অথঃ

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

মহাভারত নিয়ে ব্লগ লেখার অবিমৃশ্যকারী কোনো চিন্তা, আমার কষ্টকল্পনাতেও ছিলোনা – আজ থেকে ছয়ঋতু আগে। এই সিরিজের প্রথম গল্প ক্রোনোলজিকালি রাধা আর আয়ান ঘোষকে নিয়ে ‘শ্রী’, হলেও – সত্যি কথা বলতে ওই গল্পটা আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে সুবোধ ঘোষের ‘ভারতপ্রেমকথা’ পড়ে নেহাৎ খেলা খেলা লেখা।
তাই প্রথম সিরিয়াস গল্প বলতে গেলে দুর্যোধন এবং তস্য পত্নী ভানুমতীর গল্প ‘কৌরবানি’ই বলা উচিৎ। প্রত্যেকটা গল্প লেখার একটা কারণ থাকে, অন্ততঃ আমার মতো – কল্পনাশক্তিরহিত অলেখকের জীবনে। এর আগে আমি পরপর বেশ কিছু গল্প লিখেছিলাম, যেগুলোতে যথেচ্ছ ইংলিশ শব্দ ব্যবহারের জন্য যথোপযুক্ত তিরষ্কৃত হয়েছিলাম – বিবিধ ‘সোর্স’ থেকে। সেইসময়ই একটা দুর্মর ইচ্ছে আসে – যে এমন একটা গল্প লিখে সবাইকে দেখাবো যেখানে একটাও ইংলিশ শব্দ ব্যবহার হবেনা। প্রায় সমসময়েই – আমি শ্রী নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি বিরচিত ‘মহাভারতের প্রতিনায়ক’ পড়তে শুরু করি। ফলতঃ ‘কৌরবানি’।
তারপর যা হয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রজাতির আগাছা – এক জায়গায় সমধর্মী – তারা ঝাড়ে বংশে বৃদ্ধি পায়। বেশ কিছু দয়ালুর লাইনে শেষ কথা মানুষের পিঠ চাপড়ানি পেয়ে আমার হঠাৎ অকারণ – বাতেলা – এবং এই ব্লগ।
যাই হোক, থামা দরকার। বেদব্যাস সম্ভবতঃ পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ স্টোরিটেলার – তাঁর মহান কীর্তিকে বারংবার আমার মর্ষকামী ইন্টালেক্ট দিয়ে ধর্ষণ করলে – রৌরব নরকেও আমার জায়গা হবেনা (আর ইহজীবনে মিথ্যাচার কম করিনি – কোনো সারমেয়বেশী ধর্ম আমাকে সশরীরে স্বর্গের প্যাকেজ ট্যুরে নিয়ে যাবেন – এহেন দুরাশা পোষণ করার মতো বেওকুফ আমি নয়)। তাই ‘হয়েছি শেষ বিদায় দেহ ভাই’ এবং তস্য ভগ্নীসম্প্রদায়।
যাদের কথা বলার জন্য এই গৌরচন্দ্রিকা (সুধী পাঠক, আপনি যদি এই বিষাক্ত কলমচির কাহিনীতে উৎসাহ হারিয়ে এন্ডক্রেডিটস অবধি না পড়েন, সেই আশঙ্কায় প্রথমেই বোর করলাম) তাদের একে একে লিস্টডাউন করে ফেলি –
• দেবরূপা ব্যানার্জী, আমার একান্ত ভগ্নী, যে আমাকে নৃসিংহপ্রসাদের দু-দু’খানা বই গিফট করে ফেলেছে অদ্যাবধি। সিরিজের শুরুটাও সেই করেছিলো।
• অভিষেক মুখোপাধ্যায়, যিনি এই গল্পগুলোর অনেক কিছু ঠিকঠাক থাকার কারণ – বানান সহ।
• শিঞ্জিণী সেনগুপ্ত – তার কেন জানিনা মনে হয়েছিলো, আমার মহাভারত নিয়ে একটা সিরিজ লেখা উচিৎ। তাই বার চারেক বলেছিলেন। আমি দিদিস্থানীয়ারা চারবার কিছু করতে বললে, সেখানে বাই ডিফল্ট হ্যাঁ বলি – অপরাধ নেবেন না।
• অরিন্দম ভট্টাচার্য (সম্পর্কে আমার ম্যানেজার) এবং সুমন দাস (সম্পর্কে আমার কলিগ) যাদের সাথে একটা ছোটোখাটো মহাভারত ক্লাব যাপন করেছি শেষ কয়েক মাসে।
• দীপশান্ত দে (কলিগসম্পর্কে বন্ধু) – যার কালেকশানের মহাভারত সম্পর্কিত একটি ব্লগ যদি আপনি না পড়ে থাকেন – তাহলে আপনার পড়াশুনো শেখার কোনো মানে হয়না।
• টিনা চক্রবর্তী, আমার পেয়ারের আপন দিদি, যার সাথে আই-এস-ডি কলে (অবশ্যই তার পয়সায়) আমি মহাভারতীয় লাফঝাঁপ করেছি – বারংবার।
• রঞ্জন ঘোষাল – যিনি কেন জানিনা, আমার কিবোর্ডকৃত অর্বাচীন হুহুংকারে বিচলিত হননা।
• দ্বৈপায়ন রায় – যার ক্যাফেতে আমি খাবার খাই কম – অহেতুক তাত্ত্বিক বুকুনি করি বেশি এবং সে সানন্দে তা’তে উস্কানি দেয়
• স্নেহাশিষ ব্যানার্জী, রাজর্ষি মজুমদার, জয়দীপ চ্যাটার্জী, তনুশ্রী চক্রবর্তী, কিঙ্কিণী ব্যানার্জী, পৃথা ভদ্র, বিক্রমাদিত্য গুহ রায়, মেঘনা চক্রবর্তী, চন্দনা সেনগুপ্ত এবং আরো বেশ কিছু অস্বাভাবিক মানুষ – মাঝে সাঝে লেখাগুলো পড়ে সেগুলো পড়ার যোগ্য থাকছে বলে যাবার জন্য।
• গৌতম ভট্টাচার্য - আমার পিতাশ্রী এবং দেবযানী ভট্টাচার্য – মাতাশ্রী, যারা মহাভারত ম্যানিয়াক বললে কম বলা হয়। আমি মোটামুটি ছোটো থেকে মহাভারতের মূল কাহিনী জানি সেটা সম্পূর্ণ এদের বদান্যতা।
• এবং সর্বোপরি শাহেনশাহেআলম, বাদশা- ও -কা - বাদশা, মিস্টার ‘আদরের নৌকা’, দোর্দন্ডপ্রতাপ অভীক দত্ত – যে আমার বহু বহু বদামোর মতোই এই ব্লগটার আবদারও হাসিমুখে মেনে নিয়েছে আর এতোদিন ধরে সেটাকে পাব্লিশ করার ঝক্কি নিয়েছে – ইউ রক - কাকা।
এলাম তবে। শেষ গল্প, প্লিজ পড়ে নেবেন ক্ষমা ঘেন্নার যোগ্য ভেবে – আর জ্বালাবোনা – এই চুপ করলাম। মাইরি বলছি
~কৌস্তভ


(১)
সেদিন, মধ্যাহ্নের নিদাঘ দিগন্ত পেরিয়েছে বহুকাল – এখন সেই ক্ষণ প্রায় তিন বৎসরাধিক দূরত্বে, নিশ্চিন্ত ইতিহাস।
শুরুতে যা শর্ত স্থির হয়েছিল – দুপক্ষই প্রতিজ্ঞাহেতু তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। দুজনের মধ্যে কারো স্বভাবও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের নয়।
এখন পূর্বাহ্ন, নিদ্রাজাগরিত ধরিত্রী সদ্য কামোত্থিতা তরুণীর ন্যায় স্নেহ আর বিরাগের মাঝে বিচরিতা। তাকে ভালোবাসা উচিৎ - না একান্ত কিছু ক্ষণ তার প্রাপ্য – সে বিষয়ে যেকোনো প্রেমিকের ন্যায় দ্বিধাগ্রস্ত – আজকের দিনটি।
গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ বিদায় নিয়েছে – এখন হেমন্ত ঋতু – অগ্রহায়ণ মাস। যে অগ্রহায়ণ, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়ে কখনো বিভীষিকা, আবার কোনো বর্ষে নেহাৎ শীতের অপেক্ষায় চেয়ে স্থানগ্রহণ করা নিছক যতিচিহ্ন।
মহর্ষি বেদব্যাসের আশ্রমে আজ অনাবিল বিশ্রাম।
তিন বৎসরাধিকব্যাপী সারস্বত সাধনার কাল পরিসমাপ্তি ঘটেছে। মহাভারত এখন পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। গণনা করে দেখা গেছে – ঋক,সাম, যজু, অথর্ব – চতুর্বেদের চেয়েও বৃহদাকার এই গ্রন্থ। সমগ্র আর্যসভ্যতার কাছে এই গ্রন্থ রচনামাত্র আকরগ্রন্থের স্থান পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে পঞ্চম বেদরূপে এই গ্রন্থ গৃহীত হবে – সেই স্বীকৃতিপ্রাপ্তি ঘটেছে।
বেদব্যাস তৃপ্ত, তাঁর পুত্র শুকের গৃহত্যাগের পর যে ক্ষণিক শূণ্যতার সৃষ্টি হয়েছিল – এই বিরাট সৃষ্টি সেই মোহ ঘুচিয়েছে।
আজ ঋষি ব্যাস, লেখক ব্যাসের সাময়িক বিরতি – আজ তিনি শুধুই অতিথিবৎসল।
গণপতি কালই ফিরতে চেয়েছিলেন। এতোদিনের অনুলেখনের শেষে। ব্যাস এই রচনায় তাঁর সঙ্গীকে এতো সত্ত্বর ছাড়তে চাননি। তাঁরই অনুরোধে, এই আশ্রমে বিনায়ক অতিরিক্ত একটি দিবস থাকতে অনুগ্রহ করেছেন।
বেদব্যাসের আশ্রম বনানী মধ্যে স্থিত হলেও – ব্যাস এবং তদশিষ্যদের সযত্ন পরিচর্যায় অতি মনোরম। সংলগ্ন যমুনার অমৃতবারিতে সদা সুসিক্ত।
যমুনাবক্ষেই জন্ম বলে হয়তো, ব্যাসের এই নদীটির প্রতি বিশেষ দুর্বলতা আছে। ভারতভূখন্ডের উত্তরাংশের অতীব গুরুত্বপূর্ণ নদী হওয়া সত্ত্বেও কাল্পনিক কোনো কারণে, গঙ্গা এবং সরস্বতীর পুণ্যতোয়া ঐতিহ্যের সম্মুখে যমুনা কিছুটা ম্লান। হয়তো তার বিখ্যাত হবার বীজ নিষিক্ত হচ্ছে কোনো ভাবীকালে – অন্য কোনো শাসকের যুগে - ব্যাস তা নিয়ে ভাবিত নন।
ব্যাসের জন্মের সাথে যুক্ত বলেই হয়তো এই নদীটি তার বড়ো একান্ত লাগে। হয়তো এর জলের অঙ্গস্পর্শে নিজের পিতা ঋষি পরাশর আর মাতা সত্যবতীর ক্ষণিক প্রেমের সামান্য সাংসারিকতায় নিজেকে রাখতে ভালোবাসের ঋষি। ব্যাস স্বারোপিত ব্রহ্মচর্য সত্ত্বেও অন্তরে কবি – নিছক সন্ন্যাসী নন।
ব্যাসের কঠোর পরিচালনায় এবং শিষ্যবৃন্দের পরিশ্রমে এখানে যমুনা অকলুষ, অরণ্য এখনো প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ। ব্যাস প্রকৃতির অহেতুক অপব্যবহার বিরোধী।
যমুনার তীরেই বসে ছিলেন মহাভারতের কবি।
(২)
- ‘এখনো চিন্তা কিসের কবি? তোমার অমৃতগ্রন্থ তো এখন পূর্ণাঙ্গ’।
অতি পরিচিত কন্ঠে ব্যাস ফিরে তাকালেন। শেষ তিন বছরে এই কন্ঠের প্রশ্নের যুযুধান বুদ্ধিমত্তা – ব্যাসের কবিত্বপ্রতিভাকে সদাতীক্ষ্ণ রেখেছিলো।
গণেশ আহ্নিক এবং স্নানের শেষে, এখন সুসজ্জিত দেববেশে। গৌরদেহে উপবীতটিও উজ্জ্বল।
তাঁর প্রশ্নে ব্যাস নিজের অবস্থান ব্যক্ত করলেন নির্দ্বিধায়। বুদ্ধিমান হস্তীশীর্ষের সম্মুখে চিন্তা গোপন করা যায়না – ব্যাস পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানেন।
- ‘কার্য সমাপনের অসহায়তা বিনায়ক। এখন অলসতা যাপন’।
গণেশ সহাস্যে প্রশ্ন করলেন – ‘অবসর তোমার বড়ো অপছন্দ ঋষি’।
- ‘অবসর নয় পার্বতীপুত্র। অলসতা। অবসর মানুষকে ঋদ্ধ করে, সুচিন্তায় সমৃদ্ধ হবার অবকাশ দেয়। পরবর্তী কার্যের জন্য’।
- ‘আর অলসতা?’
- ‘চিন্তাকে বিপথগামী করে। অস্থানে শক্তির অপচয় ঘটায়। মানুষকে রিপুর অধীন করে’।
গণেশ ব্যাসের পাশে বসলেন।
- ‘কর্মযোগী কবি – তোমায় একটি কার্যের সন্ধান দিই সেক্ষেত্রে?’
- ‘বলুন’।
- ‘তাঁর আগে বলো দেখি ত্রিকালজ্ঞ ঋষি, আমার আহারের কি ব্যবস্থা করেছো অতিথি সৎকার হেতু?’
গণপতি বৃকোদর ভীমসেনের সমতুল্য না হলেও যথেষ্ট ঔদরিক।
ব্যাস সহাস্যে মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থার বিবরণ দিলেন। গণেশকে যথেষ্ট উজ্জ্বল লাগলো।
- ‘সাধু। ঋষি এবার আমার প্রশ্নগুলি করি?’
- ‘আপনার প্রশ্ন? সে তো আমি প্রতি শ্লোকবর্ণনার সময় যেখানে প্রয়োজন বলেছি স্বেচ্ছায়’।
- ‘সে তো তোমার উদ্দেশ্য ছিলো আমার লেখনীকে মন্দীভূত করে পরবর্তী শ্লোক রচনার সময় নেওয়া’।
- ‘আপনি জানতেন?’
- ‘ভুলে যাচ্ছো ঋষি আমার পিতা ও মাতা দুইজনই ত্রিনয়নে ভূষিত। অন্তর্দৃষ্টি আমাদের পারিবারিক বৈশিষ্ট্য’।
- ‘আর কি প্রশ্ন বিনায়ক?’
- ‘দেখো ঋষি শ্লোকের অর্থ তো একটি বাহ্যিক বিবরণ – আমি লেখকের অন্তর্গত কয়েকটি চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হতে চাই। নাহলে আমার অনুলেখণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে’।
- ‘আপনিই কলমধারী আপনিই প্রথম পাঠক। বেশ। বলুন বিনায়ক’।

(৩)
‘প্রথম প্রশ্ন, তুমি তো এই গ্রন্থকে ধর্মগ্রন্থ বলো’।
‘বলি’।
‘তুমি বিশ্বাস করো তোমার প্রচলিত ধর্মের অর্থ পাঠকেরা বুঝবে?’
ব্যাস কিয়ৎক্ষণ ভাবলেন।তারপর বললেন –
‘না বিনায়ক। সে আশাটা হয়তো দুরাশাই হয়ে যাবে’।
‘তবে?’
‘তবে কী বিনায়ক?’
‘তোমার মনে হয়না এই কাহিনী অপভ্রংশ দোষে দুষ্ট হবে’।
ব্যাস ঈষৎ হাস্যে বললেন – ‘লেখক তো ধর্মপ্রচারক নয় বিনায়ক। লেখকের দায় কাহিনীর প্রতি। লেখকের দায় পাঠকের আগ্রহ জাগিয়ে রাখার, তাকে বিনোদনে সম্পৃক্ত করার – লেখকের কাজ সমাজবিপ্লব করা নয় – সমাজবিপ্লব লিপিবদ্ধ করা– নায়ক হওয়া নয় – পর্যবেক্ষক হওয়া – দর্শনে পাঠককে বিদ্ধ করা নয় – কাহিনীর মাঝে অবলীলায় সম্পৃক্ত দর্শনে পাঠককে ঋদ্ধ করা। লেখক যদি শেষে কিছু হঠাৎ বাণী সমৃদ্ধ উপদেশ রচয়িতা হয়ে যায় তবে কাহিনীর গতি রুদ্ধ হয়?’
‘তাহলে যদি পাঠকেরা তোমার ধর্মোপদেশ না বোঝে তোমার আপত্তি নেই?’
‘তারা কাহিনীটি পড়বে। কাহিনীর মধ্যেই ধর্মের উত্তরণ পরিলক্ষিত করবে – তা দিয়েই সমৃদ্ধ হবে’।
‘আমার স্মরণে আছে কবি – ধর্মরূপী বকের উপাখ্যানের অন্তরে তোমার দর্শন – তবু শুরু এবং শেষ মূল কাহিনীর সাথে একাঙ্গী’।
‘পাঠকের মনোরঞ্জনও যে লেখকের দায় বিনায়ক’।
‘আর অনুলেখকের দায় ঋষি?’
‘লেখকের মানসের প্রতিভূ হওয়া। তাকে বোঝা। তার অন্তরাত্মার সাক্ষী থাকা।’
(৪)
‘জ্ঞাতমিতি’ – বলে একদন্ত মহাবাহু কিয়ৎক্ষণ থামলেন।
‘ঋষি, আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, এই মহাকাব্যের নায়ক কে?’
‘একজন লেখকের পক্ষে সব থেকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন ধীমান’।
‘কেন?’
‘কারণ, কাহিনী রচয়িতা আসলে তো প্রত্যেক চরিত্রের দেশ-কাল-অভ্যাস সমস্ত বাঁচেন। প্রত্যেক ক্রিয়ার পূর্বে তাকে ভাবতে হয় চরিত্রের মানসিকতা, তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া – প্রত্যেক সংলাপের পূর্বে তাকে ভাবতে হয় চরিত্রের বাকচাতুর্য, তার পরম্পরা, বাকরীতি, সংবেদনশীলতা – প্রতি লেখক সমগ্র চরিত্রই বাঁচেন বিনায়ক – কোনো একটিকে এগিয়ে রাখা তার পক্ষে দুষ্কর’।
‘মহাভারতকারের পক্ষেও?’
‘প্রিয় চরিত্রের নাম বলতে পারি বিনায়ক – পার্থ – অর্থাৎ তৃতীয় পান্ডব অর্জুন’।
‘শ্রীকৃষ্ণ নন কেন? নায়কোচিতো বাহুল্য তো তাঁর চরিত্রেই সর্বাধিক’
‘এবং সেই কারণেই তাঁর আচরণে কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিকতা অনস্বীকার্য। প্রতিটি কাহিনীর তো একজন ধারক থাকেন বিনায়ক – বাসুদেব তাই। তিনিই মহাভারতের দীপ্তি, প্রকাশ, চিন্তা এবং কারণ। কিন্তু তিনি যেহেতু আমার সৃষ্ট দ্বিখন্ডিত যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্মধ্বজ – সেহেতু তাঁর কিছু জানার নেই, পাওয়ার নেই, জেতার নেই, হারাবারও নেই’।
ব্যাস কিঞ্চিৎ ভেবে সংযোজন করলেন – ‘অর্জুনের চলনই মহাভারতের নির্যাস। তাঁর চক্ষু দিয়েই পাঠকের ধর্মস্বরূপ দর্শন – তাঁর গান্ডীবেই বিজয় পদক্ষেপ এবং সমস্ত জয়ের পর প্রায় সমস্ত কিছুই নিজভ্রাতাদের উদ্দেশ্যে ত্যাগ – বারংবার – সেখানেই মহাভারতের রীতি, ভারতবর্ষের রীতি’।
‘আর একলব্য উপাখ্যান কবি?’
‘প্রতি মানুষের স্বাভাবিকতা কি শুধু মহত্ত্বে বিনায়ক? রিপুতে নয়? অর্জুন স্বাভাবিক মানুষের মতোই মরণশীল তাই – জীবনের শেষ সমরে দ্বারকাতে তিনি পরাজিতও। মানবগন্ডির বাইরে তাঁর উত্তরণ ঘটেনি – সশরীরে স্বর্গে’।
‘তাই যুধিষ্ঠির নায়ক নন?’
‘যুধিষ্ঠির মহাভারতের মানস বিনায়ক। মহাভারতের ঈপ্সিত ফলশ্রুতির মানবরূপ। ইচ্ছা তো কখনো নায়ক হতে পারেনা’।

(৫)
‘অন্তিম প্রশ্ন ঋষি – মধ্যাহ্ন আগতপ্রায়’।
‘বলুন ভগবান একদন্ত’।
‘আমি কেন?’
‘অর্থাৎ?’
‘এই কাহিনী রচনা তো তুমি নিজেই করতে পারতে ঋষি, তোমার পুত্র শুক পারতো – আরো অনেকেই যথার্থ যোগ্য অনুলেখক হতে পারতেন। যিনি আমার কথা বলেছিলেন স্বয়ং সেই ব্রহ্মাও পারতেন। আমি কেন? এতো অদ্ভুত শর্তাবলী আরোপ করার পরও আমি কেন?’
ব্যাস কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে থাকলেন গণপতির দিকে।
তারপর চোখ সরিয়ে যমুনার দিকে তাকালেন।
মধ্যাহ্নের দিবাকর, স্বর্ণাভ সমুজ্জ্বলতায় যমুনায় একটি প্রায় প্রহেলিকা তৈরী করেছে। তার আশেপাশে সবই কিঞ্চিৎ অস্পষ্ট।
সকালের স্নান শেষে বনচর আশ্রমিকেরা ফিরে গেছে নিজকার্যে, আর কোনো মানুষ নেই নিকটে।
দু’একটি ক্রৌঞ্চ উড্ডীণ এই বহমান দিকশূন্য আদিগন্ত নদীর বুকে।
‘ওই তরীটি দেখছেন বিনায়ক?’
গণপতি ব্যাসের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালেন।
প্রায় দিগন্তের সীমারেখায় – অস্পষ্ট একটি নৌকার অবয়ব।
‘আমার জননী – বহুপূর্বে – তার যৌবনে এমনি নৌকাচালিকা ছিলেন – এই যমুনারই বুকে’ – ব্যাস বললেন।
‘সত্যবতীর উপাখ্যান আমি জানি দ্বৈপায়ন’।
ব্যাস উঠে নদীর আরো কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। অগ্রহায়ণের বাতাসপ্রাচুর্যে তার কেশ ও বসন উড্ডীণ।
যমুনার দিকেই চোখ রেখে বলে গেলেন ব্যাস –
‘আমি আমার পিতাকে দেখিইনি বিনায়ক। সকলে বলে তিনি মহাঋষি – কিন্তু আমি নিছক ত্যাজ্য – কারণ আমার অস্তিত্বের আগে ও পরে আমার পিতার জীবনে কোনো পরিবর্তনই ঘটাতে পারিনি’।
চারপাশের নিস্তব্ধতায় – ব্যাসের সংলাপ – গম্ভীর স্বগোতক্তির মাত্রা পেল – বিনায়কের কাছে তা প্রায় সামগানের পর্যায়ে মনে হচ্ছিলো।
‘এই কাহিনী আসলে জননীদেরই কাহিনী – তাঁদের কেউ পঞ্চপুত্রকে বিনা দ্বিধায় মানুষ করেন– অথচ জ্যেষ্ঠপুত্রের অপেক্ষা করে যান আমরণ। কেউ শতপুত্রবতী হয়েও রিক্তা। কেউ একমাত্র পুত্রকে চক্রব্যূহে হত্যা হতে দেখেও ধর্মশীলা। কেউ প্রথমে সভাকক্ষে বিবসনা হয়ে, শেষে সমগ্র ধরিত্রীর অধীশ্বরী হয়েও – পুত্রশোকাতুরা।
এই কাহিনী কি একাধারে পুরুষদের লোভ, রাজনীতি, ধর্মনীতি সমাজনীতির বাইরে একটি অন্য জগতের কথাও বলে না? যেখানে এই জননীদের অধিষ্ঠান – যেখানে জীবন নিতান্ত সহজে প্রবাহমানা – যেখানে আনন্দে-দুঃখে, ক্রোধে-প্রেমে, সর্বোপরি মানুষী সম্পর্কে কোনো নিয়মনীতির বাধা নিষেধ নেই? যেখানে জননীর মমত্ব আছে, বেদনা আছে, সাময়িক ঈর্ষাও আছে – কিন্তু কৃত্রিমতা নেই’।
বিনায়ক বললেন – ‘আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেনা কিন্তু ঋষি’।
‘আমার কি প্রয়োজন ছিল বিনায়ক, বারংবার হস্তিনাপুরে যাওয়ার এবং ধৃতরাষ্ট্রের রাজ্যলিপ্সা এবং দুর্যোধনের অসভ্যতা সহন করার?’
‘কেন যেতে ঋষি?’
‘ওখানে আমি আমার মায়ের সান্নিধ্যস্পর্শ অনুভব করি ঋষি – এখনো করি – ওই বহুপ্রাচীন রাজবংশের প্রাসাদে প্রতিটি অলিন্দের উন্মুক্ততায়, প্রতিটি সভার বিশালত্বে, প্রতিটি অন্দরমহলের গোপনীয়তায়, আমার জন্মাবধি অপ্রাপ্ত – একদা নৌকাচালিকা জননী – মিলেমিশে রয়েছেন – প্রতিটি সাধারণী মানবীর রাজমহিষী হবার নিজস্ব যোগ্যতায়’।
গণেশ কিছু বলবেন ভেবেও নিশ্চুপ রইলেন।
‘এমন একজনের সান্নিধ্য পাওয়া যে জন্মইস্তক মাতৃগর্বে বিখ্যাত – দেবাদিদেব পিতার নিকটে থেকেও যে একান্ত পার্বতীনন্দন – তাঁর নৈকট্য যে আমার কাছে পরম বিনায়ক – বলতে পারেন আমার মহাকাব্য রচনার পারিতোষিক’।
গণেশ কিছু না বলে ব্যাসের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
সিদ্ধপুরুষ সেই যে কামে-দুঃখে-ক্রোধে-আনন্ দে অবিচলিত থাকে, আজকের ব্যাস সেই যোগ্যতায় অকৃতকার্য।
কিন্তু কবিদের জন্য মাপকাঠি স্থির করে কোন ধর্মগ্রন্থ?
বাস্পরুদ্ধ স্বরে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বললেন – ‘আমার আর সন্ন্যাসী হওয়া হলোনা বিনায়ক’।
‘তাই, প্রতিটি অনুলেখকের যেহেতু লেখকের অন্তর্যামী হওয়া উচিৎ’ – ব্যাসের হস্তদুটি নিজের হস্তে নিয়ে একদন্ত মৃদুহাস্যে বললেন –‘সেক্ষেত্রে রয়ে গেল শুধু অনুলেখকের মনোযোগ?’
ব্যাস স্মিতহাস্যে প্রত্যুত্তর দিলেন –‘সঙ্গে লেখকের কর্তব্য’।

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

কৌস্তভ ভট্টাচার্য


কৌস্তভ
পেয়ারের নাম 'কে' -
না 'কে কৌস্তভ?'
জাতীয় প্রশ্ন শুনে মোটেই খুশি হয় না - বাচ্চা বেলায় কাফকা পড়ে একটু 'কে' লিয়ে গেছে। অফিসে কাজে মন নেই, নোকিয়ার ফোন নেই - এমন কি কোনো ভাইবোন নেই (এটা মেলানোর জন্য বললাম),যা নেই ভারতে নামে মনোজ মিত্তিরের নাটক আছে জানি, পরে বই বেরনোর সময় নামটা চেঞ্জ করে দেব!

যা নেই ভারতে সম্পর্কে
মহাভারত নিয়ে বাঙলায় রাজশেখর বসু উত্তরযুগে বসে মুখবন্ধ লেখা এবং বালি দিয়ে বঙ্গোপাগরে বাঁধ নির্মাণ – প্রায় সমতুল্য ধৃষ্টতা।সেহেতু বেশি কথা বাড়িয়ে – নিজের অশিক্ষা কতোটা সুদূর প্রসারিত তা সর্বসমক্ষে সোচ্চারে জাহির করার মধ্যে কোনো গৌরব অনুভব করিনা। তাই শুধু কয়েকটা কথা।
বি-আর-চোপড়া যখন তাঁর অধুনা কিংবদন্তী টেলিসিরিয়ালটি প্রথমবার টেলিকাস্ট করা শুরু করেন – সেই বছরটা – ১৯৮৬ - বর্তমান লেখকের জীবনে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে – কারণ সেই বছর আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। স্বভাবতই সেই প্রথম টেলিকাস্টের কোনো স্মৃতি আমার নেই।
ফলতঃ আমি খুব রেয়ার ব্রিড যে আগে মহাভারত পড়েছে (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কল্যাণে)। পরে দেখেছে – নাইন্টিজে রিটেলিকাস্টের সময়।তাই – বি-আর-চোপড়াময় মহাভারতে আচ্ছন্নতাটা আর যাই হোক আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি – যদিও ওটাই সম্ভবতঃ আমার দ্বিতীয় প্রিয় অনস্ক্রিণ অ্যাডাপ্টেশন – পিটার ব্রুকের পর (হায় সত্যজিৎ আপনি বড়ো তাড়াতাড়ি সিনেমা বানানো ছাড়লেন)।
মহাভারতের কাহিনীকে এমনিই এই ব্লগে উত্তরোত্তর কচলানো হবে, তাই বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু এটুকু বলার যে, এই বইটি সম্ভবতঃ, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে – কিন্তু শুধু একটিমাত্র উদাহরণ। ধর্মবকের সাথে যুধিষ্ঠিরের সেই বিখ্যাত ডায়লগ যে অধ্যায়ে তার শুরু হচ্ছে কাহিনীর মধ্যে থেকে এবং শেষ হচ্ছে অজ্ঞাতবাস সম্পর্কিত একটি আশীর্বাণী দিয়ে – মধ্যিখানে ব্যাস নিজের দর্শনটা বলে দিয়েছেন।
এইরূপ কাহিনী এবং দর্শনের মিশেলের অদ্ভুত দক্ষতা সেই যুগে যাঁর ছিলো – তাঁর চরণে প্রণিপাত না করলে সোজা বাঙলায় পাপ হবে।
এই ব্লগের নামের সাথে সাযুজ্য রেখে সবকটি ঘটনা – মূল মহাভারতে নেই – কিন্তু যেসব ঘটনার জের টানা হচ্ছে গল্পগুলির টাইমস্পেসে সেসব আছে। শুধু ঘটমান বর্তমানটা বানানো।
যে সমস্ত বই ছাড়া এই ব্লগটা হোতোনা –
১) মহাভারত – রাজশেখর বসু
২) মহাভারত – কালীপ্রসন্ন সিংহ (রেফারেন্স বুক হিসেবে)
৩) মহাভারতের ছয় প্রবীণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৪) মহাভারতের প্রতিনায়ক - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৫) মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
৬) মহাভারতের অষ্টাদশী - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
শেষে একটা কথা – ব্যাস ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’ বলতে সম্ভবতঃ ঘটনার কথাই শুধু বলেননি। অনুভবের কথা, দর্শনের কথাও বলেছেন – জীবনের এই অল এনকম্পাসিং বিশালত্বের মধ্যে শুধু অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে যে গল্পগুলো – সেগুলো ব্যাসের ব্যাপ্তির বাইরের অনুভবকে ছুঁয়ে ফেলছে – তা আর বলি কি করে।
সেদিক দিয়ে ব্লগটা সার্থকনামা হলো কিনা জানিনা
~কৌস্তভ




আপনার মতামত জানান