অঙ্কখাতার পিছনপাতা- ৩

সুপ্রভাত রায়

 

প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব

একটা নারকেলের মালাইচাকি লাগত। একটা নারকেলের মালাইচাকি, একটা গোলগাল দেখতে ঠিকঠাক ছোট কাঠ, আর একটা বা দুটো মোমবাতি। পোড়া হলেও চলবে। জ্বলবেও। ব্যাস...তালেই হয়ে গেল টর্চ। প্রতি বছর কালীপুজোর রাত্রে। সকাল থেকে প্রস্তুতি চলত। জোগাড়জান্তি...কাঠের এক দিক সরু করে ছুলে নিয়ে , মালাইচাকির চোখ ফুটো করে তাতে আটোসাটো ভাবে ঢুকিয়ে সেট করে নেওয়া। হাতল হিসাবে। যে যত বড়ো মালাইচাকি জোগাড় করতে পেরেছে তার টর্চ তত বড়ো দেখতে, তার টর্চে তত বেশি মোমবাতি ধরে, তার টর্চ তত বেশিবেশি আলো দেয় আঁধার রাতবিরেতে।
সন্ধে নামলে বাড়িতে মোমবাতি দিয়ে, অভিযান শুরু। কালীতলা অবধি ওই নিজে হাতে বানানো টর্চকে সাহসের সঙ্গী করে এগিয়ে যাওয়া। সে কিন্তু মুখের কথা নয় ! এত আলো ছিল না বলে আশেপাশে তেনারাও ছিলেন বয়সকে বাগে পেয়ে। একটু অন্ধকার দিকের রাস্তাকে বেছে নেয় মনখুশি। যাতে নিজের নিজের হ্যান্ডমেড টর্চের মোমবাতি আলোয় ধুয়ে যায় পথ। আবার হাওয়া ফাওয়া দিয়ে নিভে গেলে সে এক যতক্ষণ না জ্বলছে ভয়েভয়ে দেশলাই ঠোকা সিগারেট খেতে না শেখা বয়সে। তাই বারবার নিভে যায়। ভয় জ্বলে ওঠে।

এখন অনেক আলো। ভূতের উপদ্রব নেই। বাড়িটাড়িতে খুব একটা নারকেল ছাড়ানো হয় না। মালাইচাকির অভাব। আগ্রহের অভাব। ফাঁস হয়ে গেছে ম্যাজিকের কৌশল।
কত কিছুর ছবি উঠছে এখন। কত ফ্ল্যাশ। কত ব্যাক। ওই বানানো টর্চগুলোর একটাও ছবি নেই কাছে।
কিছুদিন আগে এমনিই একটা সন্ধে হয়ে আসছে সোনাঝুরির হাটে। আলো কমে এসেছে খুব । ছেলে বাবাকে আরও একটুক্ষণ থাকতে বলছে। দেখে বোঝা যায় তারা বেড়াতে এসেছে শান্তিনিকেতনে। হেঁটে ফিরতে হবে, রিক্সা না পাওয়া অবধি। বাবা তাড়া দেয় ছেলেকে। সাথে টর্চ নেই। ছেলে জানায় টর্চ ডাউনলোড করে নিচ্ছে সে ফোনে। বাবাও জানেন। ছেলেকে বলেন টর্চ তো একটা জিনিস, একটা হার্ডওয়্যার ওটা আবার ডাউনলোড করা যায় নাকি ? ছেলে অ্যাপ ডাউনলোড করে বাবার সামনে ম্যাজিক করে ফ্ল্যাশকে সাদাআলোর টর্চে পরিণত করে। বাবা নিশ্চিন্তি ছাড়েন। আরও একটু থাকতে দেন ছেলেকে। আমিও জানতাম না। বাবাটির মতো। আমিও তাই ভাবছিলাম কী করে হবে ! চোখের বা’দিকে যখন হচ্ছিল এসব।

ওই নারকেলের মালাইচাকি দিয়ে বানানো টর্চ থেকে এই ডাউনলোড করা টর্চের দুই মলাটের ভিতর কত টুকরো আলোর গল্প লুকিয়ে আছে না ?

সুপ্রভাত রায়

সুপ্রভাত রায়


সুপ্রভাত রায় কবিতা এবং গদ্যে সমান সাবলীল। এবার লিখতে বসলেন আদরের জন্য বিশেষ ব্লগ "অঙ্ক খাতার পিছন পাতা"...

আপনার মতামত জানান