নিউটন চন্দ্র হালদারের সাথে প্রথম দেখা

অভীক দত্ত

 

গল্প-১
।।ওয়ার্ম আপ।।



এই মুহূর্তে আমি ব্যাজার মুখে একটা টু বি এইচ কে ফ্ল্যাটে বসে আছি আর আমার সামনে একটা বাবার বয়সী লোক টি শার্ট আর বারমুডা পরে চায়ের প্লেট থেকে সুড়ুত সুড়ুত করে চা খাচ্ছে। প্রথমে আমি যখন বললাম আমি আপনার বন্ধু অরণ্যের ছেলে, বাবা পাঠিয়েছেন আপনার কাছে গোয়েন্দাগিরির খুঁটিনাটি শিখতে, ভদ্রলোক আমাকে বসতে বলে ঘরের ভিতর চলে গেলেন। খানিকক্ষণ বাদে এসে একটা বিদেশী ম্যাগাজিন এনে দিয়ে বললেন “পড়”।
আমি বইটার দিকে তাকিয়ে হাঁ হয়ে গেলাম। এ দেখি প্লে বয়!!! এক বিদেশী মামণি অদ্ভুতভাবে একটা ফুল নিজের যৌনাঙ্গে ধরে আছে। আমার হাঁ হওয়া মুখ দেখেই বোধহয় ভদ্রলোক ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দিলেন সাথে সাথেই “চাপ নেবার কিছু নেই। তুই অরণ্যর ছেলে। মানে আমার ছেলের বয়সী। কদিন আমার সাথে ঘুরবি, আর আমার কাজই হল নোংরা ঘাঁটা। মানসিক দূরত্ব থাকলে সেসব সম্ভব না তাই আগে থেকে তোকে ফ্রি করে দিচ্ছি। এসব পড়িস টড়িস তো?”
আমি আমতা আমতা করে বললাম “হ্যাঁ। মানে কলেজ হোস্টেলে তো...”।
ভদ্রলোক বললেন “বেশ তো। তাহলে তো চিন্তা নেই। পড়। আমি একটু চা করে নিয়ে আসি। তুই চা খাস?”
আমি মাথা নাড়লাম “না”।
ভদ্রলোক উঠে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন “এই তোদের জেনারেশনের এক ন্যাকামি হয়েছে। চা ফা খাবে না, যাচ্ছেতাই এক্কেবারে”।
আমি ব্যাজার মুখে বসে রইলাম। বাবা আর লোক পেল না গোয়েন্দাগিরি শেখানোর। সামনে আইবির একটা এক্সাম আছে, ক’দিন ধরেই ভাবছিলাম একজন প্রফেশনাল কারও আছে যদি হাতে কলমে কিছু শেখা যেত, বাবাকে বলতেই বাবা তার বন্ধুর কাছে পাঠিয়ে দিল। ইনি নাকি একজন মস্ত বড় ডিটেকটিভ, সি আইডি থেকেও এনাকে মাঝে মাঝে কাজে লাগানো হয়, এককালে বড় ব্যবসা ট্যাবসা করতেন এখন পাতি ঘরে বসে গেছেন। এখানে এসে যা বুঝলাম এই ভদ্রলোক পাতি ল্যাদ খেয়ে লাইফ কাটিয়ে দেন। আমার শেখার কিছু নেই। এর থেকে গুগল খুলে কয়েকটা কেস স্টাডি করলে বরং বেশি লাভ হত।
ভদ্রলোক দেখতে অনেকটা বাংলা সিনেমার খরাজ মুখার্জির মত। থ্যাবড়া নাক। চুল টুল কলপ করেছেন নাকি বোঝা যায় না দেখলে।
চা খেতে খেতে ভদ্রলোক বললেন “তুই আমাকে পল্টুকাকু ডাকতে পারিস”।
আমি কিছু না খেয়েও বিষম খেলাম। পল্টুকাকু? ভাবতেই কেমন একটা লাগল। একজন ডাকসাইটে গোয়েন্দা, তার নাম পল্টুকাকু? আমি বললাম “আচ্ছা আপনার পুরো নামটা কী? বাইরে নেমপ্লেটে এন সি হালদার দেখলাম”।
পল্টুকাকু চায়ের প্লেট থেকে আরেকটু চা গলার মধ্যে চালান করে দিয়ে বললেন “ক্রিমিনালরা আমাকে নষ্ট চন্দ্র হালদার বলে ডাকে। বাপে নাম দিয়েছিল নিউটন চন্দ্র হালদার”।
এবার হেসে ফেললাম। আর হাসি চেপে রাখা গেল না। নিউটন চন্দ্র? মানে সিরিয়াসলি? এটা একটা নাম হল?
পল্টুকাকু আমার হাসিটা দেখলেন। কিছু বললেন না। নির্লিপ্তভাবে চা খেতে খেতে বললেন “তা তুই আইবির পরীক্ষা দিবি তাই তো?”
আমি কোনমতে হাসিটা বন্ধ করে বললাম “হ্যাঁ”।
পল্টুকাকু চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন “তা ধর তুই কপালজোরে, কাউকে না ধরে টরে সেটা পাশ করেও গেলি। এবার কোন একটা মন্ত্রীর বাড়ি রেড করতে গেছিস। গিয়ে যদি দেখিস ওখানে এরকম একটা বিদঘুটে নাম। সেখানে এরকম ক্যালানের মত দাঁত বের করে হাসবি নাকি? তাহলে তুই কী তদন্ত করবি আর তাকে কী জেরা করবি? তোর দাঁত ক্যালানো দেখেই তো সে আর তোকে ভয় পাবে না!”
আমি দাঁত বন্ধ করে ফেললাম যতটা সম্ভব। তারপর বললাম “না মানে নিউটন চন্দ্র ব্যাপারটা কেমন যেন লাগল”।
পল্টুকাকু সামনের টেবিলে আমার ফেলে রাখা প্লে বয় ম্যাগাজিনটা হাতে নিয়ে নাড়তে নাড়তে বললেন “যেমনই হোক। নিজের ইমোশন আর মোশন কন্ট্রোল করতে শেখ আগে। তারপর না হয় গোয়েন্দাগিরি করবি। দরকার হলে পারসোনালিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে নাম লেখা। আর নইলে এসব লাইন ভুলে যা”।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম পল্টুকাকুর দিকে। কেমন সিরিয়াস হয়ে গেছেন হঠাৎ। আমতা আমতা করে বললাম “আচ্ছা এই উইক থেকেই এরকম কিছু একটা প্রোগ্রামে আমি জয়েন করব”।
পল্টুকাকু বললেন “ফুটবল কোচিং বা ক্রিকেট কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিস কোনদিন?”
আমি বললাম “হ্যাঁ মানে ছোটবেলায় ক্রিকেট কোচিংয়ে একবার...”।
পল্টুকাকু বললেন “কী হয় সেখানে? শুরু থেকেই ব্যাট বল করায়?”
আমি বললাম “নাহ। আগে ওয়ার্ম আপ করায়”।
পল্টুকাকু বললেন “এক্সাক্টলি। ওয়ার্ম আপ করায়। আমি এখন একটা কেস নিয়ে বসছি। তুই ওয়ার্ম আপ কর। এনে। এই নোটটা তোকে হোয়াটস অ্যাপ করছি, পড়। পুরোটা পড়বি। মগজের মধ্যে ঢুকিয়ে নিবি। যা প্রশ্ন করব তাই উত্তর দিবি। নইলে কাল থেকে তোকে আসতে হবে না”।
আমি চাপ খেয়ে গেলাম। এই ভদ্রলোকের মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে তো! প্রথমে যতটা খিল্লির লোক ভেবেছিলাম এ দেখছি সেরকম কিছু না। বরং বেশ সিরিয়াস হয়ে গেছেন।
হোয়াটস অ্যাপে ম্যাটারটা ফরোয়ার্ড করেই উনি পাশের ঘরে চলে গেলেন। আমি পড়া শুরু করলাম...


কেস
এস আর জি প্রোডাকশন হাউসের নিজস্ব ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার খুন। জি প্লাস থ্রি বাড়ির তিনটে ফ্লোরই ফ্ল্যাট করা হয়েছে। কিন্তু বাকি দুটো ফ্লোরে এখনও কেউ আসেনি। টপ ফ্লোরটা কিনেছিল এস আর জি প্রোডাকশন হাউস। ফ্ল্যাটটা গভীররাতে শুটিংয়ের রেস্টরুম হিসেবে ব্যবহার হত। খুন হয় ১৮ই মার্চ, ২০১৬। রাত দেড়টা নাগাদ। কেয়ার টেকারের নাম অমল দাস, ৩৮ বছর বয়স। মদ খাইয়ে মাথায় বাড়ি মেরে খুন করা হয়েছে। সে রাতে ফ্ল্যাটে কেউ ছিল না। জানা যায় পরের দিন ভোরবেলায়। ভোরবেলা শুটিং ছিল। শুটিংয়ের বেশ কিছু জিনিস ফ্ল্যাটে রাখা থাকত। ফ্লোর ম্যানেজার এসে দেখে ফ্ল্যাট খোলা। ঘরের ভিতর গিয়ে দেখে অমল দাস পড়ে আছে। মাথার কাছটা রক্তাক্ত। ফ্ল্যাটের সব জিনিস ঠিক ঠাক ছিল।
পুলিশ জেরা করেছে ফ্লোর ম্যানেজার রাজীব লালকে যে ওই লাশটা প্রথম দেখেছিল। সে বলছে রাত দশটা অবধি শুটিং শেষ করেই বাড়ি দৌড়েছিল পরের দিন ভোর ছটা থেকে শুটিং ছিল বলে। তার বাড়ি বারুইপুর। ভোরবেলা লাশ দেখে বেশ শকড হয়েছে সে।
প্রোডাকশন হাউসের মালিক অর্ঘ্য সেনগুপ্তর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন অমল দাস একদম নির্বিরোধী ভাল ছেলে ছিল। বনগাঁ তে বাড়ি তার। তার নিজের বাড়িও ওখানে। তিনিই কাজ দিয়ে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন। বিশ্বস্ত একজনকে দরকার ছিল ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার হিসেবে রাখার জন্য। স্টুডিও একদম কাছেই। অনেক সময়েই অনেক দরকারি জিনিজপত্র স্টুডিও থেকে নিয়ে এসে ফ্ল্যাটে রাখা হত। কোনদিনই কোনরকম গরমিল চোখে পড়েনি তাদের। অমল বিয়ে করেনি। কারও সাথে প্রেম ট্রেমও করত না। নিজের মত টিভি দেখে, আর শুটিংয়ের সময় শুটিং দেখে কাটিয়ে দিত।বাড়িও খুব কম যেত। এই সময় তাদের নতুন সিরিয়াল “সিঁথির সিঁদুরের দিব্যি” শুরু হয়েছিল। অমলকে নাকি একটা কাজের লোকের ছোট রোল দেবার কথাও নাকি তারা ভাবছিলেন।
পুলিশ ফ্ল্যাট ভাল করে পরীক্ষা করে দেখেছে। সেরকম সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় নি। মাথার চোট পরীক্ষা করে দেখার পরে বলা হয়েছে ভারী কোন লোহার রড জাতীয় কিছু দিয়ে উপর্যুপরি দু তিন বার আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে কোন অস্ত্র খুঁজে পাওয়া যায় নি। অমলের জিনিসপত্র পরীক্ষা করেও তেমন কিছুই পাওয়া যায় নি। একটা বাক্সে লাখ খানেক টাকা আর টেবিলের ওপর একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন পাওয়া গেছে। অর্ঘ্যবাবু জানিয়েছেন, ক্যাশ টাকাটা ইউনিটেরই টাকা, দরকারে অদরকারে অমলের থেকে নেওয়া হত। ফোনটা পরীক্ষা করে দেখা গেছে মামুলি ফোন করেছিল কয়েকটা তার বনগাঁর বাড়িতে। ঘটনার দিন রাত আটটায় বাড়িতে মাকে ফোন করেছিল সে।তারপরে আর কোন ফোন করে নি কাউকে। বনগাঁর বাড়িতে মা আর দুই দাদা থাকেন। অমল তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট। দাদাদের ব্যবসা আছে। এমন কিছু গরীবও নন তারা। জানা গেছে এই সব টিভির লাইনে ছোট বেলা থেকেই উৎসাহী ছিল সে। এলাকায় যাত্রাও করেছে এককালে। এখানে থাকার অবচেতন ইচ্ছার মধ্যে একটা ছিল টিভিতে মুখ দেখানো। অর্ঘ্যবাবুরও কমটাকায় কলকাতায় থাকার মত বিশ্বস্ত কাউকে দরকার ছিল। টিভির নেশায় পড়াশুনাও বেশিদূর করেনি। মাধ্যমিক ফেল।
অর্ঘ্য সেনগুপ্তর ছেলে পিকলু (বয়স ২১) অমলকে খুব পছন্দ করত। সেও খুব ভেঙে পড়েছে। পিকলুর উৎসাহেই নতুন সিরিয়ালে অমলের অভিনয় করার কথা ছিল। পিকলুর জবানবন্দীও নেওয়া হয়েছে। পিকলু একটি প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। খুনের রাতে দশটা অবধি অমলের সাথে ছিল। অমলের মধ্যে অস্বাভাবিক কোন কিছুই তার চোখে পড়ে নি।
পুলিশ ইউনিটের বাকি লোকেদের জবানবন্দীও নিয়েছে কিন্তু জানা গেছে সে রাতে এগারোটার মধ্যে সবাই বাড়ি চলে গেছিল।
এগারোটা থেকে ফ্ল্যাট খালি ছিল। কে এসে খুন করে গেছে, কেন খুন করে গেছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এই কেসটার জন্য ২রা এপ্রিল নিউটন বাবুর সাহায্য চাওয়া হল”।
...............

ইরিশশালা শুটিং, সিরিয়াল, খুন, এতো যা তা কেস দেখছি। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কী ব্যাপার কিছুই বের করতে পারলাম না অনেক ভেবেও।
শেষমেষ লেখাটা বার কয়েক পড়লাম। মুখস্ত করে ফেললাম। পল্টুকাকু ঢুকলেন কিছুক্ষণ পরে। এখন দেখি চেনাই যায় না তাকে। কোথায় সেই টি শার্ট। দেখি পায়জামা পাঞ্জাবী পরে এসছেন। আমি বললাম “কোথাও বেরবেন?”
পল্টুকাকু সোফায় বসলেন। বললেন “নাহ। এমনি পরলাম। একজনের আসার কথা আছে। তুই বল। কী বুঝলি এই এতটা পড়ে?”
আমি গড়গড় করে পুরোটা মুখস্ত বলে গেলাম। পল্টুকাকু মাথা নীচু করে পুরোটা শুনলেন। তারপর বললেন “তোকে কি ইতিহাস মুখস্ত করতে দিয়েছিলাম? আকবরের শাসনকাল ১৪ পাতা থেকে ১৭ পাতা মুখস্ত বল?”
আমি বললাম “কিন্তু আপনিই তো বললেন পড়া ধরবেন”।
পল্টুকাকু আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বললেন “তোদের মত পাবলিক আইবিতে ঢুকছে বলেই জায়গাটা এরকম হয়ে যাচ্ছে। নইলে এই সিম্পল কেসটাও আমার কাছে আসে?”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বললাম “এটা সিম্পল কেস কী করে হল? একটা ক্লু নেই, কারও কোন মোটিভ নেই, সবাই স্পস্ট করে বলছে ওরা এগারোটার সময় বাড়ি চলে গেছে। যদি ফ্ল্যাটের কিছু চুরি হত তাহলেও না হয় কথা ছিল। সেটাও হয় নি। তাহলে?”
পল্টুকাকু এবার দাঁত খিচালেন “ইহ। পেটে নেই বিদ্যে এদিকে বড় বড় টার্ম মুখস্ত করে রেখেছিস। ক্লু, মোটিভ... এই ডিটেকটিভ উপন্যাসগুলিও না!!! তোদের মাথা খেয়ে নিল এক্কেবারে। আচ্ছা বল, পুরোটা পড়ে কোন জায়গাটা সন্দেহজনক মনে হয়েছে?”
আমি অনেকক্ষণ পল্টুকাকুর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বললাম “কোন জায়গাটা?”
