দাদুকাহিনি-২

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

 

রেসিপি

আমি খুবই পান্তা ভাত খেতে পছন্দ করতাম ছোটবেলায়। এখনও করি, যদিও খাওয়া হয় কম। আমাদের দোকানের গরম চপ, কুচি করে কাটা পেঁয়াজ, লঙ্কা, অল্প লেবুর রস দিয়ে মাখা থাকত আমার প্রতিটি রোববার। আমার দাদুর সাথে একসাথে বসে আমি পান্তা ভাত খেতাম সকালে দাদু বাজার করে ফেরার পর। ততক্ষণে হেঁশেলে মুগডাল, ঝুরোঝুরো আলুভাজা, আর সরু চালের ভাত হয়ে গেছে। মাংস রান্নার ব্যস্ততা তুঙ্গে। এমন সময় মা আমাদের পান্তা ভাত বেড়ে দিত। দাদু-ই মাখত চপ। আহা, তার কী স্বাদ, এমন করে আর কেউ কোনোদিন চপ মাখতে পারেনি। আমি ছোটবেলা থেকেই কারও এঁটো খেতাম না, কিন্তু এই চপ মাখাটা কিছুতেই আলাদা বাটিতে নিয়ে বসতাম না। আমার আর দাদুর পান্তা ভাত আলাদা থালায় থাকলেও, চপমাখা থাকতো একটাই বাটিতে দুটি ভাগ করা। কাজ ভাগ করে নেওয়াই দস্তুর, তাই দাদু চপ মাখত বলে আমিই ভাগ করার কাজটা করতাম। নিখুঁত করে ৭০ভাগ আমার আর ৩০ভাগ দাদুর। প্রায় সমভাগ। দাদু অল্প আপত্তি জানিয়েও ছিল কয়েকবার, শেষে বুঝেছিল নিজে সিপিএম করলেও অন্তত চপমাখায় সাম্যবাদ চলবেনা। কিন্তু গল্পের শেষ এখানেই নয়। পান্তা খাওয়া শুরু তো করতাম দুজনে, কিন্তু ক্রমেই দেখা যেত, দাদুর চপের ভাগ দ্রুত কমছে, আমারটা একদম শুরুর মত-ই পাহাড়। অবস্থা দেখে দাদু নাজেহাল। অইটুকুনি চপমাখা তার ভাগে, তাও যদি না জোটে কী আর করা যায়! ধার চাইত দাদু আমার চপমাখা থেকে, একেবারেই যে দিতাম না, তা নয়, তবে চড়া সুদ নিতাম। দাদু একগাল হেসে রাজি হয়ে যেত। কেশব নাগের অঙ্কের থেকেও আমাদের ওই ছেলেমানুষি থেকেই আমার সুদ-আসলের ধারণা ভাল করে শেখা। এখনও যখনই পান্তা ভাত খাই চপ মেখেই খাই, আর দাদুকে খুউউউব মনে পড়ে।

আমাদের আরও অনেক প্রিয় খাবার ছিল। দাদুই আমাকে সে গুলো খেতে শিখিয়েছিল বলা চলে। কোনোদিনই আমি স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে মনোনিবেশ করিনি, আর আমার দাদুর পূর্ণ সমর্থনে আমি প্রায়ই দাদুর সাথে বেরিয়ে না না সুস্বাদু খাবার প্রথম খেয়েছিলাম মনে পড়ে। আমার সবচেয়ে প্রিয় খাবার ফুচকাও আমার প্রথম খাওয়া দাদুর সাথে মেলা দেখতে বেরিয়েই। দাদু আর আমি ঘুগনি পাউরুটি খেতেও খুব ভালবাসতাম। প্রথমে একটা ডিশে ঘুগনি নিয়ে তাতে পেঁয়াজ, লঙ্কা কুচি, লেবুর রস, বিট নুন, জিরে-ধনে গুঁড়ো, গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে নিয়ে তার উপর (এ পর্যন্ত লিখেই জিভে বর্ষা কাল, সুড়ুৎ করে জল টেনে নিয়ে লিখে চলেছি) পাউরুটি ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ছড়িয়ে দেওয়া হত। দিয়ে একটি একটি করে টুকরো মুখে তোলার যে কী স্বাদ! দেবভোগ্য। কে আর সেদ্ধ ম্যাগি খায়! ছোঃ!


এখনও আমাদের দোকান আছে। খাবারগুলো এখনও হয়। একই রকম ভাবে সাজিয়ে নিয়ে খেতে বসে দেখেছি সে সব-ই এখন সেদ্ধ ম্যাগির মত-ই পানসে লাগে।

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী


নাম- শুভদীপ দত্ত চৌধুরী
ধাম- পশ্চিম মেদিনীপুর
জন্ম- ০৯/০৬/১৯৮৯ (জন্মেই নয় ছয়!)
মৃত্যু- মতান্তর বিস্তর।
শখ- গান শোনা, ঘুরে বেড়ানো, চিঠি লেখা, ক্রিকেট, আড্ডা, প্রেম…
শিক্ষা- ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. । এছাড়াও স্প্যানিশ সাহিত্য, ফরাসী সাহিত্য, জাপানী সাহিত্য, পর্তুগীজ সাহিত্য, ব্রাজিলিয়ান সাহিত্য (সদ্য বিশ্বকাপ ফুটবল হল বলে কথা!) সম্পর্কে অগাধ অজ্ঞতা।
কবিতা লেখা শুরু- প্রেমে ল্যাং খেয়ে ২০০৬ সালে। সে সব ডায়েরি-বন্দী মনখারাপ। কলেজ ম্যাগাজিনের পর প্রথম লেখা পাঠানো একসাথে “উনিশ কুড়ি” ও “দেশ”-এ ২০১১ সালে। কবিতাগুলি ওই বছরেই প্রকাশিত। এরপর বহু বড়, মেজো, সেজো, ফুল, রাঙা, ও ন’ ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশিত।

কবিতার বই- “ব্যথার বন্দিশ”(২০১৪), প্রকাশক- যাপনচিত্র
না, এই বইয়ের সাথে কোন স্ক্র্যাচ কুপন ফ্রী নেই। ফলে নেই অল্টো গাড়ি জেতার সুযোগ। তবে আছে সময় নষ্ট করার জন্য ২৭টি কবিতা।

ধর্ম- রবীন্দ্রনাথ, বর্ণ- মোটামুটি ফর্সা।
রূপ- আহা! রস- ডাহা!
শব্দ- দিস্তে দিস্তে।
গন্ধ- ডিওডেরান্টের উপর নির্ভর করে!
স্পর্শ- হাই-ভল্টেজ স্পার্ক!


আপনার মতামত জানান