সেক্স , সেক্সি , যৌন, যৌনতা

বিশ্বজিৎ রায়

 

গত শতকের আটের দশক । ক্লাস সিক্সেই বোধহয় শব্দদুটি, একটু আগে পরে, তাদের শিরশিরে টান, রহস্য আর নিষিদ্ধতা নিয়ে আমার কাছে হাজির হয়েছিল । এই ‘আমি’কে ? বাঙালি মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী ভদ্রলোক পরিবারের ছেলে । শব্দটি হাজির হয়েছিল সমবয়সী অন্য অনেকের কাছেও । তারাও আমারই মতো , মোটের ওপর একই অর্থনৈতিক শ্রেণী থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের ইস্কুলে পড়তে আসা ছেলে । ক্লাস সিক্সে কেশবচন্দ্র নাগের অঙ্কের বইয়ের বিবিধ প্রশ্নমালায় পাটিগণিতের বেশ কিছু শক্ত অঙ্ক ছিল । ক্লাস সিক্সের পাঠ্যসূচিতে বীজগণিত ছিল না , অথচ ওই জটিল অঙ্কগুলি ‘ভ্যারিয়েবল’ এক্স ব্যবহার করে সহজেই কষে দেওয়া যায় । আমাদের অঙ্কের মাস্টারমশাই সেই সময় বীজগণিতের প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন । ‘এক্স’ ধরে কীভাবে অঙ্ক কষতে হয় তাও শিখিয়েছিলেন, ওই ক্লাস সিক্সেই । সিনেমা পত্রিকা ‘আনন্দলোক’ দেখা এক সহপাঠী একদিন গলা নামিয়ে বলেছিল ‘ এক্স ধরে নয় সেক্স ধরে অঙ্ক কর’ । শব্দটি নিষিদ্ধ শিহরণ নিয়ে তখন কানে ঢুকে পড়েছিল । আমাদের কাছে যৌনতা শব্দের আবির্ভাব এরই কাছে পিঠে, মনে পড়ে ।
তখন বুঝিনি, বোঝার কথাও নয়, এখন ভাবতে পারি, সেক্স, যৌনতা এই শব্দদুটি কিন্তু ব্যুৎপত্তিগত দিক দিয়ে একেবারেই সমগোত্রের নয় । আমরা বাঙালিরা, সমার্থক হিসেবে এ দুটোকে ব্যবহার করে ফেলি বটে , এদের মধ্যে কিন্তু অর্থের অনেক ফারাক । ১৯৯৪ তে ক্যারিশমা কাপুরের ‘খুদ্দার’ বাজারে আসে । হিট ছবি, বিশেষ করে একটি গান তো সে আমলে চূড়ান্ত হিট । ভারতীয় অর্থনীতি তখন অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহের হাত ধরে ‘মুক্তি’-র দিকে এগোচ্ছে । অর্থনৈতিক মুক্তির নানা প্রভাব, প্রতিক্রিয়া । শুধু যে খাওয়া-পরার জগৎ বদলে গেল তা নয়, দেখা-শোনা-মনোরঞ্জনের জগৎ-ও বদলে গেল । এই মনোরঞ্জনের জগতে তখন সারা ভারতে টিভি আর হিন্দি ছবির খুবই কদর । অন্যান্য স্থানীয় ভাষার সাংস্কৃতিক পণ্যকে পেছনে ফেলে মূলধারার হিন্দি সিনেমা জনগণমনধিনায়ক হয়ে উঠছিল। মধ্যবিত্তের ঘরে আর নিম্নবিত্তের ক্লাবে টিভি ঢুকে পড়েছে । পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার বাইরের দর্শকদের টিভি দেখার ব্যবস্থা করছে রিলে-সেন্টার । যেমন আসানসোলে টিভির রিলে-সেন্টার হল বলে পুরুলিয়ায় টিভি দেখা গেল । হলে টিকিট কেটে সিনেমা দেখার কষ্ট আর করতে হচ্ছিল না, টিভিই হয়ে উঠল ভরসাস্থল । দূরদর্শনে শুক্রবার রাতে বড়োদের জন্য হিন্দি ছবি দেখানোর চল হয়েছিল, এর কিছুদিনের মধ্যেই । দূরদর্শনের সাবেকি ডিডি ওয়ানের পাশাপাশি চালু হয়েছিল ডিডি মেট্রো । এই চ্যানেল দেশের সবাই দেখতে পেতেন না – ভারতবর্ষের বড়ো চারটে শহরের নাগরিকদের জন্যই মূলত ডিডি মেট্রোর অনুষ্ঠান পরিকল্পিত । এই চ্যানেল সাবেকি ডিডি ওয়ানের থেকে রঙে-ঢঙে অনেক বর্ণময় ছিল । এসবই গত শতকের আটের দশকের ঘটনা । এর পরে অর্থনৈতিক নীতি বদলাল । মুক্ত অর্থনীতির জমানায় সবজায়গায় সরকারি খবর্দারি আর চলবে না তা টের পাওয়া যাচ্ছে । এমনকী টিভিতেও সরকারি চ্যানেলের রাশ ক্রমশ হালকা হচ্ছিল তখন । ১৯৯২-তেই সি এন এন, স্টার-এর মতো বিদেশি চ্যানেল ভারতীয় দর্শকদের জন্য খুলে গিয়েছিল । বিদেশি চ্যানেল দেখা-শোনার ক্ষেত্রে জানলাকে আরও উদার করে দিল ।
এইসময় ১৯৯৩ সালে ‘খুদ্দার’ সিনেমার গান লিখেছিলেন প্রবীণ গীতিকার ইন্দীবর । অনু মালিকের সংগীত পরিচালনা , আলিসা চিনাই-এর গলা । এই ছবির জনপ্রিয়তম গানটি , সেই সময় যা আসমুদ্র হিমাচল দখল করেছিল । গানটি একটি ‘সেক্সি’ মেয়ের জবানি । সেই গানে উচ্চকণ্ঠে ‘সেক্সি’ শব্দটি ব্যবহৃত । ৯৩ সালের আগেই মুক্ত-অর্থনীতির স্পর্শে ভারতীয় টিভিতে বিলিতি অসরকারি চ্যানেল ঢুকে পড়ে ভারতীয়দের রক্ষণশীলতাকে খানিকটা ভেঙে দিয়েছিল বলেই ইন্দীবরের পক্ষে গানে এমন শব্দ ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছিল । এই গানই নয়ের দশকে সেক্সি ও সেক্স শব্দটিকে ভারতীয়দের কানে অনায়াস লভ্য করে তোলে । বহুভাষা ও জাতির দেশে বলিউডি সিনেমা এমন এক ‘সাংস্কৃতিক পণ্য’ যা আসমুদ্রহিমাচলকে এক ঘাটে জল খাওয়াতে পারে । সুতরাং ইংরেজি ‘সেক্সি’ শব্দটি খুদ্দারের গানে ব্যবহৃত হওয়ায় গোটা ভারত প্রকাশ্যে কান পেতে শুনল ।
গানটি হিন্দি-ইংরেজি মেশানো ভাষার গান, যাকে হিংলিশ বলা চলে , সেই ভাষায় মেয়েটি ‘নিজের কথা’ বলেছে । কী সেই কথা ?
নীলি নীলি আঁখে মেরি ম্যায় কেয়া করু
গোরে গোরে গাল মেরে ম্যায় কেয়া করু
হোট মেরে লাল লাল ম্যায় কেয়া করু
কালে কালে বাল মেরে ম্যায় কেয়া করু
নীল চোখ , ফরসা গাল, লাল ঠোঁটের মেয়ে – চুলটি কিন্তু কালো । আর তার শরীরের মাপ ? তাও বলেছে সে । ‘থার্টি সিক্স টুয়েন্টি ফোর থার্টি সিক্স / দেখ ও বাবা দেখ ও বাবা আই অ্যাম ইন ফিক্স’ । স্টার-সিনেমার মতো চ্যানেলে খানিক খোলামেলা রমণী শরীরের চলমান ছবি রাতের স্লটে ভারতীয়দের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল । ফলে ইংরেজিতে শরীরের মাপ-জোখ বললে ততটা কানে লাগে না । বরং বেশ শিহরণ জাগে ।
এই গানের হিংলিশ বুলিকে সংস্কৃতঘেঁষা বাংলায় রূপান্তরিত করলে বলতে হয় মেয়েটি ‘গুরুবক্ষ , ক্ষীণকটি , গুরুনিতম্ব’ । এমন রমণী শরীরই তো ভারতীয় কামশাস্ত্রীদের মতে আকর্ষণীয় । পুরনো ভারত এক বিচিত্র দেশ । ইসলামি সভ্যতার প্রবেশ পূর্ববর্তী ভারতে জীবনযাত্রার নানা চিত্র । এই ভারতে প্রবৃত্তিমার্গ যেমন ছিল , তেমন ছিল নিবৃত্তি মার্গ । ভোগ যেমন , তেমনই ত্যাগ । মেয়েরা কোথাও স্বাধীন,কোথাও পরাধীন । পুরনো ভারতের ত্যাগকে মধ্যবিত্তভারতীয় ভদ্রলোকেরা তাদের ভাবনায় মহিমান্বিত করেছে । কিন্তু কামশাস্ত্রীদের কথা ? মধ্যবিত্ত ভারতীয় ভদ্রলোকরা, যাঁরা এদেশের মূলধারার সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, তাঁরা সত্তর-আশির দশকে এঁদেরকে ভুলে থাকতেই অবশ্য স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন । ১৯৮৪-তে গিরিশ কন্নাডের নির্দেশনায় শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিক’-এর হিন্দি চলচ্চিত্র রূপ ‘উৎসব’ মুক্তি পেয়েছিল । এই ছবিতে বসন্তসেনা জনপদবধূ । চালু ভাষায় ‘বেশ্যা’ কিম্বা মানবাধিকারীদের ভাষায় ‘যৌনকর্মী’ বললে কিন্তু বসন্তসেনাদের সময়কে বোঝা যাবে না, বসন্তসেনাকেও মর্যাদা দেওয়া হবে না । বসন্তসেনা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অভিজাত শিক্ষিত রমণী । বণিকপুরুষ চারুদত্তের সে প্রেমিকা । ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার মনে করেন এই নাটকে সেই সময়ের নগর জীবনের(glimpses of urban life) ছবি ধরা পড়েছে । আবার অনেকে মনে করেন শূদ্রক যে নগরজীবনের কথা লিখেছিলেন তা কাল্পনিক, আদর্শায়িত –এমন নগরের অবিকল চেহারা খুঁজে পাওয়া যাবে না । ‘মৃচ্ছকটিক’নাটকে চারুদত্তের মতো পরিশীলিত ‘নাগরিক’ পুরুষই ছিল না, সংস্থাপনকের মতো অশিষ্ট পুরুষও ছিল । বসন্তসেনা অশিষ্টপুরুষদের প্রত্যাখ্যান করেছে । বসন্তসেনা রমণীয়,স্বাধীনচেতা – এই রমণীয়তা ও স্বাধীনভাবনাকে প্রকাশ করার মতো ‘সামাজিক পরিসর’ এই নাটকের নগরে ছিল। উনিশ শতকেই ‘মৃচ্ছকটিক’ নাটকটি বিদেশিদের জন্য অনূদিত ও মঞ্চায়িত হয়েছিল। ১৮৫০-এ প্যারিসে মৃচ্ছকটিক মঞ্চায়িত হয় । গিরিশ কন্নাডের ছবিতে বসন্তসেনার ভূমিকায় রেখা । আটের দশকের ভারতীয় দর্শক কিন্তু এই ছবিটি দেখেননি । চূড়ান্ত ফ্লপ হয়েছিল । প্রযোজক শশী কাপুরের প্রায় দেড় কোটি টাকা ক্ষতি হয় ।
নয়ের দশকে অবস্থার ক্রম-বদল ঘটল । মীরা নায়ারের ‘কামসূত্র’ ১৯৯৭ –তে মুক্তি পায় । ছবির ভাষা ইংরেজি, এখানেও প্রধানচরিত্রে রেখা । ভারত সরকারের সংস্কৃতি-মন্ত্রকের কর্মকর্তারা এই ছবি নিয়ে নানা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন । কামনার খোলা-মেলা প্রকাশ, সমকাম, উভকাম – হোমো, হেটেরো এসব রক্ষণশীল সরকারি ভারতীয়দের পক্ষে হজম করা শক্ত। কিন্তু নয়ের দশক আটের দশক নয় । দর্শকদের চোখ ততদিনে খুলে গিয়েছিল । ‘কামসূত্র’- এর আগেই দীপা মেহেতার ‘ফায়ার’ মুক্তি পেয়েছিল । ১৯৯৬-র সেই ছবির কাঠামো হিসেবে যে গল্পটি ব্যবহার করা হয়েছিল সেটি ইসমত চুঘতাইয়ের ‘লিহাফ’ । ইসমত চুঘতাই(১৯১৫-১৯৯১) জীবন ও চিন্তায় অন্যরকমের ভারতীয় নারী । ১৯৩৬-এ ইসমত ‘প্রগতি লেখক সংঘে’ যোগ দিয়েছিলেন । ইসমত উদারপন্থী, বামমনোভাবাপন্ন । ইসমতের গল্পে নারীর ন্যায়সংগত বাসনার কথা আছে – নারীর যৌনতা( Feminine Sexuality) তাঁর গল্পের অন্যতম বিষয় । ‘লিহাফ’ খুবই বিতর্কিত গল্প । বর যাকে বিয়ে করেছে কিন্তু রাতে স্পর্শ করে না, বর যাকে বিয়ে করেছে কিন্তু যার মনোযোগ সুশ্রী কমবয়সি ছেলেদের প্রতি – এ এমন এক রমণীর কাহিনি । ‘Nawab Sahib … liked to do was keep an open house for students; young, fair and slim-wasted boys.’ মেয়েটির ন্যায়সংগত অতৃপ্ত বাসনা তাকে সমকামী অভ্যেসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বাড়ির কাজে বহাল রাব্বো বেগমের সঙ্গিনী। ‘ Rabbo had no other house hold duties. Perched on four-poster bed, she was always massaging Begum Jan’s head, feet or some other part of her anatomy.’ ১৯৪২-এর গল্প যখন ১৯৯৬ তে ছবি হল তখন গল্পের কাঠামোর ওপর গড়ে ওঠা সিনেমার ইমারতটি অবশ্য বেশ অন্যরকম । খুবই অনিবার্য ছিল এই বদল । ‘লিহাফ’-এ যা ঠারে-ঠোরে বলা , অপ্রকাশ্য , তা ‘ফায়ার’-এ স্পষ্ট । সাদাত হোসেন মান্টোর বন্ধু ইসমত চুঘতাইয়ের গল্পকে দীপা মেহেতা বদলে নিলেন । তাঁর ছবিতে রাধা-সীতা দুই জা । তাদের স্বামীরা অসংবেদনশীল, দুজনেই স্ত্রীকে শরীর মনে বঞ্চিত করেছে । আর বাড়ির পুরুষদের শরীর-মনের বঞ্চনার বিরোধিতার সূত্রেই রাধা-সীতার সখ্য , মন থেকে তাদের শরীরে যাওয়া । স্পর্শ, চুম্বন,মিলন ।
এই যে মেয়েদের শরীরের মনের স্বাভাবিক ন্যায্য চাহিদা, ভারতীয় সমাজ তাকে নানা সময়ে অস্বীকার করেছে । যে ভারতীয় সমাজ বসন্তসেনাদের ঠাঁই দিত সেই প্রাগাধুনিক ভারতীয় সমাজ চাপা পড়ে গেছে নানা কারণে । মেয়েদের শরীর মনের চাহিদাকে অস্বীকারের পরস্পর সম্পর্কিত কতগুলি রূপ আছে – আধুনিক ভারতীয় সমাজে তা বেশ চোখে পড়ে । এই রূপগুলি উনিশ শতকে বিশেষ জাতীয়তাবাদী ভাবনার অনুষঙ্গে গড়ে উঠেছিল । মেয়েদের বুক ফাটবে তবু মুখ ফুটবে না , তাদেরকে দেবী বানিয়ে তোলা হবে । সেই দেবীদের নিজস্ব কামনা-বাসনা থাকতে নেই । অথবা বলা ভালো ততটুকুই থাকবে, যতটুকু পুরুষ চাইবে । এই আদল বঙ্কিমচন্দ্রের সুপরিচিত উপন্যাস ‘দেবী চৌধুরাণী’তে রয়েছে । এ হল একরকম সামাজিক ছাঁচ, মেয়েদের তা মান্য করতে হত । এই ছকের বাইরে মেয়েরা যদি নিজের মতো বাসনাময়ী হয়, তাহলে তাদের কপালে গঞ্জনার শেষ থাকে না । তারা প্রায় ‘কামতাড়িত-ডাইনি’ হিসেবে বিবেচিত । সহজ উদাহরণ পুরনো হিন্দি ছবিতে ‘হিরোইন’ আর ‘ভ্যাম্প’ । একই পয়সার এ যেন দুই পিঠ – পুরুষতন্ত্র একদিকে সতীকে চায়, অপরদিকে পুত্র-উৎপাদনকারী স্থিতিশীল পরিবারের বাইরে স্বাধীনারমণী মাত্রকেই ‘ভ্যাম্প’ বানিয়ে ছাড়ে । আধ্যাত্মিকতার ভাষায় এ হল ‘বিদ্যা মায়া’ ‘অবিদ্যা মায়া’ । ‘ফায়ার’-এর মতো ছবি সতী –ভ্যাম্প, বিদ্যা-অবিদ্যা মায়ার কাঠামোকে প্রশ্ন করছিল । এই প্রশ্নগুলোকে সবাই যে বুঝতে চাইছিলেন তা নয়, তবে ছবিটি দেখতে চাইছিলেন ।
নয়ের দশকে মুক্ত-অর্থনীতির হাত ধরে ভারতীয় সমাজে বিনোদনের নতুন নতুন মাধ্যম প্রবেশ করছিল । ভারতীয় সমাজের অবদমন , শুচিবায়ুগ্রস্ততা কমছিল । এতদিন শুচিবায়ুগ্রস্ততা ও অবদমনের ফলে যা দেখতে পারেনি সেই শারীরিকতা কোনার্ক, খাজুরাহোর দেশের মানুষ নতুন করে দেখতে চাইছিলেন । ভারত যে কোনার্ক- খাজুরাহোর দেশ এটা সচেতন ভাবে ভারতীয়দের ও বিদেশের দর্শকদের এই পর্বে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল । ফলে নয়ের দশকের ‘কামসূত্র’ শশী কাপুরের আটের দশকের ছবি ‘উৎসব’-এর মতো ফ্লপ ছবি নয় । বরং কামসূত্রের হিন্দি ডাব করা ভার্সন নাইট শো-তে হাউসফুল । কিন্তু এসবই পরের কথা ।
মেয়েদের ন্যায়সংগত নিজস্ব স্বাধীন শরীর-মনের প্রশ্ন কিন্তু ‘খুদ্দার’ তোলেনি । একটি আকর্ষণীয় রমণীয় শরীর, যে বার্বি ডলের মতো নয়, পুরনো ভারতীয় কামশাস্ত্রীদের মাপমতো মোহিনী, তার সম্বন্ধে ইংরেজি ‘সেক্সি’ শব্দটি প্রকাশ্যে ব্যবহার করেছিল মাত্র । তা এমন শরীর দেখে পুরুষেরা কী করল ?
রোমিও হাজার আগে পিছে দৌড়ে
হা সেক্সি সেক্সি সেক্সি সেক্সি সেক্সি সেক্সি
সেক্সি সেক্সি সেক্সি মুঝে লোগ বলে
পুরুষেরা এই মেয়েটিকে খুবই সুখাদ্য বলে মনে করে , ‘বাউন্সার বাউন্সার বোলে সব বোলে কিসমিস / ইটালিয়ান চাইনিজ ওয়া হোয়াট অ্যা ডিস’ । পুরুষের এই ছোটাছুটিতে মেয়েটির একটু টেনশন হয় বটে , তবে বোঝাই যায় বেশ লাগে । সব বয়সের পুরুষেরা তার রূপের গুণগ্রাহী, এটা সে উপভোগই করে ।
ইন্দীবর(১৯২৪-১৯৯৭) যখন এই গানটি লিখেছেন তখন গীতিকার হিসেবে তিনি যথেষ্ট প্রবীণ , সুপ্রতিষ্ঠিত । ‘অমানুষ’(১৯৭৬) ছবির ‘দিল অ্যায়সা কিসি নে মেরা তোরা’ গানের জন্য ফিল্ম-ফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন । ‘খুদ্দার’-এর এই গানে ইন্দীবর ‘সেক্সি’এই শব্দটিকে মেয়েটির শরীরের নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করেছেন । এতে ভুল নেই । তবে ইংরেজিতে ‘সেক্সি’ শব্দটি কেবল নারীকেই বোঝায় না । seductive, desirable, inviting, sensual, sultry, provocative, tempting, exciting, stimulating, interesting এমন হাজারও প্রতিশব্দ তার । চতুর্দশ শতাব্দীর শেষে ল্যাটিন sexus থেকে ইংরেজি sex শব্দের উৎপত্তি । সেক্স শব্দের অর্থ ‘quality of being male or female’। নারী-পুরুষ উভয়েই কিন্তু এর আওতায় পড়ছেন । ডি এইচ লরেন্সের লেখায় ‘sexual intercourse’ প্রসঙ্গে সেক্স শব্দটির প্রয়োগ জনপ্রিয় হল , এই আকর্ষণ ও ক্রিয়ায় যে অঙ্গগুলি ব্যবহার্য তাকে ইংরেজিতে বলে genitalia, বহুবচন। genitals চেনা শব্দ । অর্থ ‘sexual organs’। পুরুষের , নারীর -- লিঙ্গের ও যোনির – আকর্ষণ, ক্রিয়া সবই এর মধ্যে আছে । ইন্দীবর ৯৩ সালে যখন তাঁর গানের পদ লিখছেন তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় ‘সেক্সি’ বলতে ‘শুধু’ মেয়েদেরকে বুঝত , ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ বলতে পুংলিঙ্গের চলন, ক্ষরণ ও তৃপ্তিকে বুঝত । মেয়েটির ভূমিকা সেখানে পুরুষের অনুগামী হিসেবে থাকা – তার চেয়ে বেশি কিছু নয় । ৯৩ সালের এই গানটি একদিকে যেমন ভারতীয় সমাজের পক্ষে বেশ সাহসী , কারণ কোনও রাখ-ঢাক না করে ‘সেক্সি’ শব্দটিকে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল । ভারতীয় মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক এমনিতে এবিষয়ে ‘রাখ-ঢাক’ থাকলেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন । তবে তার বেশি বিপ্লব এই গানে ছিল না । ‘সেক্সি’ শব্দটি এখানে একমাত্রিক ভাবে প্রযুক্ত – গুরুবক্ষ, ক্ষীণকটি , গুরুনিতম্ব নারীটিই লক্ষ্য । মেয়েদের স্বাধীন বাসনা ইত্যাদি এই গান-ছবির বিষয় নয় ।
ইংরেজি সেক্স, তার থেকে গড়ে ওঠা সেক্সি নারী-পুরুষ দুয়ের বাসনার প্রকাশক ও লিঙ্গচিহ্নের নির্দেশক । ইন্দীবর ৯৩ সালে মেয়েটির ওপরে একপাক্ষিক ভাবে শব্দটি বসিয়েছিলেন, এর জন্য তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না । এর পেছনে ভারতীয় সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতা ক্রিয়াশীল । সেক্সি এখানে যৌন-আবেদনের সমার্থক । আর যৌন আবেদন যেন কেবল নারীর ধর্ম , পুরুষ সেই আবেদনে আকৃষ্ট হবে ও নারীটিকে দখল করবে । দখল করতে না পারলে নানা ভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবে । আমরা যে ‘যৌন’, ‘যৌনতা’ শব্দগুলি ব্যবহার করি সেগুলি ব্যুৎপত্তিগত বিচারে ‘সেক্স’-এর মতো স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের পক্ষে ‘সমভাবাপন্ন’ নয় ।
যৌন শব্দটির অর্থ কী ? আভিধানিক অর্থ যোনিসম্বন্ধী । ‘যোনি’ স্ত্রী জননাঙ্গ । মনু তাঁর সংহিতায় বিবাহ বলতে ‘যৌনসম্বন্ধকে’ বুঝিয়েছেন। মনু নির্দেশিত এই বিবাহের উদ্দেশ্য কী ? মনু সংহিতা অনুসরণ করলে বুঝতে অসুবিধে হয় না এই বিবাহতন্ত্র কায়েমিপুরুষতন্ত্রের পক্ষপাতী । মনু সংহিতাতে কয়েক জায়গাতে যেখানে নারীরা পূজিতা হন, সেখানে দেবতারা তুষ্ট হন জাতীয় কথা থাকলেও মেয়েরা মোটের ওপর পুরুষের অধীন । মেয়েদের পক্ষে কুমারী অবস্থায় পিতার, যৌবনে স্বামীর আর বার্ধক্যে পুত্রের অধীনে থাকাই বিধেয় (৯/৩) । এই বিবাহ প্রজননার্থে । পুত্র উৎপাদনই প্রধান লক্ষ্য । সুতরাং ‘যৌনসম্বন্ধ’ যে বিবাহ তাতে পুরুষের যোনি বিষয়ক আগ্রহ, আকর্ষণ মুখ্য ও এই বিবাহে যোনিবাসনাকে নিয়ন্ত্রণও করবে পুরুষ বকলমে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ । বিধবা হলে মেয়েরা কী করবেন তাও মনু নির্দেশ করেছেন । ফলমূল খেয়ে স্বল্পাহারে দেহক্ষয় করবেন (৫/১৫৭) । আর বিধবা ব্রহ্মচর্য পালন করলে স্বর্গ অনিবার্য(৫/১৬০)। সুতরাং এসব কথা মনে রাখলে বলতেই হয় যৌন ও যৌনতা শব্দদুটি পুরুষের কর্তৃত্বের প্রকাশক । ইন্দীবর এই মানসিকতা থেকেই ‘সেক্সি’ শব্দটিকে সীমিত অর্থে ব্যবহার করেছিলেন । ইদানীং অনেকেই রাজনৈতিক ভাবে ঠিক থাকার জন্য স্ত্রী-যৌনতা শব্দবন্ধটি ব্যবহার করছেন ।

যাই হোক ভারতীয় সভ্যতা ও সমাজ খুবই বিচিত্র । তাতে নানা জনগোষ্ঠী, নানা ভাষা, নানা ধর্ম, নানা সংস্কৃতি । এই নানা ভাষার জনগোষ্ঠীর মানুষের নানা অভ্যেসের মধ্য থেকে কোনও একটিকে ‘ভারত সংস্কৃতি’ বলে চিহ্নিত করা খুবই মুশকিল । করার প্রয়োজনই বা কী ? উনিশ শতকে পরাধীন ভারতে যাঁরা জাতিগত ঐক্যের কথা ভাবছিলেন তাঁরা ভারত সংস্কৃতির নির্দিষ্ট একটি রূপকে চিহ্নিত করতে চাইছিলেন । বাঙালি চিন্তাবিদদের মধ্যে অনেকেই এই সাংস্কৃতিক রূপের বৈশিষ্ট্যগুলি দাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন । তাতে নারী ও পুরুষের শরীরের কামনা-বাসনার চেহারা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে নানা কথা ছিল । ক্রমশই অবশ্য বোঝা যাচ্ছে এই ‘উচিত’ দিয়ে মুক্ত অর্থনীতি পরবর্তী ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে আর আটকে রাখা যাবে না । ‘যৌনতা’র ভাবনাকে কায়েমি পুত্র উৎপাদনকামী পুরুষতন্ত্রের কারাগারের মতো কাঠামো থেকে বের করে নানা প্রশ্ন তোলাই বরং উচিত । নয়ের দশকে একদিকে যেমন নারী-বাসনার স্বাধীন পরিসরের কথা উচ্চারিত হল , তেমনি সমকামীদের অধিকারের প্রশ্নও ক্রমশ প্রকাশ্যে এল । একুশ শতকের প্রথম দশকে ওনিরের ছবি ‘মাই ব্রাদার নিখিল’(২০০৫), ‘আই অ্যাম’(২০১০) সমকামিতার প্রশ্নটিকে ,সংখ্যালঘুর অস্তিত্বের সংকটকে তুলে ধরল । শুধু ছবি নয় তৈরি হল সামাজিক সংগঠন । ২০০৩-এ পূর্ব ভারতে প্রথম গড়ে উঠল যৌন ভাবে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ের সংগঠন ‘স্যাফো ফর ইকুয়ালিটি’ । শুধু যে সমকামী ও অন্য যৌনতার মানুষদের অধিকারের কথাই উঠেছে তাই নয় এই পর্বে ‘যৌনকর্মীদের’ নিয়েও আন্দোলন হয়েছে । বস্তুত পক্ষে যৌনকর্মীদের নিয়ে পূর্ব ভারতে সাংগঠনিক স্তরে আন্দোলনের সূত্রপাত গত শতকের নয়ের দশকে । ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয়’ সমিতি সোনাগাছিতে কাজ শুরু করেছিল ১৯৯২-তে । সুতরাং বলাই যায় গত শতকে নব্বইয়ের পরে ভারতে, পূর্বভারতে , পশ্চিমবঙ্গে নর-নারীর যৌনতার বিষয়টি নানাভাবে নতুন চেহারায় আলোচনার বিষয় হল ।


এই আলোচনায় সংখ্যালঘুদের অন্য যৌনতা, মেয়েদের যৌনতা, যৌনকর্মীদের প্রসঙ্গ -- নারী-পুরুষের পুত্র/কন্যা উৎপাদনকারী পারিবারিক যৌনতার প্রচলিত ধারার বাইরে -- ক্রমশই মুখ্য হয়ে উঠল । নারী-পুরুষের সন্তান উৎপাদনকারী পারিবারিক ‘যৌনতা’ যেন ‘যৌনতার ঘর’ । আর এই স্থিতিশীল যৌনতার বাইরে যা কিছু তাই যেন ‘যৌনতার বাহির’ । এখানে একটা কথা খেয়াল রাখা দরকার । মানবিক অধিকারের আন্দোলন যাঁরা করেন তাঁরা অনেক সময়েই নারী-পুরুষের যৌনতার প্রসঙ্গটি বাদ দিয়ে যান । যেমন সাবেকি মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকেরা মেয়েদের অধিকার নিয়ে নানা আন্দোলন করেছেন । উৎপাদন ব্যবস্থায় মেয়েদের ভূমিকা , গৃহশ্রম , মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি নিয়ে মার্ক্সবাদীরা যুক্তি সংগত কারণেই সরব হয়েছেন । এই সরবতা ও বৈষম্যের বিরোধিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এই বাইরের বৈষম্যের ক্ষেত্রগুলিকে চিহ্নিত করতে গিয়ে তাঁরা অনেকসময়েই দুজনের সম্পর্কের একেবারে ভেতরে, কেন্দ্রে রয়েছে যে ‘যৌনতা’ সেই প্রসঙ্গটিকে বাদ দিয়েছেন । এই যৌনক্ষেত্রটিতে যে মেয়েদের, সংখ্যালঘুদের নানাভাবে অপমান , বঞ্চনা, বৈষম্য , তঞ্চকতার শিকার হতে হয় সে কথা যেন শ্রেণীবৈষম্য , অপরাপর সামাজিক বিরোধের মতো বড়ো ঘটনার চাপে ‘ছোটোখাটো’ বিষয় হিসেবে ঢাকা পড়ে যায় । কিন্তু এসব মোটেই ব্যক্তিগত ছোটো ঘটনা নয় । তা গভীরভাবে রাজনৈতিক ।
বিষ্ণু দের ‘কেন তুমি ভাবো’ নামের কবিতাটির কথা মনে আছে ?
কেন তুমি ভাবো, এ-আকূতি শুধু যৌন ?
অংশত তাই, আবার মাধুরী মমতাও জেনো সত্য ।
কেন তুমি খোঁজ কোনটা মুখ্য গৌণ ?
বিষ্ণু দের কবিতাটিকে একটু অন্যভাবে ব্যবহার করা যেতেই পারে । যৌন আকুতির মধ্যে কত যে ওঠা পড়া , কতরকম রাজনীতির টানাপোড়েন , মেয়েদের ও সংখ্যালঘুদের প্রতি কতরকম বঞ্চনা মিশে আছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই । কোনটা মুখ্য কোনটা গৌণ বলা মুশকিল । এর ধারাবাহিক বিবরণ দেওয়াও প্রায় অসম্ভব । তাহলে কি কথাই শুরু করা যাবে না ? যাবে , শুরু করা উচিত । একটু এলোমেলো ভাবেই না হয় শুরু হোক ।

বিশ্বজিৎ রায়

বিশ্বজিৎ রায়


বিশ্বজিৎ রায় বিশ্বভারতীতে বাংলা পড়ান । বাংলা পড়েন । বাংলায় লেখেন । পড়ার বিষয়ে সর্বগ্রাসী । ওই যে শাস্ত্রে বলে না পাঠকের মন হবে গণিকার মতো । যখন যেটা পড়বে তাতেই তার মতো করে রাঙা হবে মন । এও তেমন । তার মানে বিশ্বজিৎ রায় পল্লবগ্রাহী ।অন্য পরিচয় ঠোঙাশিল্পী । মানে কাগজে নিয়মিত লেখেন -- খবরের কাগজ থেকে ঠোঙা হয় । কয়েকটা অখাদ্য বইও লিখেছেন ।

আপনার মতামত জানান