বিবাহ অভিযান

অভীক দত্ত

 


রাজর্ষি, প্রদোষ আর আমি তথাগত। একই মেসে থাকি। তিনজনেই কোডিংয়ে পৃথিবী উদ্ধার করার চাকরি করি। আর তিনজনই একটার পর একটা প্রেমে ঝাড় টার খেয়ে আপাতত ওল্ড মঙ্কের সাহায্যে সন্ন্যাসব্রত পালন করছি। প্রতিটা উইকেন্ডে আমরা মারাত্মক নেশা করি। নেশা করার সময় ফোন টোন অফ করে দিই। কারণ প্রত্যেকের বাড়িতেই অত্যন্ত টেন্সড বাবা মা থাকে, যাদের কাজ হল কদিন পর পর আমাদের চিন্তায় প্রেশার বাড়িয়ে ফেলা এবং দুদিন পর পর বিয়ের জন্য পাগল করে দেওয়া।
আজ শনিবার আর আপাতত প্রদোষ তার সাম্প্রতিকতম লেঙ্গিটি খেয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বসে আছে। আমি আর রাজর্ষি যথারীতি নেশার জিনিস জোগাড় করা শুরু করেছি। আজ প্রথমে ঠিক ছিল জলপথে ভ্রমণ হবে কিন্তু প্রদোষ সবকিছু ভুলবার জন্য কোত্থেকে সলিড একটা জিনিস এনেছে। সেটা নাকি সপ্তম স্বর্গ ইত্যাদি পার করে স্বর্গের ওপরেও যদি কিছু থেকে থাকে সেখানে নিয়ে যাবে। আমাদের ফোন অফ করা হয়ে গেছে। প্রথমে তিনজন ঘিরে বসে নেশাটা শুরু করলাম আর বেশ খানিকক্ষণ বাদে বুঝে গেলাম সত্যিই ধীরে ধীরে আমরা পৃথিবী ত্যাগ করার জায়গায় চলে এসছি।
সমস্যাটা বাঁধল প্রদোষকে নিয়ে। ব্যাটা নেশাটা করল আগের সবকিছু ভোলার জন্য, কিন্তু নেশার পরে দেখা গেল ফল হল উল্টো। জোরে জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কান মাথা খাওয়া শুরু করল। রাজর্ষি আর আমার দুজনেরই বিরক্ত লাগছিল। আমরাও দুজনে আরও জোরে চেঁচিয়ে ওকে থামাতে লাগলাম। খানিকক্ষণ পর প্রদোষ উঠে দাঁড়াল। বলল “ভাই তোরা যা পারিস কর, এখানে বসে থাক। আমি বেরলাম। আমার বহুত খিদে পেয়ে গেছে। দেখি কোন বিয়ে বাড়ি পাওয়া যায় নাকি”।
রাজর্ষি আর আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। তারপর রাজর্ষি আমাকে বলল “প্রদোষ তো ঠিকই বলেছে। এভাবে ঘরে বসে কি হবে? চ আমরাও বিয়ে বাড়ি খেয়ে আসি”।
আমারও প্রস্তাবটা মনে ধরল। ফোন তো অফ করাই ছিল। সেটা নিয়ে যাবার কোন প্রয়োজনীয়তাই ছিল না। সবে শীত পড়ছে। আমরা ঐ মেসে পরার গোল গলা টি শার্টের ওপরেই একটা সোয়েটার চড়িয়ে বেরিয়ে গেলাম।
খানিকক্ষণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটার পর দেখা গেল কোন বিয়েবাড়িই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রদোষ অধৈর্য হয়ে পড়ল। বলল “কি ব্যাপার বলত? একটা বিয়ে বাড়ি দেখতে পাচ্ছি না। এভাবে চললে হ্যালু ম্যালু তো সব কোথায় গাধার ইয়েতে ঢুকে যাবে। এভাবে কিন্তু খেলব না ভাই আগেই বলে দিলাম”।
সবে সন্ধ্যে সাতটা হবে। রাস্তায় লোকজনও আছে। আমি চেষ্টা করলাম হ্যালুর মধ্যেও নিজের জ্ঞান ফেরানোর। একটা রিক্সা ধরে বললাম “ভাই। কাছাকাছি কোন একটা বিয়েবাড়িতে নিয়ে চল তো”।
রিক্সাওয়ালা আমাদের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে বলল “কাছাকাছি মানে? কোথায় সেটা বলতে হবে তো, আর একটা রিক্সায় তিনজন নেওয়া যাবে না”।
প্রদোষ মানিব্যাগ বের করে একটা পাঁচশোটাকার নোট বের করল “এইটা নাও। আর আমাদের নিয়ে চল। বেশি কথা কিসের হ্যাঁ?”
রিক্সাওয়ালা খচে গিয়ে রিক্সা থেকে নেমে পড়ল “ওসব টাকার গরম দেখাবেন না। অন্য যাকে পারেন দেখাবেন। আমি টাকাও নেব না। কোথাও যাবও না”।
রাজর্ষি হঠাৎ রিক্সাওয়ালাকে জড়িয়ে ধরল। “কাকা রাগ কোর না কাকা। দেখো, আমাদের দেখে কি তোমার মনে কোন কষ্ট হয় না? আমরা ভীষণ কষ্টে আছি কাকা। নিয়ে চল প্লিজ কোন বিয়ে বাড়িতে”।
রাজর্ষির হঠাৎ জড়িয়ে ধরায় রিক্সাওয়ালা চাপ টাপ খেয়ে গেল। বলল “ঠিক আছে। উঠুন। উফ, কি জ্বালায় যে পড়লাম আজ”!
আমাদের এই পাড়াটা শান্তশিষ্ট। তার উপর শীত পড়ে গেছে। এত বড় নাটকটা পথ চলতি কয়েকজন বাদে কেউই খুব একটা চাক্ষুষ করল না।
রিক্সায় পাশা পাশি রাজর্ষি আর প্রদোষ বসে আছে। প্রদোষের কোলে আমি। মাঝে মাঝে চরম হ্যাল আসছে। রাস্তা ঘাট, নতুন বসানো ত্রিফলা সবই দেখতে পাচ্ছি আবার কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। মিনিট দশেক আমাদের টেনে একটা বিয়েবাড়ির সামনে দাঁড়াল রিক্সাওয়ালা। বলল “এই যে। নামুন। আমি যাই”।
আমরা চুপচাপ নেমে গেলাম। প্রদোষ ঐ পাঁচশোটাকাটাই আবার দিতে গেল কিন্তু কাকা কিছুতেই নিল না। ভাড়ার টাকাটা নিয়ে এমনভাবে জায়গাটা ছেড়ে পালাল যেন বিরাট বাঁচা বেঁচে গেছে। প্রদোষ আমি আর রাজর্ষি বেশ খানিকক্ষণ বিয়েবাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাইরে ফুল দিয়ে সুন্দর করে লেখা “অজয় ওয়েডস রাধিকা”। কোথাকার কোন অজয় কোথাকার কোন রাধিকাকে বিয়ে করছে। আমরা চিনিও না, জানিও না কাউকে। আমরা চুপচাপ বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
খানিকক্ষণ বাদে বর ঢুকল। রাজর্ষি বলল “ভাই চ ঢুকে যাই। বরযাত্রী সেজে ঢুকে যাই। চাপ থাকবে না খুব বেশি”।
প্রদোষ বেশ খানিকক্ষণ বর বউয়ের নাম দুটো দেখতে লাগল। তারপর বলল “ভয় কিসের? ভয় পাস কেন তোরা এত? চ আমার সাথে চ”।
আসলে আমরা এতক্ষণ ঢুকব কি না, ঢুকলে কি হবে এই সব নিয়েই সংকোচ করছিলাম। প্রদোষের কথায় আলাদা এনথু পেয়ে গেলাম। প্রদোষ রাজর্ষি আর আমার কাঁধে ভর দিয়ে বিয়েবাড়িতে ঢুকল আর ঢুকেই আমাদের দুজনকে চমকে দিয়ে ঐ বিয়ে বাড়ির সানাই, পাব্লিকের ভিড় ইত্যাদি সব অগ্রাহ্য করে ষাঁড়ের মত গলায় চেঁচাতে শুরু করল “রাধিকা, রাধিকা, তুমি আমার। তুমি আর কারও হতে পারো না”।
আমার হঠাৎ মনে হল শরীরের নীচে কোন ভার কমে গেল। প্রদোষ যে এভাবে এরকম একটা সিচুয়েশনে ফেলে দেবে সেটা কল্পনাও করতে পারি নি। রাজর্ষির অবস্থাও বুঝলাম তথৈবচ। ও তবু শেষ চেষ্টা করল। প্রদোষকে জোরে জোরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল “এই তোর কি হয়েছে রে? মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে ভাই? চিনিস না জানিস না কার না কার বাড়িতে এসে এসব কি শুরু করেছিস?”
প্রদোষ আমাদের দুজনকেই ঠেলে ফেলে দিল। আর ঐ একই কথা চেঁচাতে শুরু করল “রাধিকা কোথাও আছ, বেরিয়ে আস। পৃথিবীর কোন শক্তি আমাদের আলাদা করতে পারবে না”।
আমি খালি ভাবছি আজকেই বোধ হয় আমাদের জীবনের শেষ দিন। ইতিমধ্যেই আমাদের ঘিরে লোক হওয়া শুরু করে দিয়েছে। বরের বাড়ির লোকজন বেশ কৌতূহলী চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের দেখেই বুঝতে পারলাম এরা স্ক্যান্ডালের গন্ধ পাওয়া শুরু করে দিয়েছে। আমার নেশা টেশা কোথায় পালিয়েছে সেটা আমিই জানি না। আমি রাজর্ষিকে বললাম “কিরে, পালাবি? প্রদোষ যা শুরু করেছে ও তো মরবেই আমরাও জেলে যাব শিওর”।
রাজর্ষি আমার দিকে তাকিয়ে বলল “ওকে রেখে যাব না। মার খেলে একসাথেই খাব। ভুলে গেলি গত মাসে সিনেমা হলে যখন মারপিটটা লেগেছিল তোকে বাঁচাতে অফিস থেকে দৌড়ে এসছিল প্রদোষ? এখন মুখ মুছে ফেললে হবে?”
ঘটনা সত্যি। আমাকেও স্বীকার করতে হল। অগত্যা প্রদোষের পাগলামি দেখে তার ফলে যা যা ক্ষতি হতে পারে সেটার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলাম। প্রদোষ চেঁচানো বাড়াতে লাগল “রাধিকা তুমি যেখানেই থাক, এই মূল মণ্ডপের সামনে দেখা কর। তোমার প্রদোষ তোমাকে খুঁজছে”।
এই চেঁচামেচির মধ্যেই মেয়ের বাড়ির লোক চলে এল। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে এক্কেবারে গোবেচারা পরিবারের লোক। প্রদোষকে ধরে পিটাবে কি, প্রদোষের চেহারা দেখে ভয়ে কেমন সিটিয়ে গেছে তারা। একটা ধুতি পরা বয়স্ক মত লোক,সম্ভবত মেয়ের বাবা কিংবা জ্যাঠা হবে, প্রদোষকে এসে বলল “তুমি কে বাবা? তোমাকে তো ঠিক চিনি না”।
প্রদোষকে দমানো গেল না “চিনবেন মানে? চিনবেন কি করে? আমিও কি আপনাকে চিনি নাকি মশাই? ইয়ার্কি হচ্ছে? ডাকুন রাধিকাকে। আমাকে ছেড়ে কাকে বিয়ে করছে আমি জানতে চাই”।
বরের বাড়ির লোকজন এন্ট্রি নিয়ে নিল। আমি আর রাজর্ষি চুপচাপ চেয়ারে বসে পড়লাম যা হবে সব কপালের ওপর ছেড়ে দিয়ে। ছেলের বাবা প্রদোষকে বলল “আপনি কি চান একটু বলবেন কি?” আমি রাজর্ষিকে কানে কানে বললাম “সবাই সুশীল সমাজ বে। গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়ানোর ধক কারও নেই। উলটে দেখ প্রদোষকে ভয় পাচ্ছে”।
রাজর্ষি বলল “যা পারে করুক ও। দর্শক হয়ে যা। যা হচ্ছে দেখ, মার খেলে খাব আর কি করবি? ফোনও তো সাথে নেই যে কাউকে ডাকব হেল্পের জন্য।”
আমি আবার চুপ করে গেলাম। ছেলের বাবার প্রশ্ন শুনে প্রদোষ বলল “মেয়েকে এই মুহূর্তে এখানে নিয়ে আসুন। আমি দেখব, কয়েকটা প্রশ্ন করব, তারপর ছেড়ে দেব”।
ছেলের বাবা মেয়ের বাবার সাথে ফিসফিস করে বেশ খানিকক্ষণ কথা বলল। তারপর প্রদোষকে বলল “আচ্ছা, আপনি আসুন আমাদের সাথে”।
প্রদোষ আবার চেঁচিয়ে উঠল, “আমি কোত্থাও যাব না। আপনারা নিয়ে আসুন মেয়েকে। আমি এই বসলাম”।
ভরা মণ্ডপের মাঝখানে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল প্রদোষ। আবার ছেলের বাবা আর মেয়ের বাবা কি সব ফিসফিস করে কথা বলে বলল “আচ্ছা, অপেক্ষা করুন আমি রাধিকাকে নিয়ে আসছি”।
আমরা চুপচাপ বসে রইলাম। বিয়ে বাড়ির পাব্লিকের সবাই দেখলাম প্রদোষকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে মজা দেখার প্রত্যাশায়। মানুষ আসলে দেখেছি, কারও পেছনে গু পেলে ঐ গু শোঁকার জন্য নরক অবধি যেতে পারে। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে এই সব পাবলিকদের পেছন সুলভ শৌচাগার হয়ে গেছে। পাঁচ মিনিট পরে মেয়ে এল। সাজানো গোছানো মেয়ে।গয়না টয়না সবই আছে সাথে অবাক এবং ভয়ার্ত চোখে। মেয়ের বাবা প্রদোষকে বলল “দেখুন, আমার মেয়েকে আমি নিয়ে এলাম। এবার বলুন”।
প্রদোষ দেখলাম দমল না। আমাদের হতাশ করে করুণ কণ্ঠে ওর নাটক জারি রেখে দিল “রাধিকা, তুমি আমাকে ভুলে গেলে? এটা তুমি পারলে শেষ মুহূর্তে আমার জন্য করতে?”
কনে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ওর বাবার দিকে একবার, বিয়েবাড়ি ভর্তি পাব্লিকের দিকে একবার আর শেষ তক প্রদোষের দিকে তাকিয়ে বলল “আপনি কে? আমি তো আপনাকে চিনি পর্যন্ত না?”
প্রদোষ পুরো যাত্রা স্টাইলে কেঁদে উঠল “ভুলে গেলে? সব ভুলে গেলে তুমি? ঘণ্টার পর ঘণ্টা গঙ্গার তীরে আমরা কত গল্প করেছি। কত স্বপ্ন দেখেছি। সব কিছু তুমি ভেঙে পারলে? পারলে এটা করতে?”
প্রদোষের গলা পুরো যাত্রা দলের রাজা বান্টুকুমারের মত শোনাচ্ছিল। ছেলের বাবা এবার আসরে নামল “আমার মনে হয় পুলিশ ডাকা উচিত”।
প্রদোষ আবার চেঁচাল, “পুলিশ? রাধিকা, তুমি বুকে হাত দিয়ে বল তুমি আমাকে চেনো না, আমি এখান থেকে সরে যাব। কিন্তু তুমি বল, মুখ ফুটে বল”।
জায়গাটায় মহা গ্যাঞ্জাম শুরু হয়ে গেল। বরের বাড়ি মেয়ের বাড়ি ঝগড়া বেঁধে গেল। এতক্ষণ ভদ্রলোকের মত দেখতে লোকগুলো নিজেদের মধ্যে কুকুরের মত ঝগড়া আরম্ভ করে দিল। ছেলে পক্ষের লোকগুলো রীতিমত মেয়ে পক্ষের লোকেদের মেয়ের ইতিহাস লুকিয়ে বিয়ে দেবার জন্য চোর জোচ্চোর চিটিংবাজ বলতে লাগল। সব মিলিয়ে সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। বরও বেরিয়ে এল ভেতর থেকে, ঐ সব ধুতি পরা অবস্থাতেই এই ঝামেলা দেখতে লাগল বড় বড় চোখ করে। টিভি প্রোগ্রামে কিছু লোক থাকে যারা লোকজনকে ঝগড়া করতে দেখলে চুপ করে যাই, এই অজয় নামের বরটাকেও দেখলাম সেই টাইপের পাবলিক।
বাওয়াল যখন চরমে প্রদোষ চুপচাপ আমাদের পাশে এসে বসল। কনে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকল। বেশ খানিকক্ষণ বাওয়ালের পরে বরের বাবা আর মেয়ের বাবা মেয়েকে প্রদোষের সামনে এনে দাঁড় করাল। মেয়ের বাবা বলল “সত্যি করে বল তো মা, এই ছেলের সাথে তোর কি সম্পর্ক? সত্যি কথা বল , আমি কিচ্ছু বলব না”।
আমি আর রাজর্ষি প্রমাদ গুণতে লাগলাম। এইবার শিওর সেই ক্যাল খাবার মহা সময় উপস্থিত হয়ে গেছে। রাজর্ষি উত্তেজনায় আমার হাত এমন ভাবে চেপে ধরেছে যে আমার রীতিমত হাত ব্যথা শুরু করল। প্রদোষ কিন্তু নির্লিপ্ত। চুপচাপ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলছে “হ্যাঁ বল বল কি বলতে চাও বল, সবাইকে বল আমাদের ঘটনাটা”।
কনে মুখ খুলবে। মুহূর্তে চারদিক চুপচাপ হয়ে গেল। জনগণ হাতের হাতা গোটানও শুরু করে দিয়েছে আড়চোখে দেখতে পেলাম। আমি খালি ফাঁক খুঁজছি কোত্থেকে পালাব ঠিক এই সময় আমি নিজের কানকেও বিশ্বাস করে উঠতে পারলাম না কনে যা বলে উঠল “হ্যাঁ আমি ওকে চিনি। ওকে আমি ভালবাসি”। প্রদোষের দিকে তাকালাম। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম প্রদোষেরও এই কথা শুনে সব কিছু মাথায় উঠে গেছে। কনের কথা শুনে কনের বাবা মাথায় হাত দিল। বরের বাবা “আগেই বলা উচিত ছিল” ইত্যাদি বাওয়াল দিতে দিতে বরকে নিয়ে পাততাড়ি গোটাল। আমরা তিনজন চুপচাপ সেখানেই বসে রইলাম।
প্রদোষের পাশে মেয়েও বসে রইল। মেয়ের বাবা অনেকক্ষণ পাগলের মত পায়চারি করতে করতে অবশেষে বলতে লাগল “বিয়েটা কি হবে? অ্যাঁ! মেয়েটা তো লগ্নভ্রষ্ট হয়ে যাবে। এটা কি হল!!!”
রাধিকা প্রদোষকে বলল “কি গো, বিয়েটা কবে করবে?”
প্রদোষ আবার মরিয়া হয়ে উঠল “আজকেই করব। বিয়ে আজকেই হবে”।
প্রদোষের কথায় মরা বিয়েবাড়ি যেন সোনার কাঠির ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পেল। আমি আর রাজর্ষি বেশ কয়েকবার নিজেদের গায়ে চিমটি কাটতে লাগলাম। খুব ব্যথা পাওয়ায় শেষ মেষ দুজনেই চেপে গেলাম। রাত বারোটা নাগাদ প্রদোষের বিয়ে হয়ে গেল।
অনেক রাতে যখন সব চুকে বুকে গেল আমি প্রদোষকে বললাম “ভাই, তুই কি সত্যিই মেয়েটাকে চিনতিস? তোদের অ্যাফেয়ার ছিল বলিস নি তো?”
প্রদোষকে কে ধুতি টুতি পরিয়ে গেছিল। আমার প্রশ্ন শুনে বেশ একচোট হেসে বলল “জীবনে ফার্স্ট দেখলাম এই মেয়েটাকে। কিন্তু অনেককে অনেক দিন চিনেও কি ছিঁড়লাম এদ্দিন ভাই?”
আমি আর রাজর্ষিও খুব একচোট হাসলাম। তারপরই আমার হঠাৎ মনে হল রাধিকা আর প্রদোষের জুড়িটা মনে হয় না খুব একটা ফ্লপ হবে। রাধিকাও তো প্রদোষকে কোনদিন দেখে নি। ঐ বা কি করে এত বড় পাগলামিটাকে প্রশ্রয় দিয়ে বসল। যে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে ছিল, সে বিয়ের দিন এত বড় ব্যাপারটা এত সহজ করে ফেলল?
এই মেয়ে মেয়ে নয়, আরও বড় পাগলী নিশ্চয়!!!

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান