এই পরবাসে

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

[১]
ঘষা কাচের জানলার বাইরে দিয়ে তাকালেই দেখতে পাই কবির মিছিল চলেছে। তারা কেউ ছুঁয়ে দেখছে না শেষ পৌষের হাওয়া, ফিরে দেখছে না সকালের কলকাতার জেগে ওঠা। কবিতা? তাও লিখছে না তারা। শুধু বৃত্ত তৈরী করছে। সেই বৃত্তে না থাকলে তুমি ঠাঁই পাবে না বৃত্তের পত্রিকায়, কবিতাসভায়, আলোচনায়। সেদিন এক দাদার কাছে শুনলাম, ''শুধু লিখলে হবে? পি.আর. টাও তো করতে হবে!" ... তাই এখন সবাই ব্যস্ত। সব্বাই রাত জেগে লিখছে দিন জেগে 'পি.আর.' করছে। বৃত্তে জায়গা পেতে হবে। বৃত্ত মানে পৃথিবী। এবং অনেক গবেষণাসত্ত্বেও পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
[২]
তোমাকে মাঝেমাঝেই বলি না একবার জানলা দিয়ে তাকাও? রিয়াকে দেখতে পাচ্ছ? ক্লাস ফাইভ অবধি পড়াশোনা করা বসিরহাটের মেয়ে রিয়া দাসের আসল নাম আজিদা খাতুন। প্রেমিকের হাত ধরে কলকাতায় এসে সে যখন জানতে পারল প্রেমিকের স্ত্রী-সন্তান এবং ভিন্ন ধর্মের কথা, তখন এই শহরে সে একা। হিন্দু পরিবারে আশ্রয় পেয়ে বদলাতে হল নাম-পদবী এবং অভ্যাস। রিয়াকে দেখি কথায় কথায় বলে, 'ভগবানের দিব্বি!' তাকে যখন জিজ্ঞেস করি এত ভগবানের নাম নেওয়ার কারণ, ম্লান হেসে বলে ''আসলে আগে তো আল্লার কসম বলতাম"।
[৩]
আসলে কি বলো তো, আমরা একটা চক্রের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছি, না চাইতেও। যেমন দেখো, রোজ সকালে কাগজ খুললেই আজকাল মনে হচ্ছে না যে একটা ধারাবাহিক গোয়েন্দা কাহিনী পড়ছি? যার শেষে রোজই লেখা থাকছে 'ক্রমশ...'। আর এই ক্রমশ-র কোনও শেষ নেই। চক্রবৃদ্ধি হারে তা বেড়েই চলেছে। ঠিক সে'রকম করেই প্রত্যেকটা বইমেলা কিরকম যেন ধারাবাহিক বিয়েবাড়িতে পরিণত হয়েছে। একই আত্মীয়স্বজন। একই পরিচিত মুখ। ঝলমলে আলোর নীচে একইরকমের কানাকানি।
একই ভিড়। শুধু অপ্রয়োজনের জন্ম দিয়ে যায়।

[৪]
চৈত্রের ধুলোর মতো স্বীকৃতি দেবার অধিকার চাইছে সবাই। যে নিজে অস্বীকৃত, সেও চায় অন্যকে স্বীকৃতি দিতে। এই যে পদক-খেতাব নির্ভর জীবন, এর থেকে পালাতে চাও? কিন্তু পালাবে কোথায়? কাঁটাতার ঘিরে রেখেছে এই প্রান্তর।
ভাবছ তুমি কারোর স্বজন নও, তাই স্বজনপোষণ তোমায় পিছিয়ে দিচ্ছে? ভুল ভাবছ। আসলে কেউ কারোর স্বজন নয় এই বৃত্তে। প্রত্যেকে শুধু প্রত্যেকের প্রতিবিম্বের 'স্ব'। আত্মা স্পর্শ করার সুযোগ নেই এই বৃত্তে – তাহলে তুমি আত্মীয় হবে কীভাবে? আত্মীয়হীন এই বৃত্ত।আত্মাহীন এই গ্রহ।
এবং গ্রহ অর্থাৎ পৃথিবী...

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে
কিঙ্কিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কিণীর কবিতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলে।ব্লগার হিসেবে আদরের নৌকায় কিঙ্কিণীর যাত্রা শুরু হল আজ থেকে।পড়ুন এবং জানান কেমন লাগল কিঙ্কিণীর ব্লগ...


আপনার মতামত জানান