স্কুলের গল্প

কুন্তলা

 



মূল গল্পঃ A School Story
লেখকঃ M. R. James



সিগারেট খাওয়ার ঘরে বসে দুজনের মধ্যে গল্প চলছিল। স্কুলজীবনের গল্প। প্রথমজন বললেন, “আমাদের স্কুলের পাথরের সিঁড়ির ওপর একটা ভৌতিক পায়ের ছাপ ছিল। ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়, জুতোর আদলের একটা ছাপ, সামনেটা চৌকো মতো। যদ্দূর মনে পড়ে সিঁড়িটা পাথরের ছিল। সেটা নিয়ে কোনওদিন কোনও ভূতের গল্প শুনিনি। অদ্ভুত কিন্তু। এখন মাঝে মাঝে ভাবি, দাগটা নিয়ে কেউ কোনও ভূতের গল্প বানায়নি কেন।”

“ওই বয়সের ছেলেদের মতিগতি বোঝা শক্ত। ওদের গল্পের নিজস্ব যুক্তিকারণ আছে। বাই দ্য ওয়ে, এটা কিন্তু তোমার জন্য একটা ভালো বিষয় হতে পারে, “দ্য ফোকলোর অফ স্কুললাইফ।”

“তা হতে পারে, কিন্তু মালমশলা বেশি জুটবে বলে মনে হয় না। ভূতের গল্পের চালচলন জন্মমৃত্যু বিবর্তন নিয়ে যদি গবেষণা কর, দেখবে বেশিরভাগই বইয়ের গল্প নিয়ে একটু এদিকসেদিক করে চালিয়ে দেওয়া।”

“আজকাল নির্ঘাত দ্য স্ট্র্যান্ড আর পিয়ারসনের বইগুলো থেকে বেশি টোকাটুকি হয়।”

“তা তো বটেই। আমাদের সময় এ সব গল্প ছিল না। আমাদের সময়ে কোন গল্পগুলো বেশি চলত বল তো? দাঁড়াও ভাবি। একটা তো ছিল সেই ভূতের বাড়ির গল্প, যার একটা ঘরে সাহসী লোকজন রাত কাটাতে যেত, এবং যারাই যেত তাদেরই পরদিন ভোরবেলা ঘরের কোণে জবুথবু অবস্থায় পাওয়া যেত। “আমি দেখেছি! আমি দেখেছি!” বলতে বলতেই তারা মরে যেত।”

“এই বাড়িটা বার্কলে স্কোয়্যারে ছিল না?”

“খুব সম্ভবত। তার পর ধর সেই লোকটা, যে রাতের বেলা প্যাসেজে একটা শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখত একটা লোক চারপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে, আর তার চোখদুটো কোটর থেকে বেরিয়ে গালের কাছে দুলছে। আর যেন কী – হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই ঘরের গল্পটা যেটাতে একটা লোক মরে পড়ে থাকত। মৃতদেহের কপালে থাকত একটা ঘোড়ার ক্ষুরের চিহ্ন। সেই একই চিহ্ন থাকত খাটের তলার মেঝেতেও, ভগবানই জানেন কেন। তাছাড়াও এক মহিলার গল্প ছিল, তিনি ঘরের দরজা বন্ধ করে শুতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মশারির ভেতর থেকে সরু মিহি গলায় কেউ বলে উঠত, “ব্যস, আজ রাতের মতো আমরা বন্দী হয়ে গেলাম। কোনও গল্পটারই কোনও ব্যখ্যা ছিল না। এগুলো এখনও চলছে কি না কে জানে।”

“খুব চলছে। শুধু চলছে না, দেখ গিয়ে বইপত্র ম্যাগাজিনটিন থেকে মালমশলা জোগাড় করে আরও ফুলেফেঁপে উঠেছে। আচ্ছা তুমি কোনও স্কুলের কোনও সত্যিকারের ভূতের গল্প শুনেছেন? আমি তো শুনিনি। এমনকি শুনেছে এমন কাউকে দেখিওনি।”

“তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি শুনেছ?”

“জানি না। কিন্তু একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। প্রায় তিরিশ বছর আগে আমার স্কুলে ঘটেছিল। ঘটনাটার কোনও ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে।

যে স্কুলটার কথা বলছি সেটা ছিল লন্ডনের কাছে। বেশ বড় আর পুরোনো স্কুলবাড়ি, সাদা রঙের, চারদিকে মাঠ দিয়ে ঘেরা। বাগানে বড় বড় সেডার গাছ। টেমসের তীরে যে ধরণের বাগান হয়, তোমার দেখা আছে নিশ্চয়। বুড়ো এমস গাছওয়ালা তিনচারটে মাঠ ছিল আমাদের খেলার জন্য। জায়গাটা বেশ সুন্দর ছিল। তবে তখন আমরা অত বুঝতাম না।”

আঠেরোশো সত্তর সালের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ আমি স্কুলে ভর্তি হলাম। আমার সঙ্গে যে সব ছেলে ভর্তি হয়েছিল তাদের একজনের সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গেল। পাহাড়ি ছেলে, নাম ম্যাকলিওড। ছেলেটি কোনও দিক থেকেই অসাধারণ কিছু ছিল না, পড়া বা খেলা কোনওটাতেই সে চোখে পড়ার মতো কিছু করেনি কখনও, কিন্তু তাও সে আমার খুব পছন্দের ছিল। আমাদের স্কুলটা বেশ বড় ছিল। প্রায় একশো কুড়িতিরিশ জনের মতো ছাত্র। তাদের দেখাশোনার জন্য বেশ কয়েকজন মাস্টার লাগত। সে সব মাস্টাররাও ঘনঘন বদলাতেন।

এক টার্মে, সম্ভবত সেটা আমার তৃতীয় বা চতুর্থ টার্ম হবে, স্কুলে এক নতুন মাস্টার এল। নাম স্যাম্পসন। লম্বাচওড়া, ফর্সা মুখে কালো দাড়ি। স্যাম্পসনকে ছাত্রেরা বেশ পছন্দই করত। লোকটা অনেক জায়গা ঘুরেছে, সে সব জায়গার নানারকম মজার গল্প ছিল ঝুলিতে। স্যাম্পসনের নেকনজরে পড়ার জন্য ছেলেদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতার ভাব লেগে থাকত। এতদিন হয়ে গেল, আমার এখনও মনে আছে, স্যাম্পসনের ঘড়ির চেন থেকে একটা সোনার কয়েন ঝুলত। একদিন সেটার দিকে আমার চোখ পড়াতে স্যাম্পসন আমাকে জিনিসটা দেখতে দিয়েছিল। এখন মনে হয়, জিনিসটা বাইজ্যানটাইনের সোনার কয়েন গোছের কিছু একটা ছিল। সাইজে এই আমাদের কয়েনের মতোই হবে, কি তার থেকে একটু ছোট। একদিকে একজন সম্রাটের ছবি, অন্যদিকটা ব্যবহারে ব্যবহারে ক্ষয়ে মসৃণ হয়ে গেছে। এই মসৃণ দিকটায় স্যাম্পসন, খানিকটা গায়ের জোরেই, ট্যাঁরাব্যাঁকা অক্ষরে নিজের নামের আদ্যক্ষর খোদাই করে রেখেছিল - জি ডবলিউ এস। আর একটা তারিখ - চব্বিশে জুলাই আঠেরোশো পঁয়ষট্টি। কয়েনটা এই এতদিন পরেও স্পষ্ট চোখে ভাসছে। স্যাম্পসন বলেছিল জিনিসটা ও কনস্ট্যানটিনোপল থেকে কিনেছে।

ওয়েল, প্রথম যে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটল সেটা হল এইরকম। স্যাম্পসন আমাদের ল্যাটিন গ্রামার পড়াত। ওর পড়ানোর পদ্ধতি বেশ ভালো ছিল। যেটা শেখানো হচ্ছে সেটা দিয়ে বাক্যরচনা করতে দিয়ে ও বিষয়টা স্পষ্ট করে বোঝাতো। অফ কোর্স, এতে ভুলভাল বাক্য লিখে দুষ্টু ছেলেদের দুষ্টুমি করার সুযোগও থাকত, কিন্তু স্যাম্পসন এতই কড়া ধাঁচের শিক্ষক ছিল যে তার সঙ্গে ও ধরণের কিছু রসিকতা করার কথা আমাদের মাথাতেও আসত না।

যাই হোক, যে দিনের কথা বলছি, সেদিন স্যাম্পসন আমাদের ‘মেমিনি’ অর্থাৎ স্মরণ শব্দের রূপ শেখাচ্ছিল। নির্দেশ ছিল, স্মরণ, স্মৃতি, মনে রাখা ইত্যাদি দিয়ে আমাদের একটা করে বাক্যরচনা করতে হবে। সাধারণ বাক্য। এই যেমন আমার বাবাকে আমার মনে আছে, বা বইটার কথা আমার মনে আছে, এই সব। ক্লাসের অনেক ছেলেই অবশ্য কায়দা করে “আমার সবথেকে স্মরণীয় বই’ ইত্যাদি লিখছিল, কিন্তু ম্যাকলিওডকে - যে ছেলেটির কথা বলছিলাম তোমাকে - দেখে বোঝা যাচ্ছিল ও আরও প্যাঁচালো কিছু লেখার জন্য মাথা ঘামাচ্ছে। আমরা বাকিরা কোনওক্রমে বাক্যরচনা শেষ করে ছাড়া পাওয়ার তালে ছিলাম তাই কেউ কেউ তাড়া দিয়ে বেঞ্চের তলা দিয়ে ওকে লাথিটাথি মারছিল। আমি ম্যাকলিওডের পাশেই বসেছিলাম। আমি ওকে খোঁচা দিয়ে তাড়াতাড়ি লেখা শেষ করতে বললাম। কিন্তু ও যেন আমার কথা শুনতেই পেল না। ওর খাতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম কিছুই লেখেনি। এবার আমি বেশ জোরে খোঁচা দিলাম আর ক্লাসশুদ্ধু সবাইকে অপেক্ষা করিয়ে রাখার জন্য ম্যাকলিওডকে কড়া ধমক দিলাম। তাতে কাজ দিল মনে হল। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো করে ধড়মড় করে উঠে ম্যাকলিওড খসখস করে কাগজে দু’লাইন কী সব লিখল, তারপর খাতা নিয়ে দৌড়ল। ততক্ষণে ক্লাসশুদ্ধু সকলের খাতা জমা পড়ে গিয়েছিল, আর স্যাম্পসন বাকি ছেলেদের, যারা “আমার প্রাতঃস্মরণীয় পিতা” গোছের বাক্য লিখেছিল, তাদের বেশ নরমগরম শোনাচ্ছিল, কাজেই ম্যাকলিওডের খাতা দেখাতে দেখাতে বারোটা বেজে গেল আর ম্যাকলিওডকে খাতা দেখানোর জন্য বেশ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। খাতা দেখিয়ে যখন ফিরল ম্যাকলিওড, তখন ওর মুখ দেখে আমার মনে হল কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে।

“কী হল? কত পেলে?”


প্রশ্নের উত্তরে ম্যাকলিওড বলল, “তেমন কিছু হয়নি, তবে মনে হচ্ছে স্যাম্পসন আমার ওপর চটে গেছে।“

“কেন? খারাপ কিছু লিখেছিলে নাকি?”

“সে রকম তো কিছু লিখিনি, মানে আমার তো মনে হচ্ছে না। এই দেখ – চারটে গাছের ফাঁকের ভেতর সেই কুয়োটার কথা মনে পড়ে?

“এ আবার কী?” আমি বললাম, “এসব কী লিখেছ? এর মানে কী?”

“সেটাই আশ্চর্যের” বলল ম্যাকলিওড। “আমিও জানি না এর মানে কী। শুধু জানি এই বাক্যটাই মাথায় এল আর আমি লিখে ফেললাম। লেখার আগে খালি একটা ধোঁয়াধোঁয়া, আবছা ছবিও আমার মাথায় এসেছিল। চারটে গাছ, ওই যে ওই গাছগুলো, আহা, বল না, সেই কালো কালো গুঁড়ি, লাল রঙের কুলের মতো ফল?”

“মাউন্টেন অ্যাশেস ট্রি?”

“না না, মনে পড়েছে, দাঁড়াও দাঁড়াও, ইউস, ইউ ট্রি।”

“যাই হোক, স্যাম্পসন কী বলল?”

“সেটাই তো অদ্ভুত। বাক্যটা পড়ে টেবিল থেকে উঠে গিয়ে ম্যান্টেলপিসের কাছে পেছন ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর আমার দিকে না ফিরেই খুব শান্ত ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “এই বাক্যটার মানে কী?” আমার যা মনে হল আমি বললাম, কিন্তু গাছটার নাম কিছুতেই মনে পড়ছিল না। তারপর স্যাম্পসন জানতে চাইল কেন আমি এই বাক্যটা লিখেছি। বানিয়ে বানিয়ে যা তা একটা কিছু বললাম। তারপর স্যাম্পসন আমি এই স্কুলে কদ্দিন হল এসেছি, আমার বাড়ি কোথায় এইসব জিজ্ঞাসা করতে লাগল, তারপর আমি চলে এলাম। স্যাম্পসনকে দেখে মনে হচ্ছিল ওর খুব শরীর খারাপ লাগছে।”

এরপর আর এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের আর কোনও কথা হল না। পরদিন ম্যাকলিওড বেচারা ঠাণ্ডা লেগে জ্বরে পড়ল, সাত দিন আর স্কুলে আসতে পারল না। মাসখানেক নির্বিঘ্নে কাটল। ম্যাকলিওড যেমন বলেছিল যে ওর লেখা বাক্যটা পড়ে স্যাম্পসন বেশ বিচলিত হয়েছে, সেটা সত্যি হলেও স্যাম্পসনের হাবেভাবে প্রকাশ পেল না। এখন আমি নিশ্চিত যে স্যাম্পসনের অতীত জীবনে একটা কিছু সন্দেহজনক ব্যাপার ছিল, কিন্তু সেই ছেলেবয়সে আমাদের অত কথা মাথায় আসেনি।

আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল এই রকম। এক দিন কন্ডিশনাল সেন্টেন্সের ক্লাস হচ্ছিল। আমাদের বলা হয়েছিল একটা কন্ডিশনাল বাক্যের উদাহরণ লিখতে। আমরা ঠিক ভুল যা পারলাম লিখলাম, তারপর নিজেদের খাতা নিয়ে লাইন দিলাম, স্যাম্পসন খাতা পরীক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ দেখি স্যাম্পসন খাতা ছেড়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়েছে। ওর গলা দিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ বেরোচ্ছে। তারপর স্যাম্পসন টেবিলের পাশের খোলা দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। আমরা দুয়েকমিনিট হাঁ করে বসে রইলাম। তারপর আমি আর কয়েকজন উঠে স্যাম্পসনের টেবিলে রাখা কাগজগুলো দেখতে গেলাম।

টেবিলের ওপর সবথেকে ওপরের খাতাটা ছিল লাল কালিতে লেখা। ওই কালি আমাদের ক্লাসের কোনও ছেলের নয়, এমনকি হাতের লেখাটাও না। ক্লাসশুদ্ধু সবাই হলফ করে বলল, ও খাতা তাদের নয়। আমার হঠাৎ কী মনে হল আমি খাতাগুলো গুনে দেখলাম। টেবিলের ওপর সতেরোটা খাতা আছে, আর ক্লাসে ছেলে আছে মোটে ষোলোজন। আমি এক্সট্রা খাতাখানা চুপিচুপি নিয়ে নিলাম। আমার ধারণা এখনও সে খাতাখানা আমার কাছে আছে। তুমি নিশ্চয় জানতে চাইবে খাতাটায় কী লেখা ছিল। খুবই সোজাসরল কয়েকটা কথা, সাদাসাপটা।

তুমি যদি আমার কাছে না আস, আমি তোমার কাছে আসব।

“আমাকে খাতাখানা দেখাতে পারো?” বাধা দিয়ে বললেন শ্রোতা।

“সে পারি, কিন্তু আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। সেদিন বিকেলেই যখন আমি আমার লকার থেকে খাতাখানা বার করলাম – সেটা যে সেই সতেরো নম্বর খাতাটাই ছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কারণ সেটায় একটা আঙুলের ছাপ ছিল যেটা আমি আগেই দেখে রেখেছিলাম – কিন্তু তখন তাতে কোনও লেখার চিহ্নমাত্র ছিল না। আমি খাতাখানা তবু আমার কাছেই রেখে দিয়েছিলাম এবং সেদিন থেকে কোনও বিশেষ কালিতে লেখাটা হয়েছে কি না ইত্যাদি নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করে বার করার চেষ্টা করেছি, কোনও ফল পাইনি।

আধঘণ্টা পর স্যাম্পসন আবার ক্লাসে ফিরে এল। পা টিপে টিপে টেবিলের কাছে এসে ওপরের খাতাখানার দিকে তাকিয়ে দেখল। ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল ও একটা স্বপ্নের মধ্যে আছে। স্যাম্পসন কোনও প্রশ্ন করল না। খুব শরীর খারাপ লাগছে বলে আমাদের ছুটি দিয়ে দিল।

পরদিন স্যাম্পসন আবার স্কুলে এল, অন্যান্যদিনের মতোই। আর সেদিন রাতেই আমার গল্পের তৃতীয় আর শেষ ঘটনাটা ঘটল।

আমি আর ম্যাকলিওড যে ডরমিটরিতে থাকতাম সেটা ছিল মূল স্কুলবাড়ির সঙ্গে এল অক্ষরের হাতার মতো লাগানো। স্যাম্পসনের ঘর ছিল মূল বাড়ির একতলায়। সেটা ছিল উজ্জ্বল পূর্ণিমার রাত্রি। ঠিক ক’টার সময় জানি না, রাত একটা থেকে দুটোর মাঝখানে হবে, হঠাৎ একটা ঝাঁকুনিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম ম্যাকলিওড আমাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে, মুখচোখ উদভ্রান্ত।

“এস, এস, দেখবে এস, স্যাম্পসনের ঘরের জানালা দিয়ে চোর ঢুকছে!”

আমি কোনওমতে কথা বলার অবস্থায় পৌঁছে বললাম, “তাহলে সবাইকে জাগাচ্ছ না কেন?”

“না না, আমি নিশ্চিত নই লোকটা কে, চেঁচামেচি কোরো না, এসে দেখ।”

আমি জানালার কাছে এসে বাইরে উঁকি দিয়ে কাউকেই দেখতে পেলাম না। ওই মাঝরাতে ঘুম ভাঙানোয় আমার যথেষ্টই রাগ ধরেছিল এবং ম্যাকলিওডকে গালিগালাজ করলেও কিছু অন্যায় হত না, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হতে লাগল, কোথাও একটা গোলমাল আছে। আর সে গোলমালটার মুখে যে আমি একা পড়িনি, ম্যাকলিওড যে আমার সঙ্গে আছে, সে জন্য আমি নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিতে লাগলাম। আমি ম্যাকলিওডকে জিজ্ঞাসা করলাম ও ঠিক কী দেখেছে বা শুনেছে।

“আমি কিছুই শুনিনি, কিন্তু তোমাকে ডাকার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে আমি এমনিই একবার এই জানালার বাইরে তাকিয়েছিলাম, তাকাতেই দেখলাম একটা লোক স্যাম্পসনের জানালার বাইরে উবু হয়ে বসে ঘরের ভেতর দিকে তাকিয়ে আছে। আর হাতছানির দিয়ে ডাকার ভঙ্গি করছে।”

“কী রকম লোক?”

“তা বলতে পারব না, তবে একটা কথা বলতে পারি, লোকটা একেবারে হাড্ডিসার, আর দেখে মনে হচ্ছিল তার সার গা যেন ভিজে চুপচুপে হয়ে রয়েছে, আর আর” এইবার ম্যাকলিওডের গলা নেমে প্রায় ফিসফিসানিতে পরিণত হল। ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে নিয়ে ম্যাকলিওড বলল, “আমি নিশ্চিত নই লোকটা আদৌ জ্যান্ত কি না।”

আমরা আরও কিছুক্ষণ ফিসফিসিয়ে কথা বললাম, তারপর গুঁড়ি মেরে বিছানায় ফিরে এলাম। আমার ধারণা আমরা খানিকটা ঘুমিয়েছিলাম, কিন্তু পরদিন ঘুম থেকে উঠে অসম্ভব ক্লান্ত লাগছিল।

স্যাম্পসনকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। আর কখনও তার সম্পর্কে কোনও খবর পাওয়াও যায়নি। এখন যখন ভাবি, আমার গোটা ঘটনাটার মধ্যে সবথেকে অবাক লাগে এই ব্যাপারটা যে আমি বা ম্যাকলিওড যা দেখেছিলাম তা কখনও কোনও তৃতীয় ব্যক্তিকে বলিনি। বলাই বাহুল্য আমাদের কোনও প্রশ্নও করা হয়নি, কিন্তু যদি করাও হত, আমার বিশ্বাস আমরা কোনও উত্তর দিতে পারতাম না। মনে হয় যেন বিষয়টা নিয়ে কথা বলা বা আলোচনা করার ক্ষমতা আমাদের লোপ পেয়েছিল।

"ব্যস, এই হচ্ছে আমার গল্প,” বক্তা বললেন। “স্কুলসংক্রান্ত এই একটা ভৌতিক গল্পই আমার জানা আছে, তাও গল্পে ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে আমি নিঃসন্দেহ নই।”

সাধারণত এ ধরণের গল্পের পরিশেষ বলে কিছু থাকে না, কিন্তু এই গল্পটার একটা আছে, কাজেই সেটার উল্লেখ করতেই হবে। গল্পটা যদিও দুজনের মধ্যে হচ্ছিল, সেই ঘরে গল্পের একাধিক শ্রোতা ছিলেন। সে রকম একজন শ্রোতা, সেই বছরেরই শেষ দিকে, আয়ারল্যান্ডের একটা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

সন্ধ্যেবেলা তাঁর গৃহস্বামী স্মোকিং রুমের ড্রয়ারভর্তি খুঁটিনাটি জিনিস ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ একটা ছোট বাক্স হাতে তুলে নিয়ে বলে উঠলেন, “এই যে, তুমি তো পুরোনো জিনিসপত্রের সম্বন্ধে জানটান, বল তো এটা কী?” শ্রোতাটি বাক্সটি খুললেন এবং দেখলেন বাক্সের ভেতর একটা সরু সোনার চেনে একটা জিনিস আটকানো আছে। তিনি চশমা খুলে জিনিসটাকে চোখের আরও ভালো করে পরীক্ষা করলেন।

“এর ইতিহাসটা কী?”

“ইতিহাস খুবই অদ্ভুত।” বললেন গৃহস্বামী।

“বাগানের ইউ গাছের ঝোপটা দেখেছ তো? বছরখানেক আগে আমরা ওই ঝোপের ভেতরের কুয়োটা পরিষ্কার করাতে গিয়ে কী পেলাম বলতে পার?”

অতিথির গলা সামান্য কেঁপে গেল।

“একটা দেহ?”

“একটা নয় হে, দু'দুটো মৃতদেহ।”

“দুটো! কী সাংঘাতিক! ওখানে এল কী করে? এই জিনিসটা কি দেহগুলোর সঙ্গেই ছিল নাকি?”

“একটা মৃতদেহর জামাকাপড়ের সঙ্গে ছিল। বিশ্রী ব্যাপার। একটা মৃতদেহ আর একটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছিল। নির্ঘাত তিরিশ কিংবা আরও বেশি বছর ধরে ছিল, অন্তত আমরা এখানে আসার আগে থেকে তো বটেই। বুঝতেই পারছ, আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কুয়োটা বুজিয়ে ফেলেছি। সোনার কয়েনটায় কী লেখা আছে কিছু বুঝতে পারছ নাকি?”

“পারছি।” আলোর কাছে কয়েনটাকে তুলে ধরে খুব কষ্ট করে থেমে থেমে পড়লেন অতিথি। “জি ডাবলিউ এস, চব্বিশে জুলাই, আঠেরোশো পঁয়ষট্টি।”





কুন্তলা

কুন্তলা


সময় নষ্ট করার জন্য অনেকের অনেক ছুতো থাকে, আমার ছুতো অবান্তর। ঘুমোতে ভালোবাসি, তর্ক করতে একটুও ভালোবাসি না। প্রতিভা নেই, পরিশ্রম করার ইচ্ছে নেই। প্রিয় শব্দ হাততালি, অপ্রিয় খেলা বক্সিং। জ্বরজারি, সর্দিকাশি, অম্বলঅজীর্ণ, দিবাস্বপ্ন ইত্যাদি যতরকম অসুখ আছে পৃথিবীতে সবেতে ভুগি, কিন্তু নস্ট্যালজিয়াতে একটুও ভুগি না।

আপনার মতামত জানান