ফিসফাস- ১১৩

সৌরাংশু

 

নাহ ফিসফাস যাতে জ্ঞানের ফিরিস্তি না হয়ে যায় সে বিষয়ে পাঠক/ পাঠিকাদের প্রতি একটা দায়িত্ব আছে বই কি! তবে বেশী নয় ছোট দুটো ঘটনা আপনাদের সামনে রেখে দেব। সিদ্ধান্ত বা মতামত আপনাদের নিজস্ব। আমার কাজ খালি তুলে ধরা।

গতকাল মেট্রো করে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছিলাম। এই নতুন রুটটি আমার এক বন্ধু শিখিয়ে দিয়েছে। লাগেজ টাগেজ আছে? অফিস টাইম? কোন অসুবিধা নেই দশ মিনিট না হয় বেশীই লাগল। কিন্তু এয়ারপোর্ট মেট্রো লাইন ধরে চলে যাও উলটো দিকে তারপর ব্লু লাইনের মেট্রো ধরে শান্তিতে বসে বাড়ি এস। সে যাই হোক এক ঘন্টা কি আর ঘুমিয়ে কাটানো যায়? বিশেষত মোবাইলের ব্যাটারি যেখানে তল ছুঁয়েছে।

তাই চোখ এদিক ওদিক চলেই যাচ্ছিল। পাঠক পাঠিকারা আমাকে ওই রকম ভাববেন না যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অদম্য আকর্ষণে চোখ উলটো সিধে জায়গায় চলাচলকারি ফিলান্ডারার। যদি সুন্দরকে কার না ভাল লাগে বলুন। তবে আমি একটু অন্য চোখে দেখি। মানে গল্প খুঁজে বেড়াই। হাজার হোক ফিসফাসের পাঠক পাঠিকাদের প্রতি একটা দায়িত্ব আছে তো!

তা গল্প পেয়েই গেলাম বুঝলেন? দ্বারকার হাজার একটা স্টেশন থেকে এক দম্পতি তাদের বছর আটেকের কন্যা সন্তানকে নিয়ে উঠেছে। মেয়েটি মিষ্টি কিন্তু প্রজাপতির মতো চঞ্চল। পোল ধরে ঘুরে হ্যাণ্ডেল লাফিয়ে ধরে উৎসবের মরসুম নিয়ে এল মেট্রোতে। মা বাবার অবশ্য অন্য গল্প চলছে। যদিও কান পেতে শোনা খুব খারাপ, তবুও পুরো স্টোরিলাইনটা সিনেমাটিক বলে ফেলতে পারলাম না। মা বাবার মধ্যে টেনশনটা স্পষ্ট।

মা বোধহয় বাপের বাড়ি চলেছেন। মেয়েও তা জানে, তা সে জিজ্ঞাসা করে ফেলল, “পাপা হামারে সাথ কাঁহা যা রহে হো?” মা উত্তর দিলেন, “সাথ যা রহে হয়ে বেটা!” বাবা উত্তর দিলেন, “নানি কে ঘর!” উত্তর দেবার সময় মায়ের চোখ থেকে চোখ সরালেন না! মা যেন একটু হাসলেন মনে হল? মেয়েটা খুশীতে উচ্ছল হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মেরি পাপা ইজ দ্য বেস্ট!” মা বাবা দুজনেই একটু লজ্জা পেলেন। তারপর দুজনেই একটা একটা সিট খালি দেখেও বসতে গেলেন না। চোখে চোখে আড় চুপে হালকা মান অভিমানে কথা চলতে লাগল আর মেয়েটি উলটো দিকের দরজার গায়ে নিজেদের ব্যাগটার উপর বসে মা আর বাবার হাত ধরে বলে উঠল, “মেরি মাম্মি… মেরি পাপা!” সিনেমাগুলোও কি এর থেকে বেশী নাটকীয় বা জীবন্ত মনে হয় বলুন? নরনারীর প্রাথমিকতম সম্পর্কের উর্ধে মানব মানবীর সম্পর্ক হল বাবা মায়ের সম্পর্ক। সন্তানের মুখ চেয়ে আমরা কত আনোনা তরকারি মুখে দিয়ে ফেলি, কত শ্বশুরবাড়ি নিয়ে খোঁটা সহ্য করে নি, কতই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ঢোঁক গিলে হজম করে ফেলি বিনা প্রতিবাদে। বাটি ঘটির ঠোকাঠুকি না থাকলে তো সংসারে শব্দই থাকে না। শব্দই যে ব্রহ্ম! সন্তানদের বেড়ে ওঠা নিশ্চিন্ত করতে এটুকু তো সবাই আমরা করতে পারি বলুন? পরিবার কথাটার অপর মানেই তো অঙ্গে ধারণ করা। তা গরলই হোক বা অমৃত!

যাই হোক চট জলদি অপর ঘটনাটায় যাই। উত্তম নগরের কাছে এসে একটু ভিড় হল ট্রেনটি। আমার উলটো দিকে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত সীট। সেখানে দুটি ছেলে বসেছিল। দুই মহিলা আস্তেই উঠে দাঁড়ালো, কিন্তু নিমরাজি হয়ে! বলেই ফেলল, “আপ লোগোকে লিয়ে তো কামরা হ্যায়! ওঁহা তো যা সকতে হ্যায়!” মহিলাদের একজন বললেন, “আপ বয়েঠ যাইয়ে।” ছেলেটি বসল না কিন্তু আপত্তি জাহির করতেই থাকল। আমি আর থাকতে না পেরে বললাম, “এক কে মুকাবলে পাঁচ! মহিলাও কে লিয়ে আরক্ষণ ঠিক হ্যায় না?”

যদিও ছেলেগুলো খুব অভদ্র ছিল না আর আমিও ভয়ানক ক্লান্ত ছিলাম বলে আলোচনা বেশী দূর চলল না। তবুও একবার ভেবে দেখতে হয় যে আরক্ষণ কেন করতে হয়। সে চাকরীর পদেই হোক আর বাস বা ট্রেনের সীটেই হোক। আরক্ষণ কাউকে অন্যায় সুবিধা দেবার জন্য নয় কিন্তু। যদিও আজকের রাজনীতিবিদরা সে গল্প ভুলে আরক্ষণের নামে পিছিয়ে পড়াদের পিছিয়েই রাখেন। তবুও আরক্ষণ যাবতীয় অসুবিধা দূর করার জন্যই। মহিলাদের আরক্ষণ করার প্রয়োজন কেন পড়ছে সে নিয়ে আর বেশী কথা বলে কি করব? সবই তো জানেন! তবে একটা কথা বলতেই পারি, মহিলারা যদি পিছিয়ে থাকে তাহলে দেশ তো এগোয় না। মহিলারা যদিও পিছিয়ে নেই, তবে পিছিয়ে রাখার চেষ্টার কোন খামতি নেই! সেই অসুবিধাগুলো নিয়ে আমরা একটু ভাবি বরং! নারী বিরোধী বা নারী বাদী না হয়ে মানববাদী হয়েই ভাবি কথাগুলো। আগামী প্রজন্মকে আমরা কি পৃথিবী দিয়ে যাব?

সৌরাংশু

সৌরাংশু


সর্বঘটে কাঁঠালি কলা (Jack of All Trades and blah blah…) অথবা আর ডবলু এ বা পঞ্চায়েত নির্বাচনের গোঁজ প্রার্থী বলতে যা বোঝায় আদতে কোলকাতার কিন্তু অধুনা দিল্লীর বাসিন্দা, সরকারি চাকুরে সৌরাংশু তাই। দানবিক শরীর নিয়ে মানবিক বা আণবিক যে কোন বিষয়েই সুড়ুত করে নিজেকে মাপ মতো লাগিয়ে নিতে পারেন।

আপনার বাথরুমের দরজার ছিটকিনি আটকাতে হবে? বা কেঁদো বেড়ালটা রাত বিরেতে বড়েগোলাম হবার চেষ্টায়? পাড়ার নাটকে বিবেক নাই? রাজা খাজনা নিবেক নাই? চিন্তায় শান দিবেক নাই- ফোন লাগান +৯১৯XXXXXXX৩২-এ। ভৌম দোষ বাড়াতে বা বনের মোষ তাড়াতে মাইকের মতো গলা আর টুথপিকের মতো হাসি নিয়ে সৌরাংশু হাজির হবেন।

গল্প অল্প স্বল্প লিখলেও তিনি ফিসফাসেই হাত-পা ছড়িয়ে বসে শীতের রোদে তেল মাখেন আর গিটকিরি দিয়ে রামা হৈ গান। না শুনে যাবেন কোথায়! বুম্বা দা বলেছেন, “মাআআ, আআমি কিন্তু চুরি ক্করিনি!” সৌরাংশু বলেন, “যাঃ আমি কিন্তু বুড়ি ধরি নি!” খেলতে নেমে হাঁপান না, গাইতে গলা কাঁপান না, নিজের দায় পরের ঘাড়ে চাপান না, শুধু ফিসফাসেই বন দাপান! এই হলেন সৌরাংশু!
www.fisfas.in

আপনার মতামত জানান