শ্মশান- ১

অভীক দত্ত

 

আমাদের শ্মশানের পাশে নদী নেই। আর নদী না থাকলে সেখানে ইলেক্ট্রিক চুল্লী করতে দেয় না পরিবেশ দপ্তর। সুতরাং এখানে সেই আদ্যিকালের কাঠের ব্যবহারেই পোড়ান হয়। দেহের প্রাণ বেরিয়ে গেলে যে শরীরটা পড়ে থাকে সেটা যে মূল্যহীন সেটা কোনদিন মাথাতেও আসত না আমার শ্মশানে না গেলে। এই যে ভোরবেলা উঠে দাড়ি কেটে অফিস যাই, ফেসওয়াস দিয়ে মুখ ধুই, কিংবা দামী পারফিউম লাগাই, এসবই আসলে মূল্যহীন। আসল মূল্য তো প্রাণে। যেটা আমার আছে, আপনার আছে, কিন্তু একবার প্রাণ টা বেরিয়ে গেলে মৃতদেহের থাকে না।
এই যে সকাল সকাল বাজার গিয়ে বাটা মাছের জন্য তেড়ে দরদাম, কিংবা আপনার গোষ্ঠীর না বলে ওই কবিকে বেজায় গালমন্দ, চাপ নিয়ে নিজের লেখা ছাপার জন্য সম্পাদকের সাথে হাতাহাতি- এই সব কিছুই আসলে কিছুই না।
বাবার প্রাণহীন শরীরটায় আমাকে একটা গোটা শিশির ঘি মাখাতে হয়েছে। পায়ে যখন ঘি দিচ্ছি পুরোহিত বলে চলেছে এবার বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও। জ্ঞানে অজ্ঞানে যদি কোন ভুল করে থাকি বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিও।
কি ক্ষমা করবে বাবা? জন্ম হবার পর থেকে যাকে মাথায় করে রাখা, একের পর এক স্যাক্রিফাইস... সেই ছেলে যখন বড় হয়ে লায়েক হয়ে যায়... বাবার কথা মনেও থাকে না... বাবা তো তখনও ক্ষমা করে দেন, আর নতুন করে কি কিছু করার থাকে! বাবারা তো সারাজীবন ক্ষমাই করে যান।
মাকে বলে আসতে হয়েছে, মা বাবাকে নিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। কাঁদতেও পারছি না। শক্ত পাথরের মত মুখ করে মাকে সামলাতে হয়েছে। দীর্ঘতম পথ পাড়ি দিয়ে শ্মশানে আসতে হয়েছে।

আর পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় হল যখন প্রিয়জনের শরীরটা পুড়তে থাকে। মুখাগ্নি... সাড়হীন দেহে আগুন দেওয়া... পুড়তে পুড়তে হাড়গুলি ফাটতে থাকে। ধোঁয়ায় চারদিক ভরে যায়। ছাই এসে এসে গায়ে পড়তে থাকে। যে হাতে আমাকে কোলে নিয়ে আমার বায়না শুনত বাবা, সেই হাত পুড়তে থাকে। বাবা ছিল দুর্দান্ত ফুটবলার। যে পা দিয়ে একের পর এক গোল দিয়েছে, গোটা শরীরটা আলাদা হয়ে যাবার পর পা দুটো থেকে গেল। ডোম এক হাত দিয়ে সেই পা দুটো আগুনে ফেলে আরও কাঠ গুঁজে দিল সেখানে।
কি ভয়ংকর জায়গা শ্মশান। আগে না এলে কোনদিন জানতে পারতাম না। মানুষের জীবনের সব থেকে কঠিন পরীক্ষা হয় এখানে। ডোম আকণ্ঠ মদ গিলে লেগে আছে আমার বাবার লাশের পেছনে। কত তাড়াতাড়ি দেহটাকে ছাই করে ফেলা যায়।

আমাদের শ্মশানের পুরোহিতের নাম “চোঙা”। ছ ফুট চার ইঞ্চি লম্বা। আধ খ্যাপা। কোন সুস্থ লোক আর শ্মশানে কাজ করবে। সে আবার একাধারে কবি, তার ওপরে দার্শনিকও বটে। বাবার দেহটা যখন পুড়ছিল আমায় বলল “মরার পরে লোকেরা প্রথমে কাক হয়ে যায়”।
আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকালাম। এই তথ্য সে কোথা থেকে পেল? প্রশ্নটা মাথায় এলেও করলাম না। সে বলে চলল “প্রথমে বডিটা থেকে দেহটা বেরিয়েই কাকের আত্মায় প্রবেশ করে। কাকের আত্মাতেই বেশিরভাগ আত্মা যায়। মানবশরীর অত সোজা জিনিস না। এক একেকটা আত্মার ছয়শ বছর লাগে আবার মানবশরীরে আসতে”।
এই বাউন্সারগুলির উত্তরে আমি কি বলব ভেবে পেলাম না। শেষে আর কিছু না পেয়ে তাকে বললাম “এসব ছেড়ে আমায় দু চারটে কবিতা শোনাও তো”।
কয়েকটা কবিতা সে শোনাল। বুঝলাম ফেসবুক জানলে বিখ্যাত হতে তার বেশিদিন লাগত না।
পিন্টুদা পাশে এসে বসেছিল আমার। আমায় বলল “মলয়কে কিছুদিন আগে এখানেই পুড়িয়েছিলাম।“

মলয় আমাদেরই বয়সী। একসাথে খেলেছি। ওর ক্যান্সার হয়েছিল। টাকার অভাবে ঠিক করে চিকিৎসাও করে উঠতে পারে নি। মৃত্যু তো আর বয়স দেখে আসে না। মলয় চলে যাবার পর অনেকবার ভেবেছি এসব নিয়ে। কাজের ফাঁকে। কাজ সেরে ঘরে ফিরে। সময় হয়েছে। বিজ্ঞান নাক উঁচু জিনিস। সব কিছুর কিনারা করে ফেলছে থিওরি কপচে। মৃত্যুর কিনারা করতে পারছে না।
কিছুক্ষণ পর পিন্টুদা বলল "এভাবে পোড়ান সব থেকে যন্ত্রণাদায়ক তাই না?কবর দেওয়া অনেক ভাল এর থেকে। বৈষ্ণবদের বসিয়ে কবর দেওয়া হয়। পাড়ার কিশোর কাকুর মাকে কবর দিল কিছুদিন আগে এভাবে।"
আমি বললাম "আরেক ধর্মে আছে, টাওয়ার অফ সাইলেন্সে ডেড বডি রেখে দিয়ে আসে। শকুন চিলে খুবলে খুবলে শরীর ছিড়ে খায়"।
পিন্টুদা শিউরে উঠে চুপ করে গেল।
বাবাকে পুড়িয়ে ফেরার পথে দেখলাম রাস্তায় একটা বাইককে একটা লরি পিষে দিয়ে চলে গেছে। তখনও রাস্তায় রক্ত পড়ে আছে। আমাদের স্কুলের এইটের ফার্স্ট বয়, আর তার বাবা। বাবাটা স্পট ডেড। ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা তাদের মৃত্যুর এক মিনিট আগেও জানত না কিছু।
জীবন আসলে জি বাংলা? খিস্তি থাক তাদের জন্য।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান