বিপাশা

অভীক দত্ত

 

বিপাশার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল টিউলিপ গার্ডেনে। প্রথমে দেখে মনেও হয় নি ও বাঙালি। কাশ্মীরি মেয়েদের মত করে মাথায় শাল জড়িয়ে সেলফি তুলে যাচ্ছিল একা একা।
আমি চুপচাপ বসে ছিলাম একটা চিনার গাছের তলায়। শ্রীনগরে নেমেই ঠান্ডা লেগে গেছিল, মাথা ধরে আছে, জ্বর জ্বর ভাব। ভেবেছিলাম হোটেলেই থেকে যাব কিন্তু ট্যুর অপারেটর বলল “দাদা টিউলিপ গার্ডেন লোকে দেখতে পায় না আর আপনি বলছেন কাটিয়ে দেবেন? এলাকায় ফিরে মুখ দেখাতে পারবেন না যে!”
শেষমেষ প্রথমে একটা ইনার, তার ওপর জামা, তার ওপর সোয়েটার তার ওপর একটা লেদারের জ্যাকেট পরে চলে এলাম। হোটেল থেকে বেরিয়ে প্রথমেই টিউলিপ গার্ডেনে নিয়ে এল। পার্কিংয়ের জায়গা থেকে এক কিলোমিটার হেঁটে ঢুকতে হয়। হাঁটার সময়েই বুঝে গেলাম এসে ঠিক করি নি। রেস্ট নিয়ে নিলেই হত। হাঁচি হচ্ছিল যদিও কিন্তু চারদিক দেখে মুগ্ধ না হয়েও উপায় ছিল না। বিভিন্ন রঙের টিউলিপ ফুটে আছে। গোটা এলাকা জুড়ে একটা শান্ত সমাহিত ভাব। তার সাথে ঠান্ডাও। এপ্রিলেও যে এখানে এত ঠান্ডা থাকবে তা কে বুঝতে পেরেছিল! হেঁটে বেশ ক্লান্ত লাগছিল। জ্বর আসছে বোঝা যাচ্ছিল। এক দোকান থেকে জল কিনে পকেট থেকে ক্যালপল বের করে খেলাম। তারপর বাগানের মাঝখানে এসে বসলাম।
আর তারপরেই বিপাশাকে দেখলাম। কয়েক হাজার ফটো তুলে ফেলল মনে হল টিউলিপ ফুলগুলোর। সব বেঞ্চিগুলোই ভর্তি ছিল আমারটা বাদে। চারদিক দেখে বসে পড়ল। আর ছবিগুলো দেখে নিজেই বলে যেতে লাগল “ঈশ, এসব কি আর ক্যামেরায় ধরা পড়ে?”
আর তখনই আমি বুঝলাম মেয়েটা বাঙালি। আর তখনই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হ্যাচ্চো এল।
জোর শব্দ করে দু তিনটে হ্যাচ্চো দিলাম। ভিতর থেকেই বেরিয়ে এল “বাপ রে। মরলাম এবার”।
দু চারটে কাশ্মীরি কাপল ছিল চারপাশে। বাঙালি ট্যুরিস্টের মধ্যে একজন বয়স্ক মহিলা পাশের বেঞ্চিতে বসে ছিলেন। আমার হাঁচির শব্দে চমকে সবাই একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। বিপাশা আমার দিকে তাকিয়ে বলল “আপনি অল ডে খাবেন? হাঁচিটা কমে যাবে”।
আমি ওর কথা শুনে অবাক হয়ে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকালাম। এরকম হঠাৎ ওষুধ খাওয়ার প্রস্তাব কোনদিন পাই নি এর আগে। তারপর বললাম “সেটা কী ওষুধ?”
বিপাশা সেই একই রকম উৎসাহের সাথে বলল “অ্যালার্জির ওষুধ। হাঁচি হলেই খাই আমি। সব সময় সাথে আছে। খাবেন?”
আমি একবার ভাবলাম অজানা অচেনা জায়গায়, অচেনা কারও থেকে অজানা ওষুধ খাওয়াটা কি ঠিক হবে? তারপর ভাবলাম মেয়েটাকে দেখে তো ভাল বাড়ির মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে। খেয়েই নি। বললাম “আচ্ছা দিন”।
মেয়েটা অতি উৎসাহে ক্যামেরার ব্যাগ হাতড়ে ওষুধটা দিল। ছোট্ট একটা ট্যাবলেট। জল ছিলই সাথে। চুপ চাপ গিলে নিলাম ওষুধটা। তারপর বললাম “থ্যাঙ্কস” বললাম।
মেয়েটা বাকি ওষুধের স্ট্রিপটা আবার ক্যামেরার ব্যাগে ঢুকিয়ে বলল “কলকাতা?”
আমি মাথা নাড়লাম, “না, শিলিগুড়ি”।
মেয়েটা বলল “আরিব্বাস। দারুণ জায়গা শিলিগুড়ি। আমি দুবার দার্জিলিং গেছি। শিলিগুড়িতে দুবারই একদিন করে ছিলাম। আচ্ছা আমি বিপাশা। আপনি?”
আমি বললাম “উপমন্যু”।
বিপাশা বলল “কন্ডাক্টেড ট্যুর? আর কে কে এসছে”?
আমি হাসলাম “হ্যাঁ। তবে একাই এসছি”।
বিপাশা হেসে বলল “আরেহ। দারুণ ব্যাপার। আমিও কন্ডাক্টেড ট্যুরেই এসছি। তবে মাসীর সাথে। তিনি আবার শ্রীনগরে এসেই ইউরিক অ্যাসিড বাড়িয়ে পা ফুলে হোটেলেই থেকে গেলন। একা একাই চলে এলাম তাই। কী মিস করল তাই না? এটা একটা অদ্ভুত জায়গা। আমার তো ইচ্ছা করছে এখানেই থেকে যেতে”।
আমার হাঁচি এসে পড়ল। আরও পর পর তিন চারটে হল। সবাই যেভাবে পাগলের মত ফটো তুলে যাচ্ছিল, তাদের মধ্যে এরকম ভাবে হাঁচতে খারাপই লাগছিল। বিপাশার দেওয়া ওসুধেও কাজ হয় নি মনে হচ্ছিল। বিপাশা খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বলল “আপনার মনে হয় অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। দেব?”
আমি হাঁ করে খানিকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এ পাগল নাকি? চেনা নেই জানা নেই একটা লোককে অ্যান্টিবায়োটিক খাইয়ে দিচ্ছে! একটু সামলে বললাম “না না, আমি দেখছি কী করা যায়”।
বিপাশা মাথা দুলিয়ে বলল “পাগল ভাবছেন নাকি আমাকে? আমি কিন্তু ডাক্তারি পড়ছি। থার্ড ইয়ার”।
শুনেও বিশেষ আশ্বস্ত হতে পারলাম না। মুখে অবশ্য বললাম “ওহ, আচ্ছা। বেশ ভাল। তবে এভাবে দুম করে কাউকে অ্যান্টিবায়োটিক দেয় আমি দেখিনি কোন ডাক্তারকে”।
বিপাশা হাসল “সেটা ঠিকই। তবে আপনাকে এভাবে হাঁচতে দেখে কেন জানি না খারাপ লাগল হঠাৎ। আচ্ছা আমি আসি”।
বলে মেয়েটা হাঁটা দিল। আমি অবাক হয়ে ওর চলে যাওয়াটা দেখলাম।
তারপরেই হঠাৎ কেন জানিনা খুব মন খারাপ হয়ে গেল। হাঁচতে ভুলে গেলাম। যতক্ষণ পারি বিপাশার চলে যাওয়াটা দেখলাম।
২।
গুলমার্গে আবার দেখা বিপাশার সাথে। দেখা হওয়া ছাড়া অবশ্য উপায়ও ছিল না। পৌছে দেখি তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির সাথে তুষারপাত তো আছেই। খানিকক্ষণ আগে গাড়ি আটকে দেড়শো টাকা নিয়ে একগাদা গরম পোশাক পরিয়ে দিয়েছে কতগুলো কাশ্মীরি। গাড়ি থেকে নেমে দেখছি সেসব পরে নড়তে চড়তে পারছি না। তার ওপর বৃষ্টি। ভাগ্যে ছাতা এনেছিলাম। ট্যুর অপারেটর বলল “দাদা মোবাইলে তো পাব না কাউকেই, মোটামুটি ঘণ্টাখানেক ঘুরে নিন। মনে হয় না রোপওয়ে অবধি পৌঁছতে পারবেন। সেক্ষেত্রে এখানেই চলে আসবেন”। আমি ছাতা নিয়ে একটু একটু করে হাঁটতে শুরু করলাম। উপত্যকাটা পুরো বরফে ঢেকে রয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেই কয়েকজন অতি উৎসাহী দেখছি স্লেজে চড়ছে। গামবুটও পরিয়ে দিয়েছিল ওরা। আমি সেটা নিয়েই বরফে নামলাম। নরম বরফ। ভয় হচ্ছিল পা ডেবে না যায়, খানিকক্ষণ হাঁটার পর বুঝলাম চাপ নেই, বরফের নীচে মাটি একটু দূরে হলেও আছে। বেশ খানিকটা হেঁটে মনে হল এবার ফিরে যাওয়াই ভাল। অকারণ এই হাঁটাটার দরকার নেই। একটু দূরে দাঁড়িয়ে লোকেদের পাগলামি দেখাটাই ভাল। সেটা ভেবে ঘুরতেই দেখি বিপাশা এদিকেই আসছে। আমাকে দেখে ওখান থেকেই চেঁচাল “আপনার হাঁচি কমেছে? না কমলে আবার বরফে নামতে গেলেন কেন?”
আমি চেঁচিয়ে কিছু বললাম না। ওর আসার জন্য অপেক্ষা করলাম। মোটামুটি কাছে আসার পরে বললাম “আপনার মাসীর ইউরিক অ্যাসিড ঠিক হয়েছে?”
বিপাশা বলল “পুরোটা না। এসছে তবে গাড়িতেই বসে রয়েছে। ওই তো”।
হাত দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা সার সার গাড়িগুলোর একটা দেখাল সে। আমি কিছুই দেখতে পেলাম না। বললাম “আমার ঠান্ডা লাগাটা আজ একটু বেটার। ওষুধ খাই নি অবশ্য। তবে আপনার ওষুধের প্রভাবে নাকি সেটা জানি না”।
বিপাশা একটা বিচ্ছু হাসি দিয়ে বলল “আমার ওষুধের প্রভাবেই হবে”।
আমি হাসলাম। “তা হবে। আচ্ছা, থ্যাঙ্কস”।
বিপাসা বলল “থ্যাঙ্কস ট্যাঙ্কস গুলি মারুন। চলুন একটু কফি খাওয়া যাক”।
আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম এই সময়গুলো আমার খুব ভাল কাটছে। বিপাশার কথায় রাজি হওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না, কারণ আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম আমি নিজেই চাইছিলাম ওর সাথে আরও বেশ খানিকক্ষণ সময় কাটাতে।
কিন্তু সমস্যা হল ফিরব কী, তার আগেই একগাদা স্লেজচালক শুরু করে দিল “সাবজী চলিয়ে না, ম্যাডামজি অউর আপ কো ঘুমাকে লাতে হে”।
আমি বুঝলাম ওরা আমাদের স্বামী স্ত্রী ভেবেছে। বিপাশা দেখলাম ব্যাপারটা এঞ্জয় করছে। আমাকে বলল “আমি এই ঠান্ডায় আর নড়তে পারছি না, তাড়াতাড়ি চলুন তো চা খাই। এদের কথা শুনবেন না, উত্তরও দেবেন না। আমাদের ট্যুর অপারেটর বলেই দিয়েছে এদের থেকে দূরে থাকতে”।
ওর কথামতই কাজ করলাম। ওই জায়গাটা ছেড়ে কফির দোকানের দিকে রওনা হলাম। তাতে এই স্লেজওয়ালারা বেশ বিরক্ত হল। চারটে কুকথাও শুনিয়ে দিল সম্ভবত ওদের ভাষাতে।
কফি নিয়ে বসে বললাম “আপনি এই যে একা একা ঘুরছেন, আপনার মাসী কিছু বলেন না?”
বিপাশা বলল “বলে না আবার! তবে আমি পরিষ্কার বলেই দিয়েছি, বেড়াতে এসে কোন কথা শুনব না তোমার”।
আমি বললাম “আপনার বাবা মা?”
বিপাশা বলল “ছোটবেলাতেই মারা গেছে। মাসীর কাছেই মানুষ”।
খারাপ লাগল শুনে। সরি বললাম। বিপাশা কফি চুমুক দিয়ে বলল “সরি বলার কিছু নেই, আপনি জানবেন কী করে? আচ্ছা আপনি কী করেন?”
আমি বললাম “আমি ফরেস্ট সার্ভিসে আছি”।
বিপাশা চোখ বড় বড় করে বলল “ওয়াও। এটা তো দারুণ রোম্যান্টিক ব্যাপার। আপনি বাঘ দেখেছেন?”
আমি হেসে ফেললাম। ফরেস্ট শুনেই সবাই বাঘ দেখার কথা বলে কেন! বললাম “হ্যাঁ তা দেখেছি”।
বিপাশা উৎসাহিত হল “ আচ্ছা ভাবুন তো, এখানে এরকম বৃষ্টি হচ্ছে, চারদিক বরফে ঢেকে গেছে, ঠিক এই সময় দু চারটে বাঘ চলে এল এখানে? কেমন রোম্যান্টিক ব্যাপার হবে তাই না?”
আমি অবাক হলাম “রোম্যান্টিক ব্যাপার? মানে বাঘ এলে তো অনাসৃষ্টি হয়ে যাবে!”
বিপাশা বলল “কেন অনাসৃষ্টি হবে? বাঘ আসবে, তারপরে...”
কথাটা শেষ করতে পারলাম না। তার আগেই আমার ভীষণ ঘুম চলে এল। কখন যে ঘুমিয়ে
পড়লাম মনে করতে পারলাম না আর।
৩।
ঘুম ভাঙল একটা ছোট্ট ঘরে। সামনে একটা টেবিল। মাথার ওপর খুব কম পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছে। হাত পা বেঁধে চেয়ারে বসানো আমাকে।
একটু পরে তিনজন ঢুকল। আমার সামনে চেয়ার টেনে বসে একজন বলল “এই যে রিয়াজ খান, ওরফে আরিফ ওরফে আলতাফ ওরফে ডেভিড ওরফে উপমন্যু সেন। বুদ্ধিটা ভালই ছিল। আর পাঁচটা লোকের মত একা একা কাশ্মীর ঘুরতে আসার ছুতো করা। তা ঠিক আছে। যা করেছিস করেছিস। এবার বল মার দিতে হবে না সত্যি সত্যি সব বলবি? কাশ্মীরে কার সাথে দেখা করতে এসছিলি?”
ক্লান্ত লাগছিল খুব। বেশ কিছুক্ষণ ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম “বিপাশাকে আনুন। তাহলেই হবে, আর কিছু করতে হবে না আপনাদের”...

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান