১-এর দিন, ১-এর রাত...

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 

টিলা ভেঙে ভেঙে নির্মিত শহরের ভেতর এখনও কোথাও কোথাও পাথুরে টিলা আর পুরনো গাছ টিকে আছে।
এমনই এক ঘেরা সবুজের নাম বিউগ্‌ল (Bugle) রক পার্ক। সেখানে একটা বড় টিলা, আরা মাঝারি ও ছোট মাপের আরও কিছু টিলা এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকে, বড় বড় সবুজ গাছ, ইউক্যালিপ্‌টাসের গন্ধ... আর রাস্তার ট্রাফিকের আওয়াজ ছাপিয়ে পাখি, ফলাহারী বাদুর আর হনুমানদের কিচ্‌কিচ্‌। সেখানে উঁচু একটা টিলার ওপরে বসে থাকার মত একটা চৌকো পাথর আছে। দেখেই বোঝা যায়, হয় টিলার পাথর কেটে বানানো, অথবা তুলে এনে ওখানে রাখা হয়েছে। ওই চৌকো পাথরটার ওপর কেউ খুব একটা বসে না। যারা ওই পার্কে যায়, বেশিরভাগই আড়াল খোঁজে ছোট ছোট টিলা-পাথরের অন্তরালে... লোকচক্ষু থেকে দূরে। যারা পরিবার পরিজন নিয়ে যায়, তারা কেউ সেই সব পাথরের আড়ালে কি আছে খোঁজার চেষ্টা করে না। একটু সচেতন থাকে, যাতে পরিবারের ছোট সদস্যরা লুকোচুরি খেলতে গিয়ে সেই সব পাথরের দিকে না ছুটে যায়। তবে, ওই বড় টিলার ওপরে, পার্কের অনেকটা ওপরে... পা ছড়িয়ে বসে থাকতে বেশ লাগে শীতেরর দুপুরে কিংবা বিকেলে... এমন কি ঝিড়ঝিড় করে বৃষ্টি পড়লেও।

টিলার ওপরে, ওই বেমানান চৌকো পাথরটার ওপর বসে থাকি... যখন যাই। আজও ছিলাম কিছুক্ষণ। তারপর একসময় উঠে পড়লাম, একটু দূরে এসে টিলার ওপর থেকে নিচের বাগানটা কেমন লাগে দেখছিলাম... হয়ত ছবি তুলতে চেয়েছিলাম। পারলাম না, কারণ ওই পাথরের আড়ালগুলো বড় বেশি স্পষ্ট এই ওপর থেকে। মনে হ'লে এখানে দাঁড়িয়েও অহেতুক বিব্রত করছি হয়ত কাউকে। ফিরে তাকালাম ফেলে আসা চৌকো পাথরটার দিকে। সেটা খালিই পড়েছিল। হঠাৎ একটা কাক উড়ে এসে বসল। বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। মনে হ'ল, সত্যিই তো... আমি আসার আগে কেউ বসে ছিলো... আমার পরে এই কাকটা উড়ে এসে বসল... ও চলে গেলে আবার অন্য কেউ। আমাকেও হয়ত কাকটা এই ভাবেই দেখছিল, যেভাবে আমি ওকে দেখছি এখন। সে এক সময় উড়ে গেলো, তবে আমি আর ফিরলাম না পাথরটার কাছে... সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম, পার্ক থেকে বেরিয়ে যাবো বলে। বিকেলও ফুরিয়ে আসছিলো... পাথরের আড়ালে আড়ালে।

বিউগ্‌ল রক পার্ক থেকে মিশন অবধি হাঁটা পথ, মাঝে একটা মস্ত এবং ব্যস্ত ট্রাফিক সিগন্যাল... পাঁচ মাথার মোড়ের মত। তবে এই পাঁচ মাথার মোড়ে নেতাজী নেই, স্বামীজী। দেখলাম, উলটোদিকের ট্রাফিকে একটু বেশি... আর বেশ একটা শোরগোলের মাঝে এক পাশের ট্রাফিক কে তিন চার জন লোক মাঝ রাস্তায় এসে আটকে রেখেছে। বাতাসে তখনও বারুদের গন্ধ... হালকা ধোঁয়া চারিদিকে। বেশ ভেরি-তুরি বাজিয়ে একটা দল সিগন্যালের এক পাশ থেকে একটা রাস্তা ধরে বুল টেম্পল-এর রাস্তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই দলে মহিলারা আছেন, শিশু-কিশোর আছে, সপরিবার ভক্তবৃন্দ রয়েছেন... এবং হলুদ-কমলা পোশাক পরা শিষ্যরা। প্রসেশনের মত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রসেশনের একদম শেষে রথের মত দেখতে একটা গাড়ি, তার সামনে সাতটা নকল ঘোড়া। রথে বসে আছেন দাঁড়ি-গোঁফওয়ালা এক বাবাজী... শান্ত-নির্লিপ্ত। স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে ব্যক্তির নামটা বুঝতে পারলাম না। প্রসেশনের মাঝে জয়ধ্বজের মত একটা বিশাল দণ্ড তুলে একজন নাচানাচি করে জয়ধ্বনি দিচ্ছিল, কী বলছে বুঝতে পারছিলাম না। আর তাকে ঘিরে খোলা তলোয়ার নিয়ে বহুরূপীর মত সেজে চারজনের নাচ চলছিল, ওই ভেরির তালে তালে। যে ফুটপাথে দাঁড়িয়েছিলাম, তার আশেপাশে আরও বেশ কিছু কৌতূহলী পথচারী জড় হয়ে গেছিল। আর সেই ফুটপাথেই বসেছিল একটা কুকুর। রাস্তার কুকুর, বাদামী রঙের... তবে গলায় বাকল্‌স পরানো। সেও বসে বসে ঐ প্রসেশনকে দেখছিল। কি খেয়াল হ'ল, ইচ্ছে করে একদম সেই কুকুরটার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম... যাতে তৃতীয় ব্যক্তির দেখে মনে হয় দু'জনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ওই 'মজা'-র ব্যাপারটা দেখছি। কুকুরটার চোখদু'টো দেখলে আশ্চর্য হ'তে হয়... পুরো মানুষের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলো সামনের দিকে। যেন মন দিয়ে দেখছিল সব কিছু। পাশে দাঁড়িয়ে আছি খেয়াল হ'তে একবার আমার দিকে মুখ তুলে তাকালো, আমি হাসলুম... ঠিক যেমন কারও চোখাচুখি হ'লে সৌজন্যবোধের হাসি হাসতে সেখানো হয় আমাদের। সে তার মুখ অল্প ফাঁক করে আর জিভটা সামন্য বের করে যে অভিব্যক্তিতে তাকালো, স্পষ্ট মনে হ'ল, বলছে - 'হে হে'।
প্রসেশন সিগন্যাল ছেড়ে এগিয়ে গেলো। নির্লিপ্ত দৃষ্টি নিয়ে, বাবাজী বসে রইলেন রথে। একটা রব উঠছিল মাঝে মাঝে 'মহারাজ কি... জয়'। কিন্তু কি মহারাজ বা কোন মহারাজ... তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলুম ন। নরেন দত্তর মূর্তির ওপারে তখনও বারুদের গন্ধ আর বিপর্যস্ত যানবাহনের লম্বা লাইন।

মিশনের ভেতর বিশেষ কিছু নজরে পড়ল না (ইতিমধ্যে বহুবার গেছি, নতুন কিছু আবিষ্কার করার জন্য অবশিষ্ট নেই)। যেমন হয়... দশ জনের মধ্যে আটজনই হাতে চটি নিয়ে জুতো রাখার জায়গার সামনে দাঁড়িয়ে কারও না কারও শ্বশুরবাড়ির গপ্পো করছিল। পরিচিত ভাষা তো, এসেই যায় কানে।
আর, একটি হিন্দিভাষী পরিবারের মেয়ে সিঁড়ির ধাপে ধাপে উঠতে উঠতে বলল, "প্যায়েরো তলে চিটি... হাওয়া মেঁ রজনীগন্ধা। স্টিল বেটার দ্যান - হাওয়া মেঁ চিটি... প্যায়েরো তলে রজনীগন্ধা" তারপর হা হা করে হেসে উঠল।

সন্ধের পর, নিজের পাড়ায় ফিরে দেখলাম পিচের রাস্তা ভিজে। ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর ছাতে ফোঁটা ফোঁটা জল। যেখানে সারা সন্ধে ছিলাম, সেখানে আকাশ জোড়া লাল মেঘ ছিলো। বৃষ্টিটা হয়েছে আমার পাড়ার অঞ্চলেই... যেখানে আমি ছিলাম না।

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


ব্যাঙ্গালোর প্রবাসী জয়দীপের কাজই হল উইকেন্ডগুলি এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো, ফটোগ্রাফিও তার সাথে যুক্ত হয় বটে। গদ্যে পদ্যে সমান সাবলীল জয়দীপ আদরের নৌকার সহ সম্পাদনার কাজ করে চলেন নিঃশব্দে। এবার তার ব্লগ পড়েই বরং পাঠক আরও জানুক তার সম্পর্কে

আপনার মতামত জানান