শাপমোচন

অভীক দত্ত

 

১।
“এ শুধু অলস মায়া-- এ শুধু মেঘের খেলা”

আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া অন্য কোন গান গাইতে পারিনা। তাই পঁচিশে বৈশাখের সময়টা কলেজে আমার একটা ডিমান্ড তৈরি হয়। অন্য সময় সবাই ভুলে যায় যে আমার কলেজে কোন অস্তিত্ব আছে। ওহ হ্যাঁ, কলেজের কোন প্রোগ্রামেও আমাকে ডাকা হয়। সেখানে আমি কালো মোটা ফ্রেমের চশমা পরে “আগুনের পরশমণি” গেয়ে চলে আসি। তবে সেই অনুষ্ঠানের সাথে পঁচিশে বৈশাখের একটা পার্থক্য আছে। সেই অনুষ্ঠানে মঞ্চে থাকেন বড় বড় লোক, কেউ মন্ত্রী, কেউ কলেজের সেক্রেটারী, পুরোটাই চলে একটা যান্ত্রিকতার মধ্যে। সে তুলনায় পঁচিশে বৈশাখ তো আমার কাছে স্বর্গ, যে নৃত্যনাট্যই হোক, আমাকে গান করতে ডাকবেনই মিতুন ম্যাম, আর এই সময়টা আমার খুব ভাল যায়, কারণ আমি রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া অন্য কোন গানই করি না।
বলা ভাল, আমার মধ্যে একটা স্ট্যাম্প পড়ে গেছে আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া আর কিছু পারিই না। সেদিন নচিকেতার একটা গান করছিলাম ক্লাসে বেঞ্চ বাজিয়ে, হঠাৎ করে সোহম মিটমিটে চোখে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলল “ভাই নচিকেতার গানটা অন্তত রবীন্দ্রসঙ্গীতের মত করে গাস না”। শুনে আমার এত মন খারাপ লাগল যে কী বলব!!! আমি কি সব গানই রবীন্দ্রসঙ্গীতের মত করে করি নাকি? বেশ কয়েকবার একা একা রেকর্ড করে দেখেছি, কথাটা খুব একটা ভুল বলেনি। আসলেই একটা টান এসে যাচ্ছে। “সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা”য় যদি রবীন্দ্রসঙ্গীতের টান চলে আসে তাহলে সত্যিই ব্যাপারটা একটু কেমন কেমনই লাগে বটে।
সে যাকগে, যে কথা বলছিলাম, আমি হলাম ট্যাগ মারা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইয়ে, কলেজের প্রোগ্রামে এক দিন কা বাদশা, সেদিন মামণিরা আমার গান শোনে, আমার মুখ দেখা যায় না। স্টেজের পিছনের দিকে কাপড় টাঙ্গানো থাকে, সেখানে গানের দলটা বসে, আর স্টেজে নৃত্যনাট্য হয়।
আর আমার কপাল এমনই, প্রতি বছর যে মামণিই আমার গানে ইমপ্রেস হয়ে আমার সাথে আলাপ করতে আসে, আমার চোপাটা দেখলে আর ধারে কাছে থাকে না। গান শুনে যে মেয়েটা অত চাপ নিয়ে চলে আসে, সে আমার এই চশমা পরা আনইম্প্রেসিভ বদনটা দেখে চুপচাপ কেটে পড়ে। যার ফলে তিন তিনটে বছর কেটে গেলেও আসলে কেউ কথা রাখেনি। বসন্তের বাতাসে, ভ্যালেন্টাইনের হাসিতে, কলেজে কোথাও আমি নেই। আছি শুধু পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানে। এক দিন কা বাদশা। নাহ,বাদশা বলাটাও বড্ড বাড়াবাড়ি অন্তত আমার ক্ষেত্রে।
প্রথম দু বছর অনেক আশায় আশায় থেকে আমি বুঝে গেছি হয় আমাকে মারাত্মক কোন মেক ওভার নিতে হবে, নইলে কোন কিছুই না করে এটাই ধরে নিতে হবে যে ভাই... ছাড়... তেরে সে নেহি হো পায়েগা।
সত্যি বলতে কী, হ্যাঁ মানে আমি নিজেই এটা স্বীকার করে নিচ্ছি, চাদ্দিক দেখে শুনে আমি আজকাল কিরম খিটখিটে বুড়োর মত হয়ে যাচ্ছি। স্বতঃসিদ্ধভাবে ধরেই নিয়েছি যে কলেজ লাইফটা এভাবেই কেটে যাবে। জাস্ট আরেকটা ছাত্র যে বাকি দিনগুলি কলেজে আসবে যাবে আর পঁচিশে বৈশাখে গান গেয়ে কলেজ লাইফটা শেষ করবে। কেউ দেখবে না, কেউ ভালবাসবে না।
বাড়িতে বাবা মাঝে মাঝে খ্যাপায়, “কী যে কলেজে পড়িস, একটা প্রেম ট্রেম পর্যন্ত করতে পারিস না। হ্যাঁরে, তুই এরকম কেন ?”
আমি খচে যাই। মা তখন আমার সাইড নেয়। কিন্তু বাবা বলে যায় “তোর দ্বারা কিছু হবে না বুঝলি? ওই মোটা ফ্রেমের চশমা পরে, ওই মান্ধাতা আমলের জামা পরে কলেজ গেলে কোন মেয়েই তোকে দেখবে না”।
আমি খানিকক্ষণ গজগজ করে চুপ করে যাই। আসলে আমিও ভাল মতই বুঝে গেছি বাবা ঠিকই বলছে। স্টাইলবিহীন, মুখ গুঁজে বই পড়ে যাওয়া আর পাবলিক ট্রান্সপোর্টে করে কলেজ যাতায়াত করা আমার মত পাব্লিকের মামণি জগতে এক ফোঁটা ভ্যালু নেই।
জীবনটাই আমার ফ্রাস্ট্রু হয়ে গেল। আর এই ফ্রাস্ট্রুর ডিরেক্ট এফেক্ট কিনা জানি না, রিহার্সালে কমলিকা হওয়া মেয়েটাকে বেদম ঝেড়ে দিলাম। ব্যাপারটা হয়েছিল এরকম, রিহার্সালের সময় হারমোনিয়ামের একটা রিড বসে গেছিল, আমি সেটা নিয়ে গলদঘর্ম হচ্ছিলাম, হঠাৎ শুনি খুব হাসির শব্দ। এখন আমি সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে সিনিয়র, ম্যাম না থাকলে আমিই রিহার্সালটা করাই, আমার হঠাৎ করে মাথা গরম হয়ে গেল, বলেই দিলাম “ইয়ার্কি মারতে আসিস এখানে? এটা ইয়ার্কির জায়গা? আর মাত্র এক সপ্তাহ পরে প্রোগ্রাম হবে, একটা নাচও কেউ ঠিক ঠাক তুলতে পারলি না, আর হাসাহাসি শুরু করে দিয়েছিস!!!”
শুনে বাকি মেয়েগুলো আবার হেসে দিল। সব থেকে বেশি হাসল ফার্স্ট ইয়ারে আসা সোহিনী। যে এই নৃত্যনাট্যে কমলিকা হয়েছে। হাসতে হাসতে বলল “অর্কদা তোমার চশমাটা হরলিক্সের শিশি দিয়ে বানানো নাকি আমরা সেই আলোচনাই করছিলাম”।
শুনে আমি চুপসে গেলাম। এতদিন ফ্রাস্ট্রু ছিল তাও ঠিক ছিল। আজকাল আমাকে নিয়ে সবাই ইয়ার্কিও মারছে তাহলে! কিছু বললাম না। হারমোনিয়ামটা বন্ধ করে হল থেকে চুপচাপ বেরিয়ে গেলাম।

“তুমি কি কেবলি ছবি, শুধু পটে লিখা”

কলেজ ছাড়িয়ে খানিকটা এগিয়ে গেলে একটা পুকুর পড়ে, ওখানে কেউ যায় না। আমার যখন কলেজ অসহ্য লাগে আমি ওখানে গিয়ে বসি। আজও গিয়ে বসলাম। একটা ছাতিম গাছের তলায় মাচা করা আছে। ভারি সুন্দর পরিবেশ। কিন্তু আজকে আর কিছু ভাল লাগছে না। সোহিনী মেয়েটাকে ভাল ভেবেছিলাম, বেশ ভাল নাচে, ও যে অন্যদের সাথে মিলে আমার সাথে এরকম করবে আমি অন্তত ভাবি নি। খুব রেগে ফোনটা বের করলাম। ভাবলাম হোয়াটস অ্যাপে ওকে বলি আজকে খুব খারাপ করলি তুই, হঠাৎ ওর ডিপিটায় চোখ আটকে গেল। প্রোগ্রামের জন্যই হয়ত একেবারে রাজকুমারী কমলিকা সেজেছে। কাজল দেওয়া চোখ বাদে খুব সামান্য মেক আপ, কিন্তু কী অসাধারণ! রাগ টাগ ভুলে বেশ খানিকক্ষণ ছবিটা দেখলাম। আমার জীবনে ফ্রাস্ট্রু আছে ঠিকই কিন্তু কোন মেয়েকে দেখে আমি কোনদিন সেভাবে প্রেমে পড়িনি। ক্লাস নাইনের ব্যাচে একটা মেয়েকে ভাল লাগত, কিন্তু মেয়েটা কোনদিন আমায় সেভাবে পাত্তাই দেয় নি। কিন্তু এখন হঠাৎ করে কমলিকার প্রেমে পড়ে গেলাম। প্রেমে পড়া মানে যদি হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া শুরু করে, তাহলে আমি প্রেমে পড়েছি। বেশ কয়েকবার ফটোটা দেখে মনে হল এরা তো দিনে দুশোবার ফটো চেঞ্জ করে, এটাকেও চেঞ্জ করে দেবে ইচ্ছা মত, আমি ফটোটাকে সেভ করে নিলাম।
তারপরেই মনখারাপটা আবার ফিরে এল। সোহিনী আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে, আমার চশমার কাঁচ নিয়ে ব্যঙ্গ করে। এই মেয়ে তো কোনদিন আমাকে ভালবাসবে না। আর আমিও কালকে হঠাৎ করে চশমা চেঞ্জ করে হিরো সেজে আসব না। আমি যেরকম আছি, আমি সেরকমই থাকব। প্রেম থাকলে সেটা মনেই থাক, খানিকটা ফোনে ছবি হয়ে গ্যালারিতে সেভ থাক, তার বাইরে আর যাবে না কোনদিন। আমিই যেতে দেব না কখনও। আরও খানিকটা সংকুচিত হলাম এই ভেবে যে এখন ফার্স্ট ইয়ার আছে, কদিন পরে ওর বয়ফ্রেন্ড হবে, আমার সামনে দিয়েই ঘুরে বেড়াবে দুজনে মিলে, তখন খারাপ লাগবে। থাক, কী আর হবে, তার থেকে বরং পুকুরটাই দেখি। একটা পানকৌড়ি ভেসে বেড়াচ্ছে পুকুরের মধ্যে। শহরের মধ্যেই কিন্তু শহর থেকে একটু দূরে আমাদের কলেজটা। চুপচাপ বসে পানকৌড়িটাই দেখতে লাগলাম, আর মাঝে মাঝে ফোনটা বের করে সোহিনীর ফটো দেখছিলাম এই সময় ফোনটা বেজে উঠল। চমকে দেখলাম সোহিনীই ফোন করেছে, গলাটা বেশ কাঁদো কাঁদো “অর্কদা তুমি প্লিজ রিহার্সালে আস নইলে আমরা ম্যাম ভীষণ রেগে আছেন, কে যেন ম্যামকে বলে দিয়েছেন তোমার সাথে আমরা খারাপ ব্যবহার করেছি, এখন না এলে কেলেংকারি হয়ে যাবে”।
আমি আসছি বলে ফোনটা রাখলাম। আরেকবার কমলিকাকে দেখে কলেজের দিকে রওনা দিলাম।


৩।
“কখন দিলে পরায়ে স্বপনে ব্যথার মালা”

ম্যাম আমাকে দেখে বললেন “তুমি কোথায় গেছিলে? এরা কী বলেছিল তোমায়?”

