মিনি মিত্তিরের প্রেম

কুন্তলা

 



মিনি মিত্তিরের বয়স মোটে এক। ওর নামটা যে বিশেষ সুবিধের রাখা হয়নি সেটা অবশ্য মিনি এখনই বুঝতে পারে। শুধু নাম কেন, নাকটা মায়ের মতো না হয়ে বাবার মতো আর গায়ের রংটা বাবার মতো না হয়ে মায়ের মতো হলে যে আখেরে কাজে দিত সে সবও মিনি এখনই ভালোই বোঝে।

এগুলোকে নিয়তিনির্বন্ধ বলে মেনে নিতে মিনির আপত্তি নেই, কিন্তু জন্মদিনে একগাদা ভূত খাওয়ানোর ব্যাপারটা মিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। আর লোক খাওয়াবি খাওয়া, তাদের মনোরঞ্জনের জন্য সারা সন্ধ্যে মিনিকে একটা ভয়ংকর কুটকুটে জামা পরিয়ে বসিয়ে রাখাটা কী রকম বিবেচনার পরিচয়, সেটা মিনি সিরিয়াসলি জানতে ইচ্ছুক।

চটেমটে মিনি অসহযোগের রাস্তা ধরল। ভগবান দয়ালু লোক, বাকশক্তি এখনও দেননি বটে, কিন্তু গলায় জোর ঠেসে দিয়েছেন। গত এক বছরের অভিজ্ঞতায় মিনি জেনেও ফেলেছে, চেঁচানো আসলে কথা বলার থেকে অনেক বেশি কার্যকরী।

কাজেই মিনি চেঁচালো। প্রাণপণ। চেনা, অচেনা, হাফচেনা যে কেউ ওকে কোলে নেওয়ার উপক্রম করলেই বা ওর মোটা মোটা নরম গালের দিকে আঙুল বাড়াচ্ছে দেখলেই। যতক্ষণ না সামনের লোকটা ‘ওরে বাবা! ঠিক আছে ঠিক আছে!’ বলে ছিটকে যাচ্ছে। মিনির কানে এসেছে মায়ের আড়ালে কেউ কেউ, ‘কী ছিঁচকাঁদুনে মেয়ে হয়েছে রিমলির, বাব্বা’ বলে মুখ বেঁকিয়েছে, কিন্তু ও সব গায়ে মাখেনি মিনি। লোকের সব কথায় কান দিতে গেলে আর জীবনে চলতে হচ্ছে না।

হলের ওদিকটায় খাবার দেওয়া শুরু হতেই ভিড় পাতলা। এতক্ষণ যারা মিনিকে চটকানোর জন্য ঠেলাঠেলি করছিল তারা এখন আলুটিক্কি চাটের লাইনে ঠেলাঠেলি করতে ছুটেছে। বাঁচা গেছে। মিনি হাঁফ ছাড়ল। এদিকওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে মাকে খোঁজার চেষ্টা করল। পেল না। কেউ যাতে লজ্জা করে না খায় সেই তদারকি করতে গেছেন বোধ হয়।

কী করা যায় ভাবতে ভাবতে এদিকওদিক তাকালো মিনি। টেবিলের ওপর একগাদা উপহার। থালাবাটি, জামাকাপড় আরও কী সব আবোলতাবোল। একটাও পাতে দেওয়ার মতো না। বীতশ্রদ্ধ হয়ে মিনি শেষমেশ ওর জামার বুকের কাছে যে অর্থহীন গোলাপি সিল্কের বো-টা লাগানো আছে সেটার একটা কোণা ধরে টানতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে ফরফর করে বো অর্ধেক খুলে হাতে। মা ভয়ানক রাগ করবেন, কিন্তু মিনি নিরুপায়। টাইমপাস করতে হবে তো?

টানতে টানতে পুরো বো-টাই যখন প্রায় খুলে এসেছে আর মিনি ভাবছে, ইস এরা জামায় আরেকখানা বো দেয়নি কেন, তক্ষুনি মায়ের উচ্ছ্বসিত গলা কানে এল মিনির। মিনি মুখ তুলে তাকাল, আর তাকাতেই ওর ছোট্ট বুকটা ধড়াস করে উঠল।

জিতু! অনির্বাণ ও তমিস্রা বসুর একমাত্র পুত্র জীমূতবাহন, ওরফে জিতু, বাবামায়ের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছে।

জিতু সত্যিকারের স্কুলে যায় আর মিনিরা ওদের বাড়ি বেড়াতে গেলে স্পাইডারম্যান বাইক চেপে মিনিকে ইমপ্রেস করতে চায় না। শেষের অত্যাচারটা থেকে বাঁচতে আজকাল ঘোষজেঠুদের বাড়িতে যাওয়ার আগে প্রত্যেকবার প্রবল কান্নাকাটি বাধায় মিনি, কিন্তু মাবাবা হিন্ট বুঝলে তো।

জিতুকে প্রথম কবে দেখেছিল মনে নেই মিনির, কিন্তু জিতু যেদিন তমিস্রামাসির চাপাচাপিতে নিজের ছোট্ট গিটারটায় ‘আলো আমার আলো’ বাজিয়ে শুনিয়েছিল চার লাইন, সেদিন যে মিনি জিতুর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিল না সেইটা স্পষ্ট মনে আছে মিনির।

তারপরও অনেকবার জিতুদের বাড়ি গেছে ওরা। প্রত্যেকবার মিনির আফসোস হয়েছে। ইস, মা আরও ভালো দেখে একটা জামা পরালেন না কেন? সেই যে গোলাপি রঙের জামাটা কেনা হল আগের মাসেই? আর এই লাল জুতোটাই বা কী রকম? মিনি কি আর লাল জুতো পরার মতো ছোট আছে?

জিতুর প্রতি টান সেই থেকে ক্রমশ বেড়েছে মিনির, কিন্তু জিতুর দিক থেকে কোনওরকম সাড়াশব্দই নেই। অত হট্টগোলের মধ্যে বসেও হঠাৎ মনটন ভয়ানক খারাপ হয়ে যায় মিনির। ফোঁসফোঁস করে নিঃশ্বাস পড়ে। নিচের ঠোঁটটা ঠেলে বেরোতে চায়। মা কোথায় গেলেন? কাদের কাছে গেলেন? এমন কষ্টের সময় মেয়ের থেকে মায়ের পর আপন হল?

চোখের জলের বাঁধ সবে ভাঙে ভাঙে, গলা দিয়ে ভ্যাঁ প্রায় বেরোয় বেরোয় এমন সময় মিনি দেখল মাসিমেসোকে নিয়ে মা ওর দিকেই আসছেন। জিতুও আসছে সঙ্গে সঙ্গে। জিতুর হাতে রঙিন কাগজ মোড়া একটা ইয়াবড় বাক্স।

আতঙ্কিত মিনি ঘাড় ঘুরিয়ে প্রাণপণে একটা সুবিধেজনক কোল খুঁজতে লাগল, যেটায় চেপে পালানো যায়। বৃথা আশা। আলু টিক্কি চাট এখন তুঙ্গে।

দেখতে দেখতে মাসিরা একেবারে মিনির সামনে এসে পড়লেন। মুখ নিচু করে কোনওমতে হাত দিয়ে খোলা বো-টা গোছানোর চেষ্টা করল মিনি। ইস, কেন যে একদণ্ড চুপ করে বসতে পারে না মিনি? নিজেকে মায়ের থেকেও মোটা গলা করে বকতে ইচ্ছে হল মিনির।

জিতু এখন একেবারে মিনির মুখোমুখি। জিতুর বাক্সশুদ্ধু জিতুর হাত মিনির দিকে প্রসারিত। তমিস্রামাসির গলা। ‘আহা, ওকে প্যাকেটটা খুলে দেখা জিতু? অতটুকু মেয়ে কি ধরতে পারে?’ জিতু খচরমচর করে প্যাকেট খুলে বাক্সের ভেতর থেকে গোলাপি রঙের ডোরা দ্য এক্সপ্লোরার গিটার বার করে মিনির কোলের ওপর রাখল। মা চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘ও মা! কী সুন্দর গিটার? জিতুকে থ্যাংক ইউ বলেছ মিনি? . . . কী সুন্দর জামা পরেছিস রে জিতু? . . . চল চল তমিস্রা, চল অনির্বাণদা, খাবে চল . . .

মাসিমেসো আর মা আলু টিক্কি টেবিলের দিকে হাঁটা লাগালেন। জিতুও গেল, কিন্তু দু’সেকেন্ড পর। যাওয়ার আগে মিনির ডানগালে আলতো করে নিজের বাঁ হাতটা একবার ছুঁইয়েই পেছন ফিরে মাবাবার পেছন পেছন ছুট লাগালেন শ্রীমান জীমূতবাহন।

কোলের ওপর গোলাপি গিটার নিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল মিনি। কানের কাছে হট্টগোল মিলিয়ে এল, চোখের সামনে লোকের ভিড় আবছা হয়ে এল। জীবনের প্রথম জন্মদিনে, জীবনে প্রথমবার প্রেমে পড়ল মিনি মিত্তির।

কুন্তলা

কুন্তলা


সময় নষ্ট করার জন্য অনেকের অনেক ছুতো থাকে, আমার ছুতো অবান্তর। ঘুমোতে ভালোবাসি, তর্ক করতে একটুও ভালোবাসি না। প্রতিভা নেই, পরিশ্রম করার ইচ্ছে নেই। প্রিয় শব্দ হাততালি, অপ্রিয় খেলা বক্সিং। জ্বরজারি, সর্দিকাশি, অম্বলঅজীর্ণ, দিবাস্বপ্ন ইত্যাদি যতরকম অসুখ আছে পৃথিবীতে সবেতে ভুগি, কিন্তু নস্ট্যালজিয়াতে একটুও ভুগি না।

আপনার মতামত জানান