অলবিদা অর্কুট

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

আমরা ছিলাম বড্ড একা। সোশ্যালনেটওয়ার্ক শব্দটি তখন আমবাঙালী গৃহবধূর অভিধানে অধরা। অর্কুট সে সময় বেকার হোমমেকারদের কিচেন ব্লাইন্ডসকে সরিয়ে ঢুকে পড়েছিল দমকা একটা ঝোড়ো হাওয়ার মত। সালটা ২০০৮। আমরা যারা বাংলাসাহিত্য নিয়ে একটু বেশি করে বাঁচতে চাই কিম্বা গান নিয়ে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করি তাদের ড্র‌ইংরুমের জবরদোস্ত গসিপ হয়েছিল অর্কুট। আমরা এক আকাশের নীচে ডিজিটাল এক ছাদের আশ্রয়ে মাথা উঁচু করে বলতে শিখেছিলাম, বিতর্ক করতে শিখেছিলাম, আত্মপরিচয়ের গর্বে গৌরবাণ্বিত হয়েছিলাম সেই ছাদবাগানে যার নাম অর্কুট। শয়ে শয়ে কমিউনিটি, হাজার হাজার বন্ধু কত আলো সে বাগানে, কত অজানা ফুল, অচেনা পাখির কলরবে মাতোয়ারা হত অর্কুট। বিতর্ক, ঝগড়াঝাটি, আলাপ আলোচনা সবকিছুর মধ্যে বেঁচে রয়ে গেল কিছু সম্পর্ক, কিছু বন্ধুত্ব।

অর্কুট নস্ট্যালজিয়া নিয়ে লিখতে বসে মনে পড়ে যায় তারা মিউজিক টেলিভিশন চ্যানেলের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান আজ সকালের আমন্ত্রণের কথা। ২০০৮ এ অনুষ্ঠানটি শুরু হয়ে এখনো চলছে রোজ সকালবেলায়। নিয়মিত ঐ অনুষ্ঠানে ফোন করে কবিতা শোনানো ছিল যেন সে সময়ের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। হঠাত সেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকা মৈত্রেয়ী জানালো অর্কুটের এ.এস.এ কমিউনিটির কথা। ব্যাস্‌! সেদিনই আমার শুরু হল অর্কুটে নাম লেখনো। প্রতিদিনের অনুষ্ঠানের সমালোচনা থেকে ভালোমন্দ, শিল্পীদের কাছে গানের অনুরোধ এইসব করতে করতে বন্ধুসংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকল।

এহেন বেকার হোমমেকার তখন পাগলপ্রায়। ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে রেখে স্ট্যেটাস আপডেট করি। প্রেসার কুকারের সিটি উপেক্ষা করে ছবি আপলোড করি। উপছে উঠল বন্ধুত্বের পারদ। উথলে উঠল কমেন্ট। দোল-দুর্গোত্সব তখন অর্কুটময়তায় আচ্ছন্ন। কবিতা লিখতাম অনেকেই। হঠাত একদিন মনে হল অর্কুটের বাগানে কবিতার ফুল ফুটে ঝরে যাবে এভাবে? আমার পার্সোনাল ব্লগ সোনারতরীতে প্রথমে হৈ হৈ করে শুধু অর্কুটের স্টেটাস আপডেট দিয়ে আমরা লিখেছিলাম একরাশ কবিতা যার নাম ছিল “অর্কুট-আগমনী-পাঁচালি । বেশকিছু অর্কুট বন্ধুদের বসন্তের কবিতা নিয়ে “দোলছুট” । আর ঠিক সেবছরেই পয়লাবৈশাখে জায়গা পেয়েছিল “পয়লা-সাহিত্য-পার্বণ । এখন অর্কুট হারিয়ে গেলেও বেঁচে থেকে গেল আমাদের অর্কুট বন্ধুদের সেই সাহিত্য সৃষ্টি।

এতদিন গান আর লেখার সমান্তরাল ভাবে চলছিল জীবনের খুঁটিনাটি । জীবনের আলপথগুলো গুলো চলতে চলতে অনেক বন্ধু এল চারপাশে । একঘেয়েমি কাটল অর্কুটের বাগানে । কেউ ভালোবেসে ছুঁড়ে দিল একরাশ জুঁইভেজা বৃষ্টিকবিতা । কেউ দিল একগোছা শুকনো রজনীগন্ধা । কেউ আবার শিশিরসিক্ত শিউলির গন্ধ নিয়ে সামনাসামনি এসে দাঁড়ালো। আলতো করে ধরে আছি বন্ধুত্বের হাত । ভয় হয়, পাছে দুঃখ পেয়ে বসি । আলগোছে পছন্দ করি বন্ধুর ছবি । ভয় হয়, যদি আঘাত পাই। বন্ধুকে প্রতিদানে হয়ত ফিরিয়েও দি একমুঠো সত্যি শিউলি কিম্বা জুঁইভেজা সন্ধ্যেটা ।

চলতে থাকে জীবন। আলগোছে, আলতো পায়ে । মনের কার্ণিশ বেয়ে নিঃশব্দে উঁকি দেয় এসেমেস। বেজে ওঠে মুঠোফোন ঝন্‌ঝন্‌ । আমার মনোবীণায় সে ঝঙ্কারে হয়ত সামিল হয় অচেনা কোনো পাখি । সে শুধু বলে তুমি একা নও । চলতেই থাকে জীবন ছেঁড়া ছেঁড়া কবিতার ঘ্রাণ নিয়ে, অলস সময় পেরিয়ে যায় বৃষ্টিপথ, ভাবনার গদ্যেরা ভেসে যায় আপন খেয়ালিপথে, আলগোছে, আলতো পায়ে...
মনে মনে অর্কুটের ঋণ স্বীকার করি। মনে পড়ে অঞ্জন দত্তের সেই অমোঘ লিরিকস। তুমি না থাকলে...আমার জীবনটা এত মিষ্টি হতনা, তুমি না থাকলে এত কবিতার সৃষ্টি হতনা।

এখন অর্থাত এই অর্কুটোত্তর সাইবার যুগে দাঁড়িয়ে "আমার ঘরে বসত করে কয় জনা' এর উত্তরে সারা পৃথিবীর অন্ততপক্ষে এক তৃতীয়াংশ মানুষ সোশ্যাল নেটওয়ার্কের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চিত্কার করে সমস্বরে বলবে "এই তো অর্কুট ক্লাবঘরে শ'তিনেক ছাড়িয়ে ট্যুইটার খুপরিতে শ'পাঁচেক আর কেল্লাফতে ফেসবুক পাড়ায় । হাজার ছাড়িয়ে গেলে তুমি তো সেলেব ! স্মার্টফোনের সাথে সোশ্যালনেটের দোস্তি যত বাড়ছে তার ইউসারদের মধ্যেও বাড়ছে সেই বন্ধুত্বের হাতছানি । আর মানুষের ইঁদুর দৌড়ের গতিবেগ যত বাড়ছে তত বাড়ছে স্ট্রেস এবং স্ট্রেন । ফলে কম সময়ে মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে যাবার এই সুবিধে গুলোও মানুষ কাজে লাগাতে শিখেছে বুদ্ধিমানের মত । তাই দোল-দুর্গোত্সবে গ্রিটিংস থেকে শুরু করে জন্মদিন-বিয়ের তারিখ আর হাতের পাঁচ সুপ্রভাত-শুভরাত্রি তো আছেই । তারপর আমি হংকং থেকে হনললু কিম্বা বন্ধু সিকিম থেকে সিঙ্গাপুর পৌঁছিয়েই বার্তা বিনিময় । আমি আজ চিংড়ি না ইলিশ রাঁধলাম তাও জেনে গেল বন্ধু ছবিসমেত । আমার মায়ের রক্তচাপ ঊর্দ্ধমুখী সেও জানলো সারা পৃথিবী । কেউ বা তার বোনের জন্মদিনের কেক কাটার ছবি কেউ আবার শিকাগো কিম্বা টরোন্টোর এয়ারপোর্টে পা দিয়েই সারা দুনিয়াকে জানিয়ে দিল আমি " হেথায় "; কিন্তু কেউ যদি লেখে " আমার খুব বিপদ, কে আছো কোথায় , ছুটে এসো আমার কাছে ' তাহলে সেই অগণিত বন্ধুগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কেউ কি আসবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ? অচেনা, অজানা উড়োমিতে-মিতেনীর দলে কে বন্ধু আর কেই বা অ-বন্ধু বোঝা মুশকিল ।
এখন তো কিটিপার্টি থেকে শুরু করে ঘরোয়া পার্টিতে গৃহবধূদের মুখেও সেই এক কথা । দেখা হলেই " তুই ফেসবুকে আছিস্' কিম্বা ' গুগ্‌ল প্লাসে একাউন্ট খুলেছিস? ' নয়তো যেন তার সোশ্যাল স্টেটাস রক্ষা করাই দায় । কিন্তু একবার বন্ধু হয়ে যাও । ব্যাস! তারপর আর বন্ধুত্বকে কে পায়! সেই অঞ্জন দত্তর গানের মত " তুমি না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হত না ' বলে চালিয়ে যাও স্টেটাস আপডেট । আর যদি তুমি ছন্দের কারসাজি জানো তাহলে তো ফিদা হয়ে যাবে বন্ধুকুল তোমার । দুকুল ছাপিয়ে কাব্য ঝরবে ফেসবুকের আঙিনায় । উপছে পড়বে নাতি-১৪০ সনেট । আর ছন্দ না এলেও,
ক্ষতি কি ! না হয় আজ পড়বে , ফেসবুকে লিটারারি কাব্য !
পড়ল কথা সবার মাঝে, যার কথা তার গায়ে বাজে !
তবু বেঁচে থাক সোশ্যালনেট । একাকীত্বের অবসাদে ভুগছেন এমন অনেক সিনিয়ার সিটিজেনের জন্য, একরাশ মনখারাপের দুপুর নিয়ে অপেক্ষমানা হোমমেকারটির জন্য , প্রোষিতভর্তিকার জন্য আর প্রবাসী ছেলেপুলেদের মা-বাপের জন্য ; ডুবাইলিরে, আমায় ভাসাইলি রে " বলে ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ুন অর্কুট থেকে ফেসবুকে ও সেখান থেকে গুগ্‌লপ্লাসে । ট্যুইট করুন গোটাকতক। বদল করুন প্রোফাইল ছবি মাঝে মাঝে । জগতের হাটের মাঝে আপনার হাঁড়ি ভাঙুন । দেখবেন আপনি আর একা নন । বন্ধুত্বের পারদ যত চড়বে ওপরে আপনিও তত ভালো থাকবেন । সদা থাকো আনন্দে ! হ্যাপি সোশ্যালনেটওয়ার্কিং !

কিন্তু অর্কুট হল সবার প্রথম। তার হাত ধরে এসেছিল বাকীরা। তাই আজ অর্কুটকে চিরকালের মত অলবিদা জানাতে জানাতে আবারো একফোঁটা ঋণ স্বীকার, তুমি এসেছিলে বলে, অথবা তোমার জন্য জীবন আমার এই সব সেন্টিমেন্টাল বাক্যালাপে নাই বা গেলাম । সোশ্যালনেটের জন্মলগ্নে অর্কুট ছিল একমেবমাদ্বিতীয়ম্‌। একফুট বাই একফুট নীল গুগল দ্বীপের প্রথম সোশ্যালনেটের আড্ডার ঠেক।

"অর্কূটে আমি, আর চিরকুটে তুমি…' কবিতাটি লিখেছিলাম সেই অর্কুট যুগে ২০০৯তে। আজ বারবার মনে পড়ছে অর্কুটের বিদায় লগ্নে।

ল্যাপটপ হ’ল অন, পাখা ঘোরে বন বন।
সেথায় পড়ে যে মন, অর্কূট নামে কুঞ্জবন।

অবারিত বিচরণ করে সেথা, লাখে লাখে লোক,
নেশার টানে যায় বারে বার কিসের যেন ঝোঁক।

ব্রাউজারের হাত ধরে, অবলীলায় দরজা খোলে যেখানে,
মাউস নিয়ে চলে সুললিত আঙুলকে সেখানে।

কেউ ঢোকে নিজের নামে,
কেউ আসে ছদ্মনামে,
কেউ শুধু ছাপ ফেলে যায়,
কেউ এসে দেখে চলে যায়...
লিখে যায় স্ক্র্যাপ!!

বোঝাই হয় চিরকুটে অবারিত অর্কূটের ঝুড়ি,
হাতের আঙুলে মাউসের সুড়সুড়ি।
রাতের অন্ধকার ঘুটঘুট,
কেউ না কেউ টাইপ করে চলে খুট খুট…
মুক্তির স্বাদে, বন্ধুত্বের খোঁজে, সামাজিকতার দায়বদ্ধতায়
মনের খোরাকে, কাজের মাঝে, একটু হাঁফ ছাড়ার অপেক্ষায়।
ব্রডব্যান্ডের মিটার ওঠে, ল্যাপটপ বন্ধ হয় না মোটে ।
নেই কাজ তো,শুরু চ্যাট, আবার দেখো করো স্ক্র্যাপ !

“এসে গেছি ভাই, কোথায় তুমি?”
“চলে গেলে কেনো? আসছি আমি,”
“দাঁড়াও না ভাই, বাফারিং চলে তাই,”
“অফিসের তাড়া, সময় যে নাই।”

ছবি আপলোড, কমেন্ট করা,
একঘেয়েমির শেকল ছেঁড়া।
কাব্য, গল্প কত চর্চা,
আমাদের এই রোজনামচা ;
বেশ ভাল আছি, সুখে আছি মোরা,
অর্কূট তুমি, আমি ও আমরা!!!
অর্কূটে আমি, আর চিরকুটে তুমি,
মাঝখানে ডিজিটাল ঢেউ বয়ে যায়….

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে ভালবাসেন, ভালবাসেন নতুন নতুন রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে। গদ্যে পদ্যে সমান সাবলীল ইন্দিরার ব্লগ পড়ুন আদরে...

আপনার মতামত জানান