অর্জুনদা

অভীক দত্ত

 

1.
দাদার বন্ধু অর্জুনদা যখন তাকে ডাকে প্রতিবার একটা হার্ট বিট মিস করে সায়নীর। সে সারাদিন অনেক ভাবে অর্জুনদা এলে একটু ভাও নেবে, প্রথম ডাকেই যাবে না, কাজ দেখাবে, কিন্তু সে পারে না। নিজের হ্যাংলামিটা ঠিক দেখিয়ে ফেলে। এজন্য মাঝে মাঝে নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছা হয় তার। অর্জুনদা কি বুঝে যায়? সে তো চেষ্টা করেই যায় যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার। তবু কিছু না কিছু একটা ঝামেলা সে করবেই।
এই তো সেদিন দাদার ব্যাচের সব ছেলেগুলি যখন এসেছিল দাদার জন্মদিনে, দাদা বলল ঘুগনি দিতে, সে যেটাতে বেশি ঘুগনি ছিল সেই বাটিটাই দিয়ে দিল অর্জুনদাকে। ব্যাস। পিঙ্কুদা ঠিক প্যাক দিয়ে দিল তাকে। “কিরে সায়নী, অর্জুনদাকে বেশি ঘুগনি কেন? কি ব্যাপার?”
সে যতই ব্যাপারটা হালকা করার চেষ্টা করে, তত যেন লজ্জাটা বাড়তে থাকে কোন দিকে না তাকিয়ে। এক এক সময় মনে হয় হে ধরণী দ্বিধা হও। সাদা জামা আর নীল জিন্সটা যেদিন পরে অর্জুনদা মাঝে মাঝে তার মনে হয় সে মরেই যাবে। নানা অছিলায় ওদের আড্ডার সামনে দিয়ে ঘুর ঘুর করে। দাদা বিরক্ত হয়। বকা ঝকাও করে। অর্জুন কি বোঝে আসলে কেন করে সে?
মাঝে মাঝে ক্লাসের নবনীতাকে নিয়ে অর্জুনদাকে যখন দাদা আর তার বন্ধুরা খ্যাপায় তার মনে হয় ফ্যান থেকে ঝুলে পড়ে। যার জানার কথা সে যদি না জানে তাহলে কি হবে তার বেঁচে থেকে। নবনীতাদির ফটোটা দাদাদের স্কুলের ফটো থেকে সে দেখেছে। লুকিয়ে ফটোটা বের করে কাচি দিয়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সেটা। মরে না কেন মেয়েটা? এত লোকে তো মরে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া আরও কত রকম রোগে! এ সেরকম মরে গেলেই পারে।
পাড়ার মাঠে যখন ফুটবল খেলা হয়, অর্জুনদা খালি গায়ে রাজার মত খেলে, তারপরে খালি গায়ে তাদের বাড়ি আসে স্নান করে ড্রেস চেঞ্জ করার জন্য, তার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় অর্জুনদাকে ছুঁয়ে দেবার। এরকম বাজে ইচ্ছা হবার পরে সে জানে তার লজ্জা হওয়া উচিত কিন্তু সে একটুও লজ্জিত হয় না। স্কুলের বেঞ্চিতে বার বার লিখতে থাকে অর্জুনের নাম। খাতার শেষ পাতাগুলোয় পেন্সিলে লিখতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারপর আবার ইরেজার দিয়ে মুছে ফেলে।
অর্জুনদার জন্মদিন ১০ই অক্টোবর। সে তার ক্যালেন্ডারে বড় বড় করে লিখে রাখে। গত বছরও একটা গিফট কিনে রেখেছিল। অর্জুনদা যখন খেলতে গেছিল, লুকিয়ে লুকিয়ে ওর স্কুলের ব্যাগে রেখে দিয়েছিল। অর্জুনদা পরের দিন দাদাকে গল্প করছিল স্কুলে কে নাকি ওর ব্যাগে লুকিয়ে গিফট রেখে দিয়েছিল ও বাড়ি গিয়ে দেখে। দাদা যখন ওকে বলছিল বোধ হয় নবনীতা রেখেছে তার মনে হচ্ছিল পেপার ওয়েটটা নিয়ে দাদার মাথা ফাটিয়ে দেয়।
মাঝে মাঝে খুব কান্না পায় তার। কেন জানে না। মনে হয়, কেন অর্জুনদা তাকে দেখবে না। তার মধ্যে কি কম আছে। কি এমন আছে নবনীতার যেটা তার মধ্যে নেই?
নবনীতাদিও তাদের বাড়ি আসে মাঝে মাঝে। অর্জুনদার সাথে হেসে হেসে গল্প করে। তখন সায়নীর মাথায় রক্ত উঠে যায়। রান্না ঘরে বাসনগুলি জোরে জোরে শব্দ করে রাখে। মা গজগজ করতে থাকে “একটা অলক্ষী তৈরি হয়েছে। কোন কাজ যদি ভালভাবে করে”।
সে মনে মনে বলে “কেন যে করি সেটা তুমি যদি জানতে মা”। অর্জুনদার কথা কাউকে বলে নি সে। বেস্ট ফ্রেন্ড পিউকেও না। পিউর একজন বয়ফ্রেন্ড হয়েছে। সেন্ট জেমসের অনির্বাণ। পিউ সারাক্ষণ তার সাথে হোয়াটস অ্যাপে বকবক করে। আগে পিউর সাথে তার কত কথা হত। কিন্তু পিউ আজকাল ভীষণ বিজি থাকে। বলে অনির্বাণ নাকি ভীষণ পজেসিভ। একবার রিপ্লাই পেতে একটু দেরী হলেই গোসা করে রিপ্লাই করে না। অনেক ঝামেলা ইত্যাদির পর মানভঞ্জন হয় ওর। এই একা সময়টা সায়নী অর্জুনদার ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপে ঘোরাফেরা করে। দেখে কি কি নতুন ফটো আপলোড করল। কেমন কি স্ট্যাটাস দিল। ওর সব কিছুতেই ন্যাকামি মার্কা একটা কমেন্ট করবেই নবনীতাদি। “ওয়াও গ্রেট” টা মনে হয় নবনীতার বাবার সম্পত্তি। গা জ্বলে যায় তার। সে যখন কোন সেলফি ফেসবুকে আপলোড করে খুব আশা থাকে অর্জুনদা কমেন্ট করবে। কখনও করে না। এদিকে নবনীতার পেত্নী পেত্নী ফটোগুলোতে কমেন্ট থেকে শুরু করে কত রকম আড্ডা চলে। চোখ ফেটে জল আসে সায়নীর। একা একা মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে সে। ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে থাকে। খানিকক্ষণ খেলার পরে আবার মনে হয় দেখা যাক অর্জুনদা কোন আপডেট দিয়েছে নাকি। সারাদিন এই করতে থাকে সে। পরীক্ষা দেবার সময়ও অর্জুনদার কথা মনে আসে। মাঝে মাঝে তার মনে হয় পাগল হয়ে যাবে সে। মা বলে যে মাসের রেজাল্ট খারাপ হবে সে মাসেই ভ্যানওয়ালার সাথে বিয়ে দেবে। বাবা দাদাও ক্ষ্যাপায়। কিন্তু কি করে পড়াশুনা হবে তার? পিথাগোরাসের থিওরি কিংবা গ্র্যান্ড ক্যানিওনের মধ্যে অর্জুনদার মুখটা ভাসলে কি আর পড়াশুনা হয়! পুজো আসছে সামনে। মা জিজ্ঞেস করে কোন ড্রেস কিনবি। সে ভাবে কি বলবে? অর্জুনদার কোন রং পছন্দ সে কি করে জানবে। একবার একটা সাদা জামা পরে অর্জুনদার সামনে ঘুর ঘুর করেছিল, অর্জুনদা সেদিন একবারও দেখে নি তাকে। সেই জামাটা আর কোনদিন ছুঁয়েও দেখেনি সে।
একদিন সে অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর অনেক সাহসে ভর করে অর্জুনদাকে জিজ্ঞেস করল “অর্জুনদা তোর ফেবারিট কালার কি?”
অর্জুনদা মোবাইল খুটখুট করছিল। সে অবস্থাতেই বলল “ঠিক নেই রে। ভ্যারি করে। কখনও কালো ভাল লাগে কখনও ব্লু... কেন বল তো?”
সে “এমনি” বলে কোনমতে পালাল। এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতেও তার মনে হচ্ছিল হৃৎপিণ্ডটা খুলে হাতে চলে আসবে। নিজের গালে চড় কষাতে ইচ্ছা হয় তার। কেন এমন হয়! অর্জুনদা যখন আসে তখন কেন সে চুপচাপ বসে গল্প করতে পারে না। একটুখানি বসলেই মনে হয় হয়ত মরেই যাবে সে।
মাঝখানে একটা ছেলে খুব বিরক্ত করতে শুরু করেছিল তাকে। ইচ্ছা করেই দাদা আর অর্জুনদা যখন গল্প করছিল তখন গিয়ে বলেছিল সে।
“দাদা, দেখ না একটা ছেলে খুব ফোন করে জ্বালাতন করছে”।
তখন অর্জুনদা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল “তোকেও ডিস্টার্ব করছে লোকে আজকাল? তুই তো বড় হয়ে গেলি রে! তোর তো খাওয়ানো উচিত রে আমাদের”। দাদা আর অর্জুনদার কি হাসি তখন। সায়নীর মনে হচ্ছিল হে ধরণী দ্বিধা হও।
তারপর থেকে ইচ্ছা করে ছেলেটার মেসেজগুলির রিপ্লাই করে সে। ছেলেটা তাকে কত কিছু বলে “জানু”, “বেবি”। সে হেসেই মরে যায় সেগুলি দেখে। পিউ একদিন চোখ বড় বড় করে তাকে জ্ঞান দিল “ফটো পাঠাস না তো! বিওয়ার সায়নী। দিস ইজ নট ফান”। সে মনে মনে বলে যা ইচ্ছা করব। যার দেখার কথা সেই তো দেখল না। কি আর হবে। যা হবার হবে।
২।
পিঙ্কুদা তাকে প্রপোজ করেছে। হোয়াটস অ্যাপে। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল খুব ক্যাজুয়াল ভাবে। সে জিওগ্রাফিতে হাবুডুবু খাচ্ছিল। আর সেই সময়েই মেসেজটা এল।
“তোকে যদি একটা কথা বলি প্রমিজ কর কাউকে বলবি না?”
সায়নী ভেবেছিল নিশ্চয়ই কোন মজার কিছু হবে। সে সাথে সাথেই রিপ্লাই করেছিল “প্রমিজ। বলব না বল তাড়াতাড়ি”।
“আই থিঙ্ক আই অ্যাম ইন লাভ উইথ ইউ। প্লিজ সায়নকে বলিস না। তোর কি কোন ফিলিং আছে আমার জন্য?”
তার বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। সে কতবার ভেবেছে অর্জুনদা তাকে একদিন এভাবে মেসেজ করবে। কিন্তু এমন একজন করল যার কথা সে কোনদিন কোনভাবেই ভেবেও দেখে নি। সে শিগগিরি প্রোফাইল পিক স্ট্যাটাস উড়িয়ে দিল নিজের। তাতেও শান্তি না হওয়ায় হোয়াটস অ্যাপই উড়িয়ে দিল। পাঁচ সাত মিনিট পরে তার মোবাইলে পিঙ্কুদার ফোন আসা শুরু হল। সে ফোনও সুইচ অফ করে দিল। তার মাথা কোনভাবেই কাজ করছিল না। সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি পিঙ্কুদা তাকে প্রপোজ করে দেবে। পিঙ্কুদা অর্জুনদার মতই তাদের বাড়িতে আসে। তাকে খ্যাপায়। সেও হাসি ঠাট্টা করে। কিন্তু অর্জুনদার জায়গায় পিঙ্কুদাকে কোনদিনই সে বসাতে পারবে না। পিঙ্কুদাকে সে কিভাবে বোঝাবে অর্জুনদার জায়গাটা কেউই কোনদিন নিতে পারবে না।এই জন্যই কি অর্জুনদার সাথে একটু বেশি কথা বললে বা ঘুগনিটা অর্জুনদাকে বেশি দিলে পিঙ্কুদা জেলাস হয়ে যেত? কিন্তু এটা কি করে হয়? তার ভীষণ রাগ হতে থাকল। পিঙ্কুদাকে বিশ্বাসঘাতক মনে হতে লাগল। পড়াশুনা মাথায় উঠল। যতবারই পড়তে যাচ্ছে ততবারই এই ব্যাপারগুলি তার মাথার ভেতরে ঘোরা শুরু হতে পাগল।
সে বাথরুমে গেল। চোখে মুখে জল দিল অনেকক্ষণ ধরে। মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। এটা কি হল সে অনেক ভেবেও বুঝে উঠতে পারল না। অর্জুনদাটা এরকম কেন? কেন বোঝে না সে তাকে কত ভালবাসে। শুধু নবনীতার সাথে চুদুরবুদুর করে যাবে? তার হেড অফিস গরম হওয়া শুরু করল। সে খানিকক্ষণ তাদের বারান্দায় পায়চারি করতে থাকল। একসময় তার প্রচণ্ড অস্থির বোধ হতে থাকল। শেষ মেষ সে মোবাইলটা হাতে নিল। হোয়াটস অ্যাপটা রি ইন্সটল করল। প্রথমেই পিঙ্কুদাকে লিখল “সরি পিঙ্কুদা। আমার কাছে তুই আমার দাদার মতই। তোকে কোনদিন আর অন্যকিছু ভাবতে পারব না”।
তারপর সটান অর্জুনদাকে মেসেজ করল “অর্জুনদা তোকে একটা কথা বললে প্রমিজ কর তুই দাদাকে বলবি না?”
মিনিট পাঁচেক পরে রিপ্লাই এল “প্রমিজ। বল শিগগিরি। আমি জিমে”।
সে লিখে দিল “ওকে। ফ্রি হলে মেসেজ কর”।
সাথে সাথেই রিপ্লাই এল “বল বল। ফ্রিই আছি”।
সে সবে লিখতে যাচ্ছিল “আই লাভ ইউ অর্জুনদা” কিন্তু তখনই পিঙ্কুদার রিপ্লাইটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল। দেখবে না দেখবে না করেও দেখে ফেলল সে
“ভাবিস না, তুই দাদার মত দেখিস ঠিক আছে। কিন্তু ভাবার চেষ্টা কর প্লিজ। তুই জানিস না আমি তোকে কতটা ভালবাসি। দেখ আমি যে তোকে ভালবাসি এটা অর্জুনও জানে। ঐ আমাকে বলল ফিলিংস লুকিয়ে না রেখে তোকে যেন আমি বলে দি”।
সায়নীর ভীষণ কষ্ট হতে লাগল। অর্জুনদা জানে? এটা অর্জুনদাই বলেছে? সে দেখল অর্জুনদা আবার মেসেজ করেছে “কি রে কি বলবি তাড়াতাড়ি বল”।
সে অর্জুনদাকে মেসেজ করল “আই হেট ইউ। তুই এটা কি করলি? পিঙ্কুদাকে বললি আমাকে প্রপোজ করতে? ছিঃ। দাদা জানলে কি হতে পারে জানিস তুই? ছিঃ”।
মেসেজটা লেখার পর রাগে দুঃখে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলল সে। দেওয়ালে ধাক্কা লেগে ব্যাটারি সহ ফোনটা কাটা সৈন্যের মত মেঝেতে পড়ে থাকল। সে ফিরেও তাকাল না।
৩)
ফোনটা সায়নীর খুব প্রিয় ফোন। বাবা যখন কিনে দিয়েছিল তার উপর সে অনেক কিছু করেছিল। কভার, স্টিকার সব নিজের মন মত করে দিয়েছিল সে। কিন্তু এখন সেটা ব্যাটারি আর সিম কার্ড হীন অবস্থায় পড়ে আছে ঘরের এক কোণে। সে বেশ খানিকক্ষণ মন খারাপ করে বসে থাকল। জানলার বাইরে অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির সময় তাদের বাড়ির সামনের একচিলতে জায়গাটায় কাঁচা জামা কাপড় শোকাতে দেওয়া থাকে। সেটা সেই তোলে বৃষ্টি শুরু হলে। জামাকাপড়গুলি ভিজছিল সে দেখতে পাচ্ছিল কিন্তু তুলল না। চুপচাপ দেখে যেতে লাগল বৃষ্টিতে জামাকাপড়গুলি আরও ভিজে যাচ্ছে। দাদা কোন বন্ধুর বাড়ি গিয়ে বসে আছে কে জানে। বাবা অফিস। মা পুজোয় বসে। সায়নী জানে মা এলে আজ তার কপালে দুঃখ আছে কিন্তু তা সত্ত্বেও তার মন মেজাজ এতটাই খারাপ যে বাইরে যাবার কোন রকম চেষ্টাটাও করল না সে। ঘরের এক কোণে বড় ছাতাটা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। সেদিকে পাত্তাই দিল না সায়নী। টেডি বেয়ারটা আর বারবিগুলিও তাকে দেখে ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে।
মন ভাল থাকলে জোরে জোরে গান চালিয়ে একা একা ঘরের মধ্যে খানিকটা নেচে নেয় এই সময়টা আজকে হোম থিয়েটারটাও মুষড়ে আছে, যেন বুঝতে পেরেছে সায়নীর মন ভাল নেই আজ।
পাশের বাড়ির কাকিমা অসাধারন রান্না করেন, প্রায়ই ও বাড়ি থেকে মন উদাস করা খাবারের গন্ধ ভেসে আসে, আজকেও আসছিল, গোবিন্দ ভোগ চাল আর সোনামুগের ডালের খিচুড়ি হবে হয়ত, সায়নী অন্যদিন হলে কাকিমার কাছ থেকে খাবার হাইজ্যাক করে নিয়ে আসত, আজকে প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগল ওদিকে যেন কোনমতেই মনটা না যায় তার।
অর্জুনদার জন্মদিনের জন্য একটা স্পেশাল গ্রিটিংস কার্ড বানাতে শুরু করেছিল সে। সেটা খাটের এককোণে চুপচাপ বসে তার দিকে বিদ্রুপের হাসি হাসছে। মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছে সেটাকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে রেখে দেয়, অনেক কষ্টে সেই ইচ্ছাটাকে দমন করছে সে। হয়ত ছিঁড়েও দেবে কোন এক সময়।
তাদের বাড়ির সামনের মাঠটাতে এই বৃষ্টির মধ্যেই পাড়ার দুটো বিচ্ছু ফুটবল নিয়ে নেমে পড়েছে। কাদার মধ্যে লাফঝাঁপ দিয়ে খেলছে তারা। কিছু সময় পরে আরও চারটে বিচ্ছু চলে এল। বাচ্চাগুলির বাড়ি থেকে কেউ কিছু বলে না। গরীব ঘরের ছেলে। সায়নী মাঝে মাঝে পড়াতে বসে ওদের। বাচ্চাগুলিকে খেলতে দেখে সায়নীর ইচ্ছা হচ্ছিল সেই খানিকক্ষণ ঐ কাদার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করে। ভিজে জ্বর আসবে। তারপর ঠিক মরে যাবে সে। তখন অর্জুনদা বুঝবে ওকে কতটা ভালবেসেছিল সে।
টিকটিকিকে সায়নী যমের মত ভয় করে। টিকটিকি দেখলেই সে লাফালাফি শুরু করে দেয়। তাদের দেওয়ালে টিকটিকি দেখলেই সে দাদা বাবা মা যাকে পায় ডেকে টিকটিকিটা তাড়াতে বলে। আজ দেওয়ালে টিকটিকিটা তাকে দেখল। সেও দেখল। কিন্তু ভয় ডর কিছুই হল না তার। টিকটিকিটাও সম্ভবত বুঝল সায়নীর মন খারাপ আছে। অন্যদিন শত খোঁচাখুচিতেও পালায় না। আজ চুপচাপ সরে পড়ল।
সায়নীর মনে পড়ে যাচ্ছিল গত পুজোর অষ্টমীর রাতটা। নবনীতারা গ্রামের বাড়ি যায় পুজোর সময়। সেদিন সে দাদা পিঙ্কুদা অর্জুনদা আর পিঙ্কুদার বোন একসাথে বেরিয়েছিল। একসাথে ফুচকা খাওয়া, লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা, ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ করে অর্জুনদার হাত ছুঁয়ে সরি বলা পুরো স্বপ্নের মত ছিল। এবারেও প্ল্যান ছিল একসাথে ঠাকুর দেখবে। অর্জুনদার জন্মদিনে তো ঐ নবনীতাটার থাকার কথা তাই সে সেটা নিয়ে বিশেষ এক্সাইটেড ছিল না। মনে মনে ঠিক করে ফেলল সে এবার পুজোয় কারও সাথে কোথাও যাবে না সে। একা একা ঘরে বসে থাকবে। নিজেকেই শাস্তি দেবে। কেউ তো আর তাকে ভালবাসে না।
ঠোঁট ফুলিয়ে কোল বালিশ জড়িয়ে বসে থাকল সে জানলার দিকে তাকিয়ে। মাঠে ছেলেগুলি রীতিমত দাপাচ্ছে বৃষ্টির সাথে। জলের মধ্যে আছাড় খাচ্ছে কেউ, কেউ আরেকজনের ঘাড়ে উঠে পড়ছে, মজা আর কাকে বলে।
জানলার বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। জামা কাপড়গুলি ভিজে চপচপে হয়ে গেছে। রাস্তায় অল্প অল্প জল জমা শুরু হয়েছে। সায়নী উঠল। ফোনটা এনে সিমকার্ডটা ফোনের ভেতর রাখল। অন করে ফ্লাইট মোডে গেম খেলতে লাগল। খানিকক্ষণ খেলে। আর হোয়াটস অ্যাপ চেক করে। চেক করতে গিয়েই বুঝতে পারে নেটওয়ার্ক অফ করা আছে। অর্জুনদার ছবিটা দেখে আবার গেম খেলে।
মা চলে এল পুজো সেরে। এসেই চ্যাঁচামেচি স্টার্ট। অন্যদিন হলে সেও ছেড়ে কথা বলত না, আজ আর কিছুই বলল না। চুপচাপ বাইরে গিয়ে কাপড় গুলি নিয়ে এল। ছাতা ছাড়াই। ভিজে গেল পুরোটাই। মা চ্যাঁচ্যাঁতে লাগল “মাথা টাথা গেছে নাকি? কি শুরু করেছিস?”
সে কোন উত্তর দিল না। স্নানে ঢুকে গেল। শাওয়ার ছেড়ে দিল জামা কাপড় না ছেড়েই। হঠাৎ ভীষণ কান্না পেল তার। না চাইতেও কাঁদতে শুরু করল সে। তবে শব্দ না করে। যাতে মা না শুনতে পায়। মিনিট কুড়ি বাদে দরজা ধাক্কাতে শুরু করল মা “কি রে বেরো, দেখ তো অর্জুন এসছে কি বলবে? তাড়াতাড়ি কর এখনও রান্না বাকি আছে। আমি রান্না ঘরে গেলাম। তুই শিগগিরি রেডি হয়ে দেখ কি হল, ছেলেটা পুরো ভিজে গেছে। ”
অর্জুনদা এসছে? সায়নীর রাগটা বাড়তে লাগল। আজকে খুব বাজে কথা বলবে ওকে। আর না। আর কোনদিন তোমার কথা ভাবব না। তুমি ভেবেছোটা কি? তুমি খালি অ্যাটি নেবে আর আমি হ্যাংলা?
শাওয়ার বন্ধ করে টাওয়েল পরে বাথরুমের বাইরে এসে তাড়াতাড়ি জামা পরে নিল সে। চুলও
আঁচড়াল না। তাড়াতাড়ি ড্রয়িংরুমে এসে দেখল ভেজা জামা কাপড়ে দাঁড়িয়ে আছে তার অর্জুনদা। চোখ লাল। মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। তার রাগটা কোথায় যেন গুটিশুটি মেরে লুকিয়ে পড়ল। বলল “ভিজে গেছ যে। দাঁড়াও। দাদার একটা জামা দিই”।
অর্জুনদা বলল “দাঁড়া। কাকিমা কোথায়?”
অর্জুনদার গলাটা কেমন অদ্ভুত ঠেকল। সে বলল “রান্নাঘরে”।
অর্জুনদা বলল “ফোন কি হয়েছে তোর? কতবার ট্রাই করে যাচ্ছি?” গলাটা থমথমে।
আবার রাগটা ফিরে আসতে লাগল তার। বলল “ফেলে দিয়েছি”।
অর্জুনদা বলল “ভাল করেছিস। শোন, পিঙ্কুকে আমি কিছু বলি নি। ঐ আমাকে কদিন ধরে জ্বালিয়ে খাচ্ছিল। শেষে বিরক্ত হয়ে বলেছি যা পারিস কর। তুই যেটা ভাবছিস সেটা না”।
সায়নী ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকল সোফায়। অর্জুনদা দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল “আমি গেলাম”।
ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অর্জুনদা। সায়নীর ভীষণ কষ্ট হতে লাগল। অর্জুনদাকে এরকম দেখে নি কোনদিন। সে উঠল। বৃষ্টিটা আরও বেড়েছে, এই বৃষ্টিতে অর্জুনদা আবার ভিজবে? বাইরে বেরতে দেখল সাইকেলটা নিয়ে গেটের দিকে এগোচ্ছে অর্জুনদা। ছাতা টাতা কিচ্ছু নেই। সে দৌড় লাগাল অর্জুনদার দিকে। আজ তাকে বলতেই হবে।
যা হয় হবে।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান