দাদু-কাহিনী ১

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

 

আমার জন্মের আগে তো বটেই, আমার মা-বাবার বিয়েরও আগে আমার ঠাকুরদা মারা গেছেন। ঠাকুরমাও মারা গেছেন আমার জন্মের আগেই। কাজেই আমার দাদু ও দিদুন-ই ছিল আমার কাছে এই স্পেশাল সম্পর্কটির সংজ্ঞা ও উদাহরণ। সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমি মামার বাড়িতে থাকতাম। এক-ই শহরে, মেদিনীপুরে আমাদের বাড়ি ছিল বটে, কিন্তু আমি থাকতাম প্রথমে দাদু যেখানে চাকরি করত, সেই সেচ-দপ্তরের কোয়ার্টারে। কিছুতেই দিদুন-কে ছেড়ে থাকতে চাইতাম না। আমার বাবা অধুনা পূর্ব মেদিনীপুরে (তখন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলা ছিল) থাকতেন। ওখানেই আমার দেশের বাড়ি। কিন্তু আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা সব-ই মেদিনীপুর শহরে। মামাবাড়ির সান্নিধ্যে। আমার পড়াশোনার খাতিরেই বাবা এখানেই, মানে শহরে চলে আসেন। দাদুর ছিল ব্যবসার শখ। এবং খাদ্য-রসিক। মনে পড়ে প্রতিদিন নিজে বাজার করত। প্রায় তিন রকমের মাছ আসত প্রতিদিন। রবিবার খাসি। আমি যদিও এই দুই-রকম বস্তু-ই খেতাম না। কাজেই আমার যে তার বাজার করায় খুব উৎসাহ ছিল তা নয়। তো যেটা বলছিলাম, দাদু আর বাবা, সাথে মামাও, মিলে শুরু করল একটি হোটেল কাম তেলেভাজার দোকান। সেই দোকান আজও আছে, ও দিব্যি চলছে। ইদানিং কর্মচারীর অভাব দেখা দিয়েছে, ফলে কিছুটা টালমাটাল অবস্থা। যাক সে কথা, এই গল্প আমাদের দোকান নিয়ে নয়। আমার দাদু-কে নিয়ে। আমি-ই ছিলাম দাদুর একমাত্র নাতি। কাজেই খাতির ছিল খুব। আমাকে খুউউউব ভালবাসত দাদু। দাদু গড়বেতায় তার দেশের বাড়ি যেত প্রায়-ই, বিশেষ করে রিটায়ারমেন্টের পরে। দেশের বাড়িতে চাষবাস ছিল। যে কদিন দাদু বাড়িতে থাকতো না, আমার যেন কিছুতেই সময় কাটত না। কাঁহাতক আর শুধু দিদুনের উপর অত্যাচার করে সময় কাটে? তার উপর সে এতই সুগৃহিণী ও রন্ধননিপুণা ছিল সবসময় আমার সাথে খেলবার সময় কোথায় তার? হেঁশেলের যে হুঁশ ছিল না, তা তো রান্নার লিস্টিতেই মালুম পড়ে। আর আমার বিশেষ বন্ধু ছিল না। এমনিতেই খুব লাজুক ছিলাম, তার উপর আমাকে ভাল করে ভয় দেখানও হয়েছিল বাড়ির বাইরে একা বেরলেই ছেলেধরা এসে টুক করে ধরে নিয়ে চলে যাবে। আর আমি বরাবর-ই সিংহ রাশির কলঙ্ক! কাজেই নিজে নিজেই ঘরে খেলতাম। ক্রিকেট তখনও ভর করেনি। টুকটাক নানা সাইজের বল, আর কিছু খেলনাবাটি নিয়েই খেলতাম। তবে আমার প্রিয় খেলা ছিল মহাভারত, রামায়ণ খেলা। সেই খেলায় আমার হাতেখড়ি দাদুর হাত ধরেই। যদিও তার গল্প বেশি শুনেছি দিদুনের কাছেই। এখানে বলে রাখি তখনও অপু পড়িনি, দেখিওনি। দাদু আমাকে কঞ্চি বাঁকিয়ে তাতে সুতলি দড়ি বেঁধে ধনুক বানিয়ে দিয়েছিল। ঝ্যাঁটার কাঠি হত আমার তির। ধুপের বাক্স তূণীর। আমি যখন যেমন ইচ্ছে তখন তেমন রোল নিতাম। অর্জুন, আর রাম আমার খুব প্রিয় ছিল। দাদু কখনও আমার সাথে খেললে তাকে হয় রাবণ বা দ্রোণাচার্য করতাম। তাতে আমার-ই জিত হত। ইতিহাস-ই বলি বা পুরাণ—তাকে তো আর বদলানো যায় না। সে চেষ্টাও করিনি।
দাদু-ই আমাকে প্রথম মামাবাড়ির পাশের পুকুরে সাঁতার কাটতে শেখাবার চেষ্টা করেছিল। চেষ্টা বলছি, তার কারণ আমি আজও সাঁতার কাটতে পারি না। তাই জীবনে বারবার ভরাডুবি হয়েছে। সেই সাঁতার শেখার দিনগুলি ছিল ভারি মজার। দাদু প্রথমে জলে আমাকে কোলে নিয়ে নামত, দিয়ে আমার পেট-টা ধরে রাখত আর আমাকে জলের উপর শুয়িয়ে দিত, দিয়ে বলত হাত পা ছোঁড়। পাখি যেভাবে ডানা মেলে, বা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সৈনিকরা যেভাবে ঢাল তলোয়ার চালায়, সে ভাবে হাত পা ছুঁড়তাম আমি, চরম আনাড়ির মত। শুরুতে খুব ভয় করত পাছে দাদু ছেড়ে দেয়, তখন তো ছোট, কত আর বয়্‌স নয় কী দশ, বুঝতাম না, যারা ভালবাসে তারা কখনও ছেড়ে দেয় না। আস্তে আস্তে ভরসা হতে শুরু করে দাদুর উপর, তখন পুকুরে নেমে খুব মজা পেতাম। নিজেও উঠতাম না, দাদুকেও উঠতে দিতাম না। দাদু বাড়িতে না থাকলে জলে নামা হত না আমার।
মনে পড়ে শীতের দুপুরগুলোর কথা। ছাদের বেশির ভাগ অংশ-ই ছেয়ে থাকত লাউ বা কুমড়োর লতায়। এছাড়াও ছিল নানা রকমের গাছ-গাছালি। গোল ও ধানি লঙ্কার গাছ ছিল মনে পড়ে। আর কিছু ফুলের গাছ। দাদু আর দিদুন দুজনেরই ছিল গাছের শখ। শীতের দুপুরে আমরা ছাদে যেতাম, মাদুর পেতে ঘুমতাম, গল্পের বই পড়তাম, খেলতাম। আমার দাদু দোকানে যে বেগুনি হবে তার জন্য বেগুন কাটত, আমি অবাক হয়ে দেখতাম কী ভাবে অসম্ভব দ্রুততায় আর কী পাতলা করে দাদু বঁটিতে বেগুন কেটে চলেছে আমার সাথে কথা বলতে বলতেই। আর পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়েছে আর পিঠে। মাথার পেছন থেকে একটা নরম আলো ছিটকে বেরত, যেমনটা দেখেছিলাম দেবতাদের মাথার পেছনে বেরোয় সিরিয়ালে। যেন ঈশ্বর স্বয়ং এসেছেন আজ আমাদের ছাদে, আর আমাকে শেখাচ্ছেন বীজমন্ত্র, স্মিত হাস্যে ভরে আছে সমস্ত বিকেল। শান্ত মুখে তিনি আমার সমস্ত নির্বোধ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছেন, ঠিক যেমন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুন সম্মোহিতের মত বসেছিলেন রথে, আর এক আশ্চর্য রশ্মির মতো তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিকেলের আলো মেশা অন্তর্দৃষ্টি ঢেলে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। কেন যে দাদু-কে শ্রীকৃষ্ণের রোল-টা দিলাম না কোনওদিন। আজ বিকেলের আলো-নেভা ভরসন্ধেবেলা খুব আফসোস হয়।
(ক্রমশ)

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী


নাম- শুভদীপ দত্ত চৌধুরী
ধাম- পশ্চিম মেদিনীপুর
জন্ম- ০৯/০৬/১৯৮৯ (জন্মেই নয় ছয়!)
মৃত্যু- মতান্তর বিস্তর।
শখ- গান শোনা, ঘুরে বেড়ানো, চিঠি লেখা, ক্রিকেট, আড্ডা, প্রেম…
শিক্ষা- ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. । এছাড়াও স্প্যানিশ সাহিত্য, ফরাসী সাহিত্য, জাপানী সাহিত্য, পর্তুগীজ সাহিত্য, ব্রাজিলিয়ান সাহিত্য (সদ্য বিশ্বকাপ ফুটবল হল বলে কথা!) সম্পর্কে অগাধ অজ্ঞতা।
কবিতা লেখা শুরু- প্রেমে ল্যাং খেয়ে ২০০৬ সালে। সে সব ডায়েরি-বন্দী মনখারাপ। কলেজ ম্যাগাজিনের পর প্রথম লেখা পাঠানো একসাথে “উনিশ কুড়ি” ও “দেশ”-এ ২০১১ সালে। কবিতাগুলি ওই বছরেই প্রকাশিত। এরপর বহু বড়, মেজো, সেজো, ফুল, রাঙা, ও ন’ ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশিত।

কবিতার বই- “ব্যথার বন্দিশ”(২০১৪), প্রকাশক- যাপনচিত্র
না, এই বইয়ের সাথে কোন স্ক্র্যাচ কুপন ফ্রী নেই। ফলে নেই অল্টো গাড়ি জেতার সুযোগ। তবে আছে সময় নষ্ট করার জন্য ২৭টি কবিতা।

ধর্ম- রবীন্দ্রনাথ, বর্ণ- মোটামুটি ফর্সা।
রূপ- আহা! রস- ডাহা!
শব্দ- দিস্তে দিস্তে।
গন্ধ- ডিওডেরান্টের উপর নির্ভর করে!
স্পর্শ- হাই-ভল্টেজ স্পার্ক!


আপনার মতামত জানান