ফিরবে না আর কোন দিন

অভীক দত্ত

 

১।
“শোন বস, ওই সব নিজের লেখা গান ফান আমাদের
পোজ্ঞামে চলবে না। মার্কেটে ডিম্যান্ড নেই । তোমাকে
টাকা ফাকা পেতে হলে ওই চিরদিনই তুমি যে আমার,
দেখা না হায়রে সোচা না হায়রে করে মঞ্চ মাতিয়ে দিতে
হবে। কিশোর, শানু পারলে থাক, নইলে অন্যদিকে যাও।
এসব লাইন তোমার জন্য না”।
পানের পিক ফেলে কথাগুলি বলল অধিকারীদা। ইমরান
দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। কী বলবে বুঝতে পারল না।
অধিকারীদা বলল “পার পোজ্ঞাম শুরুতে সাতশো পাবে।
পাঁচটা গান। তিনটে সোলো, দুটো মিস পম্পার সাথে
গাইবে। পম্পা কিন্তু তোমার মত এলেবেলে না এটা
মাথায় রেখো। রিয়েলিটি শোয়ে ছিল। নাইন্থ হয়েছিল।
সেটা বড় কথা না। টিভিতে ছিল। মুখ চেনে সবাই।
রিহার্সাল যা দেবার দিয়ে নেবে। সাতশোতে শুরু করে
অনেকেই সাত হাজারে চলে গেছে। পোংগাপাকামি করবে
না। আমি যা বলব শুনবে। দেখবে উন্নতি করছ।
কি ব্যাপার ভায়া? রাজি তো?”

ইমরান মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দিল। অধিকারীদা
কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল “এরকম চুপ করে
থাকলে চলবে না। মুখ খুলে গাইতে হবে, দর্শকদের
নাচাতে হবে, তাহলেই হবে বুঝেছ? হ্যাঁ বল, মুখে হ্যাঁ বল”।
ইমরান হ্যাঁ বলল। অধিকারীদা বলল “তোমার এন্ট্রিটা
শুনে নাও। প্রথমে সব ইন্সটুমেন্টগুলো বাজবে। তুমি
তখন থাকবে না। ঢিক ঢাক, ঢিক ঢাক, ঢিক ঢাক, ব্যাস।
এবার মিউজিক শুরু হবে, গায়ককে দেখা যাবে না।
তোমাকে একটা কর্ডলেস দিয়ে দেব। ওটা নিয়ে মঞ্চের
পিছন থেকে শুরু করবে “তু, মেরী জিন্দেগী হে”। কুমার
শানুর মতই কিন্তু!!! আবেগ ঢেলে দেবে। তারপর গাইতে
গাইতে টোটাল এন্ট্রিটা নেবে। বুঝলে কিছু? মুখে বল”।
ইমরান বলল “হ্যাঁ দাদা বুঝেছি। রিহার্সাল দেওয়াবেন তো?”
অধিকারীদা মুখ কুঁচকে বলল “নয়া পয়সার শাকের
ক্যাশমেমো নাকি? রিহার্সাল কিসের হ্যাঁ?”
ইমরান ইতস্তত করে বলল “প্রথম শো তো! একটু যদি
হত তাহলে সুবিধা হত”।
অধিকারীদা একটা ডাক ছাড়লেন “এই নিতাই”।
নিতাই দৌড়ে এল। সাড়ে চার ফুট হাইটের ছেলে।
অধিকারীদা বলল “খগা আর বগাকে খবর দে। রিহার্সাল
হবে আজ। আর পম্পাকেও ডাকবি”।
ইমরান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। খগা আর বগা চলে এল।
কি বোর্ড আর গীটার। নিতাই প্যাড নিয়ে বসল। অধিকারীদা
বলল “আজ এই দিনটাকে... না না, তোমার বাড়ির সামনে
দিয়ে আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে গানটা জান”?
ইমরান মাথা চুলকাল “না”।
অধিকারীদা বলল “তাহলে আর কী! ওপারে থাকব আমি
গাও”।
ইমরান গাইল। অধিকারীদা শুনে টুনে বলল “ঠিক আছে
তবে আবেগটা আরও চাই। এ আমার গুরুদক্ষিণা হল
গ্রামের মানুষের জাতীয়সঙ্গীত। ওই গলাটা ভার করে
প্রণাম জানানোটা শিখতে হবে। বুঝলে?”
ইমরান মাথা নাড়াল। অধিকারীদা আবার রাগল “মুখে
বল মুখে বল”।
ইমরান “হ্যাঁ” বলল। অধিকারীদা বলল “সপ্তাহে তিনটে।
সিজনে দিনে দুটো থেকে তিনটে, মানে সপ্তাহে ১৪-১৫টা
মাচা পাবে। বুঝেছ? পারবে তো? নাকি দুদিন পরেই
খকখক করে কাশতে কাশতে বলবে অধিকারীদা আর
পারছি না?”
ইমরান মাথা নাড়ল না, মুখেই বলল “বলব না। কিছু
অ্যাডভান্স দেবেন?”
অধিকারীদা নাক কুঁচকে তাকাল “একটা পোজ্ঞামও
করলে না অ্যাডভান্স চাইছ?” ইমরান বলল “দরকার
ছিল দাদা”।
অধিকারী বুক পকেট থেকে একশোটাকা বের করে দিল।
“এই নাও”।
ইমরান টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল।
বলল “রিহার্সাল কি এখনই শুরু হবে?”
অধিকারীদা বলল “হ্যাঁ। এখানে বোস। দেখছি”।
২।
ইমরান যখন বাড়ি ফিরল বাবার কাশিটা আবার শুরু
হয়েছে। পাড়ার হোমিওপ্যাথি ডাক্তার পাল কাকু ইমরানকে
আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন “ইমরান, গতিক
সুবিধের না বাবা। ভাল হাসপাতালে নিয়ে যা। কাশি থেকে
রক্ত আছে। টেস্ট আছে অনেকগুলি”।
ইমরান বলল “আচ্ছা কাকু দেখছি”।
বাবার কাশি থামছেই না। মা বলল “বাবু, কিছু হল?”
ইমরান মাথা নাড়ল। কথা বলল না। মা বলল “একটা
টাকাও নেই এখন বাবু। কী করবি?”
ইমরান বলল “হাসপাতাল নিয়ে যাই। তুমি বাবাকে তৈরি
কর আমি আসছি”।
ইমরান ঘরে গেল। গানের খাতাটা খুলে চুপচাপ বসে রইল
প্রথম পেজে তিতিরের লিখে দেওয়া
“একটা রামধনু রং স্বপ্ন
ছুঁয়ে ভিজতে যাব সাথে,
ভেজা ঠোঁটের ভালবাসা
আকাশ ছোঁয়া রাতে...
এই ডায়েরীতে তোর লেখা সব কটা গান ছুঁয়ে থাকুক আমায়”।
ডায়েরীর প্রতিটা লেখা একটা একটা পাতা উলটে দেখল
বসে কিছুক্ষণ। তারপর দেশলাইটা বের করে আগুন জ্বালিয়ে দিল। কাল রাতে তিতিরের বিয়ে হয়ে গেছে।
কেউ কিছুতেই মেনে নেয় নি তাদের সম্পর্ক। একটা বেকার
বাউন্ডুলে ছেলে যে নিজে নিজে ঠিক করে নিয়েছে একদিন
বড় গায়ক হবে তাকে কে নিজের মেয়ের সাথে বিয়ে দেবে?
তার ওপর অন্য ধর্মের ছেলে। প্রশ্নই ওঠে না। বাবার দোকান
ছিল, চিটফান্ডের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে বসেছে।
ক’দিন ধরেই শরীর খারাপ। কেউ কেউ বলছে টিবি, কেউ
বলছে লাংস ক্যান্সারও হতে পারে।
তিতির তিনদিন আগে তার হাত ধরে বলেছিল “পালিয়ে
যাওয়া যায় না?”
ইমরান শূন্য দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ভাবছিল পালাবে
কোথায়? পালিয়ে কী করার আছে? কার থেকে পালাবে তারা?”
তিতিরকে কিছুই বলতে পারে নি সে।
কলেজ সোশ্যালে যেদিন প্রথম গান গেয়েছিল নিজের লেখা
কথায় ও সুরে, তিতির এসছিল সেদিন। মুগ্ধ গলায় বলেছিল
“তুমি এত ভাল গান গাও কী করে?” তখনও ইমরান কোন
উত্তর দিতে পারে নি। সেদিন থেকে তিতির তাকে ছাড়া
কিছু ভাবতে পারে নি কোনদিন। কিন্তু তার আর কিছু করার
ছিল না।
টিউশন পড়িয়ে কেনা গীটারটার দিকে তাকাল ইমরান।
এটা বেচলে এখন যদি কিছু দাম পাওয়া যায় সেটাতেই লাভ।
ডায়েরীর পাতা একটা একটা করে ছিড়ল সে। তারপর
দেশলাইটা বের কর আগুন ধরিয়ে দিল।
৩।
স্টেজের পিছনে দাঁড়িয়ে রক্তবমি করছিল ইমরান। পর পর
সাতদিন দুটো করে শো করতে হচ্ছে। অধিকারীদা
পরিষ্কার বলে দিয়েছে, বাবার অসুখের জন্য যে টাকা
নিয়েছিলে সেটা শোধ করার এর থেকে ভাল উপায় আর
কিছু হয় না। অন্য দলের লোকেদের সাথেও অধিকারীদা
কথা বলে তার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সে বলেছিল বলেই
করেছিল কিন্তু তিন নম্বর গানটা গাইবার সময়ই ইমরান
বুঝে গেছিল ভিতর থেকে কিছু একটা উঠে আসছে।
গান শেষ করেই স্টেজের পিছনে গিয়ে বমি করতে
রক্তের সাথে বমি বেরিয়ে এল। অধিকারীদা দেখে ভয়
পেয়ে গেল, “টাকা নিয়ে নিয়েছি। কী করলে এটা? কী
হবে এবার? ”। ইমরান হাসল।
অধিকারীদা বলল “পম্পার সাথে দুটো গান বাকি। গ্রামের
পাবলিক একটা হাড় আস্ত রাখবে না। ডান্সের দুটো গান
যদি তুমি ডুয়েটে না গাও মাঠে মারা পড়ব। কী করি এবার?”
ইমরান আবার হাসল। বলল “আমি গাইব তো দাদা।
চিন্তা করছেন কেন?”
৪।
দশ বছর পরের কথা। ফিল্মফেয়ারে বেস্ট ডেবিউ সিঙ্গারের
পুরস্কার পাওয়া মুম্বইয়ের বিখ্যাত গায়ক ইমরান হক এখন
রাস্তায় বেরোতে পারে না। একের পর এক শো আসে।
মেয়েরা পাগল হয়ে যায় তার একটু স্পর্শ পাবার জন্য।
তার সাক্ষাৎকার নিতে আসা মেয়েটি প্রথমেই জিজ্ঞেস
করল “আপনার স্টোরিটা বলুন প্লিজ। জার্নিটা সবাই
শুনতে চাইছে এখন”।
ইমরান কথাটা শুনে চমকে তার দিকে তাকাল।
কথা বলে সব কিছু বোঝানো যায়?
এত সোজা?
সে উত্তর না দিয়ে সেই হাসিটা হাসল যেটা সেদিন
অধিকারীদার সামনে হেসেছিল। মেয়েটা কিছুই বুঝল না।
বলল “আচ্ছা, অন্য প্রশ্ন করি, এখন জীবনের পরবর্তী
লক্ষ্য কী আপনার?”
ইমরান বলল “একটা গীটার আর একটা পুড়ে যাওয়া
ডায়েরী খুঁজে বের করা”।
মেয়েটা মনে হয় নতুন জার্নালিস্ট, তেমন পোড় খায়নি।
তার কথা শুনে কিছুই বুঝতে না পেরে কাঁদো কাঁদো
হয়ে বলল “প্লিজ স্যার। কিছুই বুঝতে পারছি না কী
বলছেন”।
ইমরান মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল “এক্সট্রিমলি সরি।
নিন শুরু করুন”।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান