একটি অহেতুকীকথোপকথন

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 


শ্রাবণ সায়াহ্নে সমগ্র আশাহীনতাকে অবলুপ্ত করে হস্তিনাপুর গগনে মন্ডিত বহুস্তর মেঘমালা। আসন্ন বরিষণের আশা ও আশঙ্কায় বিবিধ দোলাচলে জনপদবাসী। গঙ্গা নদীউপকূলের এই দেশে অতিবৃষ্টির বন্যাভীতি এবং শস্য ফলনের আকাঙ্খা প্রতি শ্রাবণের প্রায় অভ্যস্ত যাপনচিত্র। সহসা প্রিয়তমার মিলনেচ্ছায় কামাতুর ভেকের সরব কন্ঠ অপ্রতুল নয়।
রাজপ্রাসাদটির বয়েস গণনা করার মূঢ়তা কেউ করেনা এই জনপদে – স্বয়ং মহারাজ ভরত, তস্য পিতা দুষ্যন্ত সকলেই এই প্রাসাদের গন্ডির ভিতরেই বেঁচে ছিলেন জীবদ্দশায় – লোকশ্রুতির নায়ক হবার আগে। সে বহুযুগ পূর্ব্বের বৃত্তান্ত।
এখন অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের শাসনকাল। যদিও জনতার চোখে মহারাজের এই অধিষ্ঠান নেহাৎ সময়ের বিচিত্রগামী মনোভাব হেতু।
রাজার কনিষ্ঠ ভ্রাতা পান্ডুর স্বতঃপ্রণোদিত সিংহাসন ত্যাগের পর, দায়ভার সামলাতেই ধৃতরাষ্ট্র সিংহাসন আসীন হয়েছিলেন। পান্ডু এবং তস্য কনিষ্ঠা পত্নী মাদ্রীর অকাল মৃত্যু সেই দায়ভার অনির্দিষ্টকাল বিলম্বিত করেছে – যতোদিন না পান্ডুর জ্যেষ্ঠপুত্র যুধিষ্ঠির উপযুক্ত না হন – অবশ্য জ্যেষ্ঠ ধার্তরাষ্ট্র দুর্যোধন মনে করেন – এই সিংহাসন তাঁর একান্ত উত্তরাধিকার। কে জানে এই প্রশ্নের কি মীমাংসা রয়েছে কালের গর্ভে।
মহামন্ত্রী বিদুরকে ইদানীং অনেকেই মহাত্মা নামাঙ্কিত করছে – সেটা তাঁর নিজকর্ণগোচরও হয় – প্রায়শই।এই উপাধি বিদুরের খুব প্রিয় নয়। উপাধি বস্তুটিই এক শ্রেণীর অযাচিত বিড়ম্বনা, সেই উপাধির সমকক্ষ হতে হতে মানুষ প্রায়শই তাঁর স্বাভাবিক ধী হারিয়ে ফেলে। বিদুর এই উপাধিটিকে তাই গ্রহণও করেননি আবার লোকজনের স্বাভাবিক প্রশংসা আহত করতে বর্জনও করেননি।
অবশ্য বিদুরনীতির সার্বিকতা এবং সুচারু সম্পাদনক্রিয়া ইতিমধ্যেই বিদুরকে অন্য মন্ত্রীদের চেয়ে বিশেষ করে তুলেছে – তাঁর ক্ষেত্রজ ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে। তিনি এই মন্ত্রীটিকে বিশেষ ভরসা করেন – হস্তিনাপুরের অভিভাবকতুল্য শান্তনব ভীষ্মের মনোভাবও তাই।
শ্রাবণে রাজসভা প্রায় অনিয়মিতই হয়। এই সময় দর্শনার্থী, দূত এবং বিচারপ্রার্থী তিনপ্রকার ভিড়ই কম থাকে। কারণ আর কিছুই না – কর্দমাক্ত দুর্গম পথে যাতায়াত করার অসুবিধা। সেহেতু প্রায়শই কিছু রাজ্যশাসননীতিজনিত আলোচনার পর প্রায়শই সভা সাঙ্গ হয়ে যায়। আজও তাই হলো।
বিদুর সভার থেকে বেরিয়ে – রাজপ্রাসাদের মূল ফটকের দিকে আসছিলেন। সহসা অতিপরিচিত যুধিষ্ঠিরকে দেখে স্থির হলেন। কৈশোর কাটিয়ে ষোড়শ বর্ষাধিক বয়েস হলো ছেলেটির। পান্ডুর মৃত্যুর পর জননী পৃথার পাশে যে পঞ্চদশবর্ষীয় কৃশকায় তাপসবেশী বালক এসে দাঁড়িয়েছিলো হস্তিনাপুর রাজপথে – আজ একবছর পর তাঁর সাথে এই ধীমান আর্য রাজপুত্রের মিল অতি সামান্যই।
কুলগুরু কৃপাচার্যের ভগ্নীপতি ভারদ্বজ দ্রোণ যুধিষ্ঠিরসহ সমগ্র কুরুরাজপুত্রবৃন্দের অস্ত্রগুরু নিযুক্ত হয়েছেন কিছুদিন হলো – শেষ কিছুদিন আবহাওয়া প্রতিকূল হবার দরুণ অস্ত্রশিক্ষা বন্ধ রয়েছে। রাজপুত্রেরা আশ্রম থেকে সাময়িকভাবে রাজপ্রাসাদেই এসে বসবাস করছেন।
যুধিষ্ঠির মগ্নচিত্তে একটি গবাক্ষের পাশে উপবিষ্ট হয়ে অন্তর্মগ্ন ছিলেন। বিদুরের পান্ডুর এই জ্যেষ্ঠতনয়টির প্রতি সামান্য পক্ষপাত আছে – পরবর্তী হস্তিনাপুর নরেশ হিসেবে একেই উপযুক্ত লাগে তাঁর।
বিদুরের মানসে একটু কথা বলার ইচ্ছা হলো।
- ‘কি চিন্তায় জ্যেষ্ঠ পান্ডব?’
বিদুরের শান্ত গম্ভীর কন্ঠস্বরে চকিত ভঙ্গ হলো যুধিষ্ঠিরের।
- ‘প্রণাম কনিষ্ঠ পিতা, ভগবান ক্ষত্তা’।
বিদূর যথোচিত আশীর্বাণী করলেন। তারপর পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন
- ‘কি চিন্তাগ্রস্ত ছিলে পুত্র?’
যুধিষ্ঠিরকে সামান্য বিব্রত লাগলো। বিদুর সেই সংকোচ দেখে মৃদুহাস্যে বললেন
- ‘নিঃসংকোচে বলো পুত্র। কিসের চিন্তায় মগ্ন ছিলে?’
- ‘অযোগ্যতার’।
বিদুর উত্তর শুনে অবাক হলেন। যুধিষ্ঠির সেই বিস্ময় নিরসনেই বললেন
- ‘সমগ্র হস্তিনাপুর আমাকে ভবিষ্যত নরেশের স্থানাভিষিক্ত করে রেখেছে মানসে, তা আপনারও অবগত। কিন্তু আমি সম্ভবতঃ কৌরব পান্ডব সম্মিলিত ভাবে সবচেয়ে অযোগ্য ব্যক্তি আমার মাপকাঠিতে এবং এটা বিনয় নয়’।
এবার বিদুরের কৌতুকবোধ হলো
- ‘বিনয় নয়? তবে কী? আত্মবোধে অপারগতা?’

- ‘না কনিষ্ঠ পিতা। রাজপদে আসীন হবার কোন গুণ আমার আছে বলুন? আমি না ভীমসেন অথবা দুর্যোধনের ন্যায় বলশালী। না অর্জুনের ন্যায় ধীরোদাত্ত মহাবীর। না মহাপন্ডিত, না অসীম সাহসী, না মগধরাজ সম্রাট জরাসন্ধের ন্যায় ব্যক্তিত্বমন্ডিত। কুরুবংশরাজতালিকার মায়াগগনে শশধরে কলঙ্কবৎ লাগবে আমাকে – যে পদ কোনোকালে রাজচক্রবর্তী ভরত গৌরবান্বিত করেছেন, যে পদ কুরুজাঙ্গল দেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রথিতযশা কুরু পত্তন করেছেন – সেই পদে আমি?’

বিদুর যুধিষ্ঠিরের নিকটে বসলেন।
- ‘তবে তুমি কি চাও যুধিষ্ঠির?’

- ‘পুনরায় তাপসজীবন হয়তো বা। রাজনীতির এই মহাঙ্গণে নিজের অনুপযুক্ত স্কন্ধে হস্তিনাপুরের ভবিষ্যত দায়ভারের ছায়া বড়ো দীর্ঘতর হয়ে যাচ্ছে ক্ষত্তা’।

- ‘আর উপযুক্ত রাজা কে যুধিষ্ঠির?’

- ‘যার মধ্যে শাসকোচিতো কোনো স্বভাব আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, বীরত্ব আছে’।

- ‘আর?’

- ‘আর ক্ষত্তা?’

- ‘আর মুখ্য গুণটি বাদ দিলে জ্যেষ্ঠ পান্ডব’।

- ‘মুখ্য গুণ?’

- ‘অনৃশংসতা। যাঁর অভাব পরিচালিত ও পরিচালকের ব্যবধান রচনা করে’।

- ‘ক্ষমা করবেন ক্ষত্তা। কিন্তু আপনার বাক্য বোধগম্য হচ্ছেনা আমার এখন, রাজার কর্তব্যের মধ্যে রাজ্যসীমা বিস্তার, যুদ্ধবিগ্রহ পরিচালনা অবশ্যম্ভাবী। অনৃশংস রাজা সঠিক শাসক হবেন কী করে?’

- ‘রাজা শব্দকে শাসক অর্থে পরিসীমিত করছো যুধিষ্ঠির। নিতান্ত অনুচিৎ। রাজা আসলে পালকের মতো। প্রতিটি পিতার ন্যায় অবশ্যই অন্যায়ে সে কঠোর হবে, কিন্তু তা শোধনের উদ্দেশ্যে – হিংসা চরিতার্থে নয়’।

- ‘কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহ ক্ষত্তা? রাজ্যের সুরক্ষা? আর পরিবৃদ্ধি?’

- ‘সুরক্ষা তখনই প্রয়োজন যখন তা বিপন্ন। যেকোনো যুদ্ধের পূর্ব্বে দৌত্যের উদ্দেশ্য জানো নিশ্চয়?’

- ‘শক্তিপ্রদর্শন?’

- ‘ভুল, মিত্রকামিতা। সমস্তপ্রকার যুদ্ধই আসলে এক একটি ভুল সিদ্ধান্ত। সেটা তখনই ন্যায় যখন সেটা অপারগ হয়ে নিতে হয়; আর রাজ্যের পরিবৃদ্ধি – সার্থক রাজাকে সেটা রক্তপাতে করতে হয়না পুত্র। সার্থক রাজার রাজসূয় বশ্যতা স্বীকার হয় সানন্দে’।

- ‘আপনি অলীক কথা বলছেন ক্ষত্তা। ক্ষত্রিয় সন্তান যুদ্ধহীন অলসতায় অসার্থক জীবনে পতিত হবে’।

বিদুর কিঞ্চিৎ সময় নিলেন।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে তখন। রাজপ্রাসাদের অলিন্দে দীপগুলি প্রোজ্বল করে যাচ্ছে পরিচারকেরা একে একে।
চারপাশে একটা নিরবিচ্ছিন্ন হঠাৎ স্তব্ধতা। বিদুর কিছুটা সময় নিয়ে মৌনভঙ্গ করলেন।
- ‘চতুর্বগের অন্তর্গত সমস্ত মানুষের সার্থক জীবন বলতে তুমি কি বোঝো যুধিষ্ঠির?’

- ‘ব্রাহ্মণ্যচিতো তপোব্রতী জীবনযাপন, ক্ষত্রিয়োচিতো বীরত্ব ও শাসন, বৈশ্যচিতো অর্থনীতি এবং শূদ্রচিতো সেবা’।

- ‘এসকল তো উপসর্গ – আসলে তা নয়’।

- ‘তাহ’লে?’

- ‘স্বধার্মিক জীবন’।

- ‘ধর্মরক্ষা তো ব্রাহ্মণ্যবৃত্তি ক্ষত্তা’।

- ‘তুমি রক্ষার কথা বলছো, আমি যাপনের – তুমি ধর্মের কথা বলছো, আমি স্বধর্মের’।

- ‘পার্থক্য?’

- ‘অনুশাসন আর স্বাধীনতার। ধর্ম সাধারণী বোধগম্য একটি অনুশাসন। স্বধর্ম পালনে এই মর্ষকামী পৃথিবীর বেশিরভাগ জীবাত্মা অক্ষম সেহেতু একটি পালনযোগ্য অনুশাসন। অবশ্য জ্যেষ্ঠপিতা ভীষ্ম, মহর্ষি ব্যাসের ন্যায় ক্ষণজন্মারা ধর্ম বলতে স্বধর্মই বোঝেন

- ‘স্বধর্ম কী?’

- ‘নিজকর্মে অনুরক্ত থাকা। মোহহীন একাগ্র কর্মময়তায় লিপ্ত থাকা’।

- ‘আমিও তো সেই কথাই বলছি ক্ষত্তা। ক্ষত্রিয় হিসেবে আমার কর্ম বীরচিতো জীবননির্বাহ’।

- ‘বীরত্ব একটি প্রদর্শন যুধিষ্ঠির। ক্ষত্রিয়ের ধর্ম সেখানে শেষ হয়না। ক্ষত্রিয়ত্ব শুরু হয় সাহস থেকে। পবিত্র পাবকের ন্যায় প্রতিকূলতায় একা সংযমী থাকার সাহস থেকে, নিষ্ঠুরের প্রতিবাদ করার সাহস থেকে, অসহায়কে পরিত্রাণের সাহস থেকে, অহেতুক লোকক্ষয়ের প্রবণতা থেকে দূরে থাকার সাহস থেকে। রাজত্ব ক্ষত্রিয়ত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়। রাজার কাছে সাহসের দাবি সেহেতু সর্বাধিক’।

- ‘অর্থাৎ?’

- ‘রাজার সাহস তাঁর ধৈর্যে, সংযমে। যেকোনো পর্যায়ে রিপুপ্রভাবের উর্ধ্বে বিচরণ করার নির্মোহতায়। সিদ্ধপুরুষের ন্যায় নিজ দুঃখে অনাবিল থেকে প্রজাদের আশয় হবার আত্মবিলোপে। রাজা প্রজাদের প্রতিনিধি যুধিষ্ঠির, কোনো মন্দিরোস্থিতো বিগ্রহ নয়’।

- ‘তবে রাজধর্ম কী?’

- ‘অবিচলিত থাকা। প্রতিটি পদক্ষেপে ক্ষণিক প্রখ্যাতির আত্মরতিসুলভ সুখ উপেক্ষা করা। রাজনীতিকে আলিঙ্গণ করা এবং সম্ভব হলে আত্মস্থ করা। আর মনে রাখা পৃথিবীর অধীশ্বরের উচ্চাকাঙ্খা যে রাজার আছে, সমগ্র পৃথিবীই তাঁর সন্তানবৎ। সেহেতু প্রতিটি সন্তানের লোকক্ষয়ে বিনাশ আসলে সে রাজার পালক হিসেবে, পিতা হিসেবে পরাজয়’।

- ‘রাজার ধর্ম তাহলে অভিভাবকত্ব?’

- ‘রাজা হিসেবে’।

- ‘আর মানুষ হিসেবে?’

- ‘মানুষ হিসেবে প্রতিটি মানুষকে নিজের নিজের কর্মে অব্যাহত থেকে যেতে হবে। যথার্থ দেশগঠনের জন্য কোনো রাজা, কোনো নীতি, কোনো মহাত্মা বিদুরের বাণী যথেষ্ট নয় পুত্র। আসলে প্রত্যেক মানুষ রাজাকে প্রতিনিধি স্থানীয় করে অনাবিল নিশ্চিন্ত থাকে। দেশ কোনো একা মানুষের ক্ষমতাধীন নয়। প্রতিটি মানুষ রাজা হিসেবে, প্রজা হিসেবে, যদি নিজ কর্মে অক্ষুণ্ণ না থাকে, দেশের জন্য নিজের কর্তব্যে অক্ষমতা দেখায়, যদি রাজাকে ঈশ্বর ভেবে নিজে দীর্ঘসূত্রিতায় কাল কাটায় – সেখানে কোনো ধর্মরাজ্য অসম্ভব’।

- ‘তাই প্রত্যেক মানুষের কাছে ধর্ম নিজস্ব?’

- ‘তাই তো স্বধর্ম বললাম পুত্র। আর অনৃশংসতা রাজার সবচেয়ে বড়ো গুণ বললাম কেন জানো?’

- ‘কেন?’

- ‘কারণ একমাত্র অনৃশংসতাই স্বধর্মপালনের পরিবেশ তৈরী করতে সক্ষম। কোনো ভীতির পরিবেশে আর যাই হোক স্বধার্মিকতা হয়না পুত্র। নিজের স্বধর্ম, নিজের কাজ আসলে নিজের স্বাধীনতার অঙ্গাঙ্গী’।

- ‘তাহলে রাজা আসলে স্বাধীনতাধর্মের পালক?’

বিদুর মৃদুহাস্যে প্রত্যুত্তর দিলেন – নীরবতায়। তারপর কিছু না বলে যুধিষ্ঠিরের তরুণ মস্তক আঘ্রাণ করে চলে গেলেন।
~
শ্রাবণ সায়াহ্নে সমগ্র আশাহীনতাকে অবলুপ্ত করে হস্তিনাপুর গগনে মন্ডিত বহুস্তর মেঘমালা। আসন্ন বরিষণের আশা ও আশঙ্কায় বিবিধ দোলাচলে জনপদবাসী। গঙ্গা নদীউপকূলের এই দেশে অতিবৃষ্টির বন্যাভীতি এবং শস্য ফলনের আকাঙ্খা প্রতি শ্রাবণের প্রায় অভ্যস্ত যাপনচিত্র। সহসা প্রিয়তমার মিলনেচ্ছায় কামাতুর ভেকের সরব কন্ঠ অপ্রতুল নয়।
যুধিষ্ঠির এই মোহময়তায়, পৃথিবীর আর পৃথিবীর মানুষের স্বাধীনতার প্রেমে পড়লেন।

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

কৌস্তভ ভট্টাচার্য


কৌস্তভ
পেয়ারের নাম 'কে' -
না 'কে কৌস্তভ?'
জাতীয় প্রশ্ন শুনে মোটেই খুশি হয় না - বাচ্চা বেলায় কাফকা পড়ে একটু 'কে' লিয়ে গেছে। অফিসে কাজে মন নেই, নোকিয়ার ফোন নেই - এমন কি কোনো ভাইবোন নেই (এটা মেলানোর জন্য বললাম),যা নেই ভারতে নামে মনোজ মিত্তিরের নাটক আছে জানি, পরে বই বেরনোর সময় নামটা চেঞ্জ করে দেব!

যা নেই ভারতে সম্পর্কে
মহাভারত নিয়ে বাঙলায় রাজশেখর বসু উত্তরযুগে বসে মুখবন্ধ লেখা এবং বালি দিয়ে বঙ্গোপাগরে বাঁধ নির্মাণ – প্রায় সমতুল্য ধৃষ্টতা।সেহেতু বেশি কথা বাড়িয়ে – নিজের অশিক্ষা কতোটা সুদূর প্রসারিত তা সর্বসমক্ষে সোচ্চারে জাহির করার মধ্যে কোনো গৌরব অনুভব করিনা। তাই শুধু কয়েকটা কথা।
বি-আর-চোপড়া যখন তাঁর অধুনা কিংবদন্তী টেলিসিরিয়ালটি প্রথমবার টেলিকাস্ট করা শুরু করেন – সেই বছরটা – ১৯৮৬ - বর্তমান লেখকের জীবনে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে – কারণ সেই বছর আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। স্বভাবতই সেই প্রথম টেলিকাস্টের কোনো স্মৃতি আমার নেই।
ফলতঃ আমি খুব রেয়ার ব্রিড যে আগে মহাভারত পড়েছে (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কল্যাণে)। পরে দেখেছে – নাইন্টিজে রিটেলিকাস্টের সময়।তাই – বি-আর-চোপড়াময় মহাভারতে আচ্ছন্নতাটা আর যাই হোক আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি – যদিও ওটাই সম্ভবতঃ আমার দ্বিতীয় প্রিয় অনস্ক্রিণ অ্যাডাপ্টেশন – পিটার ব্রুকের পর (হায় সত্যজিৎ আপনি বড়ো তাড়াতাড়ি সিনেমা বানানো ছাড়লেন)।
মহাভারতের কাহিনীকে এমনিই এই ব্লগে উত্তরোত্তর কচলানো হবে, তাই বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু এটুকু বলার যে, এই বইটি সম্ভবতঃ, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে – কিন্তু শুধু একটিমাত্র উদাহরণ। ধর্মবকের সাথে যুধিষ্ঠিরের সেই বিখ্যাত ডায়লগ যে অধ্যায়ে তার শুরু হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে থেকে এবং শেষ হচ্ছে অজ্ঞাতবাস সম্পর্কিত একটি আশীর্বাণী দিয়ে – মধ্যিখানে ব্যাস নিজের দর্শনটা বলে দিয়েছেন।
এইরূপ কাহিনী এবং দর্শনের মিশেলের অদ্ভুত দক্ষতা সেই যুগে যাঁর ছিলো – তাঁর চরণে প্রণিপাত না করলে সোজা বাঙলায় পাপ হবে।
এই ব্লগের নামের সাথে সাযুজ্য রেখে সবকটি ঘটনা – মূল মহাভারতে নেই – কিন্তু যেসব ঘটনার জের টানা হচ্ছে গল্পগুলির টাইমস্পেসে সেসব আছে। শুধু ঘটমান বর্তমানটা বানানো।
যে সমস্ত বই ছাড়া এই ব্লগটা হোতোনা –
১) মহাভারত – রাজশেখর বসু
২) মহাভারত – কালীপ্রসন্ন সিংহ (রেফারেন্স বুক হিসেবে)
৩) মহাভারতের ছয় প্রবীণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৪) মহাভারতের প্রতিনায়ক - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৫) মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৬) মহাভারতের অষ্টাদশী - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
শেষে একটা কথা – ব্যাস ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’ বলতে সম্ভবতঃ ঘটনার কথাই শুধু বলেননি। অনুভবের কথা, দর্শনের কথাও বলেছেন – জীবনের এই অল এনকম্পাসিং বিশালত্বের মধ্যে শুধু অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে যে গল্পগুলো – সেগুলো ব্যাসের ব্যাপ্তির বাইরের অনুভবকে ছুঁয়ে ফেলছে – তা আর বলি কি করে।
সেদিক দিয়ে ব্লগটা সার্থকনামা হলো কিনা জানিনা
~কৌস্তভ




আপনার মতামত জানান