আলো আমার

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

মাঝে মাঝে মনে হয় আলো আর অন্ধকার নিয়ে কিছু লিখব। কিন্তু এতো যে আলো আর এতো যে অন্ধকার পড়ে আছে, কোন আলো নিয়ে লিখব আর কোনটাকেই বা বাদ দেব? যেমন ধরো, রোদ্দুর বলতেই মনে পড়ে ক্লাস ফাইভের একছাদ ভর্তি শীতের ছুটির কথা। হ্যাঁ, বাংলা স্কুলের আমরা ক্রিস্টমাসের ছুটিকে শীতের ছুটি বলে ডাকতাম। সেই শীতের ছুটির দুপুরে মা ছাদে বসে লাল উল দিয়ে মাফলার বানাত, পাশেই বোনের অঙ্ক খাতা খোলা। আসলে কিন্তু অঙ্ক করছে না ও, হিজিবিজি কীসব তিন মুন্ডুওলা রাক্ষসের ছবি আঁকছে। আর আমাদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া নীল আকাশে তখন দূঊঊরে একদম ছোট্ট হয়ে যাওয়া একটা সাদা ঘুড়ি। এই যে ছবিটা দেখলে এতক্ষণ, এই পুরো ছবিটার উপরে রোদ্দুরে ডুবিয়ে দুবার ফ্ল্যাট ব্রাশ চালিয়ে দাও- যেমন দেখতে লাগবে, ঠিক তেমনই ছিল ওই রোদ্দুরের দুপুরগুলো। কিন্তু এই ছবিতে আমি নেই। থাকব কীকরে? আমি তো তখন দু-দু’টো রোদ্দুরের ছবি দেখছি। একটা হল এইটা-যেটা বললাম, আর অন্যটা হল যেদিক থেকে ঘুড়ি উড়ে আসছে সেইদিকের নারকেল গাছের সবুজ পাতার নীচে লুকিয়ে থাকা লালচে পাতাগুলোর উপরে ঝিরিঝিরি রোদ্দুরের খেলা। ওই লাল লাল রোদ্দুরের নারকেল গাছটার ওইদিকে পূর্বাণীদের বাড়ি। কোথায় বাড়ি তা জানিনা...কিন্তু আমি দেখেছি ও স্কুল ছুটির পরে ওইদিকেই চলে যায় রোজ।

রোদ আর রোদ্দুরে কিন্তু তফাৎ আছে। রোদ্দুর বড় আদুরে আর রোদ খুব রুক্ষ। গরমকালের দিনেরবেলাকে রোদ বলে আর শীতকালেরটাকে রোদ্দুর। তাই বলে কী রোদে আলো কম? উঁহুঁ, রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে একবার চোখ বুজে রাখো, যত গরমই হোক একটুপর দেখবে নেশা হচ্ছে কেমন...চোখের মধ্যে কেমন একটা লাল লাল আলো...ঘুম পেয়ে যায় কেমন যেন!
আলোর কথা ভাবলেই দেবারতির ঘরের কথা মনে পড়ে। ওর ঘরে যখনই আসোনা কেন বাঁদিকের জানলাটা চোখে পড়বেই। সেই জানলা দিয়ে সকালের রোদ্দুর সাতটুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মাখনরঙের দেওয়ালে। তিন কাপ চা বানিয়ে এনেছে দেবারতি। চায়ের কাপের অল্প অল্প ধোঁয়ায় মিশে যাচ্ছে রশিদ খানের গলায় “রাখো রাখো হে...”। একটু পরেই শুভদীপ পড়ে শোনাবে “সুর তো ফকির/চলে ধুলোপায়ে গ্রাম থেকে গ্রামে...”। আলো হয়ে যাচ্ছে ঘরে। রোদ্দুরে মিশে যাচ্ছে আলো।

জলে আলো মিশে যেতে দেখেছ কখনো? বৃষ্টির মধ্যে? আষাঢ়ের আকাশে আলো ধুয়ে যেতে দেখি আমি। ক্রীমসন রেড, ক্রোম ইয়েলো, ভারমিলিয়ন আর আইভরি ব্লু রঙে জলরঙের কাজ সারা আকাশ জুড়ে। সেই আকাশে আলো নিভে গেলেই কড়কড় মেঘ ডেকে ওঠে। মেঘ ডাকলেই বিদ্যুৎ আর ভয়। আকাশে তখন কাচের পেপার ওয়েটের মতো কুঁচি কুঁচি আলোর ঝলক, টুকরো রঙ আর উচ্ছ্বল ঝর্ণা। অন্য এক আলোর জন্ম হয় তখন। নতুন আলোর গল্প শুরু হয়। আমার আলোর গল্পটাও এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। আলো হারিয়ে গেলে আবার এই জলের গহীন থেকেই খুঁজে আনতে হবে।
অন্ধকারের গল্প? অন্যকোনো মেঘলা দিনে হবে।

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে
কিঙ্কিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কিণীর কবিতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলে।ব্লগার হিসেবে আদরের নৌকায় কিঙ্কিণীর যাত্রা শুরু হল আজ থেকে।পড়ুন এবং জানান কেমন লাগল কিঙ্কিণীর ব্লগ...


আপনার মতামত জানান