গরম কাল, পুকুর পাড় আর মহাভারতের গল্প

অভীক দত্ত

 

আচ্ছা। গরমটা কি শুধু এখনই পড়ে? আমাদের ছোটবেলাতেও তো গরম পড়ত। কিন্তু তখন তো খুব একটা কষ্ট হত না! লোডশেডিং তো তখনও হত। তখন তো এরকম মরে যাব বলে মনে হত না। মানলাম গ্লোবাল ওয়ারমিং ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু গরমকালগুলি বেশ মজার ছিল তখন। গরমের ছুটির সময় দুপুর বেলা বাড়ির সামনে কাঁঠাল গাছের ছায়ায় মাদুর পেতে পাড়ার কাকাদের তাস খেলা দেখতাম, আর সন্ধ্যে হলে পাড়ার পুকুর পাড়ের ঘাটে সব বন্ধুরা মাদুর নিয়ে গিয়ে বসতাম। হাওয়া দিত যেমন, তেমন আড্ডাও হত। পাশের দোকান থেকে আনা সামান্য চানাচুর আর সর্ষের তেল দেওয়া মোটা মুড়ি স্বর্গীয় মনে হত। বড় হবার পরে সেই একই রেসিপিতে মুড়ি খেয়েছি কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ওই ম্যাজিকের মত টেস্টটা আর পাই নি। অনেক ভেবে দেখেছি সেটার কারণ হল ওই মুড়িটার সাথে কৈশোরের আড্ডাটা মেশানো থাকত। যেটা আর কোনদিন পাওয়া সম্ভব না।
খোলা মাঠে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে সপ্তর্ষিমণ্ডল, অরুন্ধতী আর ধ্রুবতারা চিনতাম। জিজ্ঞাসা চিহ্ন আঁকতাম আর ভাবতাম কত দূর হতে পারে জায়গাটা আমাদের থেকে? পরে বড় হয়ে মনে হয়েছে ওই জিজ্ঞাসা চিহ্নটা আসলে আমাদের অজানা ভবিষ্যৎকেই বোঝাতে চায়। অজানা ভবিষ্যৎ কেমন? পাড়ার সেই বন্ধুরা যাদের সাথে মুড়ি খেতাম, যত গরমই পড়ুক মাঠে দাপিয়ে ফুটবল খেলে জামা টামা খুলে হ্যা হ্যা করে হাফাতাম, তাদের সাথে আজকাল দেখাই হয় না। বাড়ি যাই যখন, মাঠের পাশ দিয়ে যাবার সময় আজকাল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই জায়গাটা পার হয়ে যাই। পাছে মনটা খারাপ হয়ে যায়। যাই হোক, মন খারাপ আর নষ্টালজিয়া নিয়ে না বকে, সেই মজাদার গল্পটা বলি।
সে সময়টা সন্ধ্যে হলেই উশখুশ শুরু করে দিতাম কখন মাঠে গিয়ে বসব। মাঠে গিয়ে প্রণব জ্যেঠুকে পাকড়াও করতাম। প্রণব জ্যেঠু দারুণ মহাভারতের গল্প বলতেন। বাঙাল ভাষায় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বর্ণনাটা মনে পড়লে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দেয় “ভীম তখন দাঁত কিড়মিড় কইরযা্ষ কইল ওরে দুরাত্মা কীচক, আজ তরই একদিন কী আমারই একদিন। তারপর ভীম কীচকরে ধইর্যাষ এমন মাইর মারল, যে আজও সেইডা কীচক বধ নামে সবাই জানে”। মারপিট করতে শুরু করতাম আমরা প্রণব জ্যেঠুর মাদুরে জায়গা পাওয়ার জন্য।
আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। বয়েজ স্কুল আর বাংলা মিডিয়ামের যৌথ উত্তেজনায় মেয়েদের দূর গ্রহের প্রাণী মনে হত। পাড়ার সব ছেলে পিলে যখন প্রণব জ্যেঠুর কাছে দখিণা হাওয়া খেতে খেতে মহাভারত শুনতাম সেই সময় একদিন এরকম গরমের সন্ধ্যেয় হালকা বাতাসের মত মালবিকা এল মাঠে। মালবিকারা আমাদের পাশের পাড়াতেই থাকত। একটু দূরে দূরে লক্ষ্য করতাম। কিন্তু ওই। ওর বেশি কিছুই হত না।মাঠে এসে মালবিকা আর ওর বাবা একটু দূরে গিয়ে বসত। আর অদ্ভুতভাবে আমাদের সব বন্ধুদের মধ্যেই প্রণবজ্যেঠুর গল্পের আকর্ষণ কেমন কমতে শুরু করল। যে মাদুরে জায়গা পাবার জন্য মারপিট লাগত, যে শুভ আমাকে একদিন ঠেলে মাদুর থেকেই সরিয়ে দিয়েছিল, সেই শুভই খুব উদার হয়ে গেল। “নে, তুই বস। আজ গল্পটা তোরাই শোন। আমি একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব আজকে”। ও আর বসল না। মালবিকাদের মাদুরের কাছে ঘুরঘুর করতে লাগল। কদিন পর দেখি অভিও এক কেস। ধীরে ধীরে প্রণব জ্যেঠুর মাদুর খালি হওয়া শুরু করল আর নতুন মাদুরের আমদানি হয়ে গেল। সেই নতুন মাদুর আবার আগেই মাঠে বসে না। মালবিকারা এলে তারপর তার ধারে কাছে লঞ্চ হয় সেই বস্তু। আমি ক’দিন এদিক ওদিক করে বুঝলাম অভি, শুভ, বাবন, কেউই জমি ছাড়বে না। তাই বিফলমনোরথ হয়ে চাপটাপ না নিয়ে প্রণব জ্যেঠুর কাছেই মহাভারত শুনতে বসলাম। আমি আর প্রণব জ্যেঠুর নাতি পাপাই। আগে বসতাম সাত আটজন। এখন দুজন। প্রণব জ্যেঠু সবই বুঝলেন। কিন্তু আমাদের বুঝতে দিলেন না কিছু বুঝেছেন। বিড়ি ধরিয়ে শুরু করতেন “তারপর কী হইল বলি, কর্ণর রথের চাকা বইস্যা গেল মাটিতে। অর্জুন একবার তাকায়, আর একবার ভাবে, কী করুম, কী করুম। সেই সময় কৃষ্ণ কইল, ওহে অর্জুন, তুমি কী ভাবস? এইডা জেন্টলসম্যান গেম পাইছ? এই দিসে সুযোগ ভগবানে, ধনুকটা বাগাইয়া দাও একখান তীর কর্ণরে টিপ কইর্যার। দেহ, ভুইল্যা যাইও না ভরা বাজারে তোমাগো বউয়ের শাড়ি টান দিয়া যহন দুঃশাসন হারামজাদায় খুইল্যা নিসিল তহন ওই শয়তানডাই হাসতেছিল সবার সামনে, ভুললে চলবে? তহন অর্জুন...”...
স্কুল, ক্রিকেট, ফুটবল, খেলাধুলা, বন্ধু বান্ধব সব ভুলে আমি তখন শুনে চলেছি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিবরণ, মাথা মন সব প্রণব জ্যেঠু কী বলেন সেই দিকে মগ্ন, হঠাৎ শুনি একজনের গলা “প্রণবদা আমার মেয়েও বলছিল মহাভারত শুনবে, ও এখানে বসল”। চমকে পাশ ফিরে দেখি, মালবিকা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মহাভারত শোনার অপেক্ষায়। কর্ণ, অর্জুন স্টোরি পজ, ওই অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম অভি শুভ বাবনরা মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে, আর নতুন কেনা মাদুরটা মন খারাপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে সপ্তর্ষিমণ্ডলের জিজ্ঞাসা চিহ্নটা দেখছে।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান