ধ্বনিল রে...

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

 

ভোর হয়ে আসছে। আকাশের গায়ে এখনও আলতার ছোপ লাগেনি। তবে চারিদিক ফাঁকা হয়ে এসেছে। বেশ কুয়াশা। শীতের প্রথম ইনিংসে ওপেনাররা দায়িত্ব নিয়েই খেলবে বলে মনে হচ্ছে। দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে উঠোন। ডান দিকে আম, কাঁঠাল, আর দেবদারু গাছের পল্টন। তাদের ওপারে রেললাইন চলে গেছে। একদিকে মেদিনীপুর স্টেশন আর অন্যদিকে কাঁসাই হল্ট। গায়ে শাল জড়িয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল কেউ। গাছতলায়। কুয়াশায় তাকে ভাল চেনা যায় না। চোখে কেমন একটা ঘুম ভাঙা বিস্ময়। একটা রহস্যময় সুর বাজছে সমগ্র চরাচর জুড়ে। যেভাবে শুধু মাত্র কানের উপর নির্ভর করে অনেকে রাগ চেনার চেষ্টা করে, ঠিক সেভাবে কান পেতে দিল সে আকাশের দিকে। গাছেরা তখন মাথা ঝাঁকাচ্ছে, আর বিন্দু বিন্দু শিশির ঝরে পড়ছে তার সারা শরীরে।
আস্তে আস্তে ঘুম ভাঙছে সকালের। আকাশ ঈষৎ লালচে। সুর ছড়িয়ে পড়ছে বাড়ির উঠোন থেকে হাঁটাপথে মোড়ের মাথা, সেখানে নিতাই দাদু-র চা দোকান অব্দি। মোটা আধ ময়লা সোয়েটার আর হনুমান টুপি পরা নিতাই দাদু কী শুনতে পাচ্ছে, সুর তাকে বলছে— “চা বসাও।” জিজ্ঞাসা করছে—“দিদার শরীর এখন কেমন?” সুর বাজছে, বেজে চলেছে একটানা। তুমি শুনতে পাচ্ছ, মা? সুর আস্তে আস্তে ধরা দিচ্ছে, চেনা যাচ্ছে তাকে। ও তো সেই পাগলী বুড়িটা, ফ্লাই ওভারের নিচে শোয়। নিজের মনে বিড়বিড় ক’রে কী সব যেন বলে। বোধহয় ওর ফেলে আসা দেশের কথা। একফালি রোদ্দুরের গায়ে আলগা লেগে থাকা শীতের গন্ধমাখা দীঘি, আর তার মাঝে ফুটে থাকা তার শালুক ফুলের দেশ, পলাশ পাতার দেশ। ওই তো তার গ্রাম। মাটির দু’তলা বাড়ি। বাড়ির পেছন দিয়ে বয়ে যাচ্ছেন জলদেবী। কিছুদূরে মন্দিরতলা। প্রতি বিকেলে সেখানে ধুলো ওড়ে, আবার ধুলো শান্ত হয়ে আসে সন্ধ্যারতিগানে। উনুনে পুড়ে যায় কাঠের বিষাদ। সাতটি ভাই-বোনের রূপকথা ভেসে যায় রাতের বাতাসে...
এই গ্রাম, মাটি, জল, রূপকথা— সবই গান। সবুজ শস্যের উপর যে বাতাস সুসংবাদ বয়ে আনে তাও তো গান। ওই যে দুটি শালিক ঠোঁটে ঠোঁট, গান ভ’রে দিচ্ছে হৃদয়ে, তাদের একটি কোমল ধৈবত আর একটি নিখাদ। গাছেরা তাদের অতীতের কথার খেলাপ, পরকীয়া, ভুল খসিয়ে ফেলছে শীতে, তার সাথে খসে পড়ছে এক কিশোরীর কত যে সকালবেলার রেওয়াজ, তান, সরগম। টিউশানি পড়ে ফেরার পথে সরু অন্ধকার গলিতে যে প্রেম মুখ লুকায় তা মন্দ্র সপ্তকে বাঁধা। বাড়ি ফিরে রাতে ভূগোল বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে পড়া চিঠি তবে কৌশিকধ্বনি।
যে কথা বলতে গিয়ে এত কথা, তা হ’ল ঐ ছেলেটি, চিনতে পারছে সুরের চলন। সুর তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, ছেলেটি পিছুটানহীন চলে যাচ্ছে তার পিছু পিছু। কোথায়, কতদুরে, কোন দিগন্তের কোনও পথভোলা কিশোরীর কাছে আলোকনির্মিত গানের স্কুলে সে শিখতে যাচ্ছে কীভাবে সুর হাসায়, কাঁদায়, ক্ষমা করে, ভালবাসে। আজ, ছেলেটির এই অনায়াসে চলে যাওয়ার নাম হোক ভৈরবী।

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী


নাম- শুভদীপ দত্ত চৌধুরী
ধাম- পশ্চিম মেদিনীপুর
জন্ম- ০৯/০৬/১৯৮৯ (জন্মেই নয় ছয়!)
মৃত্যু- মতান্তর বিস্তর।
শখ- গান শোনা, ঘুরে বেড়ানো, চিঠি লেখা, ক্রিকেট, আড্ডা, প্রেম…
শিক্ষা- ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. । এছাড়াও স্প্যানিশ সাহিত্য, ফরাসী সাহিত্য, জাপানী সাহিত্য, পর্তুগীজ সাহিত্য, ব্রাজিলিয়ান সাহিত্য (সদ্য বিশ্বকাপ ফুটবল হল বলে কথা!) সম্পর্কে অগাধ অজ্ঞতা।
কবিতা লেখা শুরু- প্রেমে ল্যাং খেয়ে ২০০৬ সালে। সে সব ডায়েরি-বন্দী মনখারাপ। কলেজ ম্যাগাজিনের পর প্রথম লেখা পাঠানো একসাথে “উনিশ কুড়ি” ও “দেশ”-এ ২০১১ সালে। কবিতাগুলি ওই বছরেই প্রকাশিত। এরপর বহু বড়, মেজো, সেজো, ফুল, রাঙা, ও ন’ ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশিত।

কবিতার বই- “ব্যথার বন্দিশ”(২০১৪), প্রকাশক- যাপনচিত্র
না, এই বইয়ের সাথে কোন স্ক্র্যাচ কুপন ফ্রী নেই। ফলে নেই অল্টো গাড়ি জেতার সুযোগ। তবে আছে সময় নষ্ট করার জন্য ২৭টি কবিতা।

ধর্ম- রবীন্দ্রনাথ, বর্ণ- মোটামুটি ফর্সা।
রূপ- আহা! রস- ডাহা!
শব্দ- দিস্তে দিস্তে।
গন্ধ- ডিওডেরান্টের উপর নির্ভর করে!
স্পর্শ- হাই-ভল্টেজ স্পার্ক!


আপনার মতামত জানান