থেকেও। আচ্ছা, ১৯৪৫-এর সেপ্টেম্বার মাসের পর জার্মানীর সিনাগগ্‌গুলোতে কেমন করে আবার প্রার্থনা শুরু হয়েছিল? শুরু হয়েছিল কি আদৌ? নাকি তখনও কোনও বাদ্যযন্ত্র বাজালে সবার আগে ধ্বনিত হ’ত হুটারের শব্দ, যা কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পকে হুঁশিয়ার করে দিতো... গ্যাস চেম্বার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারপর... কেমন একটার পর একটা বছর কেটে যায়। সেই যুদ্ধের মাঝখানে ফিস্‌ফিস্‌... সেই প্রার্থনা। অসীম অনন্ত অবধি পৌঁছয় কিনা জানি না... সেই দুশ্চিন্তা যেমন মন কে আচ্ছন্ন করে। ঠিক সেইরকমই উদীত হয় অস্কার শিণ্ডলার, নিকোলাস উইণ্টন... এনারা আছেন বলেই বোধহয় অসহায়ের ঈশ্বর বিশ্বাস এখনও শেষ হয়ে যায় না।

আবার সেই ফিসফিস ভেসে আসে, প্রার্থনা চলছে। কুয়াশার মত ধূপ-ধূনোয় আচ্ছন্ন চারিদিক। লাহোর থেকে অমৃতসর আর অমৃতসর থেকে লাহোর... যাত্রী নয়, রক্তাক্ত লাশ বোঝাই ট্রেন। সরকারী বাটোয়ারার পর বেশ কিছু তাড়াহুড়ো, অনিশ্চয়তা... বার বার প্রার্থনা, চোখ বন্ধ করে... যখন সেই প্রার্থনাই শেষ সম্বল। তারা দণ্ডকারণ্যতে গেছিলো... তারপর মারিচঝাঁপি? তারপর? তারপর কেউ কিছু জানে না বোধহয়... সেখানে ফিসফিস আরও বেশি প্রবল... ঝাঁক ঝাঁক বোলতার মত বোঁ বোঁ করে কান আর মাথার চারিদিকে। তারপর সবাই খুব খুশি হয়... আসলে, বছরের পর বছর এমন প্রার্থনা ঘিরেই তো জাবতীয় উৎসব আর খুশির রঙ! সেই উৎসবের রঙেই ইছামতীর দু’কূল কাঁপিয়ে সারি সারি নৌকা বিজয়াদশমীর ঢাক বাজায়, নিরঞ্জনের আশ্চর্য উৎসব। রমজানের চাঁদ দেখে প্রার্থনা... আর হাসিমুখে কোলাকুলি। ভাল আছি, এই উৎসব দেখলেই বোঝা যায় আমরা সবাই খুব ভাল আছি। এই প্রার্থনা, উৎসব, ছোট ছোট খুশি নিয়ে সুস্থ থাকার চেষ্টা, আর বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাওয়া... এইটাই থাকে... বাকি সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা... দু’দুটো মর্মান্তিক বিশ্বযুদ্ধও যেখানে বিগত শতাব্দীর ঘটনা হয়ে যায় চোখের পলকে... সেখানে কেমন করে বারামুল্লার হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর প্রিয়জনেরা সুবিচার পাবে? ‘আচ্ছে দিন’-এর জোয়ারে কি আর এইসব প্রার্থনার ফিসফাস শুনতে পাওয়া যায়?

আর এই সব সাধারণ... অতি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অতি সাধারণ স্বপ্ন... অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া ইচ্ছেগুলো, অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস... এই সবই তো সকালের সমবেত ফিসফিসের মধ্যে দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বাইরের আকাশ পায়। তারপর তো সেই মাথার ওপর উত্তপ্ত সূর্য, না হ’লে প্রবল বর্ষণ... কাঁধে কাঁধে ধাক্কা খেতে খেতে হাঁটা, না হ’লে লম্বা ট্রাফিক জ্যামে আটকে সিগন্যালের আলো পরিবর্তনের অপেক্ষা করা। সেই সময়ে পাশ দিয়ে কোনও অ্যাম্বুলেন্স বা শ্মশান-বন্ধুদের ম্যাটাডোর অন্য কোনও ফিসফাস নিয়ে চলে গেলেই বা কি। আসা-যাওয়া তো এই ভাবেই চলে আসছে চিরকাল। তাহ’লে, যার জীবন... যে বাঁচল, যার লড়াইটা এখনও চলছে... আর সব কিছুর মধ্যে হতাশায় ডুবে সে কেন হাসতে ভুলে যাবে? তার কান্না যেমন অন্য কেউ কাঁদেনি... তার হাসিটুকুও তাকেই হেসে নিতে হবে। আর সেই নিয়েই তার রবিবারের সকাল, তার একাগ্রচিত্তে অনন্তের কানে কানে ফিসফিস করা। সেই ফিসফিস শুরু হয় ঠিকই... কিন্তু থামে না আর। কেবল বাহ্যিক প্রার্থনা প্রক্রিয়ায় একটা যতি টানা হয়। মুহূর্মুহু ফিসফিসটা আমাদের নিঃশ্বাসের মত এখানে-ওখানে, কাছে-দূরে ঠিক নির্গত হয়... দিন কাটে, বেলা বেড়ে রাত হয়। নাগরিক কোলাহলে সে ফিসফিস মিশে থাকে একই ভাবে... মনে হয়, যে সব শহরের ফুটপাথ যত চওড়া, সেই সব শহরে বোধহয় ক্ষুদ্র প্রাণগুলো একটু বেশি নিরাপদ। ঠিক যেমন, কবিরা একটু বেশি নিরাপদ সেই সব রাজপথে, যেখানে বুকের ওপর সেলাইয়ের দাগের মত ট্রামলাইন শুয়ে থাকে না।

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


ব্যাঙ্গালোর প্রবাসী জয়দীপের কাজই হল উইকেন্ডগুলি এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো, ফটোগ্রাফিও তার সাথে যুক্ত হয় বটে। গদ্যে পদ্যে সমান সাবলীল জয়দীপ আদরের নৌকার সহ সম্পাদনার কাজ করে চলেন নিঃশব্দে। এবার তার ব্লগ পড়েই বরং পাঠক আরও জানুক তার সম্পর্কে

আপনার মতামত জানান