সুরের বাঁধনে

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

গান মানে কী শুধু সুর- তাল- কথা? গান মানে বুঝি মানুষ নয়? প্রত্যেকটা গানের আলাদা আলাদা মানুষ থাকে, প্রত্যেক মানুষের থাকে আলাদা আলাদা গান। কোনও গান প্রথম বিচ্ছেদের কথা মনে পড়ায়, কোনও গান হারিয়ে ফেলা খুচরো ভালোলাগার কথা আবার কোনও গান মাধ্যমিকের অঙ্ক পরীক্ষার আগের চোখ বন্ধ করা শ্বাস গিলে ফেলা ভয়কে ফিরে দেখায়। কোনও গান মায়ের, কোনও গান দিদিভাইয়ের, আবার কোনও গান পিয়ালীর। ধরো, অনেকদিন পর, মানে গানটির মানুষের কাছে সেই গান শোনার বহুদিন পর তুমি রাস্তায় হাঁটছ একা, কিংবা অনেকে, আকাশে হয়ত মেঘ আছে, হয়ত খুব রোদ কিংবা হয়ত এলইডি আলোয় ঢাকা সপ্তর্ষিমন্ডল– হঠাৎ শুনতে পেলে গানটা, সেইসঙ্গে সঙ্গে গানের মানুষটাকেও শুনতে পাবে। এই ২০১৫'র ল্যান্সডাউন মোড়ে রাস্তা পেরোতে পেরোতে হয়ত তুমি আসলে বসে আছ ১৯৯৯ সালের মফঃস্বলের প্রাইমারী স্কুলে।
যেমন ধরো ''মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর'' এটা মায়ের গান। মা গাইত দুপুরবেলা। সেইসব উঠোন ভর্তি উপচে পড়া দুপুর দেখে বিকেলের জন্য অপেক্ষা আর সইত না, ঘরে আটকে রাখত মা, ঘুমিয়ে পড়ার আগে শুনতে পেতাম ''স্বপনে কি যে কয়েছি তাই গিয়াছ চলি, জাগিয়া কেঁদে ডাকি দেবতায়, প্রিয়তম প্রিয়তম প্রিয়তম''– দুপুরের স্বপ্নে মরচে রঙের মনখারাপ ভিড় করে আসত...আর ঘুমের আড়ালে দেওয়ালে দেওয়ালে অনুরণন শুনতে পেতাম– ''জাগিয়া কেঁদে ডাকি দেবতারে, প্রিয়তম প্রিয়তম প্রিয়তম...''। তখন ক্লাস ফোর, 'প্রিয়তম' শব্দের মানে আমার জানা ছিল।
কোনও কোনও দিন ''মোর প্রিয়া হবে এসো রানি, দেব খোঁপায় তারার ফুল'' গানে আকাশে এক মেয়ের ছবি দেখতে পেতাম, তার মাথায় এক বিশাল খোঁপা, ঠিক ঠাকুমার ঝুলির কঙ্কাবতীর মতো। আর ''রামধনু হতে লাল রং ছানি আলতা পরাব পায়'' তে মায়ের গলায় কেমন কান্না শোনা যেত যেন, ঠিক কান্না নয়, কেমন একটা বালিশে মুখ গুঁজে ফোঁপানোর মতো খানিকটা, অথচ মা তখন দিব্যি রুটি বেলছে গোল করে, আমাদের পড়তে বসিয়ে। তাই বলে কী মা শুধু মনকেমনের গান গাইত? তা নয়, 'ইংটি বিংটি শিংটি উঁকি মারে গাছের আড়াল থেকে''-ও খুব গাইত ''গঙ্গা-যমুনা তীরে চল মন''-ও, কিন্তু যেমন সারাজীবন আনন্দ খুঁজে বেড়ালেও দুঃখের পাতাতেই ডায়েরী ভরে যায়, তেমনই মনকেমন করা গানগুলোই কেনজানিনা এতদিন ধরে স্পষ্ট হয়ে আছে। কেন জানিনা মায়ের গান মানেই– ''একা মোর গানের তরী ভাসিয়ে দিলাম নয়নজলে...কেন মোর গানের ভেলায় এলে না প্রভাত বেলায়? হলে না সুখের সাথী জীবনের প্রথম দোলায়...''
মায়ের মা, আমার দিদিভাই কিন্তু ''হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে'' খুব গাইত। কারণ হিসাবে জেনে গিয়েছিলাম ক্লাস টু-এ প্রাইজের দিনে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এসেছিলেন দিদিভাইয়ের স্কুলে, সেখানে এই গানের সঙ্গে নেচেছিল দিদিভাই। এটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই খুব গর্বিত গলায় দিদিভাই বলত সেইসময় শুধু ফর্সা-সুশ্রী মেয়েদেরই স্কুলে নাচের জন্য ডাকা হত, তাকিয়ে দেখতাম জ্বলজ্বল করছে দিদিভাইয়ের মেরুন পাথরের নাকছাবি। এখনও কোনও গানের স্কুলের বাচ্চা মেয়েকে ''খেলিছে জলদেবী'' কিংবা ''চমকে চমকে থির ভীরু পায়, পল্লীর-বালিকা বনপথে যায়'' গাইতে শুনলে দিদিভাইয়ের মিহি সুরেলা স্বর মনে পড়ে। মনে পড়ে ''বনপথে যায়, একেলা বনপথে যায়'' বারবার কেমন ঝংকারে ঘুরেফিরে আসত লোডশেডিং-এর সন্ধ্যেবেলায়।
পিয়ালীর গান বললেই প্রথমে যে গান পড়ে সেটা কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়, যদিও ওর গলায় আমার প্রথম শোনা গান ''তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী''। তবে ''বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী''-র পর আবার ''তুমি...''তে ফিরে আসার মাঝখানে একবার গলা কেঁপে গিয়েছিল ক্লাস নাইনের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে, তা স্পষ্ট মনে আছে। পিয়ালীর গান মানে ''দিলদরিয়ারে আমি তোর আশায় আশায় রই'', হ্যাঁ কোনও এক বাংলা ব্যান্ডের গান, কিন্তু ‘সবার মাঝি ঘরে ফেরে আমার মাঝি নাই, আমার মাঝি না-আ-আ-আ-আ-ই’-র সময় যে সাংঘাতিক গলায় আটকে থাকা কষ্ট, আর সেই শূন্যতার সঙ্গে মিশে যাওয়া মার্চের সন্ধ্যের গোলাপী-নীল আকাশ, আর দূর থেকে কেমন একটা অচেনা চাপা ভয়ের হাওয়া, ভয় কারণ সামনে মাধ্যমিক- তা কী হঠাত করে বড় হয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়? আরও একটা গান আছে- মণিরত্নমের ‘রাবণ’ সিনেমার ‘বহনে দে...’’, সুরের সম্মোহক রহমান যেন রুক্ষ মরুভূমিতে বরফের ঝর্ণা আনছেন, আর তাতে ডুবে যেতে যেতে দেখতে পাচ্ছি ফোনে নেচার পার্ক খেলছে পিয়ালী। রঙ মেলাচ্ছে রঙিন খোপের। সারাদিন, রাত, পড়তে পড়তে-ঘুমোতে ঘুমোতে ও শুধু রঙিন খোপ দেখছে চারপাশে, আর মনে মনে তাদের মেলাতে মেলাতে গান গাইছে ‘বহনে দে...’’
ছাদের রেলিংএর বাইরে ফেলে আসা এইসব সুরেই তো নিজের হারানো অ্যালবাম খুঁজে পাওয়া যায়। হঠাৎ করে।

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে
কিঙ্কিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কিণীর কবিতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলে।ব্লগার হিসেবে আদরের নৌকায় কিঙ্কিণীর যাত্রা শুরু হল আজ থেকে।পড়ুন এবং জানান কেমন লাগল কিঙ্কিণীর ব্লগ...


আপনার মতামত জানান