ফিলোজফি : একটি পুনরাধুনিক আখ্যান

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 

খাঁ খাঁ করছে চৈত্রমাসের পড়ন্ত দুপুর। একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একটা দুর্দান্ত মেয়ে একলা আইসক্রিম খাচ্ছে। ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল। সাম্য দুটো ছোট কাপ কিনল। ভ্যানিলা।
খেতে খেতে পুরোনো প্রসঙ্গের জের টানল সাম্যই, ‘তার মানে, তুই বলছিস মেয়েটা লেসবো? মেয়েদের সঙ্গে করে যখন...’
অনিকেত একমনে মেয়েটাকে দেখছিল। অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘না। লেসবো না। মালটা বাইসেক্সুয়াল। ছেলেমেয়ে সবার সঙ্গেই করতে পারে।’
‘জানতাম না তো! এটাও হয় নাকি?’
‘কেন হবে না? আমি তো নিজের চোখেই দেখছি। সন্দেহ হতেই গুগল মারলাম। দেখিয়ে দিল এমন মেয়ে নাকি প্রচুর আছে। তাছাড়া বি এফ-এ দেখিসনি? থ্রিসামগুলো? দুটো মেয়ে একটা ছেলেকে যখন করে... তার আগে নিজেদের মধ্যে...’
‘সে অনেক দেখেছি। কিন্তু ওসব তো ফ্যান্টাসি!’
‘সেক্স মালটাই তো ফ্যান্টাসি, বস! ওটুকুই তো মজা! বি এফে যা কিছু দেখায় রিয়েল লাইফ থেকে দেখায় জানবি। শুধু একটু ডোজ বাড়িয়ে দেয়।’
আইসক্রিমটা শেষ করল অনিকেত। ঠোঁটে লেগে থাকা সাদাটা জিব দিয়ে চেটে নিয়ে চোখ মারল, ‘কিছু মনে করিস না সাম্য। এসব ব্যাপারে তুই না... একটু বাচ্চা আছিস।’
সাম্য একটু চোট পেল, হয়তো, কিন্তু সামলে নিয়ে বলল, ‘তা আছি হয়তো। আমার তো তোমার মতো টেলিস্কোপ নেই। রোজ রাত্তিরের লাইভ পানুও নেই।’
অনিকেত হেসে উঠল, ‘লাইভ কী বলছিস ব্রো ! মাঠে বসে দেখছি রোজ। মাঝেমধ্যে তো মনে হয় মাঠে নেমেই দেখছি! তখনই আর চাপতে পারি না। মাল আউট হয়ে যায়।’
দুজন হেসে উঠল। পাশের মেয়েটা ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিয়ে আবার আইসক্রিমটা শেষ করায় মন দিল। দুর্দান্ত এবং একলা মেয়েরা যেমন দ্রুত আইসক্রিম বা সিগারেট খায়।
অনিকেত মেয়েটার দিকে চোখ রেখে সাম্যর কানের কাছে মুখ আনল, ‘ভার্জিন মেয়েরা বার- আইসক্রিম কেন এত পছন্দ করে বল তো? আমার একটা আইডিয়া আছে এ নিয়ে।’
সাম্য মাথা সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘তোর আইডিয়া নিজের কাছেই রাখ। ও মেয়েটা ভার্জিন তোকে কে বলল? আর ভার্জিনরা শুধু নয়, ম্যারিড মেয়েরাও পছন্দ করে। বার-আইসক্রিম আমিও পছন্দ করি। আমার বাবাও খুব করে।’
‘আর... তোর মা?’
সাম্য সত্যিই রাগল এবার। তেড়ে গেল অনিকেতের দিকে। আইসক্রিম বিক্রেতা যুবকটি কিছু বুঝল না, কিন্তু মজা পেয়ে হেসে উঠল।
মেয়েটা দ্রুত চলে গেল। দুর্দান্ত এবং একলা মেয়েরা যেমন দ্রুত হেঁটে যায়।

বিকেল গড়াচ্ছে। কিন্তু সূর্য ডুবতে এখনও বেশ দেরি আছে। অনিকেতের মা সন্ধের পরে পার্টিতে যাবেন। তার আগে অনিকেত বাড়ি ঢুকতে চায় না। বাবা গেছেন বিদেশে। বিজনেস ট্যুর। বাড়ি ফাঁকা থাকবে সন্ধের পর। ওর সঙ্গে আজকাল বাবা-মার সম্পর্ক ভাল নয় সম্ভবত। ওর বাবা-মার নিজেদের মধ্যেও শোনা যায় বিস্তর গোলমাল। একবার ডিভোর্স অবধি গড়াতে যাচ্ছিল নাকি। সাম্য এসব স্কুলজীবন থেকেই শুনে আসছে। এজন্যই বন্ধুদের কেউ চট করে অনিকেতের বাড়ি যায়-টায় না। সাম্য মোটে একবারই গেছে। তাও বছর তিনেক হয়ে গেল। ওরা তখনও স্কুলেই পড়ত।
অনিকেত সিগারেটের শেষটা বেশ স্টাইলের সঙ্গে একটা নেড়ি কুকুরের গায়ে ফেলে দিয়ে বলল, ‘শুনশান রাস্তায় হাঁটলে কেমন মাইরি ফিলোজফি গজগজ করে মাথার মধ্যে। কেমন যেন দর্শন-দর্শন পায়। তোর হয় এমন সাম্য?’
সাম্য কুকুরটার প্রতি এই আচরণ পছন্দ করল না। সে কুকুর ভালবাসে। কিন্তু চেপে গেল। গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, ‘বিকেলের রাস্তায় হয় না। রাত্তিরে হয়। একলা হাঁটলে অনেক আশ্চর্য চিন্তা আসতে থাকে...’
অনিকেত বলল, ‘ধুস! বিকেলবেলার সঙ্গেই তো ভাবনার সম্পর্ক রে ভাই! রাত্তিরটা তো কাজের সময়... তখন কী আর ভাবার ফুরসৎ আছে...’
‘তাহলে সেক্স-ফিলোজফির কথা বলছিস! যৌন-দর্শন। তাই বল।’
‘দর্শন বলতে পারিস। থিওরিও বলতে পারিস।’
‘সেটাই আমার এক্সপেক্ট করা উচিত ছিল, যখন তুই ফিলোজফির কথা বললি।’
‘ফিলজফি ঠিক আছে। কিন্তু একটা ফিলোজফার’স স্টোন যদি পেতাম বাডি... একটা পরশপাথর...’
‘সোনা বানাতিস?’
অনিকেত উদাস হয়ে বলল, ‘সোনার তো একটাই মানে হয় না রে স্টুপিড! আমি চাই মেয়ে বানানোর পরশ পাথর। যাতেই ছোঁয়াবো, যেন মাল্লু হয়ে যায়। ল্যাম্পপোস্টে ঠেকালাম... ক্যাটরিনা হয়ে গেল, টেবিলে ঠেকালাম... বিদ্যা বালান হয়ে গেল, পাশবালিশে ঠেকালাম... ’
‘টুনির মা হয়ে গেল,’ সাম্য দাঁত বের করে হাসল। ‘দ্যাখ ভাই, যদি অমন পাথর পাস, ভুল করে নিজের ওটায় আবার লাগিয়ে ফেলিস না যেন...’
এইসব হাসাহাসির মধ্যেই দিনটা সত্যিই শেষের দিকে চলে গেল।
এরপর দুজনে একটা সিনেমা হলে ঢুকল।

যখন ওরা অনিকেতের বাড়িতে পৌঁছল, ঘড়িতে বাজছে সাড়ে আটটা।
এই তিন বছরে অনিকেতদের ফ্ল্যাট কিছু বদলেছে কিনা সাম্য বুঝতে পারল না। কিছুই তার চেনা লাগছে না। অচেনাও না। শুধু মনে আছে অনিকেতের অসম্ভব সুন্দরী মা খুব সুন্দর ব্যবহার করেছিলেন। দারুণ চাওমিন খাইয়েছিলেন। আর দেওয়ালে শেকসপীয়ারের বিরাট ছবিটা মনে আছে। সেবারও অবাক হয়েছিল। কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি এই তিন বছরে। আজ প্রশ্নটা করল, ‘সবাই তো বাড়িতে রবি ঠাকুর ঝোলায়, তোরা শেকসপীয়ার ঝুলিয়েছিস! কেন রে?’
অনিকেত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উত্তর দিল, ‘ওটা আমার বাপের আমলের জিনিস।’
যেন ওর বাবা ওর বহুযুগের পূর্বপুরুষ!
সাম্য জিজ্ঞাসা করল, ‘কিন্তু কেন?’
‘বাপ ওই লোকটার খুব ফ্যান। আসলে ইংলিশের ছাত্র ছিল প্রেসিডেন্সীতে। দারুণ রেজাল্ট। কলেজে পড়ানোর কথা ছিল, দাদু বিজনেসে ঢুকিয়ে দিল।’
‘তোর যেটা হবে?’
‘আমার ওটা হবে না বাডি। আমি বিজনেসে নেই। আমি কলেজ শেষ হলেই বাইরে কাটব... সে আমেরিকা হোক, আর দুবাই। এখানে আর নয়। ছাড়। মাল খাবি তো?’
‘কোথায় পাবি?’
‘ফ্রিজে আছে। আমার ডিয়ার ড্যাডির। বিয়ার। লিকার সম্ভবত নেই।’
‘তোর বাবা বুঝতে পারলে?’
‘এখনও দিন পনের পরে ফিরবে। ততদিনে কি আর বিয়ারের হিসাব মনে থাকবে?... দাঁড়া নিয়ে আসি।’
দুজনে গিয়ে বসল অনিকেতের নিজের ঘরের সেই জানালায়। এই সেই জানালা! গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অনিকেত এই জানালার গল্প শোনাচ্ছে বন্ধুদের। রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বেশ দূরের একটা বাড়ি। তারই জানালায় ও খুঁজে পেয়েছে এল দোরাদো। ওই ফ্ল্যাটে নতুন এসেছে এক ফাঁকা যুবতী। সম্ভবত চাকরি করে, একা থাকে। প্রায় রোজ রাতেই সঙ্গী বদলায়। কখনও কখনও একই রাতে আলাদা সময়ে দুজন আলাদা সঙ্গী। কোনো রাতে পুরুষ। কোনো রাতে নারী। আর সেই খেলাটা প্রতি রাতে দেখেছে একজনই। সে... অনিকেত।
টেবিলের উপরে এই সেই টেলিস্কোপ, তোয়ালে ঢাকা।
সাম্য তবু বলল, ‘এটাই?’
‘এটাই।’
‘পেলি কোথায়?’
‘বাড়িতেই ছিল। এটা আমার দাদুর জিনিস। খুব পাওয়ারফুল। দাদুর তারা দেখার খুব শখ ছিল। আর... আমি এখন তারা দেখছি। জয় তারা!’ অনিকেত বিয়ারে চুমুক দিল।
সাম্য বলল, ‘কিন্তু দেখিস কী করে?’
‘সিম্পল।’ অনিকেত সন্তর্পনে তোয়ালে সরিয়ে বলল, ‘চোখ লাগা। সোজা দেখতে পাবি। ওর জানালাতেই ফোকাস করা আছে। একটুও সরাস না।’
সাম্য বুঝতে পারল এবার সে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। শ্বাস দ্রুত। হৃৎস্পন্দন নিজের কানের শুনতে পাচ্ছে। কান গরম। এবার প্যান্টেও চাপ পড়তে পারে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখল অনিকেতের বিকার নেই। সে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছে আনমনে। সম্ভবত দেখে-দেখে ব্যাপারটা পুরোনো হয়ে গেছে।
সাম্য খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘ধুস! এ তো ঘর অন্ধকার করে রেখেছে।’
অনিকেত বিরক্তভাবে বলল, ‘এখনও তো ফেরেনি ! দাঁড়া! একটু ওয়েট কর।’
সাম্য তার উত্তেজনা থেকে মন ফেরানোর চেষ্টা করল। অনিকেতের দিকে তাকাল। অন্যমনস্কভাবে বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিচ্ছে অনিকেত। সারা ঘরে বই আর ডিভিডি ছড়িয়ে আছে। প্রচুর পোশাক। দেওয়ালে ঝকঝকে পোস্টার। একমাত্র আর ডি বর্মণ ছাড়া কেউই এদেশের লোক নয়। তবে তারা গায়ক এটা বোঝা যাচ্ছে। অনিকেত গান এত পছন্দ করে সাম্য জানত না।
সাম্য বলল, ‘তোর ঘরটা দারুণ!’
অনিকেত বলল, ‘আমার লাইফটাও দারুণ। আমিও দারুণ। তবে একটা কথা ম্যান, ওসব কেস দেখে যদি তোমার হিট উঠে যায়, ওই বাথরুম আছে, সোজা ঢুকে যাবে। আমাকে টাচ করবে না। শালা, মেরে দেব তাহলে।’
সাম্য হাসল, ‘তুই যে সুচিত্রা সেনের মতো বলছিস! তোর মনে হয় আমি গে? গে হলে মেয়ে দেখতে এতদূর আসি তোর সঙ্গে?’
‘তবু। সাবধান হচ্ছি। কার মধ্যে কী আছে, বলা কি যায়?’
‘একটা কথা বল অনিকেত। তুই জানালাটা খুঁজে পেলি কী করে?’
‘ব্রাউজিং করতে করতে... দুম করে পেয়ে গেলাম।’
‘ব্রাউজিং !’
‘হ্যাঁ। এমনিই একদিন ফালতু পড়ে থাকা টেলিস্কোপটা ঘরে এনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ বুঝতে পারলাম এটা দিয়ে লোকের একেবারে হাঁড়ির খবর দেখা যায়। সব একদম ব্রেকিং নিউজ। আর, আমাকে কেউ দেখতেও পাবে না। যদি বিবেক মালটাকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া যায়, ব্যাপক মজা। আশপাশের বাড়িগুলোর বহুকিছু আমি দেখেছি। একেকটা ঘটনা শুনলে থ হয়ে যাবি। সেসব তো তোদের বলি না। লোকের ব্যক্তিগত ব্যাপার আফটার অল। এই জানলার কেসটা কয়েক সপ্তাহ আগে পেয়েছি।’
‘কিন্তু... আচ্ছা, ও তো নিশ্চয়ই ওসব করার সময় ঘর অন্ধকার করে নেয়। তুই দেখিস কী করে। এখন যেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না...’
‘না। মেয়েটা একদম পারভার্ট। আলো জ্বেলেই রাখে। পার্টনার আলো নেভাতে চাইলেও ও জোর করে জ্বেলে দেয় দেখেছি। অন্ধকারে বোধহয় মজা পায় না।’
‘ওহ!’ সাম্য টের পেল তার প্যান্টে চাপ পড়ছে। সে উঠে গিয়ে মেঝেতে পরে থাকা একটা মোটা বই তুলে নিল। মহেঞ্জাদারোর উপরে একটা বই। ইকনমিক্সের ছাত্র অনিকেতের এইসব বই কেন লাগছে?
অনিকেত বলল, ‘তুই লক্ষ্য রাখ। যে কোনো মুহূর্তে এসে পড়বে। রাত নটার আগেই প্রতিদিন শুরু হয়ে যায়। আমি একটু ডিম-টিম ভেজে আনি। হেব্বি খিদে পেয়েছে। তোর পায়নি?’
‘মন্দ হয় না।’
অনিকেত চলে গেল। একটু পরে বাইরে থেকে বাসন-কোসনের শব্দ পাওয়া গেল। ছ্যাঁকছোঁক হতে শুরু করল। সত্যিই মনে হয় এই ব্যাপারটা ওর কাছে পুরোনো হয়ে গেছে।
বইটা বিছানায় রেখে সাম্য গিয়ে টেলিস্কোপটায় চোখ রাখল।
আলো জ্বলেছে।
একটা ঝকঝকে সাদা ঘর। মেঝের পুরোটাই আর খাটের বেশ কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। দুজন মহিলা। একজন খুবই কমবয়সী। একদম চাঁছাছোলা জিম করা ফিগার। সাদা টপ আর জিনস পরে আছে। আরেকজনের বেশ বয়স হয়েছে। শরীরে মেদ জমেছে। সে পড়ে আছে সবুজ রঙের শাড়ি। খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে দুজন মুখোমুখি কথা বলছে। কিন্তু বয়স্ক মেয়েটি যেন একটু আড়ষ্ট হয়ে আছে। হাতের ব্যাগটাও এখনও নামায়নি। মেয়েটার উৎসুক হাত গা থেকে মাঝেমধ্যে সরিয়েও দিচ্ছে।
আজ তাহলে লেসবিয়ান হবে! জীবনে প্রথম চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত সেক্স দেখা যাবে! তা-ও আবার দুটো মেয়ের! সাম্যর মনে হচ্ছিল সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। এত উত্তেজিত হয়ে পড়বে নিজেও ভাবতে পারেনি। শেষকালে অনিকেতের সামনে প্রেস্টিজ না চলে যায়।
ইশ! যদি একা দেখা যেত...
চুমু এড়ানোর জন্য বয়স্কা মেয়েটি মুখ ফেরাতেই সাম্যর ভ্রু কুঁচকে গেল। এত উত্তেজনার মধ্যেও তার মনে হল ওকে সে কোথাও দেখেছে। কোথায় সেটা মনে করতে পারল না। কিন্তু দেখেছে সেটা নিশ্চিত। বয়স হলেও মেয়েটা খুব সুন্দরী। কমবয়সীটার চেয়ে হাজারগুণ রূপসী। দেখলেই বোঝা যায় খুব বড়োলোকের বৌ। অবিশ্যি এইসবকিছুই ওই কমবয়সীটার জন্যই। ও-ই তো অনিকেতের এল দোরাদোর দরজা।
তবে মেয়েটার যে এটা নেশা নয়, বরং পেশা, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনিকেত হয়তো রোমান্স বজায় রাখার জন্যই সেটা খোলসা করেনি।
দরজায় সামান্য শব্দ হল। দুহাতে দুটো প্লেট নিয়ে ঢুকেই অনিকেত বলল, ‘শুরু হয়ে গেছে তো? জানতাম।’
সাম্য চাপা গলায় বলল, ‘আজ একটা মেয়ে এসেছে। মাঝবয়সী।’
অনিকেত কিছুটা ডিমভাজা মুখে পুরে বলল, ‘তাই নাকি? নতুন ব্যাপার। শুরু হয়ে গেছে?’
‘এখনও হয়নি। না... মেয়েটা মাঝবয়সীটাকে কিস করছে! ও করতে চাইছে না, তোর মেয়েটা জোর করছে...’
‘তাই?’ অনিকেত লাফিয়ে এল, ‘আমাকে দেখতে দে।’
সাম্য জায়গা ছেড়ে সরে এল অনিচ্ছাসত্ত্বেও। অনিকেত টেলিস্কোপে চোখ রাখল।
অনিকেতের পিছনে দাঁড়িয়ে সাম্য বলল, ‘আমি এই মহিলাকে কোথাও দেখেছি বুঝলি! কোথায় দেখেছি মনে করতে পারছি না। কিন্তু দেখেছি এটা সিওর।’
অনিকেত নড়ছে না। স্থির হয়ে আছে টেলিস্কোপে। আজকের ব্যাপারটা যে একেবারেই নতুন রকমের, বোঝা যাচ্ছে। অনিকেতের একঘেয়েমি কেটে গেছে তার ফলে। আবার চরম আগ্রহ জেগেছে।
নিজের ডিমভাজাটা শেষ করে সাম্য একটু অপেক্ষা করল। তারপর সত্যিই ধৈর্য হারিয়ে অনিকেতের পিঠে চাপ দিল, ‘এই, আমাকে একটু দেখতে দে...’
অনিকেত বাঘের মতো মুখ ফেরাল। ওর মুখচোখের অবস্থা দেখেই পিছিয়ে গেল সাম্য।
অনিকেত গর্জে উঠল, ‘বেরিয়ে যা! এক্ষুনি বেরিয়ে যা বানচোত! না হলে কেটে ফেলব তোকে... বেরো!!’
সাম্য হকচকিয়ে গেছে। কাঁপা গলায় বলল, ‘কী হয়েছে... তোর?’
অনিকেত উন্মাদের মতো এগিয়ে এল।
সাম্য পালাল।

অনিকেতের পাড়ার ফাঁকা রাস্তায় হেঁটে চলেছে সাম্য। বাড়ি ফিরছে। অনিকেতের আচরণটা তার মাথায় ঢুকছে না। অবিশ্যি বিভিন্নরকমের আইডিয়া আসছে। প্রতিটা আইডিয়াই আগেরটার চেয়ে আজগুবি।
আইডিয়া কিছু করতে পারবে না হয়তো।
হয়তো... ফিলোজফি চাই।

অনুপম মুখোপাধ্যায়

অনুপম মুখোপাধ্যায়


জন্ম ১৯৭৯। শূন্য দশকের কবি ও গদ্যকার। একমাত্র পেশা : বিতর্কের বাইরে থাকা।
অধুনান্তিক পরিসরে লেখালেখি শুরু করে একটা সময় অনুপম বুঝতে পারেন, এই পরিসরে সংশয় এবং ক্লান্তি ছাড়া একজন কবির কিছু দেওয়ার নেই তাঁর পাঠককে। বুঝতে পারেন সংলাপের স্থান ক্রমেই নিয়ে চলেছে প্রলাপ। কাব্যগ্রন্থগুলোর নামকরণ থেকে শুরু হয়ে দুই মলাটের ভিতরে ও বাইরে অসংলগ্নতাকে ব্যঞ্জনা হিসেবে ভুল করছেন কবি, সমালোচক এবং পাঠকেরা। চারদিকে তাকিয়ে দেখতে পান, বাংলা সাহিত্যের কোনো বাজার না থাকলেও বাজারিয়ানার রাজত্ব চলছে। যে বইগুলো আধুনিকের স্বর্ণযুগে বটতলায় বিকোত, সেগুলোই হয়ে উঠেছে মূলধারা, এবং সিরিয়াস সাহিত্য চলে গেছে প্রান্তে, প্রায় বিনাশের কিনারায়। এই পরিসরে কবিতাচর্চার এবং জীবনযাপনের অর্থকে যদি পুনরুদ্ধার করতেই হয় তবে একলা চলতে হবে, অনেকের পাশে। গোষ্টী এখানে সংঘের মুখোশ পরেছে। সেই মুখোশের আড়ালে মুখ লুকোতে চাননি অনুপম। ব্যক্তিগতভাবে একটি বিপ্লবের সূচণা করতে চেয়েছেন।সম্পূর্ণতার দিকে যাত্রা, যা কদাপি ফুরোবে না। তার নাম পুনরাধুনিক। না, re-modern নয়। বলতে পারেন neo-modern। নতুন আধুনিক। এই শতাব্দীর নিজস্ব আধুনিক। সময় এবং স্থানের আদল ও আদরকে স্বীকার করেই।

আপনার মতামত জানান