পল্টুকাকু আবার আমার দিকে কটমট করে তাকাতে যাচ্ছিলেন এই সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল। পল্টুকাকু বললেন “বেঁচে গেলি এ যাত্রা। যা দরজা খোল”।
আমি রাগে গজগজ করতে করতে দরজা খুলতে গেলাম। শালা হেঁয়ালি বুড়ো। খিটখিট করা ছাড়া মালটার আর কোন কাজ নেই। ভাঁড় একটা। দরজা খুলে দেখি দুজন ইনস্পেক্টর দাঁড়িয়ে। তাদের একজন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “স্যার আছেন?”
আমি মাথা নেড়ে দরজা ছেড়ে দাঁড়ালাম। তারা ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন। আমি দরজা বন্ধ করে ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই শুনি একজন ইনস্পেক্টর বলছেন “স্যার আজকেই আমরা আপনার কথা মত সাসপেক্টকে আটক করব, কিন্তু আপনি কনফার্ম তো?”
পল্টুকাকু ইশারায় আমাকে বসতে বলে ওনার দিকে তাকালেন “আমার কাজ আমি করেছি। এবার আপনারা ঠিক করুন কী করবেন”।
ইনস্পেক্টর দুজনেই আমতা আমতা করতে লাগলেন “মানে স্যার শিওর না হয়ে... এভাবে অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে কাস্টডিতে নেওয়াটা মানে... এরকম একজন প্রভাবশালী...”
পল্টুকাকু প্লে বয় ম্যাগাজিনটা তুলে নিলেন, বললেন “অনুমান কেন হবে? কল লিস্ট কি শুধু ফোনেই থাকে? অমলের ফোন থেকে সযত্নে যে ওর ডায়াল আর রিসিভ করা নাম্বারগুলি মুছে দেওয়া হয়েছিল সেগুলি একটু কষ্ট করলে আপনারাও পেতেন ওর অপারেটরের সাথে যোগাযোগ করলে। আমাকে তো বেশি খাটতে হয় নি। আপনারা একদিকে বলেছেন পিকলুর সাথে অমলের দারুণ ব্যাপার ছিল, আবার অন্যদিকে একবারও আপনাদের মাথায় আসে নি, বাড়িতে ফোন ছাড়া পিকলুর সাথে কি ওর একবারও কথা হয় নি? ভুল তো একটাই এখানে। পিকলুর সাথে রাত সাড়ে এগারোটায় দেড় মিনিট কথা বলেছিল অমল। সেটা মুছতে গিয়ে গত সাত দিনের পুরো কললিস্ট থেকেই পিকলুর নাম উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।অ্যান্ড্রয়েড ফোন ফ্যাক্টরি রিসেট করলে সব হিস্ট্রিই সব ডিলিট হয়ে যেত, কিন্তু এখানেও বুদ্ধি প্রয়োগ করা হয়েছে। জানত সেটা করলে বরং আপনারা অপারেটরের কাছে যেতেন। এটা তো বেসিক ব্যাপার ছিল তাই না পাল সাহেব? এবার তো আপনাদের কাজ। পিকলুকে জেরা করুন, কেন এরকম করেছে”।
পাল সাহেব একটু গলা খাকরানি দিয়ে বললেন “কিন্তু স্যার এখানেও প্রশ্ন ওঠে। এটা তো পিকলুকে ফাঁসাতে অন্য কেউও করতে পারে”।
পল্টুকাকু এবার আক্রমণাত্মক হলেন “অমলের ব্যাগ থেকে যে টাকা পাওয়া গেছে, ওটা ইউনিটের টাকা হতে যাবে কেন বলুন তো? ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকারের কাছে কেউ এভাবে ট্রানজাকশান করে নাকি? পিকলুকে জেরা করলে জানতে পারবেন, অমল ইদানীং ওকে ব্ল্যাকমেল করা শুরু করেছিল। টাকাটা ওই ব্ল্যাকমেলেরই টাকা। শেষ মেষ আর উপায় না দেখে, এই কান্ডটি করেন খোকাবাবু। বুঝলেন? এবার যান। বাপ ব্যাটা দুটোকেই আটকান। টাকাটার ব্যাপারে ওরকম ঢপবাজী কথাবার্তাই অর্ঘ্য সেনগুপ্ত কে কেস খাইয়ে দিল। সম্ভবত বাপ, ছেলেকে এই ব্ল্যাকমেলের হাত থেকে বাঁচাতেই এই কাজটা কোন প্রফেশনাল কাউকে দিয়ে করিয়েছেন। ঠান্ডা মাথার কেউ... কিন্তু গান্ডুটা কল লিস্ট ক্লিয়ার করতে গিয়েই কেসটা খেয়ে গেল। সাইবার সেলের সাথে যোগাযোগ করুন, অমলের মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ পুরো ধরে ডিলিট করা হয়েছিল। দেখুন ওর হোয়াটস অ্যাপ হিস্ট্রির ব্যাক আপ জোগাড় করতে পারেন কিনা”।
বলে মনের সুখে পা নাচাতে লাগলেন পল্টুকাকু। ইনস্পেক্টর দুজন চুপচাপ কেটে পড়ল। দুজনকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল বড় সড় চাপের মধ্যে পড়তে চলেছেন। আইন আসলেই তো আর সবার জন্য না...
আমি ভ্যাবলার মত বসে রইলাম। পল্টুকাকু বললেন “কি বুইলে বাওয়া?”
আমি বললাম “এটা কি আপনি ঘরে বসেই সলভ করলেন?”
পল্টুকাকু বললেন “উহু। একটু বেরোতে হয়েছিল। আর ইউনিটের কয়েকজনের পেছনে নিজের পোষা টিকটিকি লাগালাম। ওই পিকলু ছেলেটা একটি যন্তর পিস। বাপের টাকায় ফুর্তি করে বেড়ায়। বড়লোকের বয়াটে ছোঁড়া হলে যা হয় আর কী। অমল থাকত ভোলাভালা চুপচাপ। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর মধ্যে টিভিতে অভিনয়ের আকাঙ্খা মারাত্মকভাবে বেড়ে চলছিল। পিকলুর এদিকে বয়সের দোষ। টাকা উড়াচ্ছে, মেয়ে নিয়ে ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছে। অমল দেখল এই সুযোগ, মনের সুখে মোবাইলে রেকর্ড করতে লাগল সব ক্লিপিংস। আর সেগুলি হোয়াটস অ্যাপ করা শুরু করল পিকলুকে। পিকলু প্রথমে বাপের থেকে টাকা ঝাড়তে শুরু করল। কিন্তু টাকায় কি আর অমলের ইচ্ছা কমানো যায়? ওর লক্ষ্য তো সিরিয়ালে অভিনয়। শেষমেষ পিকলুকে চাপ দিতে লাগল সিরিয়ালে অভিনয় করবে বলে। পিকলু বাপকে বলে নিমরাজি করিয়েও ফেলেছিল। অমলের কিন্তু সেই ছোট রোল পছন্দ হল না। তার দাবী ছিল তাকে হিরো করতে হবে। বড় রোল। মানে মামাবাড়ির আবদার আর কী। ফলে যা হবার তাই হল। পিকলু আর না পেরে বাপকে সব বলে দিল। বাপ ঠান্ডা মাথায় দিন ক্ষণ ফাঁকা দেখে কাজটা প্রফেশনাল কাউকে দিয়ে করিয়ে দিলেন। ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেল না প্রফেশনাল ছিল বলেই। মার্ডার ওয়েপুন সম্ভবত কোন বড় রড ছিল। শুধু এটুকু জানতে হবে মার্ডারার একা গেছিল সে রাতে নাকি পিকলু গেছিল। মাল তো আর কেউ জোর করে খাওয়ায় না। নিশ্চয়ই তার আগেই মালটাল খাওয়া শুরু করেছিল অমল। পুলিশ যদি ঠিকঠাক জেরা করে এটা বের করা কোন ব্যাপার না। এই তো কেস... অ্যাস সিম্পল অ্যাস ওয়াটার”।
আমি চুপচাপ বসে রইলাম।
পল্টুকাকু একটা হুঙ্কার ছাড়লেন “যাহ্‌, মোড়ের মাথা থেকে দুটো চিকেন রোল নিয়ে আয়, তারপর তোকে দেখছি ঘষে মেজে কী তৈরি করা যায়!!!”

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান