অরুন্ধতী

অভীক দত্ত

 

১)
অরুন্ধতী নামটা পুরনো। ওল্ড ফ্যাশন্ড। নামটা মনে পড়লেই কেমন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট দৃশ্যে স্নো হোয়াইট টাইপ মনে পড়ে। সমস্যা হল নামটা মোগল যুগের হলেও মেয়েটা মোটেও সে যুগের না। বরং ঘোরতর ভাবে এ যুগের। ডেটিংয়ের দিন হট প্যান্ট পরে চলে আসতে পারে এবং তখন আমার এবং আমার সাথে তাবৎ চারপাশের পুরুষ জাতির প্যান্ট ভেজার অবস্থা করে ফেলে। আমি যেদিন বলেছিলাম "কি দরকার এসব পরার", আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়েছিল সত্যযুগ হলে ভস্ম হতে এক দশমিক পাঁচ সেকেন্ড লাগত। তারপর থেকে ব্যাজার মুখে আমাকে মেনে নিতে হয়। ব্রেক আপ করার কথাও বলেছিলাম একদিন। দিনে দুপুরে ভরা মলে কান মলে দিয়েছিল। তারপর থেকে আর কিছু বলার সাহস হয়ে ওঠে নি।
ব্রেক আপটা ইচ্ছা করে বলি নি। আসলে তার আগের দিন বন্ধুরা মদের ঠেকে খুব প্যাঁক মেরে দিয়েছিল। এই সব অডি আমাদের মত অটো চালানো ঘরের ছেলে অ্যাফোরড করতে পারবে না এই সব শুনে বার টার খেয়ে ব্রেক আপের কথা বলে ফেলেছিলাম। শুনে কান্না কাটি চেঁচামেচি না করে পাতি কানটা মুলে দিয়ে বলেছিল "ফের যদি শুনি তিন তলা থেকে ঠেলে ফেলে দেব"। তারপর থেকে আমি আর রিস্ক নিই নি। যদি ব্রেক আপ মেনে নিত? পরে ভেবেচিন্তে দেখেছি কথাটা ঠিকই "উপরওয়ালা যা করে, ভালর জন্যই করে"।
২)
-মানুষের আসল সমস্যা কি জানিস?
-কি?
-ফুটো।মুখ কান নাক পিছন আর মেয়েদের তো আরেকটা অ্যাডিশনাল আছেই। ঐ অ্যাডিশনাল পার্টটার জন্যও আবার ছেলেদেরই দৌড়তে হচ্ছে। পেট পরিষ্কার নেই, পেছনের ফুটোর প্রবলেম, নাকে সর্দি, মুখ থেকেই তো বলে যত সমস্যার উদ্ভব, আর ইয়ে মানে... এবার ইউটিলাইজেশন অফ ফুটো যে যে মেয়েরা ঠিক করে করতে পারে তারাই কিন্তু এক্কেবারে সেরা কি বলিস? সাধে কি কিশোর দা গান গেয়ে গেছেন, “এই তো জীবন, হিংসা বিবাদ লোভ ক্ষোভ বিদ্বেষ, ফুটোতেই সব শেষ”
-আরে? এই গানটা আবার কবে গাইলেন উনি?
-তোর মাথায় কি আছে ভাই? আচ্ছা মাল তো। কি করে ঐ চাম্পিটাকে তুললি তুইই জানিস।
সবাই এবার আমায় নিয়ে পড়ল। আমি একটা সাধারন প্রশ্ন করেছিলাম শুধু কিশোর কুমার ঐ গানটা কবে গাইলেন। পাশ থেকে আরেকজন ফুট কাটল
“তুলল মানে কি? কে কাকে তুলবে? আরে মামণিদের ঘর টর মোছার জন্যও তো কিংবা এদিক ওদিক নিয়ে যাবার জন্যও তো বডি গার্ড দরকার হয়। আমাদের তথা হচ্ছে তাই। তোরা কি বয়ফ্রেন্ড ভেবে বসলি ওকে? তোরাও দেখছি সব বড় বড় গান্ডু”
আরেকজন বলল “ভাই ঐ পা যে কত ছেলে দিয়ে চাটিয়েছে তা ঐ মামণি নিজেও জানে না”।
শুরু হয়ে গেল ওদের। ওরা আসলে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না অরুন্ধতী আমার মত একটা কেলানের গার্লফ্রেন্ড হতে পারে। অরুন্ধতীর নামে ওরা যা নয় তাই বলে যায়। যে ছেলেটা লাস্টে এই কথাটা বলল সেই সকাল সন্ধ্যে ফেসবুকে অরুন্ধতীকে কুৎসিত সব মেসেজ পাঠাত। শেষে ওকে ব্লক করে দেয় ও। তার সবই আমি দেখেছি। অরুন্ধতী মেসেজগুলি আমাকে দেখিয়ে বলে “তোমার রাগ হয় না?”
আমি বলি “না”। অরুন্ধতী কিছুক্ষণ নিজের মাথাটাথা চেপে বসে থাকে। কথাটথাও বন্ধ থাকে। তারপর রাতে টেক্সট করে বলে “আমি অনেক ভেবে দেখলাম তুমিই ঠিক। এই সব ইউজলেস ফ্রাস্ট্রেটেড ছেলেদের কথায় রাগারাগি করে নিজের শরীর খারাপ করার কোন যুক্তিই নেই আসলে। ইউ নো, ইউ আর এ পারফেক্ট ম্যান?”
টেক্সটটা অনেকক্ষণ ভাবায় আমায়। আমি পারফেক্ট? নাহ... আমার অনেক দোষ আছে। আমি গান্ডু, সব ব্যাপারে কম রি অ্যাকশান দি, বুঝি কম, অরুন্ধতীর ব্যাপারে ঠেকে সবাই যেমন কুৎসিত ভাষায় কথা বলে আমার মাথার মধ্যে যে আগুনটা জ্বলা উচিত, সেটা জ্বলে না... আসলে আমি পারফেক্ট না। কিন্তু আমার লিমিটটা আমি বোধ হয় জানি। সেটা জানাই আমার পক্ষে দরকার।
৩)
অরুন্ধতী মানে জান তো?
ঐ তো তারা টারা হবে কিছু একটা
লজ্জাও হয় না। জি এফের নামের মানে জানে না, ছি ছি ছি।
কেন লজ্জা হবে, নাম জেনে কি হবে?
কি আর হবে। তবু...
অরুন্ধতী কিছু বলল না, একটু রাগলও বোধ হয়। নন্দন চত্বরে বসে আছি। কেউ কেউ এর মধ্যেই হাতের কাজ শুরু করে দিয়েছে। অরুন্ধতী আজ সালোয়ার কামিজ পরে এসছে আমাকে অবাক করে। দু তিন বার জিজ্ঞেস করেছি, এড়িয়ে যাচ্ছে কারণটা। এখন নামের মানে নিয়ে পড়েছে। আমি মানেটা জানি। ইচ্ছা করে ওকে রাগাবার জন্য মানে টা বলব না। এটার অবশ্য পজিটিভ আর নেগেটিভ দিক দুটোই আছে। পজিটিভ দিক হল ও রাগলে ওর নাক আর ঠোঁটের মাঝখানের নো ম্যান্স ল্যান্ডটায় একটু একটু ঘাম জমতে থাকে। নেগেটিভ দিক হল ঐ জায়গাটা তখন আমার ঠোঁট দিয়ে চেটে দেবার যে বন্য ইচ্ছেটা হয় সেটা চেপে যেতে হয়। কারণ ঐ সময় ও এতটাই রেগে থাকে যে আমার রিপ্রোডাকটিভ অর্গানটাকে লাথি মেরে নন প্রোডাকটিভ করে দিতে পারে।
আমি একবার আড়চোখে ওর ঠোঁটের ওপরটা দেখে নিলাম। হ্যাঁ, ঈশান কোণে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে বটে। মনে মনে একচোট হেসে বললাম “অরুন্ধতী নামের মানে আমার মনে হয় ঐ ১৯২০-৩০ সালের বাংলা ডিকশনারিতে পাওয়া যাবে কি বল?”
অরুন্ধতী রাগছে, একফোঁটা দু ফোঁটা করে ঘাম জড়ো হচ্ছে, আমি কি মনে হল টপিক চেঞ্জ করে আগের প্রশ্নটাই করে ফেললাম, “বললি না তো আজ সালোয়ার কেন?”
মেঘ ছিলই, এবার বাজ পড়ল “তোমার চোখে কি ন্যাবা হয়েছে নাকি? দেখতে পাচ্ছ না? এটা তোমারই দেওয়া অনলাইন থেকে। কাল এসছে, আজ পরলাম। সত্যি মাইরি, আজব পাবলিক তুমি”।
আমি জিভ কাটলাম। ঈশ রে, তাই তো। চারদিন আগে আমিই তো টিউশনের জমানো টাকায় কিনেছিলাম।বললাম “মালগুলো এত তাড়াতাড়ি ডেলিভারি দেবে আমি কি করে জানব? শোন না, আমাদের বাচ্চা হবার সময় আমরা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে দেব কি বল? ন মাসের জায়গায় ন দিনে দিয়ে দেবে?”
অরুন্ধতী হাসল। আমি আর দেরী করলাম না। চাদ্দিক দেখে নো ম্যান্স ল্যান্ডটা দখল করতে ঝাঁপ দিলাম।
৪)
-তোর মালটা কিন্তু সবাইকেই দেয় মামা। সাবধানে থাকিস। সেদিন দেখলাম সি এসের এক সিনিয়রের সাথে বিরাট মাখো মাখো ব্যাপার। একটু সিসিটিভি হ ভাই।
বলল অনিন্দ্য। আর কথাটা শেষ হতেই ওরা সব ফ্যাচ ফ্যাচ করে হাসা শুরু করল। আমি এমনিই হাসলাম। আমার হাসি দেখে ওরা বুঝল আমার ঝাঁট জ্বালাতে সফল হয় নি। এবার অরিত্র অন্য উইং থেকে আক্রমণ শানালো “ভাই শুয়েছিস তো মালটার সাথে? নাভিটা কেমন বল না ভাই? ডিপ”। বলে জিভ দিয়ে একটা সুরুৎ করে শব্দ করল। আমি বুঝলাম ইচ্ছা করে আমাকে রাগাতে চাইছে। আমি উত্তর দেব না দেব না করেও দিয়ে দিলাম “বলছি আমার মাল যেরকমই হোক, তোর এত চুদুরবুদুর কেন? যা না, দম থাকে তো এরকম একটা তুলে দেখা না”।
আমি সচরাচর উত্তর দিই না। এই উত্তরটা শুনে বেশ চিড়বিড়িয়ে উঠল ওরা। একজন বলল “ভাই যাই বল, তোদের এই সব কলেজ লাভ কলেজ অবধিই থাকবে। পাস আউটের পর ঐ ছামিয়া তোমার পেছনে একটা রবার্তো কার্লোসের ফ্রিকিক মেরে ভাগবে এটা বলে দিলাম দেখে নিস”।
এবারও আমি ভাবলেশহীন গলায় উত্তর দিলাম “ভাগলে ভাগবে। তাতে কারও বাপের কোন যায় আসবে না”।
এরকম উত্তর আশা করে নি ওরা। খানিকটা দমে গেল। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ভিতরে ভিতরে ফুঁসছে। কয়েক সেকেন্ডের একটা পজ নিয়ে বলল “বাপ আনলি কেন ভাই? বাপকে তো আনার কোন দরকার ছিল না”।
আমি হাসিমুখেই বললাম “আমার জি এফ টানলে আমার তোদের বাপ তার বাপ তার গুষ্টির সবাইকে টানার রাইট চলে আসে যে। ভেবে দেখ ভুল কিছু বলছি না”।
অরিত্র তেড়িয়া হয়ে বলল “খুব জিএফ জি এফ করছিস, কিছু করতে পেরেছিস বাল? শুধু বড় বড় বাতেলা মারছিস? বললাম তো তোকে কাজের লোক করে রেখে দেবে”।
আমি বললাম “আমি তো সেই একই কথা রিপিট করে যাচ্ছি। তাতে তোদের কারও বাপের কোন যায় আসবে না। আমার বাপ কি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে তোদের কারো সাথে কোন রকম কন্ট্রাক্ট সাইন করেছে?”
আমার কথা শুনে ওরা চুপ করে গেল। কিন্তু আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম বেশ ভালমতোই জ্বলেছে ওদের। এত সহজে ছেড়ে দেবে না ওরা।
৫)
আমি যত ভাবি ওদের কোন কথা শুনব না, তবু ওরা সফল হয়। মাঝে মাঝে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। ভীষণ ইনসিকিউরিটি আসে ভিতরে ভিতরে। ভয় হয়, যদি অরুন্ধতী আমাকে ছেড়ে দেয়। আসলে অবচেতন মনটা এমন একটা জায়গা যেখানে আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সেই মনটা হল যত নষ্টের গোঁড়া। ভাবতে না চাইলেও ভাবিয়ে দেয়। ঠিক মনে করিয়ে দেয় “ওহে এত ফ্রি থেকো না বাপু, ওরা কিন্তু ঠিকই বলছে, ঐ মেয়ে তোমাকে একদিন ঠিক লেঙ্গি মেরে ভেগে যাবে”। আমার ভালো মনটা যতই তার পুরনো দিনের ঢাল তলোয়ার নিয়ে লড়ে যাক, শেষ মেষ দেখা যায় অত্যাধুনিক অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে ময়দানে নামা অবচেতন মনটা ঠিক জিতে যায়।
আমার পরে অনেকবার মনে হয়েছে সেমিস্টার ব্রেকের সময় আমি অরিত্রর কথাটা শুনব না শুনব না করেও শুনে ফেললাম কেন।ডিফেন্সটা তো দুর্দান্তই ছিল আমার। সেটা কি করে ওরকম তাসের ঘরের মত ভেঙে গেছিল!
সেটা ছিল ডিসেম্বরের শেষ দিক। অরিত্র আমাকে হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েছিল “কিরে, নিজের ছামিয়ার উপরে খুব ভরসা না? অত যদি ভরসা করিস তো কাল দুপুর দুটোর দিকে সি বির রুমে একবার হঠাৎ করে ঢুকে দেখিস। দেখবি তোর মামণি প্রোজেক্ট মার্কস বাড়ানোর জন্য কি কি করে। আর হ্যাঁ, আগে থেকে জানিয়ে গেলে কিন্তু কিছুই দেখতে পাবি না”।
মেসেজটা আসার পর আমার সারারাত সেদিন ঘুম হয় নি। অরুন্ধতী ফোন করায় বাড়িতে বাবা একটা কাজ দিয়েছে বলে কাটিয়ে দিয়েছিলাম। পরের দিন চুপচাপ কলেজ পৌঁছলাম দুপুরের দিকে। ফাঁকা কলেজ। সেমিস্টার ব্রেকের সময় কয়েক জন ফ্যাকাল্টি ছাড়া কেউ থাকে না। তাড়াতাড়ি কলেজে ঢুকে সরাসরি সি বির ঘরের দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকতেই দেখি সিবির সামনে অরুন্ধতী বসে আছে। সকালেই ও জিজ্ঞেস করেছিল বিকেলে কি করছি, তখন বলেছিলাম ম্যাচ আছে। আমি যে ওভাবে আসব সেটা ওর এক্সপেক্টেশনের বাইরে ছিল। আমাকে দেখে অবাক হয়ে বলল “তুমি এখানে?”
আমার তখন হঠাৎ মাথায় ভিসুভিয়াস ভর করেছে। আমি সিবির সামনেই বিশ্রী করে চেঁচালাম “তুইই বা এখানে কি করছিস?”
অরুন্ধতী বুঝতে পেরে গেল আমি কি মিন করছি। সিবির সামনে থেকে আমাকে ঠেলে বাইরে নিয়ে গেল, আমি তখন সব কিছু বোঝা বুঝির বাইরে, ওর হাত টাত ছাড়িয়ে বাইরের দিকে হাঁটা লাগালাম। ও আমাকে বেশ খানিকটা ফলো করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপরে খান পঞ্চাশেক ফোন করেছিল। ধরি নি। হোয়াটস আর ফেসবুকে ব্লক করে দিয়েছিলাম।
৬)
পুজো শুরুর আগে সবার আলাদা উৎসাহ থাকে। উত্তেজনার মাত্রাটা অনেক বেশি থাকে। প্যান্ডেলে বাঁশ পড়বে তার ব্যাপারটাই যেন আলাদা। আর তারপর পুজো শেষ হয়ে যায়, প্রতিমা বিসর্জনটাও হয়ে যায়, একা একা বাঁশের প্যান্ডেলটা কেমন নেড়ু পাগলার মত দাঁড়িয়ে থাকে।
আমার সাথে ঐ প্যান্ডেলটার কোন তফাৎ খুঁজে পাই না আজকাল। সেমিস্টার ব্রেকের পর এমনিতেও কলেজ খুলতে দেরী আছে, পনেরো দিন পর খুলবে। ফোন অফ করা থাকে। ভুলেও অন করি না। একা একা কম্পিউটার গেম খেলি। রাতে ঘুম না এলে জেগে বসে থাকি। একটা অসহ্য কষ্ট হয় তখন। মনে হয় ও আমার সাথে এটা করতে পারল! কলেজ খুললেই অরিত্ররা খুব খুশি হবে সেটাও বুঝতে পেরেছি। ঠিক করে নিয়েছি এবার শুধু মুখ গুঁজে ক্লাস করব। যে যা বলে বলুক কান দেব না কোন। এমনিতেই বাপ মা অনেক কষ্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ায় এর পরে আর কোন সম্পর্কে জড়িয়ে নিজের ফিউচারটাকে এভাবে নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
এর মধ্যেই জোর করে বাড়ি থেকে নিয়ে গেল পিকনিকে। পিকনিক ইত্যাদিতে আমার কোন দিনই খুব একটা যাবার ইচ্ছা থাকে না। ইদানিং তো আরও থাকত না। কিন্তু কিছু করার ছিল না। বাবার অফিস থেকে নিয়ে যাচ্ছে। বাবারও তো কলিগদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেলের মুখ দেখাতে ইচ্ছে করে।
৭)
“পিউ। তুমি?”
হাসি হাসি যে মুখটা আমার নাম জানতে চাইছিল সে আমার বাবার কলিগ সুমন্ত কাকুর মেয়ে। বাবা মাঝে মাঝে বাড়িতে বলে পিউ যখন হয়েছিল তখন নাকি ঠাট্টা করে বাবা বলেছিল পিউর সাথে আমার বিয়ে দেবে। ব্যাপারটা সেই ঘিসাপিটা বাংলা সিনেমা লেভেলের হয়ে যাবার মত ব্যাপার আর কি।
অশোকনগর কল্যাণগড়ের এই পার্কটা বিরাট। কিন্তু অনেক গুলির পিকনিক পার্টি আসার ফলে এত গ্যাঞ্জাম যে চুপচাপ একটা পুকুরের পাশে এসে বসে ছিলাম। যেদিকে তাকানো যায় সব জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে। আর আমি বসে বসে জল দেখছিলাম। পিউর প্রশ্ন শুনে বললাম “তোমার নাম শুনেছি। তুমি সুমন্ত কাকুর মেয়ে তো?”
পিউ হাসল। তারপর আমার পাশের বেঞ্চিতে এসে বসল। বলল “হ্যাঁ। আচ্ছা তোমার কি মুডটা ভীষণ অফ? সবাই একদিকে মজা করছে আর তুমি একা একা বসে আছ? কি ব্যাপার বলত?”
আমি বললাম “আসলে আমার এই বিকট শব্দগুলিতে মাথা ধরে যায়। আমি এখানে আসতেও চাই নি। বাবাই নিয়ে এল জোর করে”।
পিউ অবাক হয়ে বলল “সেম হিয়ার। বিলিভ মি। এরকম নয়েজ আমার একদম পোষায় না। আর আমার বাবাও আমাকে জোর করে নিয়ে এল। হোয়াট আ কোইন্সিডেন্স!”
আমি হেসে দিলাম। বললাম “আসলে বাবাদের মনে হয় অফিসে দেখাতে হয়, এই দেখ আসলেই আমার ছেলে আছে”।
পিউও হাসল “তাই হবে। আচ্ছা তুমি তো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছ না?”
“হ্যাঁ আর তুমি?”
“সাইকোলজি। সেকেন্ড ইয়ার। কিন্তু যা অবস্থা, পড়ার চাপে খুব শিগগির সাইকো হয়ে যেতে হবে”।
পিউ ওর মোবাইল বের করল। হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ চেক করতে করতে বলল “উফ এই কলেজের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপটা না মাথা খারাপ করে দেয়। সারাক্ষণ কিছু না কিছু নোটিফিকেশন আসছেই”।
আমি বললাম “নোটিফিকেশন অফ করে দিলেই তো পার”।
পিউ হেসে বলল “করি না। কখন কি ক্লাস আছে কোনটা বাঙ্ক করতে হবে এগুলি এখান থেকেই ডিসিশান হয়ে যায় তো। তুমি হোয়াটস অ্যাপে আছ নাকি?”
আমি মাথা নাড়লাম “ছিলাম। এখন কদিন হল ফোন অফ রেখে দিয়েছি”।
পিউ চোখ বড় বড় করল “অ্যাঁ! তুমি কি সেই টেকনোলজি থেকে দূরে থাকার প্ল্যান প্রোগ্রামের পার্টিসিপ্যান্ট নাকি?”
আমি হাসলাম “না না সেরকম কিছু না, আবার অনেকটা সেরকমই”।
পিউ বলল “ওহ। তাহলে নিশ্চয়ই রিলেশনশিপ প্রবলেম বল? ওয়েট ওয়েট! আমার তো এটা মাথায় আসে নি। এভাবে একা একা বসে থাকা, ফোন অফ করে দেওয়া, নিশ্চয়ই কিছু কেস আছে বল?”
আমি কাটালাম “না না সেসব কিছু না। আসলে অ্যাডিক্টেড হয়ে যাচ্ছিলাম ফোনে। পড়াশুনা হচ্ছিল না মন দিয়ে। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসার চেষ্টা বলতে পার”।
পিউ বলল “ওহ গড। যা বলেছ। পড়া টড়া মাথায় উঠেছে। আচ্ছা তুমি ফেসবুকে তো আছ?”
আমি হ্যাঁ বললাম। পিউ নিজেই ফোন ঘেটেঘুটে বের করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল।
তারপর বলল “পাঠিয়ে দিলাম। অ্যাক্সেপ্ট করে নিও যখন অন হবে। আচ্ছা আমরা তো উইকেন্ডগুলো মিট করতে পারি। আমার ভীষণ বোরিং কাটে জান! বন্ধুগুলি সব বাড়ি চলে যায়। ঐ দুদিন কি করব বুঝতে পারি না”।
আমি বললাম “শিওর। আমারও অনেকটা সেরকমই হাল। তুমি নর্থে থাক?”
পিউ বলল “হ্যাঁ কিন্তু তাতে চাপ নেই, মেট্রো আছে তো। কোথায় মিট করবে বল”।
আমি বললাম “উইকেন্ডগুলো নাটক ভাল থাকলে দেখা যেতে পারে। সিনেমাও নট ব্যাড”।
পিউ হাসল “একদম। সত্যি। বাঁচালে। এই জঘন্য উইকেন্ডগুলো থেকে বাঁচানোর জন্য তোমাকে একটা বন্য থ্যাঙ্কস”।
এতদিন একা একা গুমরে গুমরে থেকে আমার একটু ভাল লাগতে শুরু করেছিল। পিউর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করলাম।
৮)
কলেজ খুলল। আমি ক্লাস করা শুরু করলাম। একবারের জন্যও ঠেকে আড্ডা মারতে যাই না। অরিত্র অনিন্দ্যরা যাই বলুক আমি পাত্তাই দিই না। প্রথম তিন দিন বারবার দরজার দিকে চোখ চলে যেত। অরুন্ধতী যখনই ক্লাস বাঙ্ক করে বাইরে এসে দাঁড়াত আমি বেরিয়ে যেতাম। এখনও অবচেতন ভাবে চোখ চলে যাচ্ছিল দরজার বাইরে। কখনও কখনও মনে হচ্ছিল যদি দাঁড়ায় কি করব।
কিন্তু নাহ। অরুন্ধতীকে একবারের জন্যও দেখা গেল না। আমিও দেখি না। ক্লাস করি, ল্যাব করি, তারপর বেরিয়ে যাই কলেজ থেকে। কে কি বলল, না বলল একবারের জন্যও কানে নিই না।
শুক্রবার দুটো ক্লাসের মধ্যে একটা গ্যাপ ছিল। লাইব্রেরিতে গেছি বই তুলতে, আর গেটে সামনা সামনি অরুন্ধতীর সাথে দেখা হয়ে গেল। আমার হঠাৎ করে হার্টবিট মিস করল। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম প্রতিবার ওর সাথে দেখা করার সময় যেরকম ব্লাড সার্কুলেশন বেড়ে যায় সেরকম অবস্থা হয়েছে।কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করতে চেষ্টা করলাম। আমি জানি কন্ট্রোল আমাকে করতেই হবে। অরুন্ধতীর দিকে না তাকিয়ে চলে যাচ্ছিলাম ও পথ আটকাল। বলল “কি ব্যাপার?”
ওর গলায় বেশ একটা ঠাণ্ডা ভাব থাকে রেগে গেলে যেটা শুনলে আমার বেশ ভয়ই হয়। আমি তবু মচকালাম না “কি ব্যাপার মানে?”
অরুন্ধতী বলল “তুমি আমার সাথে কোন রকম রিলেশন রাখতে চাও না একটা ভুল ধারণার জন্য তাই তো? সেটা ঠিক আছে কিন্তু আমাকে তো বলতে দিতে হবে। তুমি যেটা ভাবছ সেটা তো অ্যাবসারড। আমি তো ভাবতাম ঠিক ভুল বোঝার বুদ্ধিটা তোমার আছে। কিন্তু তুমি কে না কি বলল তার ওপর বেস করে এরকম পাগলামি শুরু করে দিলে?”
আমি আড়চোখে দেখলাম আমাদের দেখে একটা হালকা ক্রাউড হচ্ছে।
আমি মরিয়া হলাম “সব বুদ্ধিই আমার আছে। এখন পথ ছাড়। পাগলামিটা তুই করছিস। গোটা ক্লাসের লোক দেখছে এসব”।
অরুন্ধতী বলল “দেখুক। সবার দেখার দরকার আছে তোমার মত একটা গান্ডুকে যে বন্ধুদের কথায় নিজের গার্লফ্রেন্ডকে ডিচ করতে পারে”।
আমি রাগলাম এবার “ডিচ আমি করেছি? ডিচ করেছিস তুই। একটু নাম্বারের জন্য ছি ছি ছিঃ”
অরুন্ধতী ফুঁসে উঠল “তুমি একটা স্পাইনলেস ক্রিচার। ভালই হয়েছে তোমার মত বালের সাথে আমার কোন রিলেশন নেই। কে কি বলবে সে নিয়ে রোজ একটা করে ইস্যু ক্রিয়েট করা তোমার স্বভাব হয়ে গেছে। আই অ্যাম সিক অফ ইট। শোন যা হয়েছে ঠিক হয়েছে। যা করেছ ঠিক করেছ। বাই”।
অরুন্ধতী চলে যাচ্ছিল, ওর কথা শুনে আমার মাথার ভেতর আগুন জ্বলে উঠল, আমি... আমি একটা স্পাইনলেস ক্রিচার? আমি ঐ সবার মধ্যেই চেঁচিয়ে উঠলাম “আর তুই? তুই সতী!!! শালা সিবির সাথে শুস লজ্জা করে না তোর? নাম্বারের জন্য আর কি করতে বাকি রেখেছিস খানকি শালা? আর শোন তোর মত না অনেক আসবে যাবে। আই অ্যাম অলরেডি ইন আ রিলেশনশিপ। সো গো টু হেল”।
কথাগুলি বলার সময় বুঝতে পারছিলাম একটা খুব বাজে সিন ক্রিয়েট হচ্ছে চারদিকে। বলে তাই আর দাঁড়ালাম না সেখানে। জোরে জোরে পা ফেলে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে গেলাম।
৯)
“ভাই। কিছু মনে করিস না। এমন হয়”। অরিত্র কাঁধে একটা হাত রাখল। সরিয়ে দিলাম হাতটা।
ঠেকে এসে বসেছি লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে। অফিসিয়ালি ব্রেক আপ হয়েছে আমার রীতিমত সীন ক্রিয়েট করে। আর কে কি বলল শুনে কি করব। চুপচাপ বসে রইলাম। অনিন্দ্য বলল “আরে এসব পিস যাবে আসবে, তোকে তো বলেইছিলাম ভাই এসব মেয়ে আমাদের জন্য না। এরা সব করতে পারে। কাল তোকে ইউজ করছিল আজ হয়ত আমাকে ইউজ করবে। এরা এরকমই। দেখ না পড়তে এসেছিস পড়ে যা। চিন্তা করিস না ভাই”।
পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম আমি ওদের দিকে না তাকিয়েও যে আমাকে রীতিমত খোরাক করা শুরু করেছে ওরা। খোরাক করুক আর যাই করুক আমি একটাও উত্তর দিচ্ছিলাম না। অরিত্র বলল “ভাই মন খারাপ করিস না। আর তুই যে ওকে ঢপটা দিলি তুই আবার রিলেশনশিপে আছিস এটা চাবুক দিলি ভাই। এটার দরকার ছিল। মালটা আর তোকে ঝাঁট জ্বালাতে আসবে না”।
অনিন্দ্য খিক খিক করে হাসতে লাগল অরিত্রর কথা শুনে “হ্যাঁ বাড়া, মালটা এমনভাবে বলল যে মাগীটার পুরো ঝাঁট জ্বলে গেছে। আরেকটা রিলেশনশিপ... খ্যাক খ্যাক”।
আমি এবার ওদের দিকে ফিরলাম। তারপর বললাম “শোন বাঁড়া, সবাইকে তোদের মত হিংসুটে বাল আর মিথ্যেবাদী ভাবিস কেন? ঢপ মারব কেন? আমি সত্যিই একটা রিলেশনশিপে আছি। আর হ্যাঁ। যদি চাস, তাহলে আজ রাতেই সেই মেয়েটার সাথে ফেসবুকে একটা ফটো আপ করে দেখিয়ে দিতে পারি। তাতেও বিশ্বাস না হলে দেখবি আমাদের হোয়াটস অ্যাপ চ্যাট গুলি? আর কাকে মাগী বলছিস? তোরা তো মেয়েদেরও অধম। লোকের বরবাদিতে পার্টি করিস। যা আগে নিজেদের ট্রিটমেন্ট করা শুয়োরের বাচ্চাগুলো”।
ওদের উল্লসিত মুখ গুলো নিমেষে পাংশু হয়ে গেল।
১০)
“তোমার জিএফ ছিল বল নি তো”।
হাসি হাসি মুখ করে কথাটা বলল পিউ।
আমরা এখন রাস্তায় হাঁটছি। শ্যামবাজারে মেট্রোতে নেমে পিউদের বাড়ির কাছাকাছিই হাঁটছি। উত্তর কলকাতার অলি গলি দিয়ে। কেমন একটা গন্ধ ভেসে আসছে। একটু বড় রাস্তাতে ক্রিকেট খেলা চলছে। আজ রবিবার বলে ছুটির মেজাজ আছে। আমি শুনেছিলাম উত্তর কলকাতার গলিতে দারুণ ক্রিকেট খেলা হয়, আমার ক্লাসেরই এক বন্ধু একবার বলেছিল এখানে আসতে তখন খুব একটা কানে দিই নি। এখন এই জমজমাট খেলাটা দেখে মনে হচ্ছিল একটু খেললে মন্দ হত না। ছোট বেলায় পাড়ায় দারুণ খেলা হত। এখন কেউ খেলে না। সবাই সাইবার কাফেতে গেম খেলতে ব্যস্ত। আর আমরা প্রেম করতে।
উত্তর কলকাতা সেই ব্যাপারটা ধরে রেখেছে দেখে ভাল লাগল। চারদিকের পরিবেশটা বেশ মন ভাল করে দেওয়ার মতই। পিউর প্রশ্নশুনে বললাম “কি করে জানলে?”
পিউ হেসে বলল “এ আবার কঠিন কি। তোমার তো ফেসবুক প্রোফাইল খুললেই বোঝা যায়। ভর্তি শুধু ঐ মেয়েটার সাথে তোমার ফটোতে। তা ব্রেক আপ হয়ে গেছে?”
আমি রাগ দুঃখ অভিমান বর্জিত রোবটের মত গলায় বললাম “হ্যাঁ। এই তো কদিন আগে”।
“ওহ ঐ জন্যই তাহলে কদিন গুহামানব মোডে ছিলে তাই তো?”
আমি হাসলাম এবার “হ্যাঁ”। একটা ছেলে ছয় মেরেছে। বলটা বাউন্ডারির বাইরে থেকে গড়িয়ে আমার পায়ের কাছে এল। সেটা তুলে ওদের দিকে ছুঁড়ে মারলাম।
পিউ বলল “আমার বয়ফ্রেন্ড ছিল কিনা জিজ্ঞেস করলে না?”
আমি বললাম “কি হবে জেনে? পাস্ট ইজ ডাস্ট। ধুলো হয়ে যাক পুরনো স্মৃতি”।
পিউ বলল “না, তবু জেনে রাখা উচিত”।
আমি হাসলাম আর এই হাসিটার সূত্র ধরেই যেন একটা বেশ লম্বা চওড়া ছেলে আমাদের রাস্তা আটকে দাঁড়াল। পিউর মুখটা পানসে হতে দেখলাম নিমেষে। আমি বললাম “কি ব্যাপার?” পিউ অস্ফুটে বলল “আমার এক্স”।
ছেলেটা আমার গলায় একটা ধাক্কা মেরে বলল “এই শুয়োর তুই কে বে?”
পিউ ছেলেটাকে আটকাতে চাইল “রণ, হোয়াট ইজ দিস? এটা কি হচ্ছে?”
রণ নামের ছেলেটা পিউর দিকে রক্তচক্ষুতে তাকিয়ে বলল “একদম কথা বলবি না। আমি ওর সাথে কথা বলছি। এই, তুই কে বল এক্ষুণি”।
যে ধাক্কাটা মেরেছে সেটাতেই আমার গলায় বেশ ব্যথা করছিল। আমি সেটা সামলাতে সামলাতেই বললাম “আমি পিউর বন্ধু”।
কথাটা শেষ হতে না হতেই একটা বিরাশি শিক্কার ঘুষি এসে পড়ল আমার নাকে। কান মাথা সব ঝন ঝন করে উঠল। ঠোঁটে একটা নোনা স্বাদ পেলাম। বুঝলাম নাক থেকে রক্ত গড়াচ্ছে।
আমি ছেলেটাকে বাঁধা দিতে গেলাম “তুমি আমাকে অকারণ মারছ কেন বলত?”
ছেলেটা আরেকটা ঘুষি চালাল নাকে। আমি টাল সামলাতে না পেরে পড়েই গেলাম রাস্তায়। ক্রিকেটের ছেলেগুলি খেলা থামিয়ে এদিকের সীন দেখছে। পিউ রাস্তার পাশে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। আর ছেলেটা আমাকে কোন দিক না দেখে মেরে যেতে লাগল।
১১)
একা একা শুয়ে থাকি। মোবাইল একবার অন করি, আরেকবার অফ করি। হোয়াটস অ্যাপে পিউয়ের কাকুতি মিনতি চলতে থাকে। “প্লিস কাউকে বোল না। রণ আসলে এরকমই। ভীষণ পজেসিভ ছিল। সেদিন আসলে তোমাকে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারে নি”।
আমি রিপ্লাই করি না। ও ফোন করে। আবার ফোন অফ করে দি। আসলে আমি ভেবে দেখেছি এটা আমার সাথে হওয়ারই ছিল। মেয়ে ব্যাপারটা বোধ হয় আমার সাথে যায় না। মেয়ে মানেই কেমন একটা রহস্যময় ব্যাপার। যে একটা কথা বলবে, আর বাকি হাজারটা কথা ব্রা-র তলায় লুকিয়ে রেখে দেবে। মাঝে মাঝে মনে হয় পিউ তো জানত রণ পজেসিভ তাহলে শ্যামবাজারে আমাকে ডাকল কেন! ও তো সাউথেই আসতে পারত। ছেলেটা হঠাৎ করে আমাকে মারতে শুরু করল। আমি তো প্রস্তুতই ছিলাম না। কি কেন অকারণ মেরে গেল। বাড়ি যখন এলাম ঠোঁট মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। মা আঁতকে উঠল। বলল “কি হয়েছে তোর?”
আমি বললাম বাসে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ফার্স্ট এইড করে নার্সিং হোম নিয়ে যেতে জানা গেল মাথায় বড় সড় চোট লেগেছে। বেশ কিছুদিন বাড়িতে বিশ্রাম নিতে হবে। কলেজের বেশ কিছু ক্লাস মিস হয়ে গেল। শুয়ে থাকাই ভবিতব্য আসলে।
শুয়ে থাকতে থাকতে যখন চোখ বন্ধ হয় তখন পিউ আসে না। আসে অরুন্ধতী। ও যখনই আসে আমি চোখ খুলে ফেলি। কি হবে ভেবে! সবাই আসলে সমান। বাবা এত কষ্ট করে পড়াচ্ছে, এখন কনসেন্ট্রেট করতে হবে পড়াতেই। চাকরি বাকরি পেলে কত আসবে। কত যাবে। তখন দেখা যাবে যা হবার হবে।
এক বিকেলে শুয়ে আছি হঠাৎ মা এসে বলল “দেখ তো তোর কলেজ থেকে কে দেখতে এসেছে”।
আমি উঠে বসলাম বিছানায়। আর আমার সেই হার্টবিট বন্ধ হবার উপক্রম করে, বুকে ভুভুজেলা বাজিয়ে অরুন্ধতী আমার ঘরে ঢুকল। মা বলল “তোরা কথা বল আমি কিছু বানাই”। আমাকে ইশারায় বলল “কে রে?” আমি হাসলাম শুধু।
অরুন্ধতী এসে বসল আমার বিছানায়। বলল “খুব মেরেছে তো দেখছি। প্রেম করার শখ মিটেছে তাহলে?”
আমি আবার হাসলাম। সব কথার উত্তর দিয়ে লাভ নেই।
অরুন্ধতী আমার কানে হাত দিল “ঈশ, আমার এই নরম কানটাও ছাড়েনি দেখছি। তা কে এভাবে ফেলে ক্যালাল?”
আমি বললাম “ঐ মেয়েটার এক্স”।
অরুন্ধতী বলল “এই জন্যই বলি, যা করবে ভেবে চিন্তে কর। তুমি কি জানতে সিবি আমার মামা”?
আমি চমকালাম “অ্যাঁ!!!”
অরুন্ধতী বলল “আজ্ঞে। আমার নিজের মামা। আর ঐ কতগুলি উচ্চিংড়ের কথায় কি সুন্দর উদ্গান্ডুর মত লাফালাফি করে বসলে”।
আমার কি রকম সীতার পাতাল প্রবেশের মত একটা ফিলিং আসছিল। “হে ধরণী মাইয়া, দ্বিধা হও মাইরি, আমাকে টেনে নাও, আমি আর অরুন্ধতীর সামনে মুখ দেখাতে পারব না কোন দিন”।
অরুন্ধতী বলল “তাও ভাল। ঐ উচ্চিংড়েগুলিই জানাল তোমাকে নাকি কারা সব কেলিয়েছে। কলেজ থেকে বেরচ্ছিলাম, খুব দাঁত কেলাতে কেলাতে বলল”।
আমি বললাম “তুই কিছু বললি ওদের”?
অরুন্ধতী বলল “না। শুনেই তো দৌড় লাগালাম ট্যাক্সি ধরতে। আমার গান্ডুরামের তো সেই ধক নেই যে ফোন করে বলবে”।
আমি বললাম “আমি মনে হয় এযাত্রা বেঁচে যাব যা বুঝছি”।
অরুন্ধতী চোখ পাকাল “এসব আবার কি? এই কথার মানে?”
আমি হাসলাম অনেকদিন পরে “অরুন্ধতী এমন একটা নক্ষত্র যেটা যারা মৃত্যুপথযাত্রী তারা দেখতে পায় না। আমি দেখতে পেলাম। আর বেশ ভালমতোই। তাই বলছিলাম আর কি”।
আহত রক্তাক্ত আর আতাকেলানে একটা ছেলের ঠোঁট দখল করতে এই সময় একটা মেয়ে এগিয়ে গেল... আর তারপর...
থাক বাপু, ইন্ডিয়ান সেন্সর বোর্ড শালা মহা ঢ্যামনা। এই সব তোদের শুনে কাজ নেই।
শেষ

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান