গালাগালি-গলাগলি

সরোজ দরবার

 

সময় সময় গালাগালি দিতে না পারলে বাঙালিরা নাকি গলাগলি করে থাকতে পারে না। এমনিতেই নাকি গলাগলি বিষয়টা তাদের স্বভাবে তেমন নেই। তবু যেটুকু যা থাকা তার মধ্যে গালি দিতে পারার একটা বড় ভূমিকা আছে।
মার্কসের যেমন হ্যাভস এবং হ্যাভ নটস, স্কুলের চৌকাঠ বেশ কিছুদিন মাড়ানো হয়ে যাওয়ার পর মূলত দুটো শ্রেণি-গালাগালি জানে, আর জানে না। যারা জানে তারা একজোট। তারা সমস্ত না-পসন্দের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের ধ্বজা উড়িয়ে মোক্ষম একটি করে বাক্যবাণ প্রয়োগ করে। আর যারা জানে না, তারা হয় মনে রাগ পুষে রাখে, নয় তো, মানিয়ে নেওয়াই নিয়তি ভেবে নীরব থাকে।
দেখতে দেখতে কলেজ ক্যান্টিনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিভেদটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথম দল তখন নিজেদের পছন্দ দিয়ে তৈরি জগতের বাইরেটাকে প্রবল অস্বীকার করে। যে ভাই জীবনেও গাঁজায় টান দেয়নি সে করুণার পাত্র। ওদিকে করুণার পাত্র ভাবে, এর বাইরেও জীবন আছে তোমরা জানো না।
আরও পরে দেখা যায় এই গালাগালি করাটা এক ধরনের সাংস্কৃতিক রেওয়াজ। বছর বছর নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে সে ফিরে ফিরে আসে। বর্ষা নামলে কবিরা রোম্যান্টিক হবেন আর সরকার গাল খাবেন এটাই দস্তুর। তা একটুখানি ব্যাঙের হিসিতে (অনেকেই বলেন, কেউ করতে দেখেছেন কি না জানি না) যদি শহর সমুদ্দুর হয়ে যায় তো গালাগালি দেবে না তো কি ফুলচন্দন দিয়ে পুজো করবে? পুজোর সময় বাঙালি হাতের উলটো পিঠ চেটে নেওয়ার মতোই মন্ডপে মন্ডপে খাঁটি বাঙালিয়ানার স্বাদ সপসপ চেটে নেবেন, আর অবধারিত গালি খাবেন উদ্যোক্তারা। বক্তব্য এই যে এর কিঞ্চিত পয়সাও যদি সমাজের উপকারে কাজে লাগত। সব বোগাস! তা সবই যে মায়া সে তো কবে থেকেই জানা! কার না কার স্বপ্নের খেসারৎ দিয়ে এরকম বিচ্ছিরি বাঁচার সেলফিটাকে আমাদের ক্রমাগতই বুকপকেটে নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। এই শীতে, অলৌকিক সবজি বাজারের নৈসর্গিকতায় আর কুয়াশার আচ্ছন্ন মিঠে রোদের রোম্যান্টিকতার ভিতরেই পিঠে-পুলি বেচা দোকানিরা কী গালগালিটাই না খান। হায় সেই সোনাঝরা সন্ধ্যা, সেই নারকেল কোরা, সেই চালের গুঁড়ি তৈরি, সেই সদ্য পিঠে ভেপে ওঠার নিশিগন্ধা নস্ট্যালজিয়ার দৌলতে এই দোকানদারগুলো যে নেহাতই অর্বাচীন হয়ে সর্বাঙ্গীন বাঙালিয়ানাকে প্যাকেটে বেচে দিচ্ছেন সে প্রমাণ করে দেবে হাজার শব্দের ফিচার স্টোরি। সেই স্টোরি শেয়ার হবে, আহা...উহু কমেন্ট পড়বে, হুসহুস লাইকে বেশ কিছু বাঙালি প্রতি থ্রেডে এক হয়ে হাপুস হুপুস ইউনিটিতে ভেসে যাবেন। কে না জানে, ‘ইউনাইটেড ইউ স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই মিসআন্ডারস্ট্যান্ড।’
মিসআন্ডারস্ট্যান্ডের শাঁখের করাতে পড়ে ইদানীং হেব্বি গাল খাচ্ছে মিডিয়া। সিনেমার সূত্রে। এই তো সদ্য ফিল্ম-উৎসবের ম্যারাপ গোটানো হয়েছে। এখনও টাটকা ফুলকপির মতোই আন্তর্জাতিক ভাবখানা ঝরঝরে আছে। কথায় কথায় অমুক, তমুক নামগুলো জিভের ডগায় হুড়হুড় করে চলে আসছে। বিস্মৃতি এখনও ততোটা সক্রিয় নয়, যেহেতু সিনেমার লিস্টি-টিস্টি মাসকাবারি কাগজ বিক্রির সঙ্গে এখনও বেচে দেওয়া হয়নি। সুতরাং একহাত নেওয়ার এরকম অব্যর্থ সময়-সুযোগ আর আসবে না। ইতিমধ্যেই শিক্ষিত ও দীক্ষিত চলচ্চিত্র রসাস্বাদীরা প্রমাণ করে দিয়েছেন বাংলা ছবি তো নেহাতই বাসমতীর মাসে খুদকুঁড়ো। সে সব যুক্তিরও দাম আছে বৈকি, অস্বীকার করার তেমন জায়গা নেই। সে প্রসঙ্গ আলাদা। কিন্তু এই একহাত নিতে গিয়ে দুইহাতের টোকাটা খেল মিডিয়া। গর্হিত অপরাধের মধ্যে সে যা করেছে, তা হল, নিজের ভাষায় নিজের ছবির প্রচার করেছে, ভালো বলেছে, মন্দও যে বলেনি তা নয়, পরিচালকদের ইন্টারভিউ ছেপেছে, দেখিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। শিক্ষিত-দীক্ষিত সম্প্রদায় বলছেন, তা এই খুঁদকুড়োকে নিয়ে অত আদিখ্যেতার কী আছে। এতে তো মানুষ বুঝবেই না বাসমতীর বাহার আসলে কেমন। হক কথা। এদিকে পরিচালক রাও একহাতে ছবি বানিয়ে, আর একহাতে মিডিয়াকে একটু কড়কে দিচ্ছেন। এই তো সেদিন উৎসব আঙিনায় একটা সেমিনারে বক্তব্য শুনতে শুনতে মনে হল, তিনি বা তাঁরা যা বলতে চাইছেন তা হল এই- সিনেমা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এই যে পাঁচে তিনটে ঢেঁড়স নয় কাঁচকলা নয় স্টার ধরিয়ে দিচ্ছ, সে ধরিয়ে দেওয়ার তুমি কে হে বাপু! ওরকম ধরিয়ে সবাই দিতে পারে, একবার পিছনের ঘাম-রক্ত এক করা পরিশ্রমটা দেখলে বুঝতে কত ধানে কত চাল। যেন খুদকুঁড়ো যোগান দেওয়া বাপ বলছেন, খেয়ে উঠেই বাপের বদনাম গাইতে বসেছ, এটুকু জোটাতে যে কত কাঠখড় পোড়াতে হয় তা যদি জানতে। যেন কমল মিত্র সেই স্বকীয় ভঙ্গিতে উত্তমকুমারকে ধমকে বলে উঠছেন, এই লোহালক্কড়ের কারবারির শেল্টার ছেড়ে নিজে দু’পয়সা রোজগার করে বড়বড় কথা বললে ভালো হয় না কী! (যা কড়া ধমক! একটু এদিক ওদিক হয়ে গেল বোধহয় ভয়ের চোটে)।
প্রশ্ন তো এইখানেই। নিজে কী করি বা করেছি? যতবার বর্ষায় জল ভাঙতে ভাঙ্গতে প্রশাসনের মুণ্ডপাত করেছি, রাস্তায় পলিথিন ফেলার সময় সে কথা মনে রেখেছি কি? সমাজের মঙ্গলে না লাগিয়ে পুজো উদ্যোক্তারা টাকা খরচ করে বলে নিজেরা পুজো সেলফি থেকে বিরত থেকেছি কি? নাকি কর্পোরেট স্পন্সরড পিঠেপুলি উৎসবে গিয়ে সপসপ দুটো পাটিসাপটা সাঁটাইনি। সবই করেছি।
বাংলা ছবি যে সাকুল্যে এক চুলও এগোচ্ছে না, কোত্থাও কিস্যু হচ্ছে না-এ প্রসঙ্গ যাঁরা আনছেন, তাঁরা প্রকারান্তরে স্বীকারও করছেন, রিমেক ছবির রমরমা কমেছে। সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কয়েকটি বড় বাজেটের রিমেক ছবি ধাক্কা খেয়েছে। তাই একদম হচ্ছে না বলাটা বোধহয় সমীচিন নয়। এদিকে যা হচ্ছে, তা যে মানের নিরিখে আহামরি তেমনটা না হলেও, এটাও কি আশা করা যায় অসুখ থেকে উঠেই রুগী একেবারে ঝকঝকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে উঠবে। হৃত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে সময় তো লাগবে, তা যদি একটু প্রলম্বিত হয় তবে অপেক্ষা করাই শ্রেয়।
কিন্তু এর মধ্যে মিডিয়া কী ভূমিকা পালন করবে? মিডিয়া অমুককে মাথায় করে রেখেছে বলে যারা দোষ দিচ্ছেন, তাদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, তবে বাংলা কাগজের বিনোদনের পাতা, বাংলা ছবির খবরাখবর মুলতুবি করে রেখে স্রেফ হলিউড চর্চা করবে। অথবা খবরের ধর্ম অস্বীকার করে শুধু ইতিহাস রচনা করবে? তাই বলে মিডিয়া ধোয়া তুলসীপাতা এরকম কথা বলছি না। কিন্তু একটি বা দুটির নমুনা ধরে সামগ্রিক মিডিয়াকে দোষ দেওয়াই বা কতটা কাজের? রিমেক ছবিগুলো নিয়ে মিডিয়ার প্রচারের কথা সবাই বলে চলেছেন, কিন্তু রিভিউয়ের ক্ষেত্রে অনেকেই যে সৎ থেকেছেন, সেটা কেন উল্লেখ করছেন না? ফিলহাল বাংলা ছবি, আমার মতে, অন্তত দুটো জিনিস আসতে আসতে কাটিয়ে উঠছে। এক, এই রিমেক প্রবণতা। দুই, স্টার নির্ভরতা। নক্ষত্র ছেড়ে মৌলিক বিষয়ে টান অনেক বেশি । অনেকেই বলবেন, যে বাংলায় সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক আছেন, তার পরে আবার মৌলিক মৌলিক করে এত কাঁদুনি গাওয়া কীসের? তাহলে তো বলতে হয় যে বাংলায় রবীন্দ্রনাথ থেকে বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর হয়ে সুনীল-শীর্ষেন্দু আছেন, সেখানে আবার লেখালিখি করার কি মানে হয়! তর্ক বিতর্ক নয়, যদি মাঝখানের খরা কাটিয়ে বাংলা ছবি একটু হলেও ভালোর দিকে যাওয়া শুরু করে থাকে, তবে তার পিছনে মিডিয়ারও অবদান আছে। এডিটোরিয়াল পলিসি, আর বিজ্ঞাপন নির্ভরতার ফাঁদে পড়ে মাঝেমধ্যে বগাকে কাঁদতেই হয়। কিন্তু সেটাই সব নয়। হঠাৎ একটি দুর্দান্ত ছবি এসে যদি বাংলা ছবিকে পুরনো আসন ফিরিয়ে দেয়, তখন হয়তো কেউ মনেই রাখবেন না, এই মাঝের পর্বের বহু মিডিয়া কর্মীই আসলে ওই দিনটিই দেখতে চেয়েছিলেন। কিস্যু হয়নি বলে ফেসবুকের দেওয়ালে যা নস্যাৎ করে দেওয়া যায়, এবং বন্ধু দর্শক মহলে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে সিনেমার ব্যবসার বারোটা বাজিয়ে দেওয়া যায়, সেই কর্মীরা কিন্তু তা করেননি। পরিচালকরাও নিশ্চয়ই মানবেন, এই তিন স্টার-দুই স্টারের অছিলায় আসলে এঁরাই একটা রুচি তৈরি করতে চাইছেন, যা হয়তো ভবিষ্যতে একটা এক্সপেরিমেন্ট ছবিকে দাঁড় করিয়ে দেবে। জ্বর কাটার পর মুখটা যে কীরকম একটা তেতো তেতো থাকে সে তো নিশ্চয়ই তাঁরাও জানেন।
ভারতে, বিশেষত বাংলায় ছবি তৈরির ক্ষেত্রে শ্রী ঋত্বিককুমার ঘটক অনেকগুলো পাঁচিলের কথা বলেছিলেন, সকলেই জানেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল দর্শক। যে কোন সিনেমাই মার খেতে পারে দর্শকের বোধের কাছে। যে কোনও ছবিই উত্তীর্ণ হতে পারে। ‘পথের পাঁচালি’র পর কেন ‘অপরাজিত’কে গ্রহণ করল না মানুষ, সে নিয়ে তাঁর আফশোস ছিল। আজ এই পর্বে দাঁড়িয়ে, মনে হয় না কি, এই পাঁচিলটাই সবার আগে সরানো উচিত? অহেতুক গালাগালি আর গলাগলির মধ্যে না গিয়ে, যদি বোধে আর একটু শান পড়ে বাংলা ছবির জন্য সেটাই কি সবচে ভালো হয় না?
আমরা তো জানি, যিনি নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় শোনেন, মিকা নিয়ে তাঁর মাথাব্যাথা হওয়ার কথা নয়। এতেই তো ল্যাটা চুকে যায়। মিডিয়াকর্মীরাও অন্তত শাঁখের করাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন। গলাগলি করে থাকতে গিয়ে গালাগালির দরকার কি?

সরোজ দরবার

সরোজ দরবার


কথা ছিল আদরে বাঁদর হবার, হয়ে গেল ব্লগ লেখক। কিন্তু বাঁদরামি কমল কই? ভাগ্যিস বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা প্রবাদটি সত্যি। সেই জোরেই আদরে এবার তিতা পানের খয়ের। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উঠোনে হোঁচট খেয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে অবশেষে পেশায় সাংবাদিক। বেশিক্যালি না ঘরকা না ঘাটকা। জন্ম-হাওড়ায়। চরে বেড়ায়-কলকাতায়। না ভুলতে পেরেছে গ্রাম, না হয়েছে খাঁটি কোলকাতান। ফাঁটা বাঁশে আটকে ত্রাহি ত্রাহি রব। পেশা আর নেশাতেও একই সংকট। একদিকে তিতা হজম, অন্যদিকে তিতা উগরানো। সকলেই কলম ধরেন, কেউ কেউ কী-বোর্ড। অন্য কোনও ইজমে থাকার মতো মস্তিষ্ক নেই, কোনও বাদি নয় তাই, বিশুদ্ধ কী-বোর্ডি। এই করেই ধর্মে-জিরাফে-পদ্যে-গদ্ যে-গল্পে-আলাপে-প্রলাপে সর্বত্র গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। পানপাত্রে হাত দেওয়ার রেস্ত নেই, তাই পান পত্র নিয়েই হেস্ত নেস্তর আশায়। কী করতে চায়, ঈশ্বর খবরও রাখেন না। চোখে দৃষ্টি কম, গায়ে গত্তি নেই, ঘরে রোদ নেই, মিঠা পানকে খয়ের বেশি দিয়ে তিতো করে ফেলা ছাড়া আর কোন মুরোদ নেই। নেহাত বাঁদর-মুক্তো মালা প্রবাদটি ছিল বলেই, এ যাত্রায়...

আপনার মতামত জানান