যৌনতার কারক প্রকরণ : ২

বিশ্বজিৎ রায়

 

মাতৃভক্তেরা একটা গান প্রায়ই করেন, ‘সকলই তোমার ইচ্ছা / ইচ্ছাময়ী তারা তুমি/ তোমার কর্ম তুমি কর মা/ লোকে বলে করি আমি’ । এই ভাবনাটা এমনিতে নানা জনের কাছে নানা ভাবে ফিরে আসতে পারে । যাঁরা মাতৃভক্ত নন, যেমন রবীন্দ্রনাথ , তিনি এক ‘কৌতুকময়ী’র কল্পনা করেছিলেন । জীবনদেবতা বলে ডেকেছিলেন। এই কৌতুকময়ী যেন কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছেন আশ্চর্য সব পদ । ভক্তের ভগবান – কবির কৌতুকময়ী কোথাও একটা মিল আছে । এই যে আর কেউ ‘আমাকে’ ‘আমাদের’কে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছেন, এই ভাবনাটির মধ্যে রহস্যবোধ আছে, আছে আত্মসমর্পণ । ভক্তের গানে ছিল, ‘আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী’। ছিল ‘যেমন চালাও তেমনি চলি’ । ভক্ত এখানে কর্ম, ভগবান এখানে কর্তা ।
নারী-পুরুষের যৌনক্রিয়ার ক্ষেত্রে এমন একটা ভাবনা প্রাগাধুনিক ভারতে চালু ছিল । এই ভাবনাকে বলা যাক আপাতত ‘দিব্য যৌনতা’ । পুরুষ ও নারী সেখানে নিতান্ত নিজেদের আনন্দের জন্য ‘যৌন ক্রিয়া’ সম্পাদন করছেন না । আবারসামাজিক ভাবে যাকে বলে ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’ এ তেমন যৌনতা নয় । যেমন তেমন পুত্র হলে চলবে না । চাই দিব্যগুণসম্পন্ন সন্তান । সেই দিব্যতনু সন্তান উৎপাদনের জন্য নারী-পুরুষ মা-বাবা হিসেবে যেন নিতান্ত উদ্দেশ্যসাধনের যন্ত্র । কী কী করতে হবে তার বিধি-ব্যাকরণ পূর্বনির্দিষ্ট । তা পালন করে মিলিত হতে পারলেই গর্ভে ফল লাভ । এখানে নারী-পুরুষ, মা-বাবা যৌনক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ফল উৎপাদনের জন্য দিব্য বিধি অনুসরণ করছেন । যাঁরা ভক্ত তাঁরা অবশ্য বলবেন এই দিব্যবিধি অনুসরণের মধ্যে গভীর আত্মসমর্পণ ও নিবেদন আছে । তাঁরা আনন্দের সঙ্গে দিব্যবিধি পালন করছেন, দায়ে পড়ে নয় ।

অভিনব গুপ্ত ছিলেন কাশ্মীরের অধিবাসী । খ্রিস্টিয় দশম শতাব্দীর মানুষ । ভরতের রসসূত্রের তিনি ছিলেন ভাষ্যকার । এই অভিনব গুপ্তের জন্ম সম্বন্ধে একটি লোকশ্রুতি প্রচলিত ছিল । অভিনব গুপ্ত নাকি যোগিনীভূ –মানেযোগিনীর পুত্র । শৈবদের মতে যে বাবা-মা যোগিনীভূ মর্যাদাসম্পন্ন পুত্র চান তাঁরা মিলনের সময় সাংসারিক কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে থাকবেন। মা নিজেকে শক্তির সঙ্গে একাত্ম ভাববেন, বাবা নিজেকে শিবের সঙ্গে একাত্ম ভাববেন । একাত্ম ভাবা আর একাত্ম হয়ে যাওয়া তো এক নয় । মোদ্দা কথা হল বাবা-মায়ের ওপর দিব্য শিব-শক্তি ভর করছেন । তারই ফল দিব্যতনু সন্তান । বাবা-মা ক্রিয়াটি করছেন বটে তবে তাঁরা যন্ত্রবৎ , দেবভর যন্ত্র । যৌনক্রিয়ায় তাঁরা আপাত দৃষ্টিতে কর্তা , কিন্তু আসলে কর্ম – ‘তোমার কর্ম তুমি কর’ কিন্তু ‘লোকে বলে করি আমি’ । এই ভাবনা কৌশলের বিস্তার যৌনতা থেকে যুদ্ধ সর্বত্র চোখে পড়বে । কুরুক্ষেত্রের মাঠ । যুদ্ধ শুরু হবে । অর্জুন আত্মীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইছেন না । কৃষ্ণ তাঁকে বোঝাতে শুরু করেছেন । শেষে ‘বিশ্বরূপ’ প্রদর্শন । তুমি অর্জুন নিমিত্ত মাত্র । আমি মেরেই রেখেছি । আমি মেরেই রেখেছি, তুমি মারছো তির দিয়ে আর যৌনক্রিয়ার সময় শিব ও শক্তির সঙ্গে একাত্ম হয়েছি ভেবে যৌনক্রিয়া করছি এই দুয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে – তা নিয়ে দার্শনিক আলাপ-আলোচনা চলতে পারে ।একে অনেকে বলতে পারেন কর্ম- কর্তৃবাচ্য। যেমন ‘রেল চলে ঝমাঝম’ । রেল কি আর নিজে চলে ? তাকে ঝমাঝম করে চালানো হয় । ‘রেল চলে ঝমাঝম’ তাই কর্ম- কর্তৃবাচ্য । কর্ম রেলের ওপর কর্তার ভাব আরোপিত । মোদ্দা কথাটি এই যাঁরা বাহ্যত কাজটি করছেন তাঁরা অপরের হাতের যন্ত্র । আত্মসমর্পণ করেছেন । তুমি যন্ত্রী আমি যন্ত্র । বাইরের কোনও শক্তি যন্ত্রী – যন্ত্রটি তিনিই চালাচ্ছেন । তিনি কর্তা ,যন্ত্ররূপী মানুষ কর্ম । অনেকে তা বুঝতে পারছেন না, ভাবছেন তিনিই কর্তা ।
এই যে বাবা-মা ‘কর্ম’ ও ‘কর্তৃ’হয়ে , দুজনে ঈশ্বরেররূপে একাত্ম হয়ে , দিব্যতনুর জনক-জননী হচ্ছেন এই কল্পনাটি নানা ভাবে ফিরে আসে – নানা দেশে, নানা ধর্মে ।যিশুর জন্মের সময় আকাশে আলো দর্শনের কাহিনি, বুদ্ধদেবের জন্মের সঙ্গে শ্বেতহস্তী দর্শনের বৃত্তান্ত, এমনকী উনিশ শতকে রামকৃষ্ণদেবের জন্মের সঙ্গে মাতৃগর্ভে অলৌকিক জ্যোতি- সঞ্চারের কথা মিশে যেত না । পার্থিব কামনা-বাসনা ছাড়া, নর-নারীর মিলন ছাড়া তো সম্ভব নয় সন্তানজন্ম । আবার সাধারণের চেয়ে গুণে-সামর্থে বড়ো যাঁরা তাঁরা এই একই শারীরিক পদ্ধতির ফল একথা ভাবতে ইচ্ছে করে না তাই এই বিশ্বাস – যৌনতায় আমি যন্ত্র, তুমি যন্ত্রী – আমি কর্ম, তুমি কর্তা । আমি আপাতদৃষ্টিতে কাজটা করছি বটে কিন্তু করছি না ।

এই বিশ্বাসের জগৎ , বিজ্ঞান জন্মরহস্য যত বেশি ব্যাখ্যা করেছে , তত পড়েছে ভেঙে ।কিন্তু তবু তো থেকে যায় – অন্যভাবে বেঁচে ওঠে । খানিক বদলে গিয়ে সেই বেঁচে ওঠা । অভিনব গুপ্তকে নিয়ে যে গল্প তাতে বলা হয়েছে বাবা- মা যদি দিব্যতনু চান তবে কী করবেন ? অর্থাৎ যৌনক্রিয়ার ফলটি কী চাইছি তার ওপর নির্ভর করছে কীভাবে কী- হয়ে ক্রিয়া করব । ফল এখানে যৌনক্রিয়ার পদ্ধতি ও যৌনতার ইচ্ছেকে নিয়ন্ত্রণ করছে । যৌনতার ওপর এই নিয়ন্ত্রণ কিন্তু থেকেই গেছে । সংখ্যাগরিষ্ঠ আধুনিক মানুষ নিজেদের ওপর শিব- শক্তির আরোপ ঘটান না । যৌনক্রিয়ার সময় আরোপিত দৈব চরিত্রটির যন্ত্র হিসেবে কাজ করেন না । তাঁদের কাছে এই পৃথিবীর দেশ- কালের বাইরে অন্য দেশ- কাল যা অনন্ত ও পরম তার অস্তিত্ব নেই । তবে দিব্য যৌনতার ক্ষেত্রে যেমন‘যৌনতার ফল’ যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করত, তেমন আধুনিক কালেও ‘যৌনতার ফল’ কী হতে পারে বা ফল হিসেবে কী চাওয়া হচ্ছে তার ওপর যৌনতার রকম- সকম নির্ভর করত। দেশ ও সমাজের সমষ্টিগত উন্নতির কথাও সেই উন্নত ফলের কথা ভেবেই নিয়ন্ত্রিত ও নির্ধারিত হত যৌনতা । যৌনতার ফল কী হবে শুধু তাই নয় , কী হওয়া উচিত সেকথাও ঢুকে পড়ছিল এর মধ্যে ।
বাঙালিদের ক্ষেত্রে দেশ- সমাজের উন্নতির জন্য যৌনতা এইআ ধুনিক কালের গল্পটা ‘উনিশ শতক’ থেকেই শুরু করা ভালো । তখন পরাধীন ভারতবর্ষ । আগের মুসলমান শাসকদের হারিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে । তারা হিন্দু ভদ্রলোকদের মনে মগজে আস্তে আস্তে দুটো জিনিস ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন । আগেকার শাসনের থেকে এই ইংরেজ আমল ভালো । ভালো কেননা এই ইংরেজ আমলে সব কিছুই নিয়ম মতে চলে । ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের আগেই বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের এই বিশ্বাস পোক্ত হয়েছিল । বিদ্রোহের পর রানির শাসন চালু হল , ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ক্ষমতা রানির হাতে গেল । বিশ্বাস আরও দৃঢ় হল । খাতায় কলমে এসবের নমুনা আছে । রামচন্দ্র মিত্র ‘জ্ঞানোদয়’ নামের একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন । এই মাসিক পত্রে লেখা হয়েছিল, আগের শাসনকর্তাদের থেকে ইংরেজরা শ্রেষ্ঠ । কারণ তাঁরা ‘ধারানুসারে শাসন’ করেন । এই ধারা কেমন ? এই ধারার সবাই অধীন । এমনকি ইংল্যন্ডের রানিও । ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ‘জ্ঞানকিরণোদয়ঃ’ লিখেছিল, ‘রাণী আপন ইচ্ছাতে রাজ্য চালাইতে পারেন না, অন্য সামান্য লোকের ন্যায় তিনিও ব্যবস্থার অধীন’। এই ধারা, ব্যবস্থা, বিধি যে দেশের মঙ্গল করে হিন্দু ভদ্রলোকেরা তা মেনে নিলেন । ইংরেজ শাসকেরা চাকরি, বাকরি, প্রশাসন এইসব বিষয়ে ধারা- নিয়ম চালু করলেও হিন্দু- মুসলমান সমাজে , পারিবারিকতায় হাত দিতে চাননি । অর্থাৎ চাকরি- বাকরি- প্রশাসন এসব বাইরের জিনিস । অনেকে বলেছেন এই বাইরেটা হল সদর । পুরনো বাড়ির যেমন দুটো ভাগ, এও তেমন – একটা সদর, একটা অন্দর । সদরে বাইরের লোক আনাগোনা করতে পারে , অন্দরে তাদের ঢোকা নিষেধ। ইংরেজ আমলেও ‘চাকরি- বাকরি- প্রশাসন’- এর সদরে নিয়ম চালু করলেন বহিরাগত শাসকেরা । হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোকেরা তা মেনে নিলেন । কিন্তু অন্দরে সাহেবদের ঢোকা- হাত দেওয়া নিষেধ ।
ঢোকা হাত দেওয়া নিষেধ বটে কিন্তু বাঙালি পুরুষ ভদ্রলোকেরা দেখলেন বিধি- নিয়মের অনেক গুণ । বাইরে বিধি- নিয়ম মেনে চলে অনেক সুফল পাওয়া গেছে । এবার ঘরের জন্য নানা বিধি বা নিয়ম গড়ে তোলা যাক । ঘরে বা অন্দরে যেখানে বাঙালি পুরুষেরা সাহেবদের ঢুকতে দেননি সেখানে তাঁরাই নানারকম নিয়ম বা বিধি গড়ে তুলতে লাগলেন । এই বিধিগুলির মধ্যে অনেককটি নারী-পুরুষের যৌনতা বিষয়ক ।
এখন আমরা যাকে ‘একবিবাহমুখী পারিবারিকতা’ বলি উনিশ শতকে এই ‘একবিবাহমুখী পারিবারিকতা’র বিধিগুলি ক্রমশ গড়ে উঠেছিল । বাঙালি ভদ্রলোকদের উদ্যোগেই সেই বিধিগুলি গড়ে ওঠে । প্রয়োজনে তাঁরা ইংরেজ রাজপুরুষদের সাহায্য নিয়েছিলেন । তবে হিন্দু ভদ্রলোকেরা না চাইলে রাজপুরুষেরা এদেশীয়দের সমাজ- পরিবার- ঘর বিষয়ে মাথা গলাতেন না। উনিশ শতকে হিন্দুদের মধ্যে কৌলীন্য প্রথা চালু ছিল । এক কুলীন স্বামীর শখানেক বউ থাকত । নানা বয়সের সেই সব বউদের নাম জানতেন না ‘পুরুষটি’, তবে ধাম জানতেন । খাতা মিলিয়ে সেই সব ধামে গিয়ে সহবাস সুখ নিতেন , ‘তোলা’ আদায় করতেন । বুড়ো কুলীন স্বামী মরলে একসঙ্গে অনেক মেয়ে বিধবা হতেন । তাঁদের সহমরণে যেতে হত । খুবই অমানবিক এই বিধি । রামমোহন রায়ের উদ্যমে এই প্রথা রদ করা হয় । রামমোহন পুরনো বিধি বাতিল করে নতুন আইন চালু করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন । এই যে মেয়েদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে তার কারণ কী ? রামমোহন রায়ের লেখা ‘সহমরণ বিষয় প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ’ রচনায় যারা মেয়েদের পুড়িয়ে মারতে চাইত তাদের পক্ষের যুক্তিগুলি রয়েছে । কথায় কথায় তারা অঙ্গিরা ও হারীত এইসব মুনিদের দোহাই দিয়েছে । মনু কপচেছে । বিধবা হলে মনু বলেছেন ব্রহ্মচর্য পালন করা উচিত । কিন্তু বিধবারা ব্রহ্মচর্য পালন না করে যদি কামনার বশবর্তী হয় ? তখন ? হতেই পারে । হওয়া স্বাভাবিক । সেই ‘ব্যাভিচার’ আটকানোর জন্যই মেয়েদের পুড়িয়ে মারা উচিত । আর ব্যাভিচার করতে পারবে না । পুড়ে মরলে স্বর্গ নিশ্চিত । কদ্দিন থাকতে পারবে স্বর্গে ? ‘মনুষ্যের দেহেতে যত লোম আছে যাহার সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি তত বৎসর স্বর্গে বাস করে।’ খেয়াল করলে দেখা যাবে এখানে মেয়েদের ভূমিকা নিতান্তই ‘কর্মপদবাচ্য’। যৌন ব্যাভিচারের দোহাই দিয়ে স্বর্গের লোভ দেখিয়ে চিতায় তুলে দেওয়া । পুড়ে মরতে, আগুনের খাদ্য হতে কারই বা ইচ্ছা করে ! করত না । মেয়েদের সক্রিয় অনিচ্ছাকে চাপা দেওয়ার জন্য অনেকসময় সতী করতে চাওয়া মেয়েদের সমাজপতি পুরুষেরা জোর করে নেশা করাতেন । সচেতন অনিচ্ছা নেশার ঘোরে চাপা পড়ে যেত ।

(procession of a sutti woman, source- wikipedia)


কোনও কোনও মেয়ে ঘোর কেটে গেলে চিতা থেকে পালিয়ে যেত । সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা বিদ্যালয় পাঠ্য‘সহমরণ’ কবিতাটি অনেকেই পড়েছেন । চিতা থেকে কোনওক্রমে পালিয়ে যাওয়া একটি মেয়ের জবানবন্দী । সে বিবাহ করেছিল এক মুসলমান মাঝিকে । চিতা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে – মেয়েটিকে বাঁচায় ও বিবাহ করে সেই দরদিয়া মাঝি । এমন পুরুষ অবশ্য সবার ভাগ্যে জুটত না । কবিতায় যেমন হয়, জীবনে তেমন হয় না । ফলে মেয়েদের তো পুরুষতন্ত্রের ইচ্ছাধীন বস্তু হিসেবেই বেঁচে থাকতে হয় ।
রামমোহনের পর বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলনে সচেষ্ট হন । মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি । বিদ্যাসাগর তাঁর বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত রচনায় ‘পরাশর সংহিতা’ থেকে একটি শ্লোক উদ্ধার করেছিলেন । সেই শ্লোকে বলা ছিল কোন পরিস্থিতিতে মেয়েরা দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করার অধিকারী । স্বামী নষ্ট চরিত্র হলে, মারা গেলে, প্রব্রজ্যায় নিরুদ্দেশ হলে, ক্লীব বা সমাজে পতিত হলে নারী দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করতে পারেন । বিদ্যাসাগরের সময় হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদ আইন ছিল না । স্বাধীন ভারতে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে সে আইন পাশ হয় । এই শ্লোকটি কিন্তু একদিক থেকে স্ত্রীর সক্রিয় বিবাহবিচ্ছেদের সপক্ষতা করছে । নারী এখানে খানিকটা হলেও কর্তৃত্বের অধিকারিণী । বিদ্যাসাগর তাঁর রচনার শেষে গিয়ে আর কোনও শাস্ত্রের দোহাই দেননি । সামাজিক মানুষকে সরাসরি একটি প্রশ্ন করেছিলেন । তাঁর জিজ্ঞাসা ছিল স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর শরীর ‘পাষাণময়’ হয়ে যায় একথা সমাজ কেন ভাবে ? অর্থাৎ শরীরের স্বাভাবিক কামনা- বাসনাকে বিদ্যাসাগর স্বীকার করে নিয়েছিলেন । যাঁরা মেয়েদের পুড়িয়ে মারতেন তাঁরা মনে করতেন স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়েদের কামনা- বাসনা থেকে ব্যাভিচারের সৃষ্টি হবে । তাই মেয়েদের জীবনের অধিকার নেই । রামমোহনের আন্দোলন মেয়েদের জীবনের অধিকারকে স্বীকার করল । বিদ্যাসাগর বিধবাদের বিবাহের কথা বলে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বাসনাকে গুরুত্ব দিলেন – এ যেন নারী-যৌনতার অধিকার । এই অধিকারের প্রসঙ্গটি নিয়ে নানা তর্ক- বিতর্ক হয় । সমাজের একদলের মতে ‘অক্ষত যোনি’ নারীদেরই দ্বিতীয় বিবাহের অধিকার আছে । অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে সহবাস যাঁরা করেননি তাঁরা দ্বিতীয় বিবাহের অধিকারী । অর্থাৎ নিতান্ত বালিকা, বালবিধবা হয়েছে যারা তাদের এই অধিকার তাও মেনে নেওয়া যায় । কিন্তু বয়স্ক রমণীর দ্বিতীয় বিবাহ ! তাঁদের মতে অনুচিত । ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর কবিতায় ঠাট্টা করে লিখেছিলেন ‘ক্ষতাক্ষত’ সবাই এই বিবাহের সুযোগ নেবে । ‘ক্ষতাক্ষত’ মানে ক্ষত-অক্ষত যোনি দুই গোত্রের রমণী । বঙ্কিমচন্দ্র ও বিবেকানন্দ বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য এই বিদ্যাসাগরী আন্দোলন বিষয়ে তির্যক মন্তব্য করেছিলেন । সতী নারী তাঁদের শরীর - মন স্বামীর মৃত্যুর পর আর কাউকে দিতে পারেন না এই বঙ্কিম ও বিবেকানন্দের বিশ্বাস । কিন্তু পুরুষ - নারীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্ক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠতে গেলে যে জীবন দু- পক্ষকেই যাপন করতে হয় তা নিয়ে বঙ্কিম- বিবেকানন্দ নীরব।বিবাহিত নারী মাত্রেই ভালোবাসা থাক বা না থাক মেনে নিতে যেন বাধ্য পতি পরমেশ্বর । ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ‘নির্মাণের’ দায়িত্ব যেন শুধু মেয়েদের । বঙ্কিম- বিবেকানন্দ এই মেয়েদের কে যেন ‘দেবী’ হিসেবে কল্পনা করে তাদের ওপর সতীত্বের দায়িত্ব অর্পণ করছেন । বিদ্যাসাগরের এই আন্দোলন খুবই মানবিক, মেয়েদের যৌনতার অধিকারকে বিবাহ ও পারিবারিকতার সীমায় আরও একবার প্রতিস্থাপন করাই উদ্দেশ্য । উনিশ শতকে বহু বিধবা বাধ্য হয়ে গণিকাবৃত্তি বেছে নিতেন । পুরুষেরা নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পরিবার ও সমাজচ্যুত করত । তারপর অন্যত্র নিয়ে গিয়ে কিছুদিন সহবাস করত । সহবাস শখ মিটে গেলে চলে যেত । তখন মেয়েটির গণিকাবৃত্তি গ্রহণ করা ছাড়া উপায় থাকত না । বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের প্রচলন করে এই অবস্থার বদল ঘটাতে চেয়েছিলেন । রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘রমণীর দেবীত্ব ও বালিকার ব্রহ্মচর্যমাহাত্ম্যে র সম্বন্ধে বিদ্যাসাগরের আকাশগামী ভাবুকতা’ ছিল না । বিদ্যাসাগর কিন্তু সফল হননি। বিনয় ঘোষ তাঁর গবেষণা গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, যে-সমস্ত বিধবাবিবাহের আয়োজন বিদ্যাসাগর করেছিলেন সেগুলির সাংসারিক ব্যয়ভার তাঁকে বহন করতে হত । অর্থ ও পুরস্কারের লোভে পুরুষেরা বিধবাবিবাহ করতেন । পরে আর দায়িত্ব নিতেন না । ফলে বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের ফলে মেয়েদের যৌনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা হল বা তাদের কর্মপদবাচ্যতার অবসান হল তা কিন্তু নয় । তবে সমাজ খানিকটা মানবিক হল ।
এরপর একে একে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার , সহবাসের বয়স এইসব নিয়ে কথা ওঠে । সহবাস সম্মতি আইনটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয় । ইতিহাসবিদ তনিকা সরকার তাঁর ‘অ্যা প্রি- হিস্ট্রি অফ রাইটস ? দি এজ অফ কনসেন্ট ডিবেটস ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল’ নিবন্ধে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন । অপরিণত অথচ বিবাহিত নারী শরীরের ওপর ‘আইনসিদ্ধ’ বরটির যৌন কর্তৃত্বের ফল যে কী মর্মান্তিক হতে পারে তার প্রমাণ ফুলমণি দাসী । স্বামী তো বালিকার যোনি কর্তৃত্বময় হর্ষে ছিন্ন করলেন । এই ম্যারিটাল রেপের ফলে তেরো ঘন্টা একটানা রক্তক্ষরণ হল । ফুলমণি মারা গেল । উনিশ শতকের এই নিদর্শনগুলি থেকে বোঝা যায় মেয়েরা ‘কর্ম’ অর্থাৎ ইচ্ছাহীন বস্তু হিসেবে পরিগণিত । ক্রমে তাদের হাতে নানা অধিকার অর্পিত হচ্ছিল কিন্তু এতে অবস্থার খুব পরিবর্তন হচ্ছিল না । একগামীপারিবারিকতাঅবশ ্যগড়েউঠেছিল ।
‘একগামী পারিবারিকতা’ উনিশ শতকের অধিকার সচেতনতার ফল । এই ‘একবিবাহমুখী পারিবারিকতা’য় পাত্র- পাত্রী নিজেদের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে পারবেন কিনা, একই জাতের মধ্যে বিয়ে হবে নাকি ‘ইন্টারকাস্ট ম্যারেজ’ চলবে এসব বিতর্ক ক্রমে উঠেছিল । এই‘একবিবাহমুখী পারিবারিকতা’র ‘আদর্শ উদার’ চেহারা হল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা নারী তাঁদের পছন্দ মতো যে কোনও জাতের তাঁদের থেকে বয়সে বড়ো বা ছোটো নারী বা পুরুষকে ইচ্ছে মতো বিয়ে করতে পারবেন । এটা এখনও বিবাহ নামের প্রতিষ্ঠানকে মেনে নারী -পুরুষের উদার সম্পর্কে যাঁরা বিশ্বাসী তাঁদের আদর্শ।
উনিশ শতকে যে ‘একবিবাহমুখী পারিবারিকতা’ গড়ে উঠেছিল সেই বিবাহ ও পারিবারিকতার উদ্দেশ্য কী ? বঙ্কিমচন্দ্র, ভূদেব , বিবেকানন্দ – এঁরা এই বিবাহ ও পারিবারিকতার উদ্দেশ্য নিয়ে নানা কথা সাজিয়েছিলেন । তাঁদের পরস্পরের মধ্যে মতভেদও আছে । যেমন ভূদেব বাল্যবিবাহের পক্ষপাতী, বিবেকানন্দ নন । তবে এই তিনজনই একটি বিষয়ে সহমত । বিবাহ তার ফল যে আইন ও সমাজসিদ্ধ যৌনতা তা পরিবার, জাতি ও দেশের ভালোমন্দের কথা ভেবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । নারী ও পুরুষ এখানে ব্যক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে ততটা গুরুত্ব দেবেন না – পরিবার, সমাজ ও দেশের কথা ভেবে বিবাহ ও যৌনতাকে সংযত করবেন । বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দেশের কাজের সময় ‘যৌন মিলন’ নিষিদ্ধ বলে মত প্রকাশ করেছিলেন – একই কথা তাঁর প্রথমপর্বের উপন্যাস ‘মৃণালিনী’তে ছিল । বিবেকানন্দ খেয়াল করিয়ে দিয়েছেন ‘বিবাহ’ ব্যক্তিগত সুখের জন্য নয় । সুসন্তান প্রসবের জন্য মিলনকালে পবিত্র চিন্তা করতে হবে এই ছিল তাঁর নির্দেশ ।
অভিনব গুপ্তের বাবা -মায়ের মতো নিজেদের ওপর শিব-শক্তির আরোপ ঘটাতে হচ্ছে না বটে তবে যৌনতার পরবর্তী ফল ও উদ্দেশ্য নর-নারীর যৌনক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক – এও একরকমের কর্মত্ব । নারী-পুরুষ দুজনের ক্ষেত্রেই এই বিধি ক্রিয়াশীল । বিবেকানন্দ তাঁর ‘কর্মযোগ’ বইতে পুরুষ ও নারী দুজনের কর্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন । বিবাহিত পুরুষ শরীর দিয়ে নয়, মন দিয়েও যদি অন্য নারীকে স্পর্শ করেন তাহলেও তিনি নরকে যাবেন এই ছিল বিবেকানন্দের বক্তব্য । একবিবাহমুখী, একমনা, পরিবার -সমাজ -রাষ্ট্র তিনের উন্নতির জন্য পুরুষ -নারীর সুনিয়ন্ত্রিত যৌনজীবনের অনেক সুবিধে । নিজেদের এই বিধির ছাঁচে ঢেলে দিলে নানা গণ্ডগোল মিটে যাবে । উনিশ শতকের সমাজ সংস্কারের মধ্য দিয়ে এই পরিবার- সমাজ -রাষ্ট্রের উন্নয়নকামী উপযোগবাদী ভালো যৌনতার আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । কিন্তু মানুষ তো যন্ত্র নয় – তার মনের নানা গতি । কর্তা ও কর্মের নানা ভূমিকা । ছাঁচের একমেটে চেহারায় তাতো ধরা পড়বে না । কাজেই কর্তৃ ও কর্মের নানা জটিল উদাহরণে আমাদের প্রবেশ করতে হবে । পরিবার ও সমাজ থেকে ঢুকতে হবে নরনারীর শয্যাগৃহে । মিশেল ফুকো পাশ্চাত্যের যৌনতার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে খেয়াল করিয়ে দিয়েছিলেন ভিক্টোরিয় শুচিতার বোধ থেকে যৌনতার খোলামেলা রূপ ও প্রকাশ সংযত করা হয়েছিল। গড়ে উঠেছিল সন্তান উৎপাদনকারী বাবা- মায়ের পরিশুদ্ধ শয্যাগৃহের ধারণা । বঙ্গদেশেও উনিশ শতকে এই ‘পরিশুদ্ধ শয্যাগৃহ’টি গড়ে ওঠে । একদিকে বড়ো কাজের জন্য যৌনতাকে জীবন থেকে খারিজ করা চাই , অন্যদিকে আদর্শ গৃহীসমাজ ও দেশের জন্য জীবনকে নিজেদের শয্যা গৃহে সুসন্তান উৎপাদনের জন্য নিয়ন্ত্রণ করবেন । দেশ প্রেমিকের প্রণয় ও যৌন জীবন থাকতে নেই । দেশপ্রেমী ব্রহ্মচারী । এই ভাবনা স্বাধীনতার পরেও এমন প্রবল ছিল যে বিবেকানন্দের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্রের প্রেম- বিবাহের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ব্রহ্মচর্যবাদীরা সেই খবরের কাগজ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন । আর একটি দুটি সন্তান হবার পর বাবা- মায়ের ভাই- বোনের মতো জীবন যাপন বিধেয় । অবশ্য সেই সময় আধুনিক কন্ডোম- কন্ট্রাসেপটিভ পিল ইত্যাদি সুলভ্য ছিল না ।ব্যবহৃত হত না । ‘হাম দো হামারা দো’ পারিবারিকতা গড়ে ওঠেনি । ফলে প্রেম- যৌনতাকে বড়ো কাজের অন্তরায় বলে ভাবা হত । বঙ্কিমচন্দ্র তো ভেবেই নিয়েছিলেন বাঙালির পতন ও পরাজয়ের কারণ বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্য । এই প্রেমের গীতি আর্য- বাঙালি অলস, উদ্যমহীন করে তুলেছিল । সুতরাং তারা বহিরাগত শক্তির হাতে পরাজিত হল । প্রেম- যৌনতাকে পরিবার - সমাজ - দেশের জন্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, দরকারে বলি দিতে হবে এই বড়ো আদর্শের সঙ্গে দেশ - কাল - সমাজের যোগ আছে । সাহেবরা বাঙালি পুরুষদের মেয়েলি ভাবত । এফিমিনেট হিন্দু বলে রসিকতা করত । বঙ্কিমদের মনে হল প্রেম- যৌনতা মেয়েলিপনা । নারী নরকের দ্বার । পুরুষ এই প্রলোভনের বাইরে আসবে । আর উপযুক্ত রমণী তাঁর রমণেচ্ছাকে সংযত রেখে প্রয়োজনে ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধে যাবেন ।
এই বড়ো আদর্শের চাপে প্রেম- যৌনতা ছোটো বলে পরিগণিত হল । কিন্তু ব্যক্তি মানুষের মন আর শয্যাগৃহকে তো বাদ দেওয়া যাবে না । ফলে সেই ঘরে চোখ রাখতে হবে । সেই ঘর সব সময় সমাজ- দেশের জন্য নিয়ন্ত্রিত যৌনতার ঘর নয় । কর্তৃত্বে- কর্মত্বে বিপ্লবে -প্রণয়ে সে বড়ো জটিল ।



(ক্রমশ)

বিশ্বজিৎ রায়

বিশ্বজিৎ রায়


বিশ্বজিৎ রায় বিশ্বভারতীতে বাংলা পড়ান । বাংলা পড়েন । বাংলায় লেখেন । পড়ার বিষয়ে সর্বগ্রাসী । ওই যে শাস্ত্রে বলে না পাঠকের মন হবে গণিকার মতো । যখন যেটা পড়বে তাতেই তার মতো করে রাঙা হবে মন । এও তেমন । তার মানে বিশ্বজিৎ রায় পল্লবগ্রাহী ।অন্য পরিচয় ঠোঙাশিল্পী । মানে কাগজে নিয়মিত লেখেন -- খবরের কাগজ থেকে ঠোঙা হয় । কয়েকটা অখাদ্য বইও লিখেছেন ।

আপনার মতামত জানান