যৌনতার কারক প্রকরণ (১)

বিশ্বজিৎ রায়

 

প্রেমের ক্ষেত্রে কবিদের ভূমিকা যে ভয়ানক-রকম উসকানিমূলক সে কথা গুরুজনেরা বলেই থাকেন । গ্রিক দার্শনিক প্লেটো , প্লেটো পড়া বাঙালি সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ – দুজনেই প্রেমের কবিদের, দেশ থেকে নির্বাসন দিতে চেয়েছিলেন । কবিদের প্রতি প্লেটোর বিরক্তি প্রকাশের খবর তো বেশ সুপরিচিত । প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-গ্রন্থের দশম অধ্যায় নিজের চোখে না পড়লেও, ‘ভদ্রলোক’ বাঙালি পাঠক মাত্রেই জানেন, সেখানে প্লেটো কবিদের ঘাড়ধাক্কা দিতে চেয়েছিলেন। প্লেটো মনে করতেন, কবিরা মানুষের মনের যত বেহায়া আবেগ উসকে দেয় । সেই আবেগের চাপে-তাপে নগররাষ্ট্রের বাসিন্দাদের হাল তখন খারাপ । নগরের উন্নতির ও নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার, তা না করে কাব্যপড়া দুর্বলচিত্ত মানুষেরা নিম্নগামী আবেগে মজে । এদেরকে নিয়ে কী করা উচিত ? নগররাষ্ট্রের যে আদর্শ চেহারার কথা প্লেটো ভেবেছিলেন সেখানে কবিদের ঠাঁই নেই, তাদের নির্বাসিত করা উচিত । প্রেমের কবিদের নির্বাসন দেওয়াই ভালো – এই হল প্লেটোর দাওয়াই । ঘর, দেশ থেকে বিদেয় কর ।
নরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্তর কলকাতার ছেলে । সিমলে পাড়ায় বাড়ি । প্লেটোভক্ত । নরেন্দ্রনাথ মানে বিবেকানন্দ যে খুবই মন দিয়ে প্লেটো পড়েছিলেন , ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত সে কথা জানিয়েছিলেন । বিবেকানন্দ তখন খ্যাতিমান । দ্বিতীয় বার বিলেত যাচ্ছেন জাহাজে করে । সঙ্গে নিবেদিতা, আর তুরীয়ানন্দ । জাহাজপথে যেতে যেতে যা দেখছেন তাই নিয়ে ফুট কাটছেন । জাহাজ সিংহল মানে শ্রীলঙ্কা হয়ে যাবে । অমনি বিবেকানন্দের মনে হল, ‘ ওই যে একদল দেশে উঠছে, মেয়েমান্‌ষের মতো বেশভূষা, নরম নরম বুলি কাটেন, এঁকেবেঁকে চলেন, কারুর চোখের ওপর চোখ রেখে কথা কইতে পারেন না, আর ভূমিষ্ঠ হয়ে অবধি পিরীতের কবিতা লেখেন,আর বিরহের জ্বালায় হাঁসেন হোঁসেন করেন – ওরা কেন যাক না বাপু সিলোনে।’ পরাধীন ভারত । সাহেবরা হিন্দুদের এফিমিনেট বলে । মেয়েলি এই অপবাদ দূর করতে বিবেকানন্দ পিরীতের কবিদের দেশান্তরী করে ঘর গোছাতে চাইছেন ।
প্লেটো, প্লেটো পড়া বিবেকানন্দই শুধু নন এমন হাজারো উদাহরণ দেওয়া যায় যাঁরা প্রেম ও যৌনতা বিষয়ে বাছ-বিচারশীল । কী করা উচিত ও উচিত নয় তার তালিকা তৈরি করছেন দেশ কালের সাপেক্ষে । এই যে কী করা উচিত আর উচিত নয় এটা ঠিক কবিদের জগৎ নয় – ব্যাকরণবিদদের জগৎ । কবিরা তো নিয়ম মানেন না । প্রেমে ফাউল, ফেয়ার নেই । আবেগে কল্পনায় ব্যাকরণের সীমাকে মাঝে মাঝেই তাঁরা ডিঙিয়ে যান । যেমন হয়তো এতদিন অবধি এই ছন্দে লেখার চাল হঠাৎ একজন কবি অন্যরকম ভাবে লিখে বসলেন । সবাই গেল গেল করে উঠল । ব্যাকরণ ও ছান্দসিকরা বললেন হয়নি । তারপর দেখা গেল সেই অন্যরকম, ব্যাকরণ না-মানা লেখা, সাধারণের এমন ভালো লেগে গেল যে তখন ব্যাকরণবিদ ও ছান্দসিকেরা সেই নতুন রকমের লেখারও বিধি বানালেন । না হলে তাঁদের মুখরক্ষা হত না । পুরনো শাস্ত্রবিদেরা বলেন এ মজার খেলা । কবি আইন অমান্য করছেন, আর ব্যাকরণবিদেরা সেই অমান্যতাকে বাধ্য হয়ে শেষ অবধি বলছেন আচ্ছা এটাও মানা গেল, এই হল নতুন নিয়ম ।
‘প্রেম-যৌনতার’ ক্ষেত্রেও কাণ্ডটা তাই । দুজন মানুষ কোনও দেশ-কালে কী করতে পারবে ও পারবে না তা নিয়ে ব্যাকরণের মতোই নানা নিয়মকানুন । মানুষেরা সেই নিয়ম ভাঙে । প্রেমে পড়ে , যৌনক্রিয়ায় নেমে বলে নিয়ম মানব না । যৌন ক্রিয়া, প্রেম ইত্যাদি বিষয়ে দেশে দেশে নিয়মকানুন । দুজন তা ভাঙছে । ঘরের থেকে বের করে দেওয়া হয় তাদের, একঘরে করে দেওয়া হয় । ঘর সমাজ ছেড়ে তারা নিজের মতো থাকতে চায় । আবার ঘর তাদের নিজেকে বদলে ডেকেও নিতে পারে । ১৯৮০-তে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘খুবসুরত’ সিনেমায় ‘সারে নিয়ম তোড় দো’ বলে একটি গান ছিল । এই ছবিতে দ্বারকা প্রসাদ গুপ্তের স্ত্রী নির্মলা গুপ্ত খুবই শক্ত হাতে, নিয়ম মতে ঘর-সংসার চালাতেন । সেই সাংঘাতিক কড়া পারিবারিক নিয়মের বিরুদ্ধে ক্রমে কথা উঠল । কথা তুলল মঞ্জু । মঞ্জু, নির্মলা গুপ্তের দু-নম্বর ছেলে শ্যালিকা ।মঞ্জুর ভূমিকায় রেখা । মঞ্জু গুপ্ত পরিবারের রকম-সকম দেখে তো হেসে খুন । তারই উদ্যোগে ছাদে একটা নৃত্যনাট্য হল । সেই নাট্যে সবার সামনে রেখার গান ‘সারে নিয়ম তোড় দো’ । বাড়ির অন্য সদস্যরা দর্শক । শেষ অবধি নানা কৌতুককর ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্যে নির্মলা গুপ্তের তিন নম্বর ছেলের সঙ্গে রেখার প্রেম ও বিয়ে । নির্মলা রেখাকে মেনে নিলেন । ঘরের নিয়মের প্রতিবাদ করতে রেখা ছাদে নৃত্যনাট্যের আয়োজন করেছিল । তারপর ঘর তাকে মেনে নিল , নিয়মকে একটু বদলে নিল । সমঝোতা বললে সমঝোতা , বন্ধুতা বললে বন্ধুত্ব হল দুয়ের । এখানে ঘর নিজেকে বদলে ঘরের ছেলের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দিল । ১৯৮১-তে ‘খুবসুরত’ ফিল্ম-ফেয়ার এওয়ার্ড পায় । ১৯৮৮ তে হিট ছবি ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ । আমির খান আর জুহি চাওলা । শেক্সপিয়রের ‘রোমিও জুলিয়েট’-এর গল্পে প্রভাবিত ছবি । দুই পরিবারের কলহ – সেই শত্রুতা আছে বলেই আমির জুহির প্রেমকে তারা মানবে না । এই দুই পরিবারের ছেলে মেয়ের মধ্যে প্রেম-যৌনতা-বিবাহ নিষিদ্ধ । এই পারিবারিক ট্যাবু বা নিষেধাজ্ঞাকে নতুন প্রজন্মের আমির-জুহি ভাঙতে চায় । ছবিতে এক বনাঞ্চলে বাড়ি থেকে পালিয়ে আমির জুহি সত্যি সত্যি নিজেরা কাঠ বয়ে ঘর বানিয়ে বসবাস করতে শুরু করে । শেক্সপিয়রের নাটক সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে নর্থপ ফ্রাই দেখিয়েছিলেন শেক্সপিয়রের অনেক কটা কমেডিতে সবুজ বনাঞ্চলের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ । সামাজিক বিপ্লব করল কেউ । সামাজিক নিয়ম মানল না । তারপর ঘটনাচক্রে সে হাজির হল সবুজ বনাঞ্চলে । সেই বনাঞ্চল থেকে যখন সে বাইরে এল তখন সমস্যা মিটে গেল, নানা রদ-বদলের পর । ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ ট্যাজেডি । আমির-জুহির সমাজ-শহর থেকে দূরের ঘরে পারিবারিক মোড়লেরা ঢুকে পড়ে । গুলি চলে । যার পরিণতি আমির-জুহির মৃত্যু । এখানে দুজনের ‘প্রেম-যৌনতা-বিবাহ’কে পরিবারের কত্তারা মেনে নেননি । আদিত্য চোপরার ‘মহব্বতে’ ২০০০-এর ছবি । অমিতাভ বনাম শাহরুক । অমিতাভ, নারায়ণ শঙ্কর । শাহরুক রাজ আরিয়ান । ‘গুরুকুল’ নামের অসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রিন্সিপাল নারায়ণ শঙ্কর । সেখানে অন্য অনেক কিছুর মতো ব্রহ্মচর্যই নিয়ম । নিয়ম ভাঙলে বহিষ্কার । এই নিয়ম ভাঙার গল্পে কি না ঢুকে পড়ল তার মেয়ে মেঘা ! মেঘার ভূমিকায় ঐশ্বর্য রাই । ছাত্র রাজ তার প্রেমিক । জানতে পেরে শঙ্কর রাজকে তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে প্রেমের অপরাধে বের করে দিলেন । মেয়ে মেঘা আত্মহত্যা করল । অনেক বছর পরে রাজ আরিয়ান ফিরে এসেছে শিক্ষক হিসেবে – নতুন মিউজিক টিচার । তাকে প্রিন্সিপাল নারায়ণ শঙ্কর চিনতে পারেননি । চেনার কথা নয় । কারণ রাজকে যখন বহিষ্কার করা হয়েছিল তখন তার বয়স কম । প্রিন্সিপালও চুনোপুটি এই ছাত্রকে চিনে-দেখে তার কথা শুনে বের করেননি । একেবারে নির্বিচারে ঘাড় ধাক্কা দিয়েছিলেন । রাজ এখন ফিরেছে প্রতিশোধ নিতে । নিয়মের ‘গুরুকুল’কে সে খোলামেলা প্রেমের গুরুকুল বানিয়ে তুলবে । সাংঘাতিক দ্বন্দ্বের পর নিয়মের পরাজয়, প্রেমের জয় । অমিতাভ শাহরুককে মেনে নেয় । গুরুকুলে পরিবেশ বদলায় । পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো রাষ্ট্রও দুজনের প্রেমের অন্তরায় হতে পারে । ২০০৪-এর ছবি বীর-জারা । ভারতীয় ফৌজির সঙ্গে পাকিস্তানি সুন্দরীর প্রেম । দেশে দেশে শত্রুতা, ধর্মে ধর্মে বিরোধ । তাই এই প্রেমে অনেক বিপত্তি । শেষ অবধি অবশ্য প্রেমই জিতল – আদালতে ফৌজি বীর শাহরুকের নির্দোষিত্ব প্রমাণ করলেন মহিলা আইনজীবী রানি মুখার্জি । অন্যায় ভাবে জেলের চার-দেওয়ালে যাকে আটকে রেখেছিল রাষ্ট্র তার মুক্তি । প্রেমিকার সঙ্গে মিলনও সম্ভব হল । এই সব কটা গল্পই নিয়ম মানা , না-মানা, বদল ইত্যাদির ক্ষেত্রে নর-নারীর প্রেমকে নিয়েই কথা চালিয়েছে । এগুলো যদি সমকাম বা অন্যরকম কোনও যৌনতার কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠত তাহলে হয়তো নিয়মের মানা , না-মানার বিষয়টি আরও জটিল হত । ‘মহব্বতে’ যতজন দেখেছেন , প্রেমের ক্ষেত্রে পুরনো নিয়ম চলবে না বলে খুশি হয়েছেন তার কত শতাংশ মানুষ ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ দেখে খুশি হবেন বলা শক্ত । ওনিরের ছবি ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ সমকামের গল্প । বাবা ছেলেকে সাঁতারু বানাতে চায় । ছেলে সমকামী । তার সেই প্রেম তাকে সমাজ-পরিবার-সাফল্যের প্রতি উদাসীন করে তুলেছে । সমকামী ভাই নিখিলকে সহায়তা করেছে দিদি জুহি চাওলা – জনমত গড়ে তুলেছে ভাইয়ের পক্ষে । মহব্বতের মতো নাচে গানে ভরপুর বিগ বাজেট ছবি ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ নয় । নারী-পুরুষের বিয়ে করে সন্তানাদি নিয়ে সুখে থাকার জন্য যে প্রেম তা প্রথমে পুরনো নিয়মকে , যে নিয়ম বলে পাত্র-পাত্রী সমাজ ও পরিবার নির্বাচন করে দেবে , তাকে চ্যালেঞ্জ করে । সেই প্রতিবাদকে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মেনে নেন । সমকাম , অন্য যৌনতা এসবের ক্ষেত্রে সন্তান উৎপাদন করে সুখে থাকার ভবিষ্যৎ সহজ গল্পটি অনুপস্থিত । ফলে সাধারণ মানুষের সমর্থন তত মেলে না , এদের কাহিনির প্রতি কৌতূহল আছে কিন্তু প্রকাশ্য সমর্থন তুলনায় কম । সাধারণ মানুষ তো এমন করতেই পারেন । কিন্তু ফ্রয়েড ? সিগমুন্ড ফ্রয়েড ? ফ্রয়েডের ‘Three Essays on the Theory of Sexuality’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ রচনা । উনিশ শতকের শেষাশিষি এই লেখার খসড়া তৈরি হয়েছিল, বিশ শতকে ফ্রয়েড নানা রদ-বদল, পরিমার্জন করেন । এই রচনায় ফ্রয়েড ‘সেক্সুয়াল অবজেক্ট’ আর ‘সেক্সুয়াল এম’ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন । কী যৌনতার বিষয় ? কী যৌনতার উদ্দেশ্য ? তা ভালো করে জেনে বুঝে নেওয়া চাই । ফ্রয়েড লিখেছেন পুরনো এক লোককথায় চমৎকার করে বোঝানো হয়েছে বিষয়টি । এই লোককথায় আদতে মানুষ ছিল গোল, থাকত যুগলে । জিউস এসে সেই যুগলদের কেটে আধখানা করে দিল । আধখানা বাকি আধখানাকে খুঁজছে । এই অনুসন্ধানই প্রেম, মিলিত হওয়ার বাসনা ক্রিয়া যৌনতা । গল্পটি অ্যারিস্টফিনিসের সূত্রে প্লেটো ব্যবহার করেছিলেন । এই দোসরওয়ালা গোল যুগল যে শুধু নারী-পুরুষকে নিয়ে হত ট্যাঁ নয় । নারী-নারী, পুরুষ-পুরুষ মিলেও গোল হত । সেও দোসর বা যুগলের বৃত্তান্ত । ফ্রয়েডের পক্ষপাত অবশ্য নারী-পুরুষের গোলটির প্রতি । লিখেছেন, ‘The popular view of the sexual instinct is beautifully reflected in the poetic fable which tells how the original human beings were cut up into two halves—man and woman —and how these are always striving to unite again in love’ নারী পুরুষের আর পুরুষ নারীর যৌন বিষয়, সেক্সুয়াল অবজেক্ট । সন্তান উৎপাদন, গৃহধর্ম পালন তাঁদের উদ্দেশ্য । কিছু ব্যতিক্রম আছে, সংখ্যালঘু তারা । তাদের ক্ষেত্রে পুরুষ পুরুষের এবং নারী নারীর যৌনতার বিষয় । ‘People of this kind are described as having ‘contrary sexual feelings’, or better, as being ‘inverts’’ । এই ইনভার্টদের ফ্রয়েড তত মর্যাদা দেননি , তাঁর লেখায় তা স্পষ্ট । সাধারণ মানুষ তো আরও দেবেননই না ।
মিশেল ফুকো তাঁর ‘হিস্ট্রি অফ সেক্সুয়ালিটি’র তিন নম্বর খণ্ডে লিখেছেন আর্টেমিডোরাসের কথা । খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর ভাবুক । আর্টেমিডোরাসের বিখ্যাত রচনার ইংরেজি নাম ‘দি ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস্‌’ । সেখানে স্বপ্নের ভাগ-বিভাগ নিয়ে নানা কথা আছে। আছে যৌন স্বপ্নের কথাও । কোন যৌন স্বপ্ন ভালো , কোন যৌন স্বপ্ন খারাপ তা নিয়ে নানা মন্তব্য । ভালো খারাপ বিচার করতে গিয়ে আর্টেমিডোরাস তিনটে বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন । প্রকৃতি নাকি প্রত্যেক জীবের জন্য যৌনক্রিয়ার কতগুলি রকম স্থির করে দিয়েছে । তার থেকে সরে এলেই বিপদ । ‘…nature has established a definite form of sexual act for each species’ যা ঠিক করে দিয়েছে সেটাই নাকি প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক । তার থেকে বিচ্যুত হলে চলবে না । প্রকৃতিকে মনে রেখেই তৈরি হয়েছে দেশের আইন । কিছু যৌনাচার আইনসিদ্ধ । কিছু যৌনাচার আইন বিরুদ্ধ । এই আইন আবার গড়ে ওঠে নানা লাভ-ক্ষতির নিরিখে । আর্টেমিডোরাস দেখিয়েছেন সমকামের ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির বিচার করা চাই । গরীব মানুষের পক্ষে ধনীর সঙ্গে সমকাম সবসময়ই ভালো ।


এই যে প্লেটো বা বিবেকানন্দ যখন-তখন প্রেমে হাপুস-হুপুস করতে নিষেধ করছেন তার কারণ তাতে দেশের ক্ষতি । প্লেটোর সময় গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলোতে লড়াই-কাজিয়া লেগেই থাকত । এবার যদি নাগরিকরা লড়াই না করে প্রেমের কবিতায় মজে থাকে তাহলে নগরের পরাজয় অনিবার্য । বিবেকানন্দ পরাধীন দেশের সন্ন্যাসী । ভাবছেন দেশের জন্য কাজ না করে, সাহেবদের সঙ্গে লড়াই না করে প্রেমে মিনমিনে হয়ে থাকলে বাঙালির ক্ষতি । সব সময় যে হিসেবটা দেশ বা নগরকেন্দ্রিক হয় তা নয় । পরিবার গোষ্ঠীও তাদের লাভ-ক্ষতি বিচার করে প্রেম ও যৌনতার ক্ষেত্রে কী করা চলবে বা চলবে না তার নিয়ম তৈরি করে । যে হিন্দি ছবির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে সেই ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ পারিবারিক লাভ-ক্ষতির হিসেব করে । এই সব নানারকম নিয়ম-কানুন একে বলা যায় প্রেমের ব্যাকরণ, যৌনতারও ।
প্রেম হল আবেগ বিশেষ, সেই আবেগ তো বাইরে থেকে কেউ দেখতে পায় না তবে সেই আবেগের বশে মানুষ যা করে , ইংরিজিতে যাকে বলে ‘সেক্সুয়াল অ্যাক্ট’ – অক্ষম বাংলায় যা ‘যৌনক্রিয়া’ – তা চোখে দেখা যায় । এই যৌনক্রিয়ার ব্যাকরণ আছে । আর্টেমিডোরাস তো সেই যৌনতার ব্যাকরণের কথা লিখেছিলেন – যেমন তিনি বলবেন মানুষের ক্ষেত্রে মুখোমুখি হয়ে যৌনাচারই প্রাকৃতিক, ব্যাকরণসম্মত । আবার কীভাবে ক্রিয়া করব তার ব্যাকরণ যেমন আছে , তেমনই আছে কার সঙ্গে ক্রিয়া করতে পারব বা পারব না তারও হিসেব । বাবা-ছেলে, মা-ছেলে এদের মধ্যে যৌনাচার – ইনসেস্ট, অজাচার ।
যৌনতার এই বিধিনিষেধ ব্যাকরণ শাস্ত্র ভারতবর্ষেও ছিল । বাৎস্যায়নের কামশাস্ত্রের কথা তো প্রায় সকলেরই জানা । অনেকেরই তা পড়ার কৌতূহল । বাৎস্যায়ন কিন্তু বয়েজ হোস্টেল বা গার্লস হোস্টেলের জনপ্রিয় চটি বইয়ের লেখক নন । কীভাবে যৌনক্রিয়া করতে হয় তার ব্যাকরণকার । আমাদের দেশের মন্দির গাত্রে যে সব শৃঙ্গারমুদ্রা থাকে বাৎস্যায়নের শাস্ত্রে সে-সবের কথা আছে । শুধু বাৎস্যায়ন নন পরবর্তীকালে আরও অনেকে যৌনতার ব্যাকরণ লিখেছেন । কোক্বক বলে একজনের কথা শোনা যায়, বই পাওয়া যায় । তিনি মধ্যযুগের যৌনব্যাকরণবিদ ।
এই যে নানা-জন নানা-সময়ে যৌনতার ব্যাকরণ লিখছেন সেই ব্যাকরণ লেখার উদ্দেশ্য কী ? উদ্দেশ্য হচ্ছে যৌনতার একটা ঘর বানানো । ব্যাকরণ যেমন ঘরও তেমন । ব্যাকরণ উদার হলে ঘর বড়ো । কোনও ঘর আবার ছোট । কোনও ঘরে আলোবাতাস খেলা করে , কোনও ঘর ভীষণ দম চাপা । প্রাগাধুনিক ভারতের কোনারক দেখে অবনীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ ইহারই শিখরে, এই শব্দায়মান, চলায়মান উর্বরতার চিত্রবিচিত্র শৃঙ্গারবেশের চূড়ায় , শোভা পাইতেছে কোণার্কের দ্বাদশশত শিল্পীর মানসশতদল – সকল গোপনতার সীমা হইতে বিচ্ছিন্ন, নির্ভীক, সতেজ, আলোকের দিকে উন্মুখ।’ অবনীন্দ্রনাথ এখানে যৌনতা শব্দটি ব্যবহার করেননি । লেখেননি যৌনবেশ । শৃঙ্গার শব্দটি যৌনতার মতো ‘পুরুষতান্ত্রিক’ নয় – যোনি বিষয়ক আকর্ষণ, যোনিকেন্দ্রিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা শৃঙ্গার বলে না । শৃঙ্গারের মধ্যে পুরুষ ও নারী ‘উভয়’লিঙ্গের রতিবাসনা, সেক্সুয়াল আর্জ মিশে থাকে । ‘রতিমন্দির’ শব্দটি অভিধানে খুঁজে পাওয়া যাবে । এই মন্দিরে সকলেরই রতিবাসনা প্রকাশের অধিকার আছে । সুতরাং কোনারক বা রতিমন্দির আলোহাওয়া মাখা বেশ বড়ো মাপের ঘর – যেখানে অনেকের অনেক রকম বাসনা ও বিভঙ্গ স্বীকার করা হয়েছে । কোনারকে তো আর অবনীন্দ্রনাথ থাকতে পারবেন না । তাঁকে ফিরতে হচ্ছে । সেই ফেরার বিবরণ দিতে গিয়ে অবনীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘এইবার ফিরিতেছি – উদয়ের পার হইতে আবার সেই অস্তের পারে; আর-একবার সংসারের দিকে, সুরুচি-কুরুচি শ্লীল-অশ্লীলের দিকে’ । কোনারক প্রাগাধুনিক পর্বের মন্দির, সেখান থেকে অবনীন্দ্রনাথ ফিরছেন তাঁর সময়ে । পরাধীন দেশ, ইংরেজ আমল । প্রেম ও শৃঙ্গার বিষয়ে কোনারকের মন্দিরগাত্র যতটা উদার, উন্মুক্ত ও সহনশীল অবনীন্দ্রনাথের ভারত ততটা উদার, উনমুক্ত ও সহনশীল নয় । ইংরেজ আমলের এই ভারত আধুনিক তবে ‘যৌনতার ঘর’টি সংকীর্ণ । হাঁফ ধরে যায় । কত রকমের যৌন বাসনা ও পছন্দকে যে ঘর ছাড়া করতে হয় , কত যৌনপদ্ধতিকে যে ঘাড় ধরে ‘বাহির’ করা হয় !
এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে , যৌনতার বিষয়ে ক্রমপ্রগতির কথা ভাবা যাবে না , অন্তত ইতিহাস তা সমর্থন করবে না । এমন বলা যাবে না প্রাচীন কালে যৌনতার বিধি-নিষেধ সংকীর্ণ ছিল আধুনিক কালে তা উদার হয়েছে । আবার আধুনিক কালে কোনও একটি পর্বকে এই ক্রমপ্রগতির সূত্রে বিচার করা যে যায় না, তা নয় । যেমন কেউ বলতেই পারেন উনিশ শতকে মেয়েদের চিতায় পুড়িয়ে মারা হত, পড়াশোনা করতে দেওয়া হত না , বাল্যাবস্থায় মেয়েদের সহবাসে বাধ্য করে প্রায় মেরে ফেলা হত । এখন একুশ শতকে এসব হয় না । সুতরাং প্রগতি হয়েছে । এই প্রগতি যৌনতার ক্ষেত্রেও চোখে পড়ে । এসব ভুল নয় । তবে আধুনিক যুগে এমন অনেক উদাহরণ আছে যা প্রাচীন যুগের তুলনায় খুবই পশ্চাৎপদ । তাই বলা ভালো প্রেম ও যৌনতার ক্ষেত্রে সবসময় একটা টানাপোড়েন চলে, সেকালেও একালেও – ঘরটা বড় করা যাবে না যাবে না তাই নিয়ে টানাপোড়েন ! ঘর ছোটো হলেই অনেক কিছু বাইরে চলে গেল । তখন আবার ঘর বড়ো করার অধিকারের লড়াই। যেমন এখন ভারতে সমকামীরা তাঁদের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছেন । ‘সেম-সেক্স’ লাভের ঐতিহ্য যে ভারতে ছিল তা নিয়ে ইংরিজিতে সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে । এ অধিকার আদায়ের লড়াই । তাঁরা মনে করেন আগের ভারত সমকামের ক্ষেত্রে উদার, এখনকার ভারত অনুদার । এটা ভাবাই যেতে পারে স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে নব্বই দশকের আগে অবধি সেক্স-যৌনতা বিষয়ে ভারতবাসীর মোটের ওপর যে মনোভাব তার থেকে নব্বই পরবর্তী সময় অনেক উদার , কিন্তু এর মানে এই নয় যে অতীত ভারত সার্বিক ভাবে অনুদার ছিল । বরং বলা ভালো এই বিষয়টা তেল মাখানো বাঁশে বাঁদরের ওপরে ওঠার অঙ্কের মতো জটিল । এই এগিয়ে যাচ্ছে এই পিছিয়ে পড়ল ।
আর একটা কথা । তা যৌনতার প্রকারভেদ রীতি-নীতির শাস্ত্রকে যৌনতার ব্যাকরণ বলাই যায় । তবে ভাষার ব্যাকরণের একটি প্রকরণ সত্যি সত্যি দুজনের সম্পর্ক বুঝতে খুবই কাজে লাগে । সেটি কারক । ব্যাকরণের কারক প্রকরণকে যে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কসূত্র বুঝতে কাজে লাগানো যায় তা আমাদের অনেক কিছুর মতো রবীন্দ্রনাথ খেয়াল করিয়ে দিয়েছিলেন । তাঁর ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’-এ আছে সম্বন্ধ পদ ও পজেসিভ কেসের কথা । তিনি লিখেছিলেন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ পদ আছে, কিন্তু পজেসিভ কেস নাই । হক কথা । একজন আরেকজনের সখা, প্রেমিক হতে পারে , কিন্তু তাই বলে পজেসিভ হবে কেন ? দখল করতে চাইবে কেন ? কিন্তু চায় তো ।

রবীন্দ্রনাথ লেখেননি কিন্তু তখন খেলা শুরু হয় কর্তৃ কারক ও কর্ম কারকের ।
সংস্কৃত ব্যাকরণ বলে, ক্রিয়ান্বয়ী কারকম্‌ । বাক্যে ক্রিয়া পদের সঙ্গে অন্য পদের যে সম্পর্ক তার রকমের ওপর নির্ভর করে সেটি কোন কারক । যেমন, ‘রাম ফুটবল খেলে’ – এই বাক্যে রাম আর ফুটবল এই দুয়ের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক দুরকম । কে খেলে ? রাম । রাম হল কর্তা । কর্তৃ কারক । কী খেলে ? ফুটবল । ফুটবল কর্ম । কর্ম কারক । সাধারণ ভাবে কর্মের ওপর কর্তাই আধিপত্য করে । ফুটবল মাঠে থাকবে না মাঠের বাইরে তা তো রামই ঠিক করে। লাথি মেরে সে বলকে মাঠের বাইরে পাঠাল , টোকা মেরে বলকে নিয়ে মাঠে খেলল – রামই সব ঠিক করছে । যৌনতার ঘর ছোট না বড় কী হবে তা তো কর্তাই ঠিক করবেন । প্রাকৃতিক বিধি, সামাজিক নিয়ম এসবের দোহাই দেওয়ার অধিকারী যিনি তিনি কর্তা । আবার দুজনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও , একজন কর্তা অপর জন কর্ম । রাম সীতাকে বলল বনে যা । রাম কর্তা, সীতা কর্ম । রাম সীতাকে বলল বিছানায় আয় । এখানেও রাম কর্তা, সীতা কর্ম । সীতা ইচ্ছায় এলে একরকম । আর ইচ্ছা করছে না । রাম বলল আয় আয়, তুই আসতে বাধ্য । সে আরেকরকম । অস্বীকার করার উপায় নেই যৌনতার ব্যাকরণে এখনও পর্যন্ত ছেলেরাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কর্তা, মেয়েরা কর্ম । তবে কর্তা আর কর্মের এই খেলা বড়ো জটিল । যৌনতার ঘর-বাহিরের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব নিবিড় ।
আর একটা কথা । এই কর্তা-কর্ম সম্পর্ক নিয়ে যে ব্যাকরণ তা হল একেবারে ভেতরের নিয়ম । খেলার মুহূর্তে দুজন মানুষ ঠিক করে নিচ্ছে, আবার ঠিক করে নিচ্ছেও না । খেলতে খেলতে বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে । এ এক আশ্চর্য খেলা ।
ইদানীং যৌন সচেতনতা প্রকাশক এক বিজ্ঞাপনে ‘লুডো’ খেলতে বলা হয় ঠাট্টা করে । ‘চল লুডোই খেলা যাক’ । সাপ-লুডো না খেলে বরং খুব মন দিয়ে বিচার করা উচিত কে কর্তা, কে কর্ম । এ খেলার নাম দেওয়া যাক যৌনতার কারক প্রকরণ । এবার সেই খেলার ভেতরে ঢোকার সময় এল ।
(ক্রমশ)

বিশ্বজিৎ রায়

বিশ্বজিৎ রায়


বিশ্বজিৎ রায় বিশ্বভারতীতে বাংলা পড়ান । বাংলা পড়েন । বাংলায় লেখেন । পড়ার বিষয়ে সর্বগ্রাসী । ওই যে শাস্ত্রে বলে না পাঠকের মন হবে গণিকার মতো । যখন যেটা পড়বে তাতেই তার মতো করে রাঙা হবে মন । এও তেমন । তার মানে বিশ্বজিৎ রায় পল্লবগ্রাহী ।অন্য পরিচয় ঠোঙাশিল্পী । মানে কাগজে নিয়মিত লেখেন -- খবরের কাগজ থেকে ঠোঙা হয় । কয়েকটা অখাদ্য বইও লিখেছেন ।

আপনার মতামত জানান