স্মৃতির গাছপালা

রঙ্গীত মিত্র

 

কিছুদিন ধরে খেয়াল করছি যে আমি বেশ ভাল রকমের ভুল করে ফেলেছি।ভুল করে ফেলেছি,কিছু অবাক মানুষকে বিশ্বাস করে।আসলে হয়তো মানুষ চিনতে পারি না।কিম্বা সবার প্রতি আমার খুব মায়া।দরদ। সত্যি কি তাই? না কি এর পিছনে কোনও স্বার্থ আছে,আমার? কিন্তু কেন জানি না,সবার উপকার করতে আমার খুব ভাল লাগে।এমন কি যে আমার ক্ষতি চায় তারও।আমি জীবনে কখনো রিভেঞ্জ নেবার কথা ভাবিনি।বরং ভিতরের কষ্টটাকে আরও বাড়িয়ে বলেছি,না না সব ঠিক হয়ে যাবে। এবং আমার তো কোনও তাড়াহুড়ো নেই। ঝট করে সেলিব্রিটি হবার থেকে...অনেকে বেশি ভালো কাজ,সৃষ্টিশীল কাজ করাই আমার স্বপ্ন। যখন স্কুলে পড়তাম। আমার বন্ধুরা আমার থেকে অনেক বেশি স্মার্ট ছিল। সুপ্রতীক যেমন ভাল ক্রিকেট খেলত,তেমনি মল্লার গিটার বাজাতো। সবার একটা মূল লক্ষ্য ছিল কি করে (একাধিক) ভালো বান্ধবী পাওয়া যায়।আমি সেসব বুঝতাম না বলেই কখনো কখনো তাদের পিয়নের কাজ করেছি। ভালবেসে কারুর জন্যে কিছু করতে গিয়ে,বুঝেছি যে যাদের জন্যে আমি এতো কিছু করেছি,তারা তার অযোগ্য।

খেয়াল করছি,মানুষের ভিতরের জগতটা ক্রমশও শেষ হয়ে যাচ্ছে। সবাই যেন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে,ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার দৌড়ে।কেউ যেন কারুর ভালো চায়না।নিজেই সব কিছু পেতে চায়।এই ক্ষমতার উপর তাদের অধিকার বোধ নিম্নমধ্য-মেধাদেরও প্রতিভাবান বানিয়ে দিয়েছে। চারপাশের এই নিম্নমধ্য- মেধা- মুখোশ- রঞ্জিত- হৃদয়হীন- অনুকরণপ্রিয় মানুষের ভিড়। তাদের সবই আছে।কিন্তু প্রাণহীন। প্রাণহীনতাই তাদের শেষ করে দিচ্ছে। তারা যে সেটাই বুঝছে না।

ঘূর্ণিঝড় সেদিন ওড়িষ্যা- অন্ধ্র- উপকুলে আক্রমণ করলো। আমার বন্ধু সূরিয়াকান্তকে আমি ফোন করি।তখন সে কটকে। ও আমাকে জানায় “ বন্ধু,কোনও ভয় নেই।আমরা সবাই একসাথে আছি।এক সাথে থাকলে,যেকোনো শত্রুর মোকাবিলা করা যায়।আর আমরা আগের সুপার সাইক্লোনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছি...আমাদের কিছু হবে না।চিন্তা করোনা।পুজোটা এনজয় করো।”

পুজোয় অনেক মজা করলাম। আমাজন নদীর মতো জনস্রোত দেখলাম। সৃষ্টিসুখের চরম-মাত্রা অবধি হেঁটে যেতে দেখলাম আমার শহরকে। চারদিকে আলো আর সেলেব্রিটির ভিড়। এ যেন বিশাল ব্রিগেড সমাবেশ।এ যেন উচ্ছ্বাস নিয়ন্ত্রণ-সীমা অতিক্রম করে ,বেশি নেশা করে বমি করে ফেলেছে।মানুষ এবং মানুষের ভিড়ে আটকে গিয়ে,আমিও ঠিকরে ঠিকরে পড়ছিলাম।শহরের ক্রিয়েটিভ স্পিরিট এবং বাজারের আকর্ষণ... দুইয়ের লড়াই... প্রফিটমার্জিন নিয়ে জেগে থাকা ব্র্যান্ড নেম... রাতকে জনবহুল করে দিয়েছিলো। সাহসী করে দিয়েছিলো। সকালে বেরিয়ে দেখতাম,রাস্তা প্রায় ফাঁকা...মদ খাওয়ার পর ফাঁকা মদের বোতলের মতো তার অবস্থা।

আমি,নিজে অনিশ্চয়তায় ভুগি। ভাবি যে বদলে যাবো। আমার বন্ধুদের মতো । জানেন তো আমাদের এই সময়ের একটা দারুণ অ্যাডভান্টেজ হল,সব ইজিলি অ্যাভেলেবেল। উন্মুক্ত। সেক্স... ওয়াইন... সিগারেট... এনি থিং। আপনার যা ভালো লাগে আপনি তাই করতে পারেন। এখন মেয়েরাও খুব ভালো ভালো চাকরি করছেন। সুতরাং তারা পুরুষ নির্ভর নন। মির্চ মসলার বারে,একটি মেয়েকে দেখছিলাম দু-বোতল বিয়ার...তার পর আরও কিসব খাচ্ছিল।কিছুক্ষণ বাদে তার বন্ধুরাও চলে এলো।কি সব আড্ডার টপিক।আচ্ছা,আড্ডারও কি সেক্স আছে? বিভাজন আছে না কি? আমি তো মনে করে সব কিছুই সবার জন্যে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দিলেই তার মৌলিকতা শেষ হয়ে যাবে। যদিও এখনো সমাজ মনে করে,মেয়েরা খালি গসিপ করে। মেয়েরা খুব একটা বুদ্ধিমান নয়। কোনও মহিলা যদি কিছু অ্যাচিভ করেন,তখন-ই সমাজ তার খুঁত খুঁজতে আরম্ভ করে।আসলে আমাদের এই সমাজে পুরুষের জন্যে এক রকম আইন মহিলাদের জন্যে আর একরকম।একটি মহিলাকে কাজ করতে গেলে অনেক বেশি লড়াই করতে হয়ে।আমরা এমন ভাবে নিজেদের তৈরি করেছি,যাতে একজন মহিলা কেবল তার স্বামী বা পুরুষের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারেন। বেশি হলে পার্টিতে ভদকা খেতে পারেন...দামি সিগারেট...কিম্বা দামি কোনও পোশাক।কিন্তু তাকে সেই উক্ত পুরুষের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। এইরকম মানুষিক গঠনের বিরুদ্ধে লড়াই করে অনেককে দেখি তাঁদের নিজেদের সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করছেন।কেউ কেউ আমাদের বন্ধু...বা আত্মীয় অথবা প্রতিযোগী।আমিই তো অনেক মেয়ের কাছে হেরে গেছি। এখানে বলে রাখা ভালো আমার বেস্ট-ফ্রেন্ড একজন মেয়ে।আমি নিজে মনে করি যে এইভাবে জেন্ডার অনুযায়ী পার্থক্য করাটা সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। কিন্তু আমাদের সমাজ এখনো সেইরকম ভাবে সুশিক্ষিত নয়।যদিও আমাদের আদিজীবনচর্চা অনেক লিবারল ছিলও।ওপেনসোসাইটি থেকে অনেক আধুনিক গুণ ছিলও। তারপর মিশ্রণ।বিভিন্ন রক্তের মিশ্রণে আমরা অনেক বদলে গেছি।বিভাজনের বিক্ষোভ আর মাল্টিন্যাশালিজমের ক্যাডারপণাই এম ইন লাইফ হয়ে গেছে। কি করে যেন এন্টারপ্রেনার থেকে ম্যানেজার হয়ে গেছি। মিডিল ম্যানের কাজ করা...এবং নিজেকে যতটা পারা যায় লুকিয়ে রাখা।আমার দিদিকে স্মোক করতে দেখেছি,লুকিয়ে।খুব সাবধানে।গোপনে। ও খুব নিরাপত্তা-হীনতায় ভুগতও।সব সময় ভয় পেতো,বড়রা যদি জেনে যায়? এইভাবেই আমার প্রথম পর্ণগ্রাফি দেখা। আমার পক্ষে নিয়ম ভাঙা যতটা সোজা...একটি মেয়ের পক্ষে অনেকটাই কঠিন। এখন ভাবার সময় এসেছে...কারণ আমাদের ভিতর হঠাত করে পরিবর্তন এসেছে।আমরা খুব দ্রুত জায়গা পরিবর্তন করছি। আমার প্রজন্মের অনেকেই তো কনফিউজড।তারা শুধু মিডিয়াহাইপকেই ফলো করে যাচ্ছে। নিজের ভিতরের ভাবনা নেই।অন্যের দেখানো পথকে অনুসরণ করছে।তাই একদিকে যেমন সব ওপেন হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ওরিজিনালটিও নষ্ট হচ্ছে।

টোকিওতে আবার ঝড়

ছড়িয়ে দেবে তেজস্ক্রিয়তা।

ক্ষমতার পায়ের নিচে, তাই

গড়াগড়ি খেলছে পুরস্কার।

আর আমি তোমাকে ভালোবেসে

বিছানায় বালিশের সাথে খেলেছি ।

শুধু তোমার লাল জামার ফাঁক দিয়ে

বেরিয়ে আসা স্তন ;

জিনসের কোমর থেকে ঝুলে পড়াঃ ইকুই-ল্যাটারাল ট্র্যাঙ্গেল,



আমাকে,তুমি বিছানা-প্রবাহে ভাসিয়ে দিয়ে

হাওড়া-ব্রিজের মত জেগে থাকো।

রঙ্গীত মিত্র

রঙ্গীত মিত্র


কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রঙ্গীত মিত্র আধুনিক কলকাতার কবি। আর তাকে কে না চেনে?
যারা চেনেন না তাদের জানাই রঙ্গিত কে না চিনলে জীবন বৃথা...


আপনার মতামত জানান