দোল live

অনির্বাণ দাস

 


পিচ রিপোর্ট
শুনলাম মালের দোকান দশটার পরেও বন্ধ হয়নি রাতে আজ। লোকের মাথা লোকে খাচ্ছে। মফস্বলের সবেধন নীলমণি এই একটা মাত্র কাউন্টার। তার উপর আবার ভোরে আজ বেশ কয়েকঘণ্টার একটা ঝিঙ্কা চিকা বৃষ্টিও হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ তো এরকমই এক সম্ভাবনাময় কাউন্টারের সন্নিকটে একটি মোড়ায় বসে বসে লিখেছিলেন- “রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত আকাশে...”। এখন কথা হল গৃহবাসীরা আজ বসন্ত উৎসবে মেতে উঠেছে কাউন্টারের সামনে। রঙ বিনিময় হবে কাল। গলা বেয়ে নেমে ভিতরে ভিতরে পিচকিরি চালাবে। ভূত করে ছেড়ে দেবে মাথা ফাটা মাখিয়ে। আর? কে যেন দিতে না পারা ঠোঙার আবির ঠোঙাতেই নিয়ে আবার ফিরে আসছে আজ। কীসের দোল কীসের ফাগুন কীসের কী, ভিতরে তখন জন্ম জন্মান্তরের উথাল পাথাল বৃষ্টি। পোস্ট অফিসের পাশের গলিতে সকাল থেকে রেসিং সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যে- সে এবার আরও বেশি একা একা ফিরে আসছে একটা কান্না-চাপা শব্দের ভিতর। ক্লাস নাইন থেকে। প্রতিশোধের মতো প্রতিবার প্রতিজন্মে শুধুমাত্র নিজে নিজের হাতে ব্লেড চালাবে বলেই মানুষের জীবনে দোল আজও আসে।


টস
গত বছর এরকম সময়ে আমরা কৃষ্ণর দোকানের পিছনে অলরেডি বসে গেছি। আনাচে কানাচে অলিতে গলিতে পিচকিরি হাতে ছোট ছোট নানা রঙের জলদস্যু। মাথায় টুপি মাথায় পরচুলা। মফস্বলের ফাগুন কিশোর আগুন কিশোর সাইকেলে বাইকে বেরিয়ে পড়েছে দলে দলে। বান্ধবীরাও। কে নেই খেলায় আজ? কী নেই- ভাবার সময় কোথায়? ফুল মস্তি এখন শুধু। রাজু আবার কোত্থেকে একটু মাংস রান্না করে এসেছে ঝাল ঝাল করে। ভাবা যায়? দোকানের বাইরে বক্সে তখন- “চিকনি চামেলি...”। আর ফোন আসছে শুধু- কোথায় ভাই কোথায়? পলিপ্যাকে আবিরের ঠোঙা নিয়ে এ পাড়া চলে যাচ্ছে ও পাড়ায়। আজ যাওয়াই যায়। আজ চেনা সোজা না। আজ ধরা পড়াও কঠিন। তাই তো একবারের জায়গায় দুবার তিন বার ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে চক্কর মারব যত খুশি। রঙ দিতে পারি না পারি, দেখা হোক না হোক, আবার কান্না পাচ্ছে যখন, আজ বসন্ত, শিওর...


পাওয়ার প্লে
রং নাম্বার কথাটা কাল থেকেই জ্বালাচ্ছে খুব। এবছরই প্রথম দোল খেলছি না। অপারেশনের পর ডাক্তারের হুকুম- কমপ্লিট বেড রেস্ট। ডাক্তারকে কী করে বোঝাই শুধু তো আবির না, আবিরের সঙ্গে একটু রঙ্গন দুটো একটা টগর আর জুঁই যে দিত – তার ফোন নাম্বারও আমার কাছে আর নেই। শুধু শুকনো কয়েকটা ফুল আজও কোন এক খাতার আড়ালের পাতায়। কী করে নিস্তার পাই সেই খেলা থেকে বলো দেখি ডাক্তার। নাছোড় নীল একটা আকাশের নিচে সে ছিল আমার রক্ত মাংস অস্থি মজ্জার সকল মিথ্যার চেয়েও বড় এক সত্য। বুড়ির ঘরের দিব্যি। তারপর তো বাংলা ও ইংলিশের গঙ্গা যমুনা দিয়ে বয়ে গেল কত জল। ফাঁকা বোতলের মতো এই পানাপুকুরে ভেসে রইল হৃদয়। দেখা হবে বলে, আজ হোক কাল হোক। যেখানে যত শ্মশান যেখানে যত কবরখানা যেখানে যত রক্তপাত যেখানে যত ক্ষমা লেখা আছে। তোমার অহংকারী স্টেথো বসন্ত বলতে কতটুকু বোঝে ডাক্তার? চলো তার চেয়ে কবীর সুমন শুনি- “সারারাত জ্বলেছে নিবিড়/ধূসর নীলাভ এক তারা/তারই কিছু রঙ নাও তুমি... ... /যা কিছু নেই, নাই বা হল সব পাওয়া/না পাওয়ার রঙ নাও তুমি”...


স্লগ ওভার
বসন্ত মূলত কয় প্রকার? দুই প্রকার- গুটি এবং জল। আমরা জল ওরা গুটি। ওরা কারা? ওরা হল- “দখিন হাওয়া জাগো জাগো জাগাও জাগাও...” আর আমরা? আমরা হলাম – “ফাগুনি পূর্ণিমা রাতে চল পলায়ে যাই...”। একদম বাংলায় বলতে গেলে ওরা শান্তিনিকেতন, আমরা অশান্তিনিকেতন। ক্যাচালের কথা উঠতেই আরেকজনের কথাও আজ খুব মনে পড়ছে। আরেকজন মানে শীতকাল। তার দোতালার ঘরে যে ভাষায় দুলেছিলাম- তাতো কবেই হারিয়ে ফেলেছি। দোষ গুণের কথা যোগ বিয়োগের অঙ্ক থাক আজ না হয় তোলাই থাক।চিরকাল কেউ কারও পুরোপুরি থাকে না। যদি থাকে, জেনো ঢপ আছে। নির্ঘাত আছে জল আছে দু এক হাতা। যদি না থাকে? তাহলে আর কী, হাতে তো রইলই আধখাওয়া বাকি জীবন... পুরোপুড়ি...
কথা যখন উঠলই আজ, ছাদের কথাও কিন্তু বলতে হবে। বিজয় সরকারের গান সেই থেকেই তো আর পিছু ছাড়ল না- “তোমায় প্রথম যেদিন জেনেছি , মনে আপন মেনেছি/ তুমি বন্ধু আমার মন জানো না...”। তার পর কী হয়েছিল? বল বল খুলে বল। ঝেড়ে কাশো বাপ। কী আবার হবে, হওয়ার ছিল যা তাই হয়েছে অসহ্য সেই “ফাল্গুনি দোল পূর্ণিমায়”। তারপর? তারপর আর কী- “কাষ্ঠযোগে দাবানল/জ্বালায় পোড়ায় বনজঙ্গল/ মন পুরানো আগুন বন্ধু তাহা না/কত বিরহীর অন্তরতলে/ বিনা কাষ্ঠে আগুন জ্বলে/ তুমি জানো না...”।
আরে অঘটন তো না হয় বুঝলাম, ঘটনাটা একটু বল। সে'বার বিকেল থেকে আরেক প্রস্থ নাম্বার ওয়ান অফুরান। করার মধ্যে শুধু একটা এস এম এস করেছিলাম “abir”। ফলাফল গড়াল রাত্তিরের ছাদে। চাঁদের আলোয় তখন সে কী পূর্ণিমা যে দেখিলাম- জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব? ও ছাদ সামলে রাখো জোছনাকে...

ড্রিঙ্কস ব্রেক
মাথাটা একদিকে হেলে আছে। ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে নামছে লালা। উস্কো-খুসকো ধুলো ধূসরিত চুল দাড়ি। চোখে অনির্দেশ। একটা এনামেলের থালার পেছনে বসে আছে সে। সে মানে প্রায় উলঙ্গ ক্ষয়ে যাওয়া এক মানুষ অথচ যুবক। থালায় মুড়ি। কুকুরে মুখ দেয় থালায়। ছেটানো মুড়ি শালিখ খুঁটে খায়। খেতে খেতে গায়ে ওঠে। মানুষটা নড়ে না চড়ে না। তাঁতিপাড়ায় কী একটা সার্ভের কাজে গেছি, দেখি নারকেল সুপুরির ডালপাতা আর কাগজ পলিথিন দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া ছাউনির সামনে উঠোনের মতো একটা জায়গায় পায়ে দড়ি দিয়ে একটা খুঁটিতে বাঁধা সেই এলোমেলো লোক। পাশেই কঙ্কালসার বৃদ্ধা খেজুরপাতা দিয়ে পাটি বুনছে। জানলাম- ইনি ওই লোকটির মা। আর কেউ নেই ফ্যামিলিতে। চলে কোনোমতে, অথবা চলে না। বিপিএল কার্ড খায় না মাথায় দেয় জানে না। ভোটার কার্ড? আছিল বুধ হয়, এখন আর কিসসু নাই বাপ। কুনোমতে আছি। আমি মইরে গেলে এই হাবাগুবা পুলাডাও...।
বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারি নি সেই অসহায়তার সামনে। তাও তো কতো বছর হয়ে গেল। গাইঘাটার সেই সুদূর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কবে ট্রান্সফার হয়ে চলে এসেছি। মধু জ্যোৎস্নায় আজ ভেসে যাচ্ছে চরাচর। দোলের দিনে আমি পড়ে আছি আমার যন্ত্রণা নিয়ে, তোমার যন্ত্রণা নিয়ে তুমি। আর? আনন্দধারা বহিছে ভুবনে... আনন্দ বসন্ত সমাগমে... বিকশিত প্রীতিকুসুম হে...

রাতের আকাশে ফালতু একটা এনামেলের থালা...

অনির্বাণ দাস

অনির্বাণ দাস


কবিতা আর লেখালেখির জগতে প্রায় পনেরো বছর অতিক্রান্ত অনির্বাণ দাসের। “অহর্নিশ” পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন বহুদিন, বর্তমানে “বাতিঘর” পত্রিকার সম্পাদনায় নিযুক্ত। “ডাকাডাকি”, “এসো”, “বিষণ্ণ আসবাব”, “লোডশেডিঙের মাঠ”, এবং সর্বশেষ কবিতার বই “ব্লেড” পাঠকমহলে সাড়া জাগায়। “ঘটি গরম এসপেশাল” অনির্বাণের প্রথম গদ্যের বই।

আপনার মতামত জানান