নিবেদন

বিশ্বজিৎ রায়

 

যৌনতার ঘর ও বাহির যাঁরা পড়ছেন তাঁদের কাছে কয়েকটি কথা নিবেদন করছি । মূল লেখার সঙ্গে এই নিবেদনের যোগ নেই, আবার আছেও হয়তো ।
কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন ফেরার পথে তারা ওঠে, মাঝে মাঝেই । পাথরে পাথর ঠুকে গান গায় । ময়লা জামা । চুল ধুলোমাখা । জট পড়া । তাদের দলে বাচ্চা মেয়ে আছে , ছেলেও । তাদের গলা যে খুব সুমধুর তা নয় ।
টিভিতে ইদানীং বাচ্চাদের দিয়ে নাচ- গান- কৌতুক মুখরিত নানা অনুষ্ঠান হয় । সেই সব অনুষ্ঠানে মধ্যবিত্ত -উচ্চমধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে -মেয়েরা তাদের স্মার্টনেস দেখানোর জন্য কচিগলায় ‘বড়োদের’ প্রেমের গান গায়, তাদেরকে গাওয়ানো হয় । সেই গানে মাঝে মাঝেই সুড়সুড়িপ্রদায়ী যৌনতা থাকে । তাতে অ্যাঙ্কার ও সমবেত দর্শকেরা আমোদও পান । বাচ্চা-ছেলেমেয়ের শরীর অনেকসময় যৌনাবেগের প্রকাশকও হয়ে ওঠে – সেই ছেলে বা মেয়েটি যে বুঝে সেই সব অনুকরণ করে তা নয় । আধও বোঝা, না বোঝা । লোভ তার বাহবা পাওয়ার । বিশেষ পরিস্থিতির শিকার তারা ।
ট্রেনের ‘তাদের’ অবশ্য এই আলো ও আমোদ জোটে না । ট্রেনের তারা উপার্জনের জন্য পাথরে পাথর ঠুকে গান গায় । তাদের ধুলোমাখা শরীর ও জট পড়া চুলে ‘টুনির মা’ বা ‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট লাভ’এর গান যখন ঠিকরে ওঠে তখন সেই অসামঞ্জস্য দেখে ট্রেনের বাবুরা কৌতুক বোধ করেন । দু-পাঁচটাকা দেন । কোনও কোনও সচেতন বাবু আবার বলেন খাবি, নেশা করিস না । জানেন তাঁরা এদের মধ্যে আঠার, ডেনরাইটের নেশার চল আছে । আর ওই ছেলে-মেয়েরা জানে আধো জানা-অজানায় টুনির মা বা হান্ড্রেড-পার্সেন্ট লাভের আলতো যৌন সুড়সুড়িওয়ালা গান করে কারণ এই সব গানের বিক্রি ভালো । দু-টাকা, পাঁচ টাকা , কোনও দিন দশ টাকাও । খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান এইসব মৌলিক অধিকার নেই, নিরুপায় যৌনতা বিক্রি আছে ।
এক সন্ধেবেলা রাসবিহারীতে দেখেছিলাম সেই দৃশ্য । সিম্ফনির ফুটে যেখানে পেয়ারা বিক্রি হয় সেখানে একটি আট নয় বছরের বাচ্চা রাস্তায় উপুড় হয়ে শুয়ে তার যৌনাঙ্গ মাটিতে ঘষছিল । তা রোমাঞ্চিত এবং যান্ত্রিকভাবে দীর্ঘতা প্রাপ্ত হচ্ছিল । পেয়ারা বিক্রেতা ও অপরাপর দরিদ্র মানুষেরা সেই খেলা উল্লাস ভরে বিনোদন হিসেবে দেখছিলেন । ওই কিশোরের যৌনাঙ্গ যে পরে ব্যথায়-যন্ত্রণায় কাতর হতে পারে সে সবের বোধ নেই তার – অভ্যেস, নেশা, বাহবা সব মিলিয়ে সে দৃশ্য । বাইরে যিনি দেখছেন তাঁর কাছে যে কী বেদনাময় !
আসলে যৌনমুক্তি, যৌনস্বাধীনতা এই শব্দগুলো খুব সহজ নয় ।
যৌনতার সঙ্গে অর্থনীতির যোগ নানারকম । আর যৌনতা, অনেক সময়েই কোনও একটা কিছুর বিকল্প প্রকাশ । কেউ কারও ওপরে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে – যৌনভাবে তাকে দখল করা যাক । যুদ্ধ, দেশভাগ, দাঙ্গার সময় মেয়েরা ধর্ষিতা হন এই বোধ থেকে । আবার ‘ম্যারিটাল রেপ’ সেও তো আছে । রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ উপন্যাসে ব্যবসায়ী মধুসূদন পড়তি জমিদার বংশের মেয়ে কুমুকে বিয়ে করে তো নিজের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান । বিবাহিত স্বামী মধুসূদনের ধর্ষণের শিকার কুমু । জগদীশ গুপ্তের ‘চন্দ্র-সূর্য যতদিন গল্পে ‘ম্যারিটাল রেপ’ আরও তীব্র বেদনাদায়ক চেহারা নিয়েছে । ধর্ষিতা প্রথমা স্ত্রী উলঙ্গিনী উন্মাদিনী হয়ে বাড়ি থেকে চলে গেছেন – পরদিন সকালে । যৌনবাসনার সঙ্গে অমানবিক অপরাধের মিশেল শুধু পুরুষদের পক্ষ থেকেই ঘটে , মেয়েদের দিক থেকে নয় এমন বলা যাবে না । ধর্মমঙ্গল কাব্যের সেই মেয়েটি, সুপুরুষ নায়কের কাছে যাবার বাসনায় যে নিজের সন্তানকে কুয়োয় ফেলে দিল, তাকে কী বলব আমরা !
কাজেই যৌনতার ঘর-বাহির নিয়ে কথা বলার সময় একদিকে যেমন যৌনস্বাধীনতা ও মুক্তির প্রসঙ্গ আসবে তেমনই ভাবতে হইবে এইসব কথাগুলোও ।
আমরা যৌনমুক্তি ও স্বাধীনতার নামে অনেকসময় মাত্রাবোধ হারিয়ে ফেলি । যৌনতার এক পক্ষে মুক্তির প্রসঙ্গ, অন্যপক্ষে কত যে অমানবিক বিচিত্র অত্যাচার । শিশু, কিশোর আর নারীরা এই অত্যাচারের শিকার হন বেশি । এই অত্যাচারকে ‘অনাচার’ বললে কী ভুল হবে ?
এ সপ্তাহে এটুকুই । ‘যৌনতার ঘর ও বাহির’ আসলে যৌনতা কীভাবে ক্ষমতার প্রকাশক হয়ে ওঠে সে বিষয়ে কিছু ভাবনা চিন্তা । এই ক্ষমতার ছাঁচ কীভাবে ভাঙা যায় আসবে সে কথাও ।
কথাগুলো নানা কারণে মূল লেখা থামিয়ে ধরিয়ে দিতে হল ।
পরের সপ্তাহে আবার মূল লেখা ।

বিশ্বজিৎ রায়

বিশ্বজিৎ রায়


বিশ্বজিৎ রায় বিশ্বভারতীতে বাংলা পড়ান । বাংলা পড়েন । বাংলায় লেখেন । পড়ার বিষয়ে সর্বগ্রাসী । ওই যে শাস্ত্রে বলে না পাঠকের মন হবে গণিকার মতো । যখন যেটা পড়বে তাতেই তার মতো করে রাঙা হবে মন । এও তেমন । তার মানে বিশ্বজিৎ রায় পল্লবগ্রাহী ।অন্য পরিচয় ঠোঙাশিল্পী । মানে কাগজে নিয়মিত লেখেন -- খবরের কাগজ থেকে ঠোঙা হয় । কয়েকটা অখাদ্য বইও লিখেছেন ।

আপনার মতামত জানান