একটি জেরা ও তারপর

অভীক দত্ত

 

-তাহলে আপনি বলছেন খুনটা আপনি করেন নি?
-না স্যার বিশ্বাস করুন স্যার। আমি করিনি।
-কিভাবে বিশ্বাস করব? আপনাকে বিশ্বাস করার মত কিছুই তো
করেন নি।
-কেন স্যার? একথা বলছেন কেন?
-ঘটনাস্থলে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্টস পাওয়া গেছে।
আপনার বউ বলেছে ওই সময় আপনি ঘরে ছিলেন
না। অফিসের লোক বলেছে ওই দিন আপনি
তাড়াতাড়ি অফিস থেকে পালিয়েছিলেন।
এবার বলুন আপনাকে কিভাবে বিশ্বাস
করব?
-তাতেও কি প্রমাণ হয় খুনটা আমিই করেছি?
-হয়। যতক্ষণ না আপনি বলছেন ওই দিন আপনি
ঠিক কী করছিলেন।
-স্যার সেটা বলতে একটু সমস্যা আছে।
-সেক্ষেত্রে কিন্তু আপনাকে অ্যারেস্ট করতে
হতে পারে।
-অ্যারেস্ট কেন স্যার?
-অপরাধ করলে শাস্তি তো হবেই।
-স্যার আপনাকে কিভাবে বিশ্বাস করাব খুনটা আমি করি
নি?
-বিশ্বাস করাতে কে বলেছে। আপনি আপনার অবস্থানটা
ক্লিয়ার করলেই আর কোনরকম ঝামেলার মধ্যে
আপনাকে টেনে নিয়ে যাব না আমি সে
কথাটাই আপনাকে বোঝাতে চাইছি।
-ঝামেলা তো হয়েই গেল না স্যার? এই
যে থানায় ডেকে আপনি আমাকে
প্রশ্ন করছেন, এটা ঝামেলা না
বলুন?
-নাহ। এ তো কিছুই নয়। আপনি সহযোগিতা না করলে
আমরা সেই ব্যবস্থা করে দেব যাতে আপনিও আপনার
শরীরের কিছু অঙ্গের ব্যবহার সারাজীবনের মত ভুলে
যাবেন।
-এরকম বলবেন না স্যার। ভয় লাগছে।
-লাগবে তো। খুন করে এসছেন, ভয় তো
পাবেনই। তা কিভাবে খুন করলেন?
ওরকম একটা সুন্দরী মহিলাকে
খুন করতে দুবার ভাবলেন না?

-সুন্দরী কোথায়? আপনার চোখে কি ন্যাবা হয়েছে
স্যার?
-ওহ। সুন্দরী নয়? আমার তো দেখে সুন্দরীই মনে
হয়েছিল।
-পাওয়ার আছে আপনার চশমার?
-হ্যাঁ তা আছে।
-ওই জন্যই। শুনুন স্যার। আপনার এই
সুন্দরীকে আমি খুন করিনি। আমি
খুনের কথা ভাবতে যাব কেন
খামোখা বলুন তো?
-কেন ভাবতে পারবেন না কেন? আর ওনার ঘরে
আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট এল কোত্থেকে?
-তার আগে আপনি বলুন না আমি এই মহিলাকে
খুন করতেই বা যাব কেন?
-অনেক কিছুই হতে পারে। পাড়ার অনেকেই বলছে
আপনি ওনার বাড়ি প্রায়ই যেতেন। সেটার
কি কোন বিরুদ্ধ প্রমাণ আছে আপনার
কাছে?
-বাড়ি যেতাম? ওটাকে বাড়ি বলছেন
আপনি? ওখানে তো অনেকেই
যেত।
-অনেকে বলতে?
-অনেকে বলতে অনেকেই। ইয়ে, মানে প্রফেশনাল
রিলেশনশিপ আর কী।
-তা আপনি ওই সময়টা প্রফেশনাল রিলেশনশিপ
মেটাতে ওখানে ছিলেন?
-সেটা আমি কি একবারও বলেছি স্যার?
-তাহলে বলুন, নইলে এবার অন্য ব্যবস্থা
নিতে হতে পারে।
-কী ব্যবস্থা স্যার?
-থার্ড ডিগ্রির নাম শুনেছেন?
-আপনি কি আমায় অ্যারেস্ট
করেছেন?
-হ্যাঁ। করছি। আপনার কথাবার্তা আমার যথেষ্ট
সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।
-কী হিসেবে সন্দেহজনক একটু বলবেন?
-আপনি তো এটাই বলছেন না খুনের সময়ে
আপনি কোথায় ছিলেন।
-খুনের জায়গাতে ছিলাম কিনা জানতে চাইছেন
তো?
-অবভিয়াসলি।
-তার আগে বলুন, জেলে খাবার কী
দেয়?
-পোড়া রুটি।
-সকাল সন্ধ্যে বাংলা সিরিয়াল দেখাবে না তো?
-টিভি কোথায় পাবেন? ওসব গল্প নেই।
আমি রাজি। আপনি বরং আমাকে অ্যারেস্টই করুন
তার মানে আপনি আপনার অপরাধ স্বীকার
করছেন?
-সে আপনি যা যা করার করে দিন। আমি
ভেবে দেখলাম জেলে নিয়ে গেলে যেতে পারেন।
-অদ্ভুত! তবু আপনি বলবেন না
সেদিন আপনি কী করছিলেন?
অথবা খুনটাই বা করলেন কেন?
-ওকে। বলেই দি তাহলে।
-বলুন বলুন।
-দিনের পর দিন অফিসে কাজের প্রেশার। মাথা যায়
পাগল পাগল হয়ে। অফিস থেকে ফিরি। শুরু হয়ে
যায় সিরিয়ালের প্যান প্যানানি। ওই গানগুলি
শুনলেই আমি চেঁচামেচি শুরু করে দিতাম। বউ তো
একদিন বলেই দিল না পোষায়, যাও
অন্য কোথাও গিয়ে বসে থাক।
-তারপর?
-তারপর আর কী! এক কলিগের থেকে
জানলাম ওই আপনার সো কোল্ড সুন্দরীর ব্যাপারে।
-হু, বলে যান।
-অফিস থেকে ফেরার সময় রাত ন’টা অবধি
ওখানেই কাটিয়ে যেতাম। বউ জিজ্ঞেস করলে বলে
দিতাম অফিসের কাজ। সাড়ে ন’টায় বাড়ি
ফিরে খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তাম। অবশ্য
তখনও বউয়ের সিরিয়াল দেখা চলতে থাকত।
-তারপর?
-তারপর আর কী! সেদিন অফিসের
প্রেশার আর নিতে পারিনি। মাথা ধরে
আছে। আপনার সুন্দরীর বাড়ি গেলাম। ভাবলাম
গিয়ে জল টল খাই।
ঠান্ডা হই। কিন্তু...
-কিন্তু কী?
-আর কী! পৌছে দেখি জোরে জোরে কী কিরণলামা
না কী দেখছে। কেউ মুখ লাল করে, কেউ মাথায়
শিং দিয়ে রাক্ষস সেজেছে। ওকে বললাম প্লিজ
বন্ধ কর। বলল বস না, একসাথে দেখি।
আমি বললাম কাল রিপিট দেখে নিও।
বলে কীনা না, এখনই দেখতে হবে। আজ
বিরাট কীর্তি হবে, কীসব কটকটিভাজা
টাজার কথা বলল।
-মরেছে। তারপরে?
-তারপর আর কী! বিশ্বাস করুন মশাই, আর মেজাজ
ঠিক রাখতে পারি নি। বাড়িতে এই, যেখানে একটু শান্তি
পেতে যাই, সেখানেও এই, আর পারলাম না। ওই টিভির
রিমোটটাই ছুঁড়ে মারলাম মাথায়। তারপর ওখানেই...
মানে আর কন্ট্রোল করতে পারলাম না।
-তাহলে আপনিই?
-হ্যাঁ আমিই। শুধু আরেকবার বলুন জেলে
সিরিয়াল চলে না তো?
-নাহ...
-কী হল আপনি এরকম মুষড়ে পড়লেন কেন স্যার?
-আপনাকে আমার হিংসে হচ্ছে মশাই।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান