চলব আপন মতে, শেষে মিলব তাঁরই পথে

অনির্বাণ দাস

 


অলংকরণ তৌসিফ হক


ভোটের ভটভটিতে চেপে আমরা বছরের পর বছর এই ভবনদী পারাপার করে চলেছি। কী আমাদের গন্তব্য, কোথায় যে আসলে পৌছতে চাই জানি না। জানি শুধু ভোট দিতে হবে। দিয়ে যেতে হবে, বছরের পর বছর। ব্যালটবাক্সের ভিতর থেকে রাজা বেরিয়ে আসবেন, আর আমাদের সকল যন্ত্রণার অবসান তখন। চাষীকে আর আত্মহত্যা করতে হবে না। আগুনে পুড়ে মরতে হবে না স্টিফেনকোর্টকে। লোডশেডিঙের এই দুনিয়ায় একটা ভাল আলোয় তিনি আসবেন। হাত থেকে হেরিকেন নামিয়ে রাখবে পাবলিক। প্রবল জয়ধ্বনির ভেতর এই ব্যা ব্যা ব্যাকরণে আই পি এল আর বি পি এলের মধ্যবর্তী ঘোলাজলে তখনও জেগে থাকবে ক্যুইজের একটাই প্রশ্নঃ ‘প্রজা’র বিপরীত শব্দটা কি?
প্রতিদিন ‘সহজপাঠ’ পড়তে হয় আমার এখন,নিতান্ত জীবিকার প্রয়োজনেই। তো হঠাৎ সেদিন হল কী, ওই চারটে লাইন বাড়ি ফেরার পরও সঙ্গে রয়ে গেল ‘চেয়ে চেয়ে চুপ করে রই-/তেপান্তরের পার বুঝি ওই,/মনে ভাবি ওইখানেতেই/আছে রাজার বাড়ি’।
আমার তো আর তেমন ‘পক্ষিরাজের বাচ্ছা ঘোড়া’ নেই তাই রাজার বাড়ি খুঁজতে শুরু করে দিলাম অন্যভাবে কখন যেন। ‘’বাড়িতে আরও-একটা জায়গা ছিল, সেটা যে কোথায় তাহা আজ পর্যন্ত বাহির করিতে পারি নাই। আমার সমবয়স্কা খেলার সঙ্গিনী একটি বালিকা সেটিকে রাজার বাড়ি বলিত। কখনো কখনো তাহার কাছে শুনিতাম, ‘আজ সেখানে গিয়াছিলাম’। কিন্তু, একদিনও এমন শুভযোগ হয় নাই, যখন আমিও তাহার সঙ্গ ধরিতে পারি। সে একটা আশ্চর্য জায়গা, সেখানে খেলাও যেমন আশ্চর্য খেলার সামগ্রীও তেমনি অপরূপ। মনে হইত, সেটা অত্যন্ত কাছে, একতলায় বা দোতলায় কোনো একটা জায়গায়; কিন্তু কোনমতেই সেখানে যাওয়া ঘটিয়া উঠে না। কতবার বালিকাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছি, রাজার বাড়ি কি আমাদের নাড়ির বাহিরে’। সে বলিয়াছে ‘না, এই বাড়ির মধ্যেই’। ...(জীবনস্মৃতি)
‘ডাকঘরে’ ঢুকে দেখি সেখানেও এক রাজা। একটা অক্ষরশূন্য সাদা কাগজ রুগ্ন বালক অমলের হাতে দিয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছে মোড়ল, ‘রাজা লিখছেন, আমি আজকালের মধ্যেই তোমাদের বাড়িতে যাচ্ছি, আমার জন্য তোমাদের মুড়ি-মুড়কি ভোগ তৈরি করে রেখো- রাজভবন আর আমার এক দণ্ড ভালো লাগছে না। হা হা হা হা!’ অথচ রাজা যে আসবেই তার কাছে এটা বিশ্বাস করতে অমলের কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল যে তার আকাশে ধ্রুবতারাটিকে দেখিয়ে দাও’। ‘আগমন’ কবিতায় লিখলেনঃ ‘ কোথায় আলো, কোথায় মাল্য, কোথায় আয়োজন!/রাজা আমার দেশে এল, কোথায় সিংহাসন!/ হায় রে ভাগ্য, হায় রে লজ্জা- কোথায় সভা, কোথায় সজ্জা ! / দুয়েক জনে কহে কানে, ‘বৃথা এ ক্রন্দন / রিক্ত করে শুন্য ঘরে করো করো অভ্যর্থনা’, / ওরে দুয়ার খুলে দে রে, বাজা শঙ্খ বাজা- গভীর রাতে এসেছে আজ আঁধার ঘরের রাজা।/বজ্র ডাকে শুন্যতলে, বিদ্যুতেরই ঝিলিক জলে/ ছিন্ন শয়ন টেনে এনে আঙিনা তোর সাজা-/ঝড়ের সাথে হঠাৎ এল দুঃখরাতের রাজা’’।
কে এই রাজা? কোথায় তাঁর বাড়ি? তাঁর নিজস্ব রাজাকে একটু একটু করে গান, কবিতা, নাটক ও অন্যান্য রচনায় নির্মাণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। রাজা তাঁর অন্তরের অভিভাবক, তাঁর পরাণসখা, বন্ধু। তাঁরই সঙ্গে খেলেছেন প্রাণের খেলা। রাজা মানেই কিন্তু শাসক নয় ‘রাজর্ষি’তে লিখলেন ‘গোবিন্দমাণিক্যকে দেখিয়া ফকিরের রাজা বলিয়াও মনে হইল, সন্ন্যাসী বলিয়াও বোধ হইল। তিনি ঠিক এরূপ আশা করেন নাই। তিনি মনে করিয়াছিলেন হয় একটা লম্বোদর পাগড়ি-পরা স্ফীত মাংসপিন্ড দেখিবেন, নয়তো একটা দীনবেশধারী মলিন সন্ন্যাসী অর্থাৎ ভস্মাচ্ছাদিত ধূলিশয্যাশায়ী উদ্ধত স্পর্ধা দেখিতে পাইবেন। কিন্তু দুয়ের মধ্যে কোনোটাই দেখিতে পাইলেন না। গোবিন্দমাণিক্যকে দেখিয়া মনে হইল তিনি যেন সমস্ত ত্যাগ করিয়াছেন, তবু যেন সমস্ত তাহাঁরই। তিনি কিছুই চান না বলিয়াই যেন পাইয়াছেন... কোন প্রকার আড়ম্বর নাই বলিয়াই তিনি রাজা, এবং সমস্ত সংসারের নিকটবর্তী হইয়াছেন বলিয়া তিনি সন্ন্যাসী। এইজন্য তাঁকে রাজাও সাজিতে হয় নাই, সন্ন্যাসীও সাজিতে হয় নাই’।
রাজার পোশাক গায়ে চাপালেই কি সে রাজা? রাজা তো ভিতরে ভিতরে হয়ে ওঠার ব্যাপার। সে তো এক অন্য অর্জন। ‘মুক্তধারা’য় ধনঞ্জয় বৈরাগী-কে দিয়ে বলালেন, ‘রাজা হলেই রাজাসনে বসে, রাজাসনে বসলেই রাজা হয় না’।‘সত্যি কথা বলব বাবা? যতক্ষণ তাঁর আসন বলে চিনবি ততক্ষণ সিংহাসনে দাবি খাটবে না, রাজারও না, প্রজারও না। ও তো বুক ফুলিয়ে বসবার জায়গা নয়, হাত জোড় করে বসা চাই’। রাজার মত ভান করে তুমি ঘুরে বেড়াতে পার, মানুষকে সাময়িক ভুলও বোঝাতে পার, কিন্তু সে বিভ্রান্তি একদিন না একদিন কেটে যাবেই।
আজকের এই ভোটের বাজারে প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতায় নেমে পড়া সিংহাসনলোভী ধূর্ততা দেখতে দেখতে হয়তো মনে পড়ে যাবে ‘অরূপরতন’ নাটকের কথা।
সুরঙ্গমাঃ কাকে তুমি রাজা বলছ?
সুদর্শনাঃ ওই যার মাথায় ফুলের ছাতা ধরা আছে।
সুরঙ্গমাঃ ওই যার পতাকার কিনশুক আঁকা?
সুদর্শনাঃ আমি তো দেখামাত্রই চিনেছি, তোর মনে কেন সন্দেহ আসছে।
সুরঙ্গমাঃ ও তোমার রাজা নয়, আমি যে ওকে চিনি।
সুদর্শনাঃ ও কে?
সুরঙ্গমাঃ ও সুবর্ণ। ও জুয়ো খেলে বেড়ায়।
সুদর্শনাঃমিথ্যে কথা বলিস নে। সবাই ওকে রাজা বলছে। তুই বুঝি সকলের চেয়ে বেশি জানিস।
সুরঙ্গমাঃ ও যে সবাইকে মিথ্যে লোভ দেখাচ্ছে, সেই জন্যে সবাই এর বশ হয়েছে।যখন ভুল ভাঙবে তখন হায় হায় করে মরবে’।
ক্ষমতার লালসাময় আমাদের এই যক্ষপুরী-তে বসে আমরা রোজ টের পাই রাজা আসলে কী, রাজা আসলে কেন। সোনা দানা হীরে মানিকের স্তুপের ভিতরে বসে থাকা ভয়ংকর অন্য এক রাজার অসহায়তাও আমরা দেখেছিলাম ‘রক্তকরবী’তে, “নন্দিন,একদিন দূরদেশে আমারই মতো একটা ক্লান্ত পাহাড় দেখেছিলুম। বাইরে থেকে বুঝতেই পারিনি তার সমস্ত পাথর ভিতরে ভিতরে ব্যথিয়ে উঠেছে। একদিন গভীর রাতে, ভীষণ শব্দ শুনলুম, যেন কোন দৈত্যের দুঃস্বপ্ন গুমরে গুমরে হঠাৎ ভেঙে গেল। সকালে উঠে দেখি পাহাড়টা ভূমিকম্পের টানে মাটির নীচে তলিয়ে গেছে। শক্তির ভার নিজের অগোচরে কেমন করে নিজেকে পিষে ফেলে, সেই পাহাড়টাকে দেখে তাই বুঝেছিলুম’’। এবং এখানেই সবশেষে দেখলাম নিজেরই। এতদিন ধরে গড়ে তোলা অন্তঃসারশূন্য ক্ষমতাকেন্দ্রটিকে ভেঙে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন রাজা স্বয়ং। নিজের বিরুদ্ধে তাঁর নিজের লড়াই। গানকে সন্দেহ করেছিল যারা, যারা যৌবনকে হত্যা করেছিল শুধুমাত্র ক্ষমতা ও সম্পদের লোভে, তাদের সুসংগঠিত ব্যবস্থাটির মাঝখান থেকেই নিজের বিরুদ্ধে নিজে অস্ত্র তুলে নিচ্ছেন রাজা। প্রেমের চেয়ে শক্তিমান অস্ত্র আর আছে?
রাজা মানেই কি যুদ্ধবিলাস? রক্তের হোলিখেলা? হিংসা ও ঈর্ষার চোরাকারবারি? ক্ষমতার বলয়টিকে আরও দৃঢ় ও নিরাপদ করে তুলতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষের নানাবিধ অস্ত্র আস্ফালন? ষড়যন্ত্র? আর সদম্ভ সাজা ঘোষণা? ‘রাজা ও রাণী’ নাটকে দেখলাম বিক্রমদেবকে। রাজার এক মানবিক মুখ। বন্ধু দেবদত্তকে বলছেন “রাজার হৃদয় সেও হৃদয়ের তরে/ কাঁদে। হায় বন্ধু, মানবজীবন লয়ে /রাজত্বের ভান করা শুধু বিড়ম্বনা।/দম্ভ-উচ্চ সিংহাসন চূর্ণ হয়ে গিয়ে/ ধরা সাথে হোক সমতল, একবার/ হৃদয়ের কাছাকাছি পাই তোমাদের”।
রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন দিক থেকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন তাঁর আপন রাজার বিবেককে। হাসি ও তাতার হাত ধরে রাজা স্নান করতে আসছেন গোমতী নদীতে। একটি রক্তস্রোতের রেখা শ্বেতপাথরের ঘাট বয়ে নেমে গেছে। গতকাল ভুবনেশ্বরীর পুজোয় বলি হয়েছে একশো এক মহিষ। ‘হাসি সেই রক্তের রেখা দেখিয়া সহসা সংকোচে সরিয়া গিয়া রাজাকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘এ কিসের দাগ বাবা!’ রাজা বলিলেন, ‘রক্তের দাগ মা’। সে কহিল, ‘এত রক্ত কেন’! এমন একপ্রকার কাতর স্বরে মেয়েটি জিজ্ঞাসা করিল, ‘এত রক্ত কেন!’ তিনি সহসা শিহরিয়া উঠিলেন’। আর আজ? মহিষের রক্ত তো কোন ছাড়, মানুষের রক্তস্রোত দেখেও শিউরে ওঠে না রাজহৃদয়।
অথচ আজকের সময়ও রাজার সমীপে এই একটাই প্রশ্ন কিন্তু ক্রমাগত রেখে চলেছে – ‘এত রক্ত কেন?’ নিরুত্তর রাজকীয় নিষ্ঠুরতার ভিতর শুধু সিংহাসন জেগে থাকে। ‘রাজা প্রজা’ প্রবন্ধে এক জায়গায় বলছেন রবীন্দ্রনাথঃ “কিন্তু প্রাচ্য রাজামাত্রই বুঝিতেন, দরবার স্পর্ধাপ্রকাশের জন্য নহে; দরবার রাজার সহিত প্রজাদের আনন্দসম্মিলনের উৎসব। সেদিন কেবল রাজোচিত ঐশ্বর্যের দ্বারা প্রজাদিগকে স্তম্ভিত করা নয়, সেদিন রাজোচিত ঔদার্যের দ্বারা তাহাদিগকে নিকটে আহ্বান করিবার দিন। সেদিন ক্ষমা করিবার, দান করিবার, রাজশাসনকে সুন্দর করিয়া সাজাইবার শুভ অবসর’।
‘মুক্তধারা’ নাটকে কিন্তু এলেন যুবরাজ অভিজিৎ উত্তরকূটের রাজা রণজিতের একেবারে একশো আশি ডিগ্রি উল্টো একটা উত্তরাধিকার নিয়ে। শিবতরাইয়ের অবাধ্য প্রজাদের শায়েস্তা করতে (জীবন হেল করে দিতে?) যন্ত্ররাজ বিভূতিকে দিয়ে মুক্তধারার ঝরনায় বাঁধ নির্মাণ করেছেন রাজা। একটু একটু করে শুকিয়ে ছটফট করতে করতে নিষ্প্রাণ হয়ে যাবে অবাধ্য শিবতরাই –তখন তারা রাজার বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য। উত্তরকূটের যুবরাজ অভিজিৎ কিন্তু মেনে নিতে পারেননি এই নির্মম ও রাজকীয় ষড়যন্ত্র। “ বিভূতিঃ অভিশাপ! দেখো, উত্তরকূটে যখন মজুর পাওয়া যাচ্ছিল না তখন রাজার আদেশে প্রত্যেক আঠারো বছরের উপর বয়সের ছেলেকে আমরা আনিয়ে নিয়েছি। তারা তো অনেকেই ফেরে নি। সেখানকার কত মায়ের অভিশাপের উপর আমার যন্ত্র জয়ী হয়েছে। দৈবশক্তির সঙ্গে যার লড়াই, মানুষের অভিশাপকে সে গ্রাহ্য করে?
দূতঃ যুবরাজ বলছেন কীর্তি গড়ে তোলবার গৌরব তো লাভ হয়েছেই, এখন কীর্তি নিজে ভাঙবার যে আরো বড়ো গৌরব তাই লাভ করো’’। অভিজিৎ এভাবেই কিন্তু হয়ে উঠেছেন আমাদের মনের রাজা।
ওদিকে ধনঞ্জয় বৈরাগীর কণ্ঠে তিনি বলছেনঃ ঠাট্টা কেন করব? এক পায়ে চলার মত কি দুঃখ আছে? রাজত্ব একলা যদি রাজারই হয়, প্রজার না হয়, তাহলে সেই খোঁড়া রাজত্বের লাফানি দেখে তোরা চমকে উঠতে পারিস কিন্তু দেবতার চোখে জল আসে। ওরে রাজার খাতিরেই রাজত্ব দাবি করতে হবে’। আসলে এটাই রবীন্দ্রনাথের ‘আমরা সবাই রাজা’ তত্ত্ব। ‘ত্রাসের দাসত্ব’ করতে হলে আর ‘রাজার সনে মিলব কি স্বত্বে?’ সম্মানটুকুই তো ফিরে আসবে তাঁর কাছে। ‘বিফলতার বিষম আবর্তে’ দাঁড়িয়ে রাজা আর কবে অনুভব করবেন এই চিরকালীন সত্য?
তাঁর ভাবনার তরণী কিন্তু ফিরে ফিরে এসেছে সুরে ও স্বরে হৃদয়ের রাজাটিকে গড়ে তুলতেঃ ‘আমরা বসব তোমার সনে-/ তোমার শরিক হব রাজার রাজা,/ তোমার অর্ধেক সিংহাসনে’।
তাঁর পূজা ও প্রেম এখানেও হাতে হাত রাখছেঃ “ মহারাজ, একী সাজে এলে হৃদয়পুরমাঝে!/ চরণতলে কোটি শশী সূর্য মরে লাজে’’। ত্রাসের রাজা নয়, শেষপর্যন্ত প্রেমের রাজাকে নির্ণয় করতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘শাপমোচন’এ লিখছেনঃ ‘চৈত্রপূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে শুভলগ্ন। সেই বিবাহরাত্রে দূরে একলা বসে রাজার বুকের মধ্যে রক্ত ঢেউ খেলিয়ে উঠল। ... লোকান্তরে কার সঙ্গে এইরকম জ্যোৎস্নারাত্রে সে যেন এক দোলায় দুলেছিল। ... একটা পদ তার মনে গুঞ্জরিয়া উঠছে ‘ভুলো না- ভুলো না- ভুলো না” । এই জাতিস্মর দুঃখটুকু যার নেই, তিনি আবার রাজা কীসের?
‘ভোটভিক্ষুক’ আর রাজভিখারি’- দুটো এক জিনিস নয়। ‘কৃপণ’ কবিতায় গ্রামের পথে পথে ভিক্ষা করার সময় হঠাৎ দেখি আজ স্বর্ণরথে চেপে কোন মহারাজ যেন। ভাবলাম, কার মুখ দেখে যে উঠেছি। উনি নিশ্চয়ই এখন রথের থেকে ধনধান্য ছড়াবেন। পথের দু’পাশ থেকে মুঠো ভরে কুড়িয়ে নেব। এমন সময় আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে তুমি নেমে এলে স্বর্ণরথ থেকে পথের ধূলায়। তোমার তো কম্যান্ডো বডিগার্ড ব্ল্যাক ক্যাট লাগে না, তোমার কনভয়ে তুমিই একা- কত সহজে প্রসন্ন মুখে নেমে এলে আমার সমতলে। আমার সব ব্যথা জুড়িয়ে গেল আজ। ‘হেনকালে কিসের লাগি তুমি অকস্মাৎ/ ‘আমায় কিছু দাও গো’ বলে বাড়িয়ে দিলে হাত’।/ মরি, এ কী কথা, রাজাধিরাজ, ‘আমায় দাও গো কিছু’-/শুনে ক্ষণকালের তরে রইনু মাথা নিচু।/ তোমার কিবা অভাব আছে ভিখারি ভিক্ষুকের কাছে!/ এ কেবল কৌতুকের বশে আমায় প্রবঞ্চনা।/ঝুলি হতে দিলেম তুলে একটি ছোট কণা’।
পণ্ডিতরা হয়ত শুধু ঈশ্বরতত্ত্বের কথাই বলবেন, আমি বলব মানবিক মূল্যবোধ ও দুঃখ বদলের কথা। ‘জীবনদেবতা’কে আমাদের মতোই একজন রক্ত মাংসের দুঃখ সুখের মানুষ ভাবতে ভাল্লাগে আমার। রাজাকেও। ‘যবে পাত্রখানি ঘরে এনে উজার করি-একি,/ভিক্ষা-মাঝে একটি ছোট সোনার কণা দেখি!/দিলেম বা রাজ ভিখারিরে স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে-/তখন কাঁদি চোখের জলে দুটি নয়ন ভরে,/তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূন্য করে?’
বিশ্বাসের রাজ্যে, স্তব আর বাস্তবের এক মধ্যবর্তী নির্বাচনে এভাবেই তো তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের ‘আত্মার শান্তি, প্রাণের আরাম’, হয়ে ওঠেন নির্বিকল্প, হয়ে ওঠেন কবির রাজা।

অনির্বাণ দাস

অনির্বাণ দাস


কবিতা আর লেখালেখির জগতে প্রায় পনেরো বছর অতিক্রান্ত অনির্বাণ দাসের। “অহর্নিশ” পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন বহুদিন, বর্তমানে “বাতিঘর” পত্রিকার সম্পাদনায় নিযুক্ত। “ডাকাডাকি”, “এসো”, “বিষণ্ণ আসবাব”, “লোডশেডিঙের মাঠ”, এবং সর্বশেষ কবিতার বই “ব্লেড” পাঠকমহলে সাড়া জাগায়। “ঘটি গরম এসপেশাল” অনির্বাণের প্রথম গদ্যের বই।

আপনার মতামত জানান