আমি, সে ও নিমডিহির দোল

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

রামসীতার বনবাস চলাকালীন পাতার কুটীরে মধুচন্দ্রিমা যাপনের কথা । সেই পর্ণ কুটীর নবদম্পতির কাছে এক বিশেষ প্রাপ্তি ছিল সেই মূহুর্তে। রাজগৃহের সুখ সেখানে না থাকলেও ভীড় ছিলনা একটুও। আর জনমানব শূন্য চিত্রকূট পাহাড়ের গুহায় শ্বশুরঘরের ঝুটঝামেলা থেকে নববধূ সীতাও অব্যাহতি পেয়েছিলেন।

আর চার-চারজন শাশুড়ি, শ্বশুর, দেওর, জা-জেউলির দ্বারা নতুন বৌ'টীর no ragging, no leg pulling, no bullying !!! অতএব শুধুই স্বামী সোহাগ আর প্রকৃতির কোলে মধুচন্দ্রিমা যাপন। তবে মাঝে মাঝে চাঁদের আলো ঐ লক্ষ্মণ দেওরের জন্য একটু ক্ষীণ হয়ে যেত তবুও পাওয়াটাই অনেক বেশী ছিল সেই মূহুর্তে। ঠিক এমনি সংসার পালিয়ে দ্রৌপদীরও বনবাস হয়েছিল পাঁচস্বামীর সাথে। সেখানেও পর্ণকুটীর, আর সংসারের কূটকাচালী থেকে মুক্তি ।


মহানগরের কোলাহল, ল্যান্ডফোনের কিড়িং কিড়িং আর কলিংয়ের ট্রুং, ট্রুং থেকে দুটিরাত, তিনটিদিন দেড়শো শহুরে দম্পতি এক ছাদের নীচে জড়ো হয়েছিল ক্লান্ত ফাল্গুণের শেষ ক্ষণে । বসন্তের ঝিরিঝিরি হাওয়া গায়ে মাখতে নিমডিহিতে।
খবর পেলাম ফেসবুকেতে আর অন্য একটা ট্যাব খুলে আই আর সিটিসির ওয়েবসাইটে। ঝাঁ করে টিকিট বুকিং আর যথাসময়ে শেষ বসন্তের ভোরে সাঁতরাগাছি থেকে রূপসী বাংলায় এসি চেয়ার কারে। বেশ গুছিয়ে বসে দু ভাঁড় ধূমায়িত চা দিয়ে টুকুটাকি মুখরোচক ।
সেদিন ফাল্গুণ মাসের সংক্রান্তি। আর সে বছরের মত দোল-পলাশের শেষ লং উইকএন্ডের শুরু। রূপসীবাংলা দুলকি চালে সাঁতরাগাছি ছেড়ে বেরিয়ে গেল ।


তারপর একে একে রাশি রাশি প্রাতরাশের হাতছানি ...একে একে ব্রেড-বাটার-অমলেট, ভেজ কাটলেট উপেক্ষা করে আমরা গরম আলুরচপে মন দিলাম । সাথে মুড়ি মুড়ি মশলা মুড়ি। কিছু পরে ঠান্ডা শশা আবার সিঙাড়া । তারপর একটু ছোট্ট ন্যাপ। দু-এক লাইন কবিতা লেখা। এবার পালিশ্‌... মানে শ্যু পালিশ্‌ ... এই করতে করতে খড়গপুর, মেদিনীপুর, শালবনী, গড়বেতা, বিষ্ণুপুর, ছাতনা, আদ্রা, আনাড়া আর তারপর পুরুলিয়া এসে গেল ঝপ্‌ করে ।
ওভারব্রিজ পেরিয়ে স্টেশনে এসে দেখি বাংলানাটক ডট কমের গাড়ি হাজির। কলকাতা পুরো যেন খলখল করছে পুরুলিয়া স্টেশনে। চারজন করে কলকাতাইয়াকে নিয়ে পাঁচ-ছ'টা ভাড়ার গাড়ি নিমডিহি অভিযানে বেরিয়ে পড়ল সেই ঠা ঠা রোদ্দুরে।

অচেনা বন্ধুত্ব এখন ফেসবুকের কৃপায় জলভাত। অজ্ঞাতকুলশীল তো কি ? কুছ পরোয়া নেই! সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। অতএব বন্ধুত্ব জমে দৈ। দু-তিনদিন বিদেশে একসাথে থাকতে হবে বলে কথা অতএব রামগড়ুরের ছানা না হয়ে সেই দোল-পলাশ উইকএন্ডের আড্ডা সেশন শুরু সহযাত্রী দুই ফ্রিলান্স ফোটোগ্রাফার বন্ধুর সাথে।

রুক্ষ-শুষ্ক পুরুলিয়ার দুপুরটা পেরোতে পেরোতে পাহাড় দৃশ্যমান হল। মনে হল কলকাতার বাইরে এসেছি। দূরে পাহাড়ের মাথায় সুপ্ত শঙ্কুর মত এক মৃত আগ্নেয়গিরি দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল সেবার শীতের শেষে বাগমুন্ডি পাহাড়ের পিকনিকের কথা।পলাশ, পলাশ আর পলাশ। বনপলাশ, রুদ্রপলাশ আর বসন্তের পলাশ। আগুণ লেগেছে যেন পাহাড়ের গায়ে। পাতা শূন্য গাছ সামনে-দূরে আর ফাগুণের শেষে যেন এতক্ষণে ফাগুণ লাগল আমার মনে। অশোক, শিমূল ফুটে গেছে বসন্তের শুরুতেই। এদ্দিন ধরে বসে ছিলাম পলাশের পথ চেয়ে।
দোলের সব রং নিয়ে বসে আছে সে । অতএব প্রথম পয়সা উশুল। ন্যাশানাল হাইওয়ে ধরে প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর পশ্চিমবাংলার বর্ডার পেরিয়ে ঝাড়খন্ডে প্রবেশ। সরাইকেলা জেলার মধ্যে কিছুদূর গিয়ে বাঁদিকে বিশাল দলমা রেঞ্জ আর ডান দিকে অযোধ্যা। যেন দুই রাজ্যের কোলাকুলি। মধ্যিখানে নিমডিহি গ্রাম।
নিমডিহি রেল লাইন পেরিয়ে আমাদের নির্ধারিত আখড়ায় নিয়ে গেল সেই গাড়ি। লাল, নীল, সবুজ, হলদে ফেস্টুন উড়ছে মাথার ওপর দিয়ে.....বাংলানাটক ডট কমের বসন্ত উত্সবে সামিল হলাম বেশ কিছু কলকাতাইয়া। পৌছানোমাত্র‌ই রেজিস্ট্রেশন। মাথাপিছু দুরাত, তিনদিনের প্যাকেজ মাত্র দু'হাজারে এই বাজারে। ফুডিং, লজিং আর দেখনদারির ভাড়া।
প্রত্যেকের হাতে এল একটি করে গামছা, সাবান আর পানীয় জলের বোতল। এবার শুরু রাম-সীতার পর্ণকুটির থুড়ি তাবুঁর মধ্যে অরণ্যের দিনরাত্রি। ঘেরাটোপের মধ্যে দুপুর রৌদ্র আগুণ জ্বালিয়ে দিয়েছে। মাটীর ঘর আর পাকাবাড়ির বুকিং পেলামনা। শিল্পীরা উঠেছেন সেখানে। রঙীন কাপড়ের ঘেরাটোপের মধ্যে সারে সারে ঘর আর ডর্মেটরি। মেঝেতে সদ্য উঠে যাওয়া শস্যক্ষেতের চড়াই উতরাই চাপা পড়েছে খড় দিয়ে । আর তার ওপর এক চিলতে তোষক। চাদর দিয়ে মোড়া। সাথে বালিশ। ঘরের মধ্যে ইলেকট্রিকের অস্থায়ী সংযোগে শুধু বাল্ব জ্বলবে রাতে। দুপুরে ঘরের বাইরে আম গাছের ছায়ায় আস্তানা গড়ে নিলাম। সুন্দর হাওয়া আর ঠান্ডা সেখানে। অদূরেই বিশাল ফুডকোর্ট। সেখানেই জমিয়ে রান্নাবান্না চলছে ও চলবে বুঝলাম। সুস্বাদু দুপুরের খাওয়াদাওয়া হল । তারপর বিশ্রাম।এবর সূর্যাস্তের পরেপরেই পায়ে হেঁটে নিমডিহি স্টেশন ও সেখান থেকে জোইড়্যার অর্থাত ঝর্ণার ধারে। নদীর উতস সেখানে। জলটা আছাড়ে পড়ছে। আর শুধু পলাশ এধার ওধার ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফুটে আছে।
সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসতেই মাঠের ওপর চাঁচর বা হোলিকা যাই বল জ্বালানো হল। সেই আগুণকে ঘিরে হৈ হৈ করে মাদলের দ্রিমি দ্রিমি সাথে কোমর জড়িয়ে সমবেত ঝুমুর নাচ । মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় দোলের আগের দিন সেই পাড়ায় পাড়ায় ন্যাড়াপোড়ার কথা। কার আগুণ কত উঁচু হয় তার যেন রিয়েলিটি শো! আর চীত্কার
"আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠবে বল হরিবোল।"
অনেকদিন পর সামনাসামনি বর্ষ শেষের এই আগুণ জ্বলা দেখলাম।
কয়েক একর জায়গা জুড়ে ১৯৪৮ সাল থেকে নিমডিহির ঐ স্থানে লোকসেবায়তন বিদ্যালয় চলে আসছে। তাদের বাগান, খেলার মাঠ, স্কুল ঘর, ফল-ফুলের গাছ, শাল-পিয়াল-মহুয়া-পলাশ, গোয়াল ভরা গরু, ছাগল নিয়ে আমাদের দু-তিন দিনের সংসার বাংলানাটক ডট কমের আয়োজনে।
সেবারের মত বসন্তোত্সবের সূচনা ঘোষিত হল। এবার মঞ্চে বাঁকুড়ার এক্দল খুদে ছৌ শিল্পীদের ছৌনাচ। তারপরে নদীয়ার বাউল ফকিরদের গান। বাউল-বাউলানীরা মাতিয়ে দিলেন মঞ্চ। এবার পুরুলিয়া ছৌ একাডেমীর বড়ছেলেদের পুরুষ ছৌ নৃত্য । দূরে অন্ধকারে গরম আলুর চপ, ফুচকা আর জিলিপি ভাজা হচ্ছে। গিয়ে দু তিন ঠোঙা কিনে এনে আবারো বসে পড়লাম। ঊড়িষ্যার কালাহান্ডি গ্রাম থেকে আসা বাজেশাল লোকনৃত্য...একদল পুরুষ কোমরে বাদ্যযন্ত্র ঝুলিয়ে নাচছে আর তার সাথে একদল মেয়ের লোকনৃত্য ..রঙ্গবতী, রঙ্গবতী কনকলতা.... সেই বসন্তে, মাতাল দখিন হাওয়ায়, ঘুটঘুট্টে অন্ধকারে ভরিয়ে দিল মন। মঞ্চ থেকে তাঁবুর খোঁয়াড়ে ফেরার পথে দেখতে পেলাম আমগাছে ঝুলন্ত আলোর ঝিকিমিকি আর মাটীতে পথের নিশানা ঝুড়ির লন্ঠনের টিমটিমে আলো। সব মিলিয়ে বসন্ত জাগ্রত সে আঁধারে। রাংচিতের বেড়ার মধ্যে জোনাকীর ফুটফুটে আলো তারার মত জ্বলছে তখন।
ফুডকোর্টে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে এবার রামসীতার সেই পর্ন কুটিরে প্রবেশ। ভোরের আগেই উঠে অস্থায়ী কমন বাথরুমে প্রাত:কৃত্য সেরে নিতে হবে অতএব অচিরেই সেরাতের মত আমাদের রিটায়ারমেন্ট @ নিমডিহি। রাতে বেশ ঠান্ডা সেই একচিলতে কুটির। সুখনিদ্রা হল কিছুটা তরপরেই পাখিদের কিচিরমিচির কনসার্টে অন্ধকার থাকতেই উঠে পড়া । তাঁবুর কাপুড়ে করিডরে এপাশ ওপাশ থেকে ব্রড স্পেক্ট্রাম নাকডাকানির শব্দ । বিস্তৃত তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ব্যাপ্তি তাঁবুর বাইরে এসেও শোনা গেল কিছুটা। গিয়ে স্নান সহ প্রাতঃকৃত্য সেরে ফিরে আসা। শহুরে মানুষেরা বিলাপে ব্যস্ত তখন। নিজেদের ফ্ল্যাটের মধ্যে বেডরুম সংলগ্ন স্নানঘরে অভ্যস্ত জণগণ তবুও উত্ফুল্ল নিমডিহির স্থান মাহাত্ম্যে। আকাশে বাতাসে জনতার সম্মিলিত স্নোরিং কত কত ডেসিবেল সীমা ছাড়িয়ে অবশেষে পুবের আলো ফুটি ফুটি । এবার লুচি-আলুর দম-জিলিপি সহযোগে দোলের প্রাতঃরাশ । তারপর মাঠে জমায়েত হয়ে বাউল ফকিরদের সাথে দোতারায় সুর তুলে নগর সংকীর্তণ। উদ্দেশ্য বাকী জনগণের প্রভাতফেরির মাধ্যমে ঘুম ভাঙানিয়া গান...."রাই জাগো গো, জাগো শ্যামের মন মোহিনী বিনোদিনী রাই, চেয়ে দ্যাখো আর তো নিশি নাই গো জয় রাধে...." স্কুল বাড়ির চাতাল, মাটীর ঘরের উঠোন, পাকা ঘরের আঙিনা পেরিয়ে চলল গান। যেন পুবের আলোয় ভাসতে ভাসতে চলল। তাকিয়ে দেখি ঘুমন্ত জনতা ঘরের বাইরে। কলকাতার নামীদামী শিল্পিও এসেছেন বেশ কযেকজন। আবার ফিরে আসা প্রভাতফেরির পরিক্রমণ সেরে। এবার গাছের নীচে থরে থরে রং বেরংয়ের ফাগ রয়েছে। আর দূরে দেখা গেল মহুয়া ভরা সব ক্যান সাজানো টেবিলের ওপর। এবার শুরু দোল খেলা। প্রকৃত অর্থে রং খেলা বলতে যা বোঝায়। সেই সাথে মহুয়া পান।
উদ্দাম নাচাগানা চলল কিছুক্ষণ ধরে। তারপর যে যার মত স্নান সেরে নিয়ে ফুড কোর্টে গিয়ে ফায়েডরাইস আর চিলি চিকেন খেয়ে আবারো গাছের নীচে ছায়ায় ছায়ায় দুপুর যাপন। মহুয়ায় জমে গেছে দুপুর ঘুম । উঠে দেখি বিকেল হয়ে গেছে। আবারো মঞ্চে গিয়ে সান্ধ্য অনুষ্ঠানের তোড়জোড় চলছে। লোকনৃত্য, লোকসংগীত শিল্পীদের আনাগোনা চলছে। সেই স্কুলের ছোটদের পরিবেশ সচেতনতার ওপর নৃত্য-গীতি আলেখ্য দিয়ে শুরু করে আবার ছৌ, বাজেশাল লোকনৃত্য, বাউল-বাউলানী, লোকগান.... সেই পূর্ণিমার জ্যোত্স্নার চুঁইয়ে পড়া রূপোলী আলোয় যেন বড্ড মায়াময় ছিল। রাতের আহারে পোলাও-মাংস-চাটনী হোলির স্পেশ্যাল ফিস্ট। ভোরে উঠে পটশিল্পের ওয়ার্কশপ আর ছৌ নাচের মহড়ায় কিছুটা অনুশীলন । আবার খেয়েদেয়ে ফেরার পালা। কলকাতায় নিজের ঘরে ফেরার গান । মহানগরের কোলাহলে মিশে যায় যে গান। সেও এক লোকগান কিম্বা রোজনামচার সংকীর্তণ । কিন্তু অনেক ভীড়ের মাঝে হারিয়ে যায় সেই গান। খোঁজে নিস্পন্দ, নিথর পুকুরের জল, মাটির হাওয়া আর সজনে ফুলের গন্ধ সে বসন্তে।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে ভালবাসেন, ভালবাসেন নতুন নতুন রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে। গদ্যে পদ্যে সমান সাবলীল ইন্দিরার ব্লগ পড়ুন আদরে...

আপনার মতামত জানান