সোহিনীসহ বাকিরা এককোণে কেঁচো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বুঝলাম আমি যদি বলে দি তাহলে ওদের কপালে অশেষ দুর্গতি আছে। চশমাটা ঠিক করতে করতে মাটির দিকে তাকিয়ে বললাম “না ম্যাম সেরকম কিছুই না"।
ম্যাম রেগে গেলেন আমার কথা শুনে "দেখো অর্ক, সিনিয়র হিসেবে তোমার একটা দায়িত্ব আছে। তুমি জানো আমি কতটা টেন্সড এই নৃত্যনাট্যটা নিয়ে? এক তুমিই তো আছ যার ওপর ভরসা করা যায়। আমায় যখন ক্লাস নিতে যেতে হয় তখন তোমাকেই রিহার্সালটা করাতে হবে। তাহলে কোথায় চলে গেছিলে তুমি? আর আমি যে শুনছিলাম ওদের সাথে তোমার কিছু একটা হয়েছে?”
আমি মাথা নাড়লাম “ম্যাম ঠিক আছে। আর হবে না। ওরা দেখবেন ঠিক করে ফেলতে পারবে”।
ম্যাম খানিকক্ষণ সবাইকে তুমুল ঝেড়ে টেড়ে রিহার্সাল করাতে শুরু করলেন।
রিহার্সালের সময়ে অন্যদিন আমি গানেই মন দি। আজকে বার বার সোহিনীর দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল, দুয়েকটা কথাও ভুল হল। যারও লাগি ফিরি একা একা লাইনে একা শব্দটাই ভুলে গেলাম। অথচ এই গানটা আমি অন্তত হাজার বার করেছি। ম্যাম এমনিতেই ক্ষেপে ছিলেন, আমার কান্ড দেখে আরও খেপলেন। বললেন “অর্ক কোন সমস্যা হয়েছে? বাড়ির সবাই ঠিক আছে তো?”
আমি মাথা টাথা নাড়িয়ে হাসলাম। “একটু স্লিপ করে গেছিল ম্যাম, আর হবে না”।
এইসব ঝামেলার মধ্যেই একসময় রিহার্সাল শেষ হল। রিহার্সালের শেষে সবাই যখন বেরচ্ছিল তখন সোহিনী এগিয়ে এল “থ্যাঙ্কস অর্কদা”।
আমি হাসলাম “ঠিক আছে। আচ্ছা এই চশমাটাকে তোরা হরলিক্সের কাঁচ বলছিলি কেন?”
সোহিনী হেসে দিল, বলল “হরলিক্সের কাঁচের বোতল হত আগে, ওটার তলায় যে কাঁচটা থাকত সেটা যেমন মোটা, তোমার চশমাটাও সেরকম মোটা। তাই আমরা হাসছিলাম”।
আমি আর রাগলাম না। বরং আমারও একটু হাসি পাচ্ছিল। সোহিনী বলল “আচ্ছা তুমি চশমা ছাড়া একেবারেই দেখতে পাও না?”
আমি বললাম “নাহ। আমার বেশ হাই পাওয়ার”।
সোহিনী বলল “অনেক রকম ট্রিটমেন্ট হয় তো। সেগুলো করলে কিন্তু চশমার পাওয়ার বেশ কম হয়ে যায় শুনেছি। সেগুলি করতে পার তো”।
আমি বললাম “করব হয়ত কোনদিন। কিন্তু আমার এই চশমাটা খুব প্রিয়। এটা ছাড়তে হবে ভাবলেই কেমন মন খারাপ লাগে”।
সোহিনী শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ল। “চশমাও প্রিয়? অদ্ভুত তো! আচ্ছা তুমি একটু চশমাটা খোল, চশমা ছাড়া তোমাকে কেমন লাগে দেখি”।
আমি খুললাম চশমাটা। ঝাপসা হয়ে এল চারদিক। সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলে আমার কেমন ভয় ভয় করে। তাড়াতাড়ি পরে নিলাম আবার। সোহিনী বলল “তোমাকে কিন্তু চশমা ছাড়া বেশ ভাল দেখায়। কখনও দেখেছ?”
আমি হাসলাম “চশমা খুললেই সব ঝাপসা হয়ে যায় তো! কিভাবে দেখব?”
সোহিনী এবার হাসল না। বলল “আমি সরি অর্কদা। ওভাবে চশমা নিয়ে ইয়ার্কি মারাটা একদম ঠিক হয় নি তখন”।
আমি বললাম “ঠিক আছে। এটার প্রায়শ্চিত্ত করে দিস ফাটাফাটি প্রোগ্রাম করে তাহলেই হবে”।
সোহিনী বলল “করব। নিশ্চয়ই ভাল হবে দেখো। আচ্ছা আমি আসছি এখন। কালকে রিহার্সাল দুটো থেকে তো?”
আমি মাথা নাড়লাম।
সোহিনী চলে যেতেই হঠাৎ কেমন যেন একটা কষ্ট হল। বুঝলাম, আমি গেলাম এবার। ওয়ান সাইডেড লাভ স্টোরি শুরু হল আরেকটা আজ থেকে।

৪।
“কোথা বাইরে দূরে যায় রে উড়ে, হায় রে হায়”
অনুষ্ঠানের আগের রাতগুলি প্রথম প্রথম আমার ঘুম হত না। জেগে বসে থাকতাম। একটু যদিও বা ঘুম হত, দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেত। দুঃস্বপ্নগুলিও অনেকটা এরকম হত, আমি স্টেজে গেছি,অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে আর আমার গলা থেকে একটুও স্বর বেরোচ্ছে না। অনেকরকম চেষ্টা করছি গান গাইবার কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।
এবারও ঘুম হল না। কিন্তু সেটা টেনশনের জন্য নয়। দিনটার পরে আর এই রিহার্সাল, একসাথে থাকা, দেখা হওয়াগুলো এত সহজে হবে না সেটার জন্য। এ’কটা দিনও মিতুন ম্যাম যখন থাকতেন না তখন ওরা আমাকে নিয়ে মজা করেছে, কিন্তু এবারে আর আমার মন খারাপ হয় নি। বরং আমিও মজা পেতে শুরু করেছি। বুঝেছি, নিজেকে নিয়ে মজা করাটাও জানতে হয়। আমি একবিংশ শতাব্দীতে থেকে অষ্টাদশ শতকের পোশাক, চশমা পরে ঘুরে বেড়াব, আর কেউ সেটা নিয়ে মজা করতে পারবে না, সেটা হাস্যকর। সোহিনীই সব থেকে বেশি মজাগুলো করত, একদিন যেমন হঠাৎ খুব নিরীহ মুখ করে বলল “আচ্ছা অর্কদা, তুমি যে ফোনটা ইউজ কর, সেটা কি আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল আবিষ্কার করেছিলেন?” আমি অবাক হয়ে বললাম “কেন বলত?”
সোহিনী হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বলল “না তোমার সবই তো ওই সময়ের তাই ভাবলাম”। আমিও হেসে ফেললাম। আর হাসতে হাসতেই ওর হাসিটা দেখে আরও মরতে লাগলাম।
এই সোহিনীই যখন আবার মিতুনম্যাম পাঠ করেন, গান হয়, তখন কী অসাধারণভাবে কমলিকা হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আমি তো আসলে প্রেমে পড়েছিলাম রাজকুমারী কমলিকার, কিন্তু নিজের অজান্তেই বুঝতে পারছি, এই দুটো সত্ত্বাই মেয়েটার মধ্যে প্রবলভাবে আছে, যখন রিহার্সাল হয়, তখন সোহিনীর চাউনি, ওর অভিনয়, প্রতি মুহূর্তে আমাকে বিদ্ধ করে। আমার তখন মনে হয় রাজার মত ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াই, বলে দি ওকে, সোহিনী, আমার কমলিকা হবি?
তখনই আবার যত রাজ্যের ভয় এসে ঘিরে ধরে আমাকে, আমি তো শুধু হাসি ঠাট্টার পাত্র, এসব বলে মাঝখান থেকে আরও কতজনের হাসির খোরাক হব। শাপমোচনে কুরূপ রাজাকে দেখে কমলিকার প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয় এই প্রতিক্রিয়াটা আমার এই কথা শুনেও তো ও দেবে!

৫।
“তুমি গেলে যখন একলা চলে
চাঁদ উঠেছে রাতের কোলে...”

“শাপমোচন” নৃত্যনাট্য অসাধারন হল। স্বয়ং প্রিন্সিপাল এসে আমাদের সাথে হাত মিলিয়ে গেলেন। সোহিনীরও খুব প্রশংসা হল। মিতুনম্যাম প্রতিবারের মত এবারেও অনুষ্ঠানের পরে মিষ্টি খাওয়ালেন। সোহিনীর বাবা-মাও এসছিলেন। আমাদের সবার সাথে পরিচয় করলেন। আমার বাবা মা প্রতিবারই আসে। এবছরও অনুষ্ঠান শেষে অপেক্ষা করছিল আমার কাজ শেষ হবার।
প্রতিবার রুদ্রদা থাকে, কিন্তু এবার রুদ্রদা নেই, পাস আউট হয়ে গেছে, তাই আমাকেই দায়িত্ব নিয়ে ইন্সট্রুমেন্টগুলি গাড়িতে তোলার তোড়জোড় করতে হল। রাত প্রায় এগারোটা বেজে গেছে। মেয়েরা যারা ফ্যামিলির সাথে আসেনি, তাদের ম্যাডাম আলাদা গাড়িতে তুলে দিয়েছেন।
ইন্সট্রুমেন্টগুলি তুলে দিয়ে ফিরছি এই সময় দেখি সোহিনী দাঁড়িয়ে আছে হলের বাইরে। কমলিকা হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। মেক আপ ধুয়ে ফেলেনি। আমি ওকে দেখে অবাক হলাম “কীরে, তুই এখানে? আমি তো ভেবেছিলাম এতক্ষণে তুই চলে গেছিস?”
ও হাসল “না, ম্যাম বললেন মৃত্তিকাকে নিয়ে যেতে, ও চেঞ্জ করছে এখন। বাবা মা হলেই আছে, মনে হয় তোমার বাবা মার সাথেই গল্প করছে।”
আমি বললাম “তা ঠিক আছে, তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
ও সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল “তোমাকে খুব জ্বালিয়েছি না এ ক’দিন?”
আমি হাসলাম “দূর!!! কী যে বলিস! হাসি ঠাট্টা না হলে সময় কাটে কী করে? হ্যাঁ প্রথমদিন একটু রাগ করলেও পরে আমিও তো তোদের সাথেই মিশে গেছিলাম”।
সোহিনী বলল “আসলে এতদিন ঠিক বুঝছিলাম না। যন্ত্রের মত নেচে যাচ্ছিলাম। আজ সকালে ভাল করে শাপমোচনের পুরোটা পড়লাম। একজন মানুষের ভিতরটা না দেখে আমরা কিভাবে
তার বাইরের গঠনটাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে ফেলি না? তোমার যেটা সমস্যা, সেটা নিয়ে আমি দিনের পর দিন সবাইকে নিয়ে ইয়ার্কি মেরেছি। কখনও ভাবিনি আসলে আমি কত বড় ভুল করেছি”।
আমি বললাম “ঠিক আছে। এবার এই ফাটা রেকর্ডটা বন্ধ হলে খুশি হব”।
সোহিনী হাসল এবার। বলল “তাহলে প্রায়শ্চিত্ত হল বল?”
আমি বিস্মিত গলায় বললাম “প্রায়শ্চিত্ত মানে?”
সোহিনী বলল “তুমি বলেছিলে মনে আছে সরি বলার দরকার নেই , নাচটা ঠিক করলেই হবে?”
আমি হেসে ফেললাম “হ্যাঁ। খুব ভাল প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে। আচ্ছা, এবার যা তাহলে। অনেক রাত হয়েছে”।
সোহিনীর গলাটা হঠাৎ ধরে এল “গেলে খুশি হও? অনেক জ্বালিয়েছি যখন। কাল থেকে তো আর দেখাও হবে না সেভাবে”।
আমি বললাম “তা কেন? অনেক রাত হয়েছে। তোদের তো অনেক দূরেও যেতে হবে বোধ হয়”।

সোহিনী “আসছি” বলল। তারপর ধীরে ধীরে রওনা হল হলের ভিতর। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম রাজকুমারী কমলিকা চলে যাচ্ছে। নিজেকে অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করেছি এ’কটা দিন। এখন আরও নিয়ন্ত্রণের পালা। কিন্তু তার আগে...
মোবাইলটা বের করলাম। কমলিকার ছবিটা এবার ডিলিট করে দিতে হবে।
হঠাৎ দেখি হোয়াটস অ্যাপে একটা নোটিফিকেশন। এখনই এল। সোহিনী! লেখা
“’বড় বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে
কোথা হতে এলে তুমি হৃদমাঝারে।’
অনেক সাহস করে বললাম। একটা উত্তর দিও।”

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। আরেকবার কৃতজ্ঞ হলাম রবীন্দ্রনাথের কাছে...

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান