ছোটোবেলার বিস্কুটেরা

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

ছোটোবেলায় মুনমুন সেনের হাসি মুখে বিজ্ঞাপন দেখতাম “আমার পছন্দের বিস্কুট ক্যালকাটা নাস্তা”। সে অনেককাল আগের কথা, যখন কিনা তিনি যে দলের সাংসদ সেই দলের সবেমাত্র জন্ম হয়েছে, তখন চায়ের সঙ্গে ‘কুকিজ’ বস্তুটি আপামর বাঙালীর সন্ধ্যের মেগা সিরিয়ালের অংশ হয়নি, এমনকী স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল কাঁপানো ‘মা’ সিরিয়ালটিও শুরু হয়নি। তখনকার এন্ডি গেন্ডিরা আমরা সেই বিজ্ঞাপন দেখে বায়না করতাম ‘চিনি বিস্কুট’ খাবার। দোষ নেবেন না প্লিজ! আমরা ছিলাম নিতান্তই বাংলা মিডিয়ামে পড়া, বিকেল বেলা ঝুঁটি বেঁধে মফঃস্বলের টুকরো মাঠে এলাটিং বেলাটিং খেলা পাবলিক। ‘চিনি বিস্কুট’ ছাড়া রোজ দেখতাম গোল গোল মারী কিংবা থিন অ্যারারুট বিস্কুট, ওদিকে বিশেষ পছন্দ ছিল না। তবে হ্যাঁ,ভিতরে কমলা রঙের ক্রীম দেওয়া অরেঞ্জ বিস্কুট খুব খাওয়া চলত বিস্কুট দুটোর কপাট খুলে, চেটে চেটে ক্রীম সাফ করে। তখন সবাই খুব পড়তাম নন্টে-ফন্টে, দেখতাম কেল্টু দা কিদারুণ বেকারীর জানলায় হাত গলিয়ে বের করে আনে উল্ললসসস সুস্বাদু বিস্কুট। কুকিজ মানে তখন ছিল বিদেশী বিস্কুট। পাঁচ টাকায় এক প্যাকেট তখন পাওয়া যেত না।

এছাড়াও প্রবল জনপ্রিয় ছিল পার্লে জি’র প্যাকেটের উপর ওই গালফোলা নাদুস নুদুস শিশুটি, যে ছেলে না কি মেয়ে তাই নিয়ে ক্লাস ওয়ানে মধুবনের সঙ্গে লেগেই গিয়েছিল হাতাহাতি। মধুবনের বক্তব্য মেয়ে হলে চুলে ঝুঁটি কই! আর আমি বাটিছাঁট চুল মাথায় ( মা বলত ছোটোরা বড় চুল রাখলে নাকি ঠান্ডা লাগে) যুক্তি সাজাতে না পেরে দিয়েছি মুখ ভেঙিয়ে। ার অমনি “দিদিমণি, কিঙ্কিণী আমায় মুখ ভ্যাঙ্গাচ্ছে” বলে দিয়েছে নালিশ ঠুকে। আমিও রাগে পরের দিন টিফিনে আনা গুড ডে বিস্কুট দিইনি ওকে। এমনিতেও গুড ডে আমাদের কাছে ছিল বিস্কুটদের রাজা, ভাগ করে তাকে বিয়োগ করার মোটেই ইচ্ছে ছিল না।
দিন কয়েক আগে বিস্কুটের দোকানে হঠাত চোখে পড়ে গেল জোকারের মুখ আঁকা মিল্ক ক্রীম দেওয়া বিস্কুট। মনে পড়ে গেল পুষি দি’র কথা। পুষি দি ছিলেন পাড়ার প্রাইমারী স্কুলের দিদিমণি, যাকে বলে খুবই ভালোমানুষ। কিন্তু তাঁর দাদা সাঙ্ঘাতিক গম্ভীর, মোটা চশমা পরা অঙ্কের ভয়াবহ অধ্যাপক। তখন ক্লাস ফাইভ আমার। অঙ্কে ভয় পেতে তখনও শুরু করিনি, কিন্তু পাড়ার লাইব্রেরীতে বলল, মেম্বার হতে গেলে পুষি দি’র দাদার সই লাগবে। অরণ্যদেবের খুলিগুহায় যাচ্ছি ভেবে জয় মা বলে তাঁদের বাড়িতে ঢুকে সই চাইতে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক মোটেই তেমন ড্রাকুলা টাইপের তো ননই, উপরন্তু পুষি দি’র বৌদি ঐ জোকারের মুখের মতো দেখতে বিস্কুট দিলেন প্লেট সাজিয়ে, সঙ্গে চানাচুর। আহা! তারপর থেকে রাস্তায় পুষি ডি কে দেখলেই ভাবতাম উনি নিশ্চয়ই রোজ ঐ জোকারমুখো বিস্কুট খান বলে অত হাসিখুশি। আর তাঁর দাদা? বুড়ো মানুষ কী আর ওসব খান নাকি?

আর একটা বিস্কুট পাওয়া যেত ছোটবেলায়, ছোটো ছোটো চৌকো চৌকো, এলাচের মত খেতে, সেটা পাওয়া যেত অর্পিতাদের বাড়ি গেলে। অর্পিতার মায়ের কাছ থেকে গল্প শুনি বিয়ের পরদিন সকালে যখন প্রথম ঢূকলেন এবাড়ি, তাঁকে নাকি দেওয়া হয়েছিল ন্যাতানো মিয়োনো থিন অ্যারারুট, দুপুরে নাকি খুব কেঁদেছিলেন কাকিমা, বাপের বাড়ির ক্রীম ক্র্যাকারের কথা মনে করে।

ক্রীম ক্র্যাকারের কথায় মনে পড়ে গেল ফিফটি ফিফটি বিস্কুটের কথা, কারণ মামাবাড়িতে দাদু খেত ক্রীম ক্র্যাকার, আর আমার বিস্বাদ লাগত বলে আমার জন্য ফিফটি ফিফটি। হায়! তখন বোরবোন পাওয়া যেত না। বোরবোন খেলাম বড় হয়ে, যখন আর হ্যান্সেল গ্রেটেল পড়ি না। কেন? জানেনা, ওদের ডাইনি বুড়ির বাড়ির টালি বোরবোন দিয়ে বানানো?

হ্যান্সেল-গ্রেটেলদের মত একটা বাড়ী কিন্তু আমি খুঁজে পেয়েছি বড়বেলায়। যাদবপুরে ভর্তি হয়ে। যাদবপুর স্টেশনের বাইরে এক্তা আহাহা বেকারীর দোকান। আমার ছোটোবেলায় না পাওয়া অনেক কুকিজ এখনকার ছোটোদের জন্য পাওয়া যায় সেখানে।




কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে
কিঙ্কিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কিণীর কবিতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলে।ব্লগার হিসেবে আদরের নৌকায় কিঙ্কিণীর যাত্রা শুরু হল আজ থেকে।পড়ুন এবং জানান কেমন লাগল কিঙ্কিণীর ব্লগ...


আপনার মতামত জানান