মৌবনে আজ...

অভীক দত্ত

 

জ্যাকেটের চেনটা কেটে গেছিল। সৌরভ গেছিল বাজারের দর্জির কাছে। দর্জি কাকু ভাল মুডেই ছিল। রেডিওতে গান বাজছিল। বাজারেও চাদ্দিকে একটা সুখী সুখী পরিবেশ। কিন্তু তাল কাটল একটা গান শুরু হতেই। "মৌবনে আজ মৌ জমেছে"।
গানটা প্রথম লাইন হতেই দর্জি কাকু "ধুস, যত উল্টো পালটা গান" বলে রেডিওটা বন্ধ করে দিল। সৌরভ তো হা। এটা কী হল! হেমন্তর এত সুন্দর একটা গান উল্টো পালটা?
সে কিছু বলল না, কাজ হতেই চুপ চাপ চলে এল।
#
আসল গল্পটা অবশ্য সৌরভের জানার কথা নয়।
এক পাড়াতেই থাকা অধীর আর শিউলির গল্প ছিল সেটা। শিউলির প্রিয় গান "মৌবনে আজ মৌ জমেছে"।তখন তো এত এফ এমের রমরমা ছিল না। কলকাতা ক আর কলকাতা খ এর সময়। অনুরোধের আসরে বারবার এই গানটার জন্য চিঠি পাঠাত শিউলি। আর অধীর সে চিঠি পোষ্ট করে আসত। একদিন যখন কানে এল "এর পরে শুনবেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় এবং নচিকেতা ঘোষের সুরে, বন্ধু চলচ্চিত্রের গান মৌবনে আজ মৌ জমেছে। অনুরোধ করেছেন বারাসাত থেকে শিউলি সাহা এবং অধীর সরকার"। সেদিন শিউলি আর অধীরের আনন্দ ছিল দেখার মত। দুজনের মধ্যে একটা বোঝাপড়া ছিল। অধীর ভাল ছাত্র ছিল। কিন্তু কপালের ফের হলে যা হয়। একরাতের মধ্যে সব ওলট পালট হয়ে গেল।
অধীরের বাবা হঠাৎ একদিন হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেলেন। মায়ের অসুখ, দিদির বিয়ে, ক্লাস ইলেভেনেই পড়াশুনায় ইতি টেনে কলকাতায় বড়বাজারে যাতায়াত, তারপর দর্জির কাজ শিখে এলাকাতেই দোকান দেওয়া, এসব করতে করতে কখন যেন একদিন শিউলি না চাইতেই ওর বিয়ে হয়ে গেল জব্বলপুরে। সবকিছু শেষ হয়ে গেল।
#
বেচারা সৌরভ তো এত কিছু জানে না। তাই সেদিন টিউশন শেষে অনেক রাত করে যখন বাড়ি ফিরছিল তখন যখন দেখল মোবাইলে "মৌবনে আজ মৌ জমেছে" চালিয়ে দর্জিকাকু কেমন চুপচাপ স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, তখন অবাক হওয়া ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান