চন্ডালিকা

অভীক দত্ত

 



১)

।।সায়ন আর ওর পানুর স্টক।।

“ঐ মেয়েটাকে দেখছিস? থার্ড বেঞ্চ কর্নার?”
সায়নের কথায় দেখলাম মেয়েটাকে। সাধারন চেহারা। চোখ দুটো বেশ সুন্দর।
মাথা নাড়লাম। “হ্যাঁ কি কেস? ছক করবি?”
“দূর বাল। কে ছক করবে এর সাথে?”
“মানে? সমস্যা কোথায়?”
“সমস্যা কি বলছিস? বড় সমস্যা আছে। মেয়েটার পানু আছে মার্কেটে”।
চমকে উঠলাম সায়নের কথা শুনে। “বলিস কি?”
“হ্যাঁ রে ভাই। ঐ যে আসানসোলের একটা কেস বেরিয়েছিল না? এটা সেই টা”।
আমি আসানসোলের কোন কেসের ব্যাপারেই শুনি নি কিছু। সায়নকে বললাম “দেখাতে পারবি?”
সায়ন বলল “হ্যাঁ দাঁড়া এস এসের ক্লাসটা শেষ হলেই দেখাচ্ছি ক্যান্টিনে গিয়ে, দেখ কাকা কি কলেজে ভর্তি হলাম, ক্লাসে সানি লিওন পড়বে”।
আমি মাথা নাড়লাম ওর কথা শুনে। এস এস এসে গেছিলেন। কিন্তু এস এস কি বলছিল কানে ঢুকছিল না। আড়চোখে একবার দেখে নিলাম মেয়েটার দিকে। কোই, সানি লিওন কেন, দিব্যি পাড়ার মেয়েদের মতই তো দেখতে। আমাদের সাথেই ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। কেউ তো আগে কিছু বলে নি। অবশ্য আমি ভর্তি হয়েই বেড়াতে চলে গেছিলাম। প্রায় পনেরো দিন পরে কলেজে এসেছি। বেশ কিছু নোটসও এর ওর তার থেকে জোগাড় করতে হয়েছে। আজ জয়েন করলাম আর সায়ন আজই ব্রেকিং নিউজটা দিয়ে দিল।


২।

আনন্দী পাল। নাম। দেখেও নিলাম সায়নের মোবাইল থেকে। বেশি কিছু না। স্নান করতে গিয়ে জামা টামা খুলে আবার পড়ছে। কেউ লুকনো ক্যামেরায় তুলেছে।
দেখে কেন জানি না খুব একটা খুশি হতে পারলাম না। একজন স্নান করছে সেটা ভিডিও করে তুলে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ায় বিরাট কিছু কৃতিত্ব আছে কি? সায়নকে বললাম “ক্লাসের সবাই জানে নিশ্চয়ই?”
সায়ন বলল “কে জানে, আমি কাউকে কিছু বলি নি। শুধু তোকেই বললাম। আবিস্কারটা করেছি গত পরশু। ও তো পরশুই ভর্তি হয়েছে। সবে ক্লাস শুরু হয়েছে। স্যারের থেকে পারমিশন নিয়ে দেখলাম পিছনে গিয়ে বসল। দেখেই কেমন একটা চেনা চেনা লাগল। তুই তো জানিসই, এসব ব্যাপারে আমার বিরাট জ্ঞান। বাড়ি গিয়ে কয়েকটা কালেকশন দেখেই বুঝলাম হু হু... এই সেই কেস”।
বিরাট জ্ঞান? তা আছে। সায়ন আর আমি ক্লাস ফাইভ থেকে একসাথে পড়ি। মালটার পেছন ক্লাস সেভেন থেকেই পাকা আমের মত পাকা। কত রকম পানু যে ওর হার্ড ডিস্কে আছে তা ভগাদাই জানে। নতুন কালেকশন, পুরনো কালেকশন সব হাতের মুঠোয় মালটার। ভিন্টেজ পানুও জোগাড় করে আনে। কোথায় ১৯৬০ সালে কি স্টাইলে হত সে সবও জোগাড় করে এনেছিল একবার। সাপের সাথে, কুকুরের সাথে কোন ব্যাপারেই পিছিয়ে নেই ও। সব আছে ওর কালেকশনে। নিজেই গর্ব করে “আমার এমন কালেকশন, মরার পরে কলকাতা মিউজিয়ামের থেকেও মনে হয় বেশি কিছু রেখে যেতে পারব পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভাই”।
আমি বেশ কয়েকবার ভিডিওটা দেখলাম। তারপর সায়নকে বললাম “ভাই, এটা ডিলিট করবি? কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ক্লাস করতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে”।
সায়ন আমার দিকে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এল “পাগলা নাকি তুই? এসব অলুক্ষুণে কথা খবরদার মুখেও আনবিনা”।
আমি কিছু বললাম না। কিন্তু ঠিক করলাম সায়নের মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে ঠিক ডিলিট করে দেব ভিডিওটা।

৩)

সায়নকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ মারা গেছে। কিংবা কোন সাব্জেটে ফেল করে ইয়ার ল্যাগ খেয়েছে। আমার দিকে অনেকক্ষণ করুণ চোখে তাকিয়ে বলল “ভাই এটা তুই করতে পারলি? একবারও ভাবলি না কি করছিস?”
আমি নির্লিপ্তভাবে তন্দুরি রুটি আর আলুরদম সাঁটাতে সাঁটাতে বললাম “কেন ভাবব না ভাই, আমার যেটা ঠিক লেগেছে সেটা করেছি। তোর তো নিশ্চয়ই ব্যাক আপ আছে কিংবা সাইটে পেয়ে যাবি”।
সায়ন মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে বলল “না ভাই, এটা কোত্থাও ছিল না, আমার ল্যাপিতেই ছিল, জাস্ট দুদিন হল সেটা ফরম্যাট করেছিলাম এই মোবাইলে কয়েকটা ছোট ফাইল ব্যাক আপ রেখে। বড়গুলো সব এক্সটারনাল হার্ড ডিস্কে রেখে দিয়েছিলাম। ঈশ রে, কি করলি। ক্লাসে সকালে দেখে রাতে একবার করে দেখতাম আর কোন কিছু দেখার প্রয়োজন পড়ত না। এটা তুই কি করলি ভাই রে”।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম বাঁচা গেল, মুখে বললাম “আরে ব্যাপারটা তা না, আমি ভেবেছিলাম তুই হয়ত ব্যাক আপ রেখেছিস। আর কলেজে এলেই তো দেখাতে বসতিস। আর ভিডিওটা খুব ডিস্টার্বিং আমার কাছে। তাই ডিলিট করে দিয়েছিলাম”।
সায়ন বেশ খানিকক্ষণ মাথা চাপড়াল। তারপর আমার অ্যাসাইনমেন্টটা থেকে টোকা শুরু করল। একবার করে টোকে আর মাথা চাপড়ায় “হায় হায় এটা কি করলি তুই ভাই”। আমি ওকে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দিয়েও খুশি করতে না পেরে শেষতক পঁচিশটাকা খসিয়ে একটা আইসক্রিম কিনে দিলাম। তাতেও গাই গুই করছিল যখন তখন তেড়ে খানকতক গালাগাল দেবার পরে দেখা গেল বাছাধন ঠাণ্ডা হল।

৪)

ছমাস পরে-

সব কলেজেরই নিয়ম, দক্ষ ব্যাটসম্যানের মত সবাই প্রথমদিকে একটু দেখে খেলে টেলে ধীরে ধীরে রিলেশনশিপের দিকে ঝুঁকে যায়। সেটা সিনিয়র জুনিয়র হোক কিংবা নিজেদের ক্লাসের। মেয়েরা খুব বেশি কেউ ফাঁকা থাকে না। আর সুন্দরী হলে তো কথাই নেই। আমি আর সায়ন বরাবরের ক্যালানে। আমরা ঐ দেখেই খেলে যেতে লাগলাম কিন্তু কাউকে জোগাড় করে উঠতে পারলাম না শেষ তক।
কিন্তু আমাদের চমকে দিল যে ঘটনাটা সেটা হল আনন্দীর একটা বয়ফ্রেন্ড হয়ে গেল। সিনিয়র কুণালদা। কুণালদা ছেলে ভাল, পড়াশুনায় খুবই ভাল। আমাদের শুরুতে নোটস ইত্যাদি দিয়ে হেল্পও করত, সেই কুণালদা যখন আনন্দীকে নিয়ে ক্যান্টিন ইত্যাদিতে যাওয়া শুরু করল সায়ন একটা বিকট “হাইলি সাসপিশাস” মুখ নিয়ে আমার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আমি কিছুই বলছি না দেখে শেষে নিজেই মরিয়া হয়ে বলল “এটা কি হল ভাই? ভাল ছেলেটার তো মারা গেল পুরো। ওতো জানেই না মিয়া খলিফাকে জি এফ বানিয়েছে”।
আমি বললাম “অদ্ভুত তো। তুই এমনভাবে কথা বলছিস মেয়েটা এইসবই করে বেড়ায়। দেখ ভাল করে খবর নিলে হয়ত দেখা যাবে ওটা ঐ মেয়েটারই ছিল না। তুই শিওর ঐ মেয়েটাই সেই মেয়েটা?”
সায়ন অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বলল “ঢ্যামনামো হচ্ছে? তুমি দেখ নি? পরিষ্কার দেখা গেছে ভিডিওটাতে এই সেই মেয়ে। আমি গেলাম কুণালদাকে সাবধান করতে”।
সায়ন হন হন করে হাঁটা লাগাল। আমি কোনমতে ওকে জড়িয়ে ধরে আটকালাম। চাদ্দিকের পাবলিক এমনভাবে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল যেন আমরা গে কাপল। কিন্তু সেটা ইম্পরট্যান্ট ছিল না। ইম্পরট্যান্ট ছিল সায়নকে আটকানো। ওকে আবার বোঝালাম “দ্যাখ ভাই। যে যা পারে করতে দে না। পরের ছেলে পরমানন্দ, যত মোদ পাড়ায় ততই আনন্দ। তুই কেন বলত খামোখা টেনশন নিচ্ছিস?”
সায়ন বারবার মাথা নাড়তে নাড়তে বলতে লাগল “এটা ঠিক হল না যাই বলিস, খুব বাজে কাজ হয়ে গেল ভাই”।

৫)

।।ফ্ল্যাশব্যাক।।

।।তিন্নির কথা।।
পিঙ্কুদা এলে মনটা ভাল হয়ে যেত ছোট তিন্নির। পিঙ্কুদা ক্লাসে ফার্স্ট হয়, পড়াশুনায় দারুণ, আবার কি সুন্দর আবৃত্তি করে। আবৃত্তি করার সময় পিঙ্কুদার চেহারা এক্কেবারে চেঞ্জ হয়ে যায়। তিন্নি কিংবা পাপ্পা সবাইকে অবশ্য হরবখত শুনে যেতে হত বাবা মার কাছ থেকে “দেখ পিঙ্কুকে দেখে শেখ। ওর মত হতে পারিস না?”
তিন্নি ভাবত সে কি করে পিঙ্কুদার মত হবে। ওরকম হওয়া সম্ভব নাকি। পিঙ্কুদা ঐ একজনই। মাসির ছেলে, সেই ছোট্টবেলা থেকেই পিঙ্কুদাকে ভাইফোঁটা দেয় সে।
পিঙ্কুদাকে প্রায়ই মাসি তাদের বাড়ি রেখে যেত। মাসি কলকাতায় কাজ করে, মেসো দিল্লি অফিসে থাকে। পিঙ্কুদা তাদের পড়ায়, তাদের পাড়ার ছেলেদের সাথেই খেলত। তাদের বাড়ির ছেলের মতই থাকত।
তিন্নি যখন ক্লাস সিক্স তখন হঠাৎ করে একদিন তার ভীষণ শরীর খারাপ হল। মা অনেককিছু বোঝাল তাকে।তার শরীরটা আর আগের মত রইল না। নিজেকে নিজেই ভয় পেতে শুরু করল সে। আগে পিঙ্কুদার ঘাড়ে কাঁধে উঠে খেলত কোনরকম দ্বিধা ছাড়াই, এই ঘটনার পর থেকে সে সবের কথা ভাবতেই পারল না সে। আর পিঙ্কুদাও যেন এই সময় থেকেই কেমন অন্য রকম হয়ে গেল। আগে ঘাড়ে উঠলে বা জড়িয়ে ধরলে কেমন বিরক্ত বোধ করত, আর এই পরিবর্তনের পরে যেন তাকে আদর করার মাত্রাটা হঠাৎই বাড়িয়ে দিতে শুরু করল। যেটা এতদিন সে করত, পিঙ্কুদা সেটা করা শুরু করল।
বাড়িতে কেউ না থাকলেই জড়িয়ে ধরা, না না অছিলায় পিঠে হাত দেওয়া বেড়ে যেতে লাগল পিঙ্কুদার। তিন্নির প্রবল অস্বস্তি হত , এদিকে কাউকে বলতেও পারত না যে পিঙ্কুদা এসব করে। বিশেষ করে তাদের বাড়িতে কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে পিঙ্কুদার যেরকম ইমেজ, তিন্নি ভয় পেত তাকেই হয়ত সবাই মিথ্যেবাদী বলবে। আগে দুপুরগুলিতে পাপ্পা খেলতে বেরোলে পাপ্পার সাথে পিঙ্কুদাও বেরিয়ে যেত, কিন্তু এই সময় দেখা গেল, পাপ্পা বেরল পিঙ্কুদা ঘুমের ভান করে মটকা মেরে পড়ে থাকত। তারপরেই তাকে নানা অছিলায় ছুঁতে শুরু করত। সে যখন ক্লাস এইট, শেষ মেষ না পেরে মাকে বলল। মা শুনেই কিছু একটা করেছিল যেটা তিন্নির এখন আর মনে নেই, তবে তার পর থেকে পিঙ্কুদা তাদের বাড়িতে চলে গিয়েছিল, যাবার আগে তার দিকে রহস্যময় দৃষ্টিতে হেসেছিল, যে দৃষ্টিটা তিন্নি কোনদিন ভুলতে পারবে না।
সে যখন ক্লাস ইলেভেন, তাদের এক দূর সম্পর্কের মাসীর বিয়েতে পিঙ্কুদা সেই কান্ডটা করেছিল। কিভাবে তার চেঞ্জ করার ভিডিওটা তুলে ফেলেছিল। তারপর তাকে কোণায় নিয়ে গিয়ে বলেছিল “কি রে, একটা জিনিস আছে দেখবি?”
তিন্নি ভেবেছিল মজার কিছু হবে। সে কদিনে সেও পুরনো সব কথাই ভুলে গেছিল। পিঙ্কুদার দেখানো ভিডিওটা দেখে তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। সে হাতে পায়ে ধরেছিল পিঙ্কুদার কিন্তু পিঙ্কুদা শোনে নি। বাজারে ছেড়ে দেয় সেই ভিডিও। অনেক কিছু করে তার বাবা কোনমতে ধামাচাপা দিতে পেরেছিল সেই সব। কিন্তু এর ফলে যেটা হল, উচ্চ মাধ্যমিকের আগেই আসানসোল ছেড়ে উড়িষ্যা, পিসির কাছে চলে যেতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু কপালে থাকলে যা হয়, উড়িষ্যায় পিসির ট্র্যান্সফার হয়ে গেল তার কলেজে ভর্তি হবার সময়, আর হল হল সেই কলকাতাতেই, যেখানে এখন পিঙ্কুদা চাকরি করে।


৬)
।।এন্ড অফ ফ্ল্যাশব্যাক, ব্যাক টু বর্তমান।।

সায়ন আজকাল পড়াশুনায় মন দিয়েছে, বলছে বাড়িতে নাকি বাপের কাছে বিরাট কেস খেয়েছে। ওদের বাবার অফিসে কম্পিউটার শেখাচ্ছিল সেটা ও জানত না, বাপকে দিব্যি কায়দা করে ঘ্যামসে ছিল। একদিন ও যখন ছিল না, ওর বাপ চুপচাপ ওর কম্পিউটার খুলে সব পানুর ফোল্ডার খুলে ভিডিওগুলি পজ করে রেখে ওর ঘরে বসে ছিল। সায়ন স্বপ্নেও ভাবে নি বাপ এতকিছু জানে। তাই কোনরকম হিডেন ফাইল বা পাসওয়ার্ডও রাখত না মেশিনে। দিব্যি ঘরে গান করতে করতে ঢুকে দেখছে বাপ ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে বসে আছে। তারপর কি হল সেসব আর আমায় বলে নি। জিজ্ঞেস করলেই মুখটা করুণ করে বলে “কি আর বলব ভাই, সেসব ইতিহাস। আর ইতিহাস পড়ে এস এস সিতে চাকরি পাওয়া ছাড়া পৃথিবীতে কোন লোকটার কি উপকার হয়েছে বল দেখি”। স্মার্টফোন পাল্টে ওর বাপ ওকে একটা নোকিয়া ১০৮ কিনে দিয়েছে যাতে ফোন করা আর ফোন ধরা ছাড়া কিছুই করা যায় না।
অবশ্য আমাকে মাঝে মাঝেই চমকাতে ছাড়ে না ও। কুণালদা আনন্দীকে নিয়ে ঘুরলেই কুণালদার সাথে কথা বলতে যায়, আর আমি যাই ওকে আটকাতে। কুণালদাকে গিয়েই বলে “কুণালদা কেমন আছ?” কুণালদা আর আনন্দী তখন আমাদের দেখে। কুণালদা হয়ত বলল “ভাল আছি”। আর এদিকে আমার হার্ট বিট বাড়তে থাকে এই বুঝি পাগলাটা বেফাঁস কিছু বলে দেয়। কিন্তু মালটা ঠিক কোন নোটস লাগবে কিংবা এই সাব্জেক্টের জন্য কি বই পড়বে এসব ভাট বকে চলে আসে, ততক্ষণে অবশ্য আমার হার্ট অ্যাটাকের দশা চলে আসে। যখন কুণালদারা চলে যায় তখন আবার সুস্থ হই আমি। তবে আমি জানি সায়ন আর যাই করুক, আমাকে জিজ্ঞেস না করে ও কিচ্ছু করবে না।
এর মধ্যে একদিন একটা ঘটনা ঘটল। সায়ন সেদিন কলেজে আসে নি। কোথায় নাকি ওর বাপ ওকে নিয়ে যাবে কিসব বলেছিল আমার মাথায় ঢোকেনি। আমি লাইব্রেরীতে বসে আছি একা একা আর আনন্দী এল। আমার পাশেই বসল। আমি আড়চোখে ওকে দেখে হাসলাম। আনন্দী বলল “তোর সাথে যে ছেলেটা সবসময় থাকে সে কোথায় রে?”
আমি হেসে বললাম “সে আসে নি আজ। সত্যিই রেয়ার ঘটনা। বাই দ্য ওয়ে তোর সাথে যে ছেলেটা সব সময় থাকে সেই বা কোথায়?”
আনন্দী হেসে ফেলল “সেও আজ আসে নি। আচ্ছা, কিছু মনে করিস না, আমার না বি এস এন এলের কানেকশন। একটা দু মিনিটের কথা বলতে ফোনে দশ মিনিট লেগে যাচ্ছে। আমাকে তোর ফোনটা একটু দিবি?”
আমি বললাম “শিওর”।
আনন্দী ফোনটা নিয়ে লাইব্রেরীর বাইরে গেল। আমি অবশ্য তখন দেখিই নি ও কোথায় ফোন করেছে, ভেবেছিলাম কুণালদাকেই করেছে হয়ত।
রাত্রে বাড়িতে তখন সা রে গা মা পা হচ্ছে। বাবা মা সবাই টিভির ঘরে। আমিও দিব্যি আমাদের কলেজের সব মেয়েদের হার্টথ্রব দুর্নিবারের গান শুনছি আর ভেতরে ভেতরে হিংসায় মরছি এই সময় ফোনটা বেজে উঠল। বাবা বিরক্তির মুখ করল “আহ, বাইরে যা তো”।
আমি তড়িঘড়ি ফোনটা ধরে বাইরে যেতেই ওপাশ থেকে কতগুলি বাছাবাছা গালাগাল ভেসে এল “কিরে খানকির ছেলে, খুব রস না? মাগী পটিয়েছ বাড়া? জানো কি মাগী? এম এম এস আছে মাগীর বুঝেছ? সবাই জানে আসানসোলের পানুর কথা। গার্লফ্রেন্ড বানিয়েছ বাঁড়া? গার্লফ্রেন্ড গাঁড়ে ঢুকে যাবে তোমার”...
এতগুলি কথা বলে ফোনটা কেটে গেল। আমি বুঝতে পারলাম ছেলেটা আমাকে কুণালদা ভেবে কথাগুলি বলে গেল। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিলাম। বাবা জিজ্ঞেস করল “কিরে কে ফোন করেছিল?”
বললাম “সায়ন”।
খানিকক্ষণ পর ট্রু কলারের কথা খেয়াল হল। নাম্বার সার্চ করে যে নামটা পাওয়া গেল সেটা হল পিনাকি চ্যাটার্জি। কিছুই বুঝলাম না এরপরে কি করব।

৭)
যাদের কোন প্রেম নেই তাদের মনে হয় কলেজের কালচারাল কমিটিতে নিয়ে নেওয়া হয়। আমার মত একটা প্রথম শ্রেণীর আতাকেলানে কে কেন যে এত বড় সম্মান দিল সেটা আমি মনে হয় সারাজীবনেও বুঝতে পারব না। সায়ন অবশ্য সন্দেহ প্রকাশ করে বলে সিলেবাঁশের (বানান ভুলটা ইচ্ছাকৃত বলতে হবে?) কঠিন ব্যাপার স্যাপার পেরিয়ে কাউকে কলেজ ফেস্টে একদিন রবি ঠাকুর মাড়ানোর মত না পেয়ে আমাকে হাড়িকাঠে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল আমি আপত্তি ইত্যাদি জানানোর অনেক আগেই আমাকে আমাদের ইয়ারের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হল। কী, না নৃত্যনাট্য নামাতেই হবে একখান, এলাকার বড় কে একজন আসবে নীল সাদা পার্টির, তিনি নাকি আবার কলেজের কি ইয়েও, প্রিন্সিপালকে বলে দিয়েছেন রবি ঠাকুরের নাকি একটা নৃত্যনাট্য চাই। লোকটাকে আমি চিনি। এলাকার প্রোমোটার ছিল, এককালে দু চারটে মার্ডারও নামিয়েছে, এখন হঠাৎ করে নেতা হয়ে ভাবছে রবি ঠাকুরের গান বাজালেই সংস্কৃতিবান হয়ে যাওয়া যায়।
আমি বার খেয়ে মদন মিত্র হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবিস্কার করলাম আর হাতে আর একমাস সময় এদিকে একটা বড় নৃত্যনাট্য নামাতে হবে। চোখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলাম বসে বসে। সায়ন কিছুক্ষণ আমার পাশে বসে আমাকে ফিল করছে ইত্যাদি মুখ চোখ করে ভেগে গেল। আমি কী করব উদ্ধার করতে না পেরে মোবাইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সার্চ দিলাম। আর তখনই আনন্দী এসে বসল ক্যান্টিনে। আমি ওকে দেখে হাসলাম। ভাবলাম সেই ফোনের ব্যাপারটা বলব নাকি কিন্তু চেপে গেলাম। কেমন একটা অস্বস্তি হয় ওসব নিয়ে চিন্তা করলে। আনন্দী ওর টেবিল ছেড়ে আমার টেবিলেই এগিয়ে এল “আজকে তোর পার্টনারকে দেখলাম মনে হল?”
আমি হাসলাম “হ্যাঁ, ও এসছে তো। কুণালদা আজকেও আসেনি?”
আনন্দী বসল “না। আজকেও আসেনি”। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল “তা আজ তোর পার্টনার নেই কেন? কোথায় গেল সে?”
আমি হতাশ হবার মুখ করে বললাম “আমি এত বড় বাঁশ খেয়েছি, আর কি কেউ পাশে থাকে বল?”
আনন্দী অবাক হল, বলল “বাঁশ খেয়েছিস? কেন?” তারপর কয়েক সেকেন্ড পজ নিয়ে বলল “ওহ তুই তো এবার নৃত্যনাট্যের দায়িত্বে আছিস না? হি হি। এটা সত্যি বাঁশের কিন্তু”।
আমি করুণ মুখ করে বললাম “পাড়ার রবীন্দ্র নজরুল সন্ধ্যায় স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় প্যাটিস আর লাড্ডু নেওয়া ছাড়া এই জন্মে আমার আর কোন এক্সপেরিয়েন্স নেই মাইরি। আমি যে কী করব”।
আনন্দী হাসল। হাসলে মেয়েটাকে বেশ সুন্দর দেখায় কিন্তু। আমি কী একটু একটু প্রেমে পড়ছিলাম? নিজেকে সামলালাম। এ এখন কুণালদার মাল।গুরুজনে বলে গেছেন পরদ্রব্যের দিকে কভু চক্ষু তুলিয়া তাকাইবে না। কিন্তু গুরুজনের কথা কি সব সময় মনে রাখা সম্ভব? কোন বানচোদ মনে রাখে? আনন্দী হাসি টাসি থামিয়ে বলল “জানিস, আমি কিন্তু এককালে নৃত্যনাট্য করেছি। নাচের ক্লাসের ম্যাম করিয়েছিলেন। চন্ডালিকা”।
ডুবন্ত মানুষ সামনে খড়কুটো যা পায় সেটাই আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। আমিও সেই চেষ্টাটাই করলাম। বললাম “প্লিজ এবার তাহলে তুইই এটা দায়িত্ব নিয়ে নামিয়ে দে। আর তুইই চন্ডালিকা হ”।
আনন্দী আঁতকে উঠল “না না, এসবে আমি নেই। ক্ষেপেছিস নাকি? লোকে হাসবে?”
আমি কিন্তু বুঝতে পারছিলাম ও না না বললেও ভেতরে ভেতরে বেশ খুশ হয়ে উঠছে। বিরাট কোহলীর মত অ্যাগ্রেসিভ হলাম “আমি ওসব জানি না, আমি কালাচারাল জি এস কে বলে দিচ্ছি এবার চন্ডালিকা হচ্ছে, আর আনন্দী টোটাল দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছে ব্যাস। দাঁড়া আমি সিঙ্গারা আনছি সিঙ্গারা খা”।
আনন্দী খানিকক্ষণ গোঁজ হয়ে বসে থেকে বলল “ওকে খারাপ হলে কিন্তু আমায় দোষ দিতে পারবি না”।
আমি বললাম “কে দোষ দিচ্ছে। কেউ কি কিছু বোঝে নাকি। ব্যাকগ্রাউন্ডে রেকর্ড করা গান চলবে আর হাত পা নাড়াবি ব্যাস টোটাল রাবীন্দ্রিক অ্যাটমোসফিয়ার তৈরি। আর কি চাই?”
আনন্দী খিল খিল করে হেসে ফেলল, আর আমি সেই হাসি দেখে মুগ্ধ হতে লাগলাম আর নিজেকে সামলাবার জন্য জোরে জোরে নিজেকে চিমটি কাটতে থাকলাম। ঈশ ঈশ ঈশ ঈশ, এ আমি কী করতে যাচ্ছি।
#
খানিকক্ষণ পরে সায়ন এল। আমার মেঘ কেটে গিয়ে আমি দিব্যি কোল্ড ড্রিঙ্ক আর সিঙ্গারা সাটাচ্ছি দেখে আমার প্লেটের থেকে একটা সিঙ্গারায় তড়িঘড়ি একটা কামড় দিয়ে বলল “ভাই, কি ব্যাপার এত খুশ”?
আমি হাসতে হাসতে বললাম যা যা হল।
সায়ন টোটালটা সিঙ্গারা টিঙ্গারা সুদ্ধ বিষম খেয়ে খানিকক্ষণ আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল “গাঁড় মেরেছে বাঁড়া। পুরো কমপ্লিট গাঁড় মেরেছে বাঁড়া”।

৮)
যে ব্যাপারটা ভেবেছিলাম ভীষণ ক্যাজুয়াল ভাবে উতরে গেলেই আমি বেঁচে যাব, সেটা যে আনন্দী এত দুর্দান্তভাবে করবে সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। গোটাটা নিজেই দায়িত্ব নিয়ে কাস্টিং থেকে শুরু করে সবই কিভাবে যেন ঠিক করে ফেলল। রিহার্সালও শুরু করে দিল। দিন পাঁচেকের মাথায় আমায় এসে বলল “দেখ, এই রেকর্ড করা গানে নেচে সেই ফিলটা কিন্তু আসছে না। আমাদের কলেজেরই পাঁচ ছ জনকে দিয়ে আমি গাওয়াব ঠিক করেছি”।
আমি আঁতকে উঠলাম, “গাওয়াবি মানে? গোটাটাই লাইভ হবে নাকি?”
আনন্দী আত্মবিশ্বাসীর মত জোরে জোরে মাথা নাড়ল “হ্যাঁ, তুই চিন্তা করিস না, সে ব্যবস্থাও আমি করে নিয়েছি। সেকেন্ড ইয়ারের দুটো দিদি আছে, রীতিমত টিভিতে গান গায়। ওদের বলাতে ওরা রাজিও হয়ে গেছে। দইওয়ালা সহ বাকি ছেলেদের গানে রাতুলদাকে রাজি করিয়ে ফেলেছি। কোরাসের টিমও তৈরি। তোকে যে কাজটা করতে হবে, স্টেজ করার সময় এটা মাথায় রাখতে হবে, যে লাইভ নৃত্যনাট্যে যেভাবে স্টেজ হয়, এবার যেন সেভাবে হয়। গোটা গানের ইউনিটটাই কিন্তু এবার স্টেজে থাকবে”।
আমি খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম “কিছুই বুঝলাম না আমি”।
আনন্দী আমার দিকে কয়েকসেকেন্ড তাকিয়ে হেসে ফেলল “আচ্ছা। সে ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি। কুণালদার বন্ধু অনিকেতদা না? ওকে বললে হয়ে যাবে”।
আমার ধড়ে প্রাণ এল। সত্যি বলতে কী, আমার মত এই সব অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ ছেলেকে এই সব দায়িত্ব দেওয়া রীতিমত ক্রাইমের পর্যায়ে পড়ে। এরা যে সব টেকনিক্যাল টার্ম ব্যবহার করছে সেসব রীতিমত চাপের। প্রথমদিন আনন্দী যখন গোটা ইউনিটকে চন্ডালিকার ব্রিফিংটা দিচ্ছিল, আমি রীতিমত অবাক হয়ে গেছিলাম। মেয়েটার রীতিমত পড়াশুনা আছে। সায়ন অবশ্য আমাকে একেবারে বর্জন করেছে এইসব ব্যাপারে। পরিষ্কার বলে দিয়েছে “তোর এই সব কালচার ফালচার নিজের গাঁড়ে গুঁজে রেখে দে বাঁড়া। আমি এই সবে নেই”।
আমি ওকে বেশি জোর করি নি। ভালুকের গল্পটা ছোটবেলায় সবাই পড়েছিল। আমিও ব্যতিক্রম নই। বন্ধুর কঠিন সময়ে যে বন্ধু পিঠটান দেয় সে তো সেই কবেই জেনে গেছিলাম। প্রথম প্রথম কষ্ট হলেও আজকাল দিব্যি রিহার্সালের সময়ে কলেজ আওয়ারসের বাইরেও কলেজে থেকে যাই। সবাই রিহার্সাল করে আর আমি চুপচাপ বসে বসে ওদের রিহার্সাল দেখি। আনন্দী যে এত অসাধারন নাচে সেটা সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। নাচ বোধহয় ওর রক্তে আছে। যেমন এক্সপ্রেশন দেয়, সেরকম নাচতে পারে। শুধু আমি না, গোটা ইউনিটটা মাঝে মাঝে ওকে দেখে যায় খালি। কুণালদা তো আমাকে একদিন জড়িয়ে টড়িয়ে ধরে থ্যাঙ্কস দিয়েই দিল “ভাই নিজের জি এফের ব্যাপারে যেটা জানতাম না, তুই তো সেটাকে এক্কেবারে দারুণ ভাবে আবিস্কার করলি রে। তোর মধ্যে সত্যিই সুপ্ত প্রতিভা আছে। যেমন হেল্প লাগবে স্টাডি মেটিরিয়ালের ক্ষেত্রে আমাকে বলবি শুধু। সব পেয়ে যাবি তুই”।
আমি মনে মনে বলি “তাও কপাল ভাল ভাল জিনিসটাই জানতে পেরেছ। বাকিটা জানতে পারলে যে কী করতে তা ভগাদাই জানেন”।
সব কিছু সুন্দর মাখনের মতই হয়ে যাচ্ছিল আর এর মধ্যেই সেই ঘটনাটা ঘটে গেল।

৯)
দিনটা ছিল শনিবার।বিকেল পাঁচটা নাগাদ রিহার্সাল শেষ হতে না হতেই বৃষ্টি শুরু হল। কলেজ থেকে বেরোতে আমাদের সবারই দেরী হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যবশত সবার কাছে ছাতা থাকলেও আমার আর আনন্দীর কাছেই ছিল না। সবাই চলে গেল আর দুরুদুরু বুকে আমি লক্ষ্য করলাম আমার সাথে আনন্দীও দাঁড়িয়ে আছে কলেজের বাইরের টিনের শেডটার তলায়। আর কেউ নেই। একটা ভ্যানও নেই। কলেজ টাইমের বাইরে যেহেতু রিহার্সাল হচ্ছিল, সে খবর তো ওরা আর কেউ রাখে না, প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে আমাদের বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছতে হবে। এদিকে ভালই বৃষ্টি চলছে। আমাদের কলেজটা কলকাতা শহরের দক্ষিণের দিকে, একটু শহরতলী ঘেঁষা। শহরের বাইরের দিকে বলে কমিউনিকেশনটা একটু গোলমেলে।
সবার মাঝখানে থাকলে যে রকম স্বাভাবিক ভাবে কথা হয়, এখন তো সেরকম সময় না। আমি একটু ইতস্ততই বোধ করছিলাম ওর সাথে কথা বলতে। দেখা গেল ঐ স্মার্ট বেশি আমার থেকে। বলল “তুইও আটকে গেলি, আমিও আটকে গেলাম। এবার সন্ধ্যে নামার আগে যে আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে তার কী হবে?”
আমি বললাম “কিছুই করার নেই। এককাজ করা যাক, বৃষ্টিটা আরেকটু ধরলে হাঁটা লাগাই। ভিজলে ভিজব আর কী করা যাবে?”
আনন্দী হাসল “দেখ আমার মনে হয় না এর থেকে আর কমবে। হাঁটা লাগাই?”
আমি দেখলাম একবার। স্ট্রীটলাইটগুলি জ্বলে গেছে সব। আর আকাশের যা অবস্থা এর থেকে কোনভাবেই কমতে পারবে না, বরং বাড়তে পারে। আমার যা ঠাণ্ডা লাগার ধাঁচ নির্ঘাত তিন দিন ভাইরাল ফিভার হয়ে ঘরে শুয়ে থাকতে হবে। তাই আমতা আমতা করলাম “না মানে আর দশ মিনিট দেখে গেলে হত না? এতে বেরোলে আমার নির্ঘাত জ্বর আসবে”।
আনন্দী অবাক হয়ে বলল “সে কীরে, বৃষ্টিতে ভিজলে তোর জ্বর আসে? তোর অবস্থা তো তাহলে খুব খারাপ। ওকে আরেকটু দেখা যাক”।
আমি কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম আর এই সময়েই একটা কালো গাড়ি হর্ন বাজাতে বাজাতে আমাদের টিনের শেডটার কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেল আর গাড়ি থেকে নামল একটা লোক। আমাদের থেকে কয়েকবছর বড় হবে। আনন্দী লোকটাকে দেখেই ছিটকে আমার কাছে চলে এল, ওর মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল, লোকটার চোখগুলি কেমন অস্বাভাবিক, আমার দিকে তাকিয়ে বলল “কিরে বানচোদ ছেলে তোকে কী বলেছিলাম ভুলে গেছিস? ওকে এখনও ছাড়িস নি তুই? তোর তো গাঁড় মেরে রেখে দেব আমি”।
আনন্দী আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছে নিজের অজান্তেই সেটা বুঝতে পারলাম। আর এটাও বুঝলাম এই সেই পিনাকী মালটা, যেটা সেদিন রাত্রে আমাকে ফোন করেছিল। আমি বললাম “আপনি কি আমাকে ফলো করছেন? দেখুন, আমি যখন যা ইচ্ছা করতে পারি, তার জন্য আপনাকে কৈফিয়ত দিতে যাব না”।
কেউ কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিনাকী আমার মুখে ঘুষি চালাল। ঘুষিটা দাঁতে লাগায় একটা কষটা স্বাদ লাগল জিভে। বুঝলাম রক্ত বেরোচ্ছে। আমি কেমন অবশের মত বসে পড়লাম। আনন্দী চেঁচিয়ে উঠল বাঁচাও বাঁচাও বলে। সেটা শুনে ভয় পেয়েই হয়তো বা, ছেলেটা গাড়িতে চড়ে চম্পট দিল। আনন্দী একটু দূরে গিয়ে রাস্তাতেই বৃষ্টির মধ্যে বসল। লজ্জায়, অপমানে না বৃষ্টির ঠাণ্ডায় জানি না কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল। কয়েক মিনিট পরে আমাকে ক্লান্ত গলায় বলল “তুই সব জানিস না?”
আমি চুপচাপ মাথা নাড়লাম।

১০)
বৃষ্টিটা তখনও কমেনি। বরং বেড়েছে। আমার কিংবা আনন্দীর কারোই সেসব আর মাথায় ছিল না। মুখে ফেটে রক্ত পড়ছে। মাড়িতে মেরেছে, দাঁতে বেশ খানিকটা কনকনে ব্যথা করছে। আনন্দী আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে পারলে মাটিতে মিশে যায়। লজ্জায় অপমানে কেমন একটা হয়ে গেছে। আমি কোন কথা না বলে চুপচাপ একটা ঘোরের মধ্যে হাঁটছিলাম। রাস্তায় কেউ নেই। দূর থেকে বাস চলার শব্দ ভেসে আসছে খালি।
আনন্দীই একসময় নীরবতা ভঙ্গ করে বলল “আমার জন্য তোকে মার খেতে হল। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিস”।
আমি আনন্দীকে বললাম “আমার আর কী হয়েছে! কিন্তু এই ছেলেটা যেভাবে তোর পেছনে লেগেছে তাতে তো তোর আরও বড় ক্ষতি হতে পারে”।
আনন্দী বলল “এবং ছেলেটা আমার মাসতুতো দাদা”।
আমি চমকে উঠলাম “সেকী???”
আনন্দী বলল “যেদিন থেকে কলকাতা এসছি, আমাকে ভিডিওটা নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে যাচ্ছে। ওর সাথে শুতে হবে”।
কেঁদে ফেলল আনন্দী। আমি একটু অস্বস্তির সাথে চারিদিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। কেউ নেই কোথাও। যাক। নইলে একটা অকওয়ার্ড সিচুয়েশন হত। লোকে ভাবত আমার জন্য কাঁদছে হয়ত।
আমি বললাম “আমার ফোন থেকে ওকেই ফোন করেছিলি?”
আনন্দী বলল “হ্যাঁ। তোর নাম্বার থেকে করে বলেছিলাম আমার বয়ফ্রেন্ডের নাম্বার এটা। আর ডিস্টার্ব করলে তোমার কপালে দুঃখ আছে”।
আমি বললাম “হ্যাঁ, সেই রাতে আমাকে ফোন করে হুমকি দিয়েছিল”।
আনন্দী বলল “কুণালদা সেদিন কলেজে এলে ওর ফোন থেকেই করতাম। আমি সরি রে”।
আমি বললাম “এটা নিয়ে চাপ নিস না প্লিস। কিন্তু আমার এটা ভাবতেই খারাপ লাগছে নিজের মাসতুতো দাদা এটা কী করে করতে পারে”!
আনন্দী বলল “বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটাই হয়। আমি কিছুদিন একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে সেশন করেছিলাম। সেখানেই জানতে পেরেছিলাম, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাড়ির লোকেরাই এই সব জিনিসগুলি করে থাকে। এদেশের রেপ কেসগুলির অধিকাংশই নিজেদের বাড়িতে দাদা কিংবা বাবার কাছে হয়, যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোন রকম পুলিশ ডায়েরী হয় না। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি সুইসাইড করতে, পারি নি। একটা সময়ে মনে হত চারদিকে সবাই আমাকে দেখে হাসছে, আমাকে নিয়েই কথা বলছে, সবাই যেন আমার ভেতরটা দেখে ফেলে সেটাকে আঁচড়ে কামড়ে রক্তাক্ত করার জন্য এগিয়ে আসছে। দিনের পর দিন একই দুঃস্বপ্ন দেখেছি আমি। আমার যেটুকু গোপনীয়তা, গোটা পৃথিবীকে সেটা দেখিয়ে দিয়েছে পিঙ্কুদা। এখনও দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করে যাচ্ছে ওর সাথে না শুলে গোটা পৃথিবীতে আবার ছড়িয়ে দেবে আমার ক্লিপটা। ওর বউ আছে, বাচ্চা আছে, ভদ্র সামাজিক পরিচিতি আছে, কিন্তু তবু ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে যত দিন যাচ্ছে। কুণালদা তো কিচ্ছু জানে না। ও যেদিন জানতে পারবে ও তো আমাকে ঘেন্না করা শুরু করবে। আমি তো অস্পৃশ্য হয়ে যাব! আমি জানিনা আমি কী করব”।
আনন্দী ফুঁপিয়ে উঠল। আমি বুঝতে পারছিলাম না ওকে কী করে সান্ত্বনা দেব। কী থেকে কী হয়েছিল ঐ পিনাকীর সাথে পুরো ব্যাপারটাই ধীরে ধীরে আমাকে বলল ও। আমি শুনে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। কী ভয়াবহ একজন মেয়ের জীবন! বাড়ির বাইরে তাদের যত না ভয়, বাড়ির ভেতরেও সে ভয় কোন অংশেই কম নয়!
আমাকে আনন্দী বলল “আমি মনে হয় চন্ডালিকা করতে পারব না রে। সবাই যখন আমার পাস্ট জেনে যাবে, সবাই আমাকে ঘেন্না করবে। তুই আমাকে ঘেন্না করছিস না? সত্যি করে বল?”
সন্ধ্যে নামছে বৃষ্টির মধ্যে। আমি আনন্দীর দিকে শান্তস্বরে তাকিয়ে বললাম “তুই যেদিন কলেজে ভর্তি হয়েছিস, সেদিন থেকে জানি তোর পাস্ট। আমার সেদিন যদি ঘেন্না না থাকে, আজকেও থাকবে না। বরং তোর প্রতি আমার সম্মানটা দিনে দিনে বেড়েছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পরিস্থিতিতে একটা মেয়ে কীভাবে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে, হাসতে পারে, সবার সাথে স্বাভাবিক ভাবে মিশতে পারে, সেটা বোধহয় তোর সাথে পরিচয় না হলে আমি কোন দিন জানতে পারতাম না। তুই কোনদিন ভুলেও ভাববি না আমি তোকে একটুকুও ঘেন্না করি। তুই কালকে চন্ডালিকা বোঝাচ্ছিলি যখন সবাইকে, আমিও শুনছিলাম। আনন্দ যখন বলছেন “যে মানব আমি, সেই মানব তুমি কন্যা” সেই জায়গাটা মনে আছে? আমরা সবাই বন্ধু, এখানে অস্পৃশ্যের কী আছে রে? কবে, কে না কে কী করেছে, তার জন্য তুই নিজের জীবন কেন নষ্ট করবি! এতদিন তুই একা লড়েছিস ঐ জানোয়ারটার বিরুদ্ধে, জানবি আজ থেকে আমিও তোর সাথে আছি এই লড়াইতে। আজকে বাড়ি যা। আমরা ভেবে ঠিক করব কালকে, কিভাবে এই পিনাকীর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তুই চিন্তা করবি না, দরকার হলে ওর বউয়ের সাথে দেখা করে সব ব্যাপারটা খুলে বলব আমি”।
আনন্দী কিছু বলল না। চুপচাপ হাঁটতে লাগল। ঐটুকু রাস্তা পেরোতে অনেকক্ষণ কেটে গেল।
ওকে বাসে তুলে দেবার সময় শুধু অস্ফুটে বলল “থ্যাঙ্কস রে”। আমি হাসলাম।
তারপর ঠিক করতে লাগলাম বাড়ি ফিরে এই মুখ কেটে যাবার কী অজুহাত দেওয়া যায়।

১১)
পরের দিন রবিবার। একটু দেরী করেই ঘুম ভাঙল। আগের দিন বাড়ি গিয়েই ফার্স্ট এইড করা হয়েছিল।বাবা মা কে বলে দিয়েছি রাস্তায় পড়ে এই হাল। ভাল ভাল কথা শোনাল বাবা। পাওয়ার ছাড়াও যে কিছু কিছু কান্ডজ্ঞানহীন পাব্লিকের চশমা পরার দরকার সে নিয়ে ৩০ নম্বর প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জ্ঞান শুনতে হল। সকালে দাঁত মাজার সময় দেখলাম একটু একটু রক্ত বেরচ্ছে থুতুর সাথে। বুঝলাম ডেন্টিস্টকে একবার দেখাতেই হবে। মাড়িতে একটু একটু রক্ত লেগে আছে। বেশ খানিকক্ষণ আয়নায় নিজেকে দেখে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বললাম “ব্যাটা পিনাকি তোমার মার গাড়ব দাঁড়াও, তুমি এটুকু রক্ত বের করলে, তোমার কী হাল করি দেখ”।
উপরওয়ালা বলে কেউ আছেন নাকি জানি না, কিন্তু তিনি বোধহয় আমার কষ্ট মেনে নিতে পারেন নি, নইলে...
ব্রেকফাস্ট টেবিলে বাবার সাথে রোজই আমার খবরের কাগজ নিয়ে মারপিট লাগে। আজও লাগল। কোনমতে খবরের কাগজটা বাগিয়ে কাগজের প্রথম পাতায় কোণার দিকে চোখ রাখতেই দেখলাম

বাইপাসে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, মৃত মদ্যপ যুবক
গতকাল রাতে ই এম বাইপাসে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহত হলেন এক মদ্যপ যুবক। পিনাকী চ্যাটার্জি(২৭) নামের ঐ মদ্যপ যুবকের কালো রঙের আই টেন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাসের পিছনে ধাক্কা মারলে ঘটনাস্থলেই ঐ যুবকের মৃত্যু হয়। বেশ খানিকক্ষণ বাইপাসের যান চলাচল ব্যাহত হয়। বিস্তারিত খবর ভিতরের পাতায়”।
আমি খবরটা তিন চারবার পড়ে বিকট একটা চিৎকার দিলাম। বাবা খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বলল “ডাক্তার ডাকব না ট্রেনের টিকিট কাটব রাঁচির? মাথা টাথা গেছে নাকি তোর?”
আমি লাফাতে লাফাতে নিজের ঘরে দৌড়লাম।

#
আনন্দীকে খবরটা দেবার পরে ও শান্ত গলায় বলল “জানি, যে বাসটায় মেরেছিল, সেটায় আমি ছিলাম। অনেকদিন পরে আমি কালকে ভালভাবে ঘুমাতে পেরেছি।”
আমি ভাবলাম এও সম্ভব? এটাই হয়? আমার মাথা একেবারেই কাজ করছিল না। অদ্ভুত একটা আনন্দ হচ্ছিল। কারও কারও মৃত্যুর খবরে যে এরকম একটা আনন্দ হতে পারে তা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারি নি আমি।
আনন্দী বলল “আমি ঠিক করেছি কুণালদাকে সব বলে দেব। তারপরে ও যা সিদ্ধান্ত নেবে নিক”।
আমি কিছু বললাম না। আমি জানি, যে মানসিক দৃঢ়তা ওর আছে, এরপরেও ও ঠিকই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। আর কুণালদা যদি ওকে ছেড়ে দেয়?
তাহলে আমি একটা লটারির টিকিট কাটব। জয় গুরু। দেখিস মা!!!


চিত্র কৃতজ্ঞতা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান