সেলফি

অভীক দত্ত

 

“তোমার বিরহে রহিব বিলীন
তোমাতে করিব বাস
দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী
দীর্ঘ বরষ মাস”...

অফিস যাই নি আজ। বসকে ফোন করে বলে দিয়েছি, আজ যাব না। সারাটা রাত জেগে ছিলাম। কালকে সন্ধ্যেয় অফিস থেকে ফিরে হোয়াটস অ্যাপ চেক করতে দেখলাম ফটো পাঠিয়েছে।
ও। বিয়ের কনের সেলফি। হাসি মুখে। একফোটা দুঃখ নেই তাতে। আলোয় ভরে থাকা সাঝঘরে ফটোটা তোলা। আমাকে
পাঠিয়েছে কেন খুব ভাল করে জানি। দুদিন আগেই বিয়ের কার্ডের ছবি পাঠিয়ে লিখেছিল “আসিস। তোর প্রিয় ফিশ ফ্রাই আর মাটন থাকবে”। সাথে হাসি হাসি মুখের স্মাইলি।

আমি রিপ্লাই করিনি দেখে কিছুক্ষণ পর আবার লিখল “তুই ঠিক যেরকম যেরকম মেনু বলেছিলি, বাবাকে বলে সেই একই মেনু করিয়েছি। শুধু বিয়েটা তোর সাথে হল না”।
আমি তাতেও রিপ্লাই দিই নি।
রিপ্লাই দেওয়া মানেই কথায় কথা বেড়ে যাওয়া। সেসব এপিসোড
যখন দরকার ছিল তখন করে নি। এখন যখন সিনেমার দি এন্ড
লেখার পালা, সেখানে সিনেমাটাকে মেগা সিরিয়ালে টেনে নিয়ে
যাওয়ার কোন কারণ দেখি না।
যেদিন ব্রেক আপ করেছিল সারারাত বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
পাড়ার ছেলেরা এসে বেধড়ক মেরেছিল। মুখ টুখ ফেটে রাস্তায়
পড়ে ছিলাম। একবারও দেখে নি। সেই যে ঘরে
ঢুকেছিল তারপরে।

মেসে ফিরে চুপচাপ বসে ছিলাম। ডাক্তার দেখাইনি। চোখের তলায়
কালি, ফাটা ঠোঁট, দাঁতে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। কিন্তু কিচ্ছু
দেখাইনি।
তার পরের দিন বন্ধুরা জোর করে নিয়ে গেছিল ডাক্তারের কাছে।
বারবার ফোন করেছি ওকে। সুইচড অফ। মেসেজের পর মেসেজ
করেছি। রিপ্লাই পাই নি।
প্রায় একমাস পাগলের মত ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতাম। পাড়ার
ছেলেগুলি প্রথমে ধাওয়া করত। তারপরে সয়ে গেছিল ওদেরও।
বুঝে গেছিল মোল্লার দৌড় কতখানি। একদিন একজন ডেকে বুঝিয়েছিল
“দেখ ভাই, তোকে তো ভদ্র ঘরের ছেলে বলেই মনে হয়, কেন
ফালতু ফালতু বাওয়ালি করছিস? যা না, ছেড়ে দে না, অকারণ ঝামেলা,
তোরও, আমাদেরও”।
তারপর থেকে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম।
ব্রেক আপের কারণও ভারি অদ্ভুত ছিল। ওর বাবার আমাকে পছন্দ
না। একদিন দেখা হয়েছিল। দেখা করেই পত্রপাঠ ক্যান্সেল। আমি নাকি
ঠিক ওদের সমাজের মেলামেশার যোগ্য না।
পরেরদিন আমাকে বলে দিল বাবার তোকে পছন্দ না। আমাদের
আর দেখা না হওয়াই ভাল। কত সুন্দরভাবে সব শেষ হয়ে গেল।
আমিও ছাড়িনি। বলেছিলাম তাহলে প্রেমটা বাবাকে বলেই শুরু করতে
পারতি। আমার এত সময় নষ্ট করালে কেন?
কিছু বলেনি।
আমার এত প্রশ্নের একটা উত্তর ও দেয় নি। বাবার পছন্দ না। ব্যস।
একমাস পাগলের মত ঘুরলাম। সিগারেটের ছ্যাকা দিলাম যতবার
মনে পড়ত ওকে।
হঠাৎ করে এটা শুরু করল। বিয়ের আগে থেকে। কী ভাবে ও?
সেলফি পাঠালেই আমি জ্বলে যাব? আমি আর জ্বলি না এখন।
জ্বলার কারণও নেই।
ওর বাবার আমাকে পছন্দ না যখন তখন খামোখা আমি জ্বলে
নিজেকে নষ্ট করতে যাব কেন? কারণটাই বা কী? শুধু কাজের
কাজ যেটা করেছি, আজকে ছুটি নিয়ে নিয়েছি। রাতে ঘুমাতে
পারি নি। এপাশ ওপাশ করেছি।
এভাবে কষ্ট পাবার অধিকার তো আমার নেই। আমি তো আসলে
কোন দোষ করিনি। তাহলে কেন এটা আমার সাথে হবে? আমি
বারবার এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে গেছি। শেষমেশ না পেয়ে মেয়ে
খুঁজে গেছি। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে পাগলের মত মেয়ে অ্যাড করে
গেছি।
কারও সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি, দেখা করার জায়গায় যখন
এসেছে, তখনই আটকে গেছি। বারবার ওর মুখটা মনে পড়ে যেত।
ফেসবুকে আমকে ব্লক করে রেখেছে। অন্য প্রোফাইল থেকে
বারবার দেখেছি। কোন বিকার নেই।
যেরকম বন্ধুদের সাথে কে এফ সি যেত, সিটি সেন্টার যেত
সব একই রকম আছে, শুধু আমি নেই। হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ
সীন হয়ে যেত, রিপ্লাই করত না।
শেষে আমিও মেসেজ পাঠানো বন্ধ করে দি। অসহ্য সময়
কেটে গেছে একের পর এক দিন।
এখন যেখানে আমার কোন দোষ নেই, সেখানে আমাকেই বিয়ের
ছবি দিয়ে যাওয়া, আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে ও কী মজা পায়
সেটা আমি জানি না।
কিন্তু আমিও ঠিক করেছি, উত্তর আমি আর দেব না। তাতে যা
হয় হোক। ভুলে আমাকে যেতেই হবে।
গরমকালে বিয়ে করার কথা অবশ্য আমাদের ছিল না। ওই বলত
শীতকালে বিয়ে করবে। গরমকালে লোকে কী করে ওই সব
ধড়াচুড়ো পরে বিয়ে করে কে জানে!


এই একটাই অমিল পেলাম।
কাল রাতে বিয়ে হয়ে গেল। আজ নিশ্চয়ই বাসী বিয়ে। কাল
ফুলসজ্জা।
আহ... মনে পড়ছে সব কিছু আবার। অসহ্য কষ্ট শুরু হল।
ভুলতে পারা এই দেড় বছর পরেও এত সোজা হচ্ছে না তাহলে!
প্রতিটা মুহূর্ত মনে পড়ে যাচ্ছে বিচ্ছিরিভাবে। ফুচকা খাওয়া,
প্রথম চুমু খাওয়া, সঅঅঅব।
বিয়ের সাজের সেলফিটা দেখলাম। ফটোতে কাউকে ছোঁয়া যায়
না। ওকে ছুঁতে চাইলেও পারলাম না। ফটোটা বেলা দশটা নাগাদ
ডিলিট করতে গেলাম। পারলাম না।
বেরিয়ে পড়লাম সাড়ে দশটা নাগাদ। হেঁটে বেড়াই আজ শহরটা।
হেঁটে যদি খানিকটা মনের বোঝা হালকা করা যায়।

অনেকটা রাস্তা হাঁটলাম একা একা। হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে যাচ্ছে
ওর সাথে হাঁটার কথা।
হোয়াটস অ্যাপ খুললাম। আর কোন ছবি পাঠায় নি। কিছু লেখেওনি
আর। অনেকক্ষণ হেঁটে একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলাম।
বসার সাথে সাথেই দেখি একটা আন নোন নাম্বার থেকে ফোন।
ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল “অরিত্র বাবু বলছেন?”
আমি হ্যাঁ বলতেই বলল “...থানা থেকে বলছি। আপনি একবার
আসবেন আজকেই”।
অবাক হয়ে বললাম “কেন বলুন তো?”
“সোহিনীদেবী কাল সুইসাইড করেছেন। গতকাল বিয়ের রাতে। এবং ওনার মোবাইল রেকর্ড ঘেটে পাচ্ছি আপনাকে সেলফিটা পাঠিয়ে উনি
সুইসাইড করেন”।
আমি আর কিছু বললাম না। শুধু মনে হল
এত দিনের সব প্রশ্নের উত্তর একবারে দিয়ে গেল ও

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান