একটা শুরুর গল্প

অভীক দত্ত

 

-উফ। বাঁচলাম।
-কেন?
-জীবনে এই প্রথম মেয়ে দেখতে এসছি। এত লোকের সামনে কেমন কেমন লাগছিল।
-ওহ। আমার কিন্তু প্রথমবার না। এর আগেও দুজন এসছিল।
-তাই? তা রিজেক্ট কি ওরাই করল না আপনি?
-৫০-৫০।
-মানে?
-প্রথমটা ওরা রিজেক্ট করেছিল। তারপরেরটা আমি।
-কেন রিজেক্ট করেছিল প্রথমটা?
-তেমন কিছুই না। ছেলের মা বলেছিল মা শুনেছি তুমি ভাল গান গাও। একটা গান শোনাও। আমি হেসে বলেছিলাম মেয়ে দেখতে এসছেন দেখুন না। এটা তো আর “ইচ্ছেনদী” চলছে না যে গান শোনাব!
- সত্যি? এটা যাতা ছিল। রিজেক্ট তো করবেই।
-আমিও চাইছিলাম রিজেক্ট করুক। একটু বেশিই ডমিনেটিং ছিল ফ্যামিলিটা। আমাদের বাড়িতে এসেই ছেলেটার বাবা বাস্তু টাস্তু নিয়ে একগাদা জ্ঞান দিয়ে দিল। শুনেই ঝাঁট... ঈশ... সরি...
-না না, আপনি বলুন না। বেশ মজা লাগছে।
-থ্যাঙ্কস... হ্যাঁ মানে শুনে ঝাঁট ফাট জ্বলে গেছিল আর কী! তখনই ঠিক করেছিলাম উল্টো পালটা বলে কাটাতে হবে।
-আর সেকেন্ডটা?
- ছেলেটার জীবনে অনেক প্রশ্ন। প্রথম কথাতেই জিজ্ঞেস করছে বয়ফ্রেন্ড কটা ছিল, ভার্জিন কিনা এইসব। তখন হেসে হেসে মনের মত উল্টো পালটা উত্তর দিয়ে দিয়েছিলাম। যাই হোক, ওরা চলে গেলে বাড়িতে স্ট্রেট বলে দি, এই ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হলে আমি পাতি শ্যাওড়াগাছে গলা দিয়ে শ্যাওড়া গাছের পেতনি হয়ে যাব।
-হা হা...উফ... এক্কেবারে যা তা সত্যিই।
-আর আপনি? মেয়ে দেখেননি কেন?
-আসলে সেরকম কোন প্ল্যান ছিল না আর কী। ক’দিন আগে মনে হল বিয়েটা করা যায়, কিন্তু সমস্যা হল সারাজীবন এত মন দিয়ে পড়াশুনা করেছি, প্রেম ট্রেম তেমন করে উঠতে পারি নি কখনও। ফলস্বরূপ বাবার শরণাপন্ন হতে হল। বাবা-ই কলিগের থেকে আপনার কথা বলল। এই যে আপনি রূপে লক্ষী, গুণে সরস্বতী... না কি সব।
-হি হি। কিসব! আমার মুখের খিস্তি তো শোনে নি, তাহলে আর এই সব কথা কেউ বলত না।
-আমার কিন্তু মেয়েদের মুখে খিস্তি শুনতে বেশ ভাল লাগে।
-তাই?
-হ্যাঁ। আমাদের ক্লাসে অন্বেষা বলে একটা মেয়ে ছিল। ওর খিস্তি শুনেই ওর প্রেমে পড়ে গেছিলাম আমি। কিন্তু চিরকালই ক্যালানে টাইপের ছিলাম। তাই কিছু বলে উঠতে পারি নি।
-বেশ রোম্যান্টিক কিন্তু। খিস্তি শুনে প্রেম। কত আনকমন তাই না?
-এটা এমন কিছু না। আমার এক বন্ধুকে রাস্তায় হিসি করতে দেখে একটা মেয়ে ওর প্রেমে পড়ে গেছিল।
-হোয়াট? ইম্পসিবল!
- মানে মেয়েটা তাই বলেছিল আর কী! সত্যি মিথ্যা যাচাই করে দেখি নি।
-আপনি কিন্তু বেশ বিচ্ছু আছেন। দেখে মনে হয় না। কী সুন্দর গভীর গৌতম বুদ্ধের মত সমাধিস্ত অবস্থায় এখানে এলেন। আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম গুড বয় টাইপ। বায়ু নিষ্কাশন করে এক্সকিউজ মি বলা পাবলিক।
-উফ যাতা!!! আর কী কী ভেবেছিলেন?
-তেমন কিছু না, তবে বাবার মুখে খুব প্রশংসা শুনেছি আপনার ব্যাপারে। লাখে একটা ছেলে, পড়াশুনায় দারুণ, মোটা মাইনের চাকরি, মানে আদর্শ জামাই বলতে যা বোঝায় আর কী! আর খুব থ্রেটও খেয়েছি।
-কেমন থ্রেট?
-এই যে ভদ্র মামণি হয়ে থাকতে হবে, বেশি ট্যান্ডাই ম্যান্ডাই করা যাবে না, বাংলা সিরিয়ালের চির লাঞ্চিত বধূদের মত ছল ছল চোখ করে থাকতে হবে যাতে আমাকে দেখলেই আপনি আরব মহাসাগরে পড়ে যান... এই আর কী!
-তা আপনার মধ্যে তো তার কোন লক্ষণ দেখতে পারছি না। হ্যাঁ মানে শুরুতে ঠিকঠাকই পারছিলেন, কিন্তু আমার সাথে কথা বলতে গিয়ে...
-পারছি না বস। পাতি পারছি না। বেশিক্ষণ ন্যাকামিটা পারি না। তাছাড়া এই অভিনয় টভিনয় আমার পোষায় না। একটা ছেলেকে ইমপ্রেস করতে গিয়ে একটা মেয়ে যতরকমভাবে পারবে নিজেকে চেঞ্জ করে যাবে আর ছেলেটা সেটা ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে দেখবে, জাস্ট নেওয়া যায় না।
-আচ্ছা আপনি ছেলে দেখতে যেতে পারেন তো? সব সময়ে মেয়েরাই সেজে বসে থাকবে কেন?
-এটা চরম আইডিয়া। এরপর এটাই বলব বাড়িতে। আমি আর সাজগোজ করে মন্দিরা বেদী হয়ে বসে থাকতে পারলাম না। বরং ছেলে পার্টিকে বল আমি দেখতে যাব। আচ্ছা তুমি স্মোক কর?
-না।
-এই সরি সরি। তুমি বলে ফেললাম।
-তুমিটা চলতে পারে। চাপ নেই। তুইটাও চাপ নেই।
-নাহ। তুমিতেই আমি ঠিক আছি। আচ্ছা যেটা বলছিলাম, স্মোক কর না ভাল, ড্রিঙ্ক কর?
-হ্যাঁ তা করি।
-ভাল।
-তোমার কোন নেশা আছে?
-আমার? তেমন কিছু নেই। তবে বন্ধুদের বার্থ ডে পার্টিগুলোতে এক দেড় পেগ খাওয়া হয়ে যায়।
-তা মন্দ না। একবারে নিরামিষটাও কেমন যেন।
-হ্যাঁ। আচ্ছা তুমি আমাকে খারাপ মেয়ে ভাবছ না তো?
-খারাপ ভাল আবার কী! ইচ্ছে হলে খাবে! তাছাড়া মেয়ে হলে মদ খাওয়া যায় না যারা ভাবে তারা আমার মতে অলকনাথের পরের এডিশন। আর হ্যাঁ। তুমি তো ইমেজ বিল্ডিংয়ের জন্য ঢপও মারতে পারতে। সেটাও তো মারো নি।
-ওহ। বাঁচালে।
-আচ্ছা ওটা কী? ওই ছবিটা? তুমি নাচতে?
-খুব ভাল। নাচ আমার জীবন ছিল। কিন্তু টেনের পর কিছুতেই নাচতে দিল না বাবা মা।
-কেন?
-সে অনেক কথা। ধিঙ্গি মেয়ে নাচবে কেন, ইত্যাদি অনেক গভীর ব্যাপার। আচ্ছা তোমরা ক্লাস টু থেকে একটা মেয়েকে নাচ শেখালে। তারপর টেনে ওঠার পর বললে সব বিসর্জন দে, এটা ভাল না। আচ্ছা খারাপই যদি হবে তাহলে টুতে যখন পড়তাম তখন কেন নাচে ভর্তি করতে গেলে?
-এক্স্যাক্টলি। তবে দেখো, ফিউচারে যদি ভাল বর পাও তাহলে সে হয়ত নাচে উৎসাহিত করতেই পারে।
-তার চান্স নেই। বাড়ির বউ ধেই ধেই করে নাচবে সেটা অনেকেই মেনে নিতে পারে না।
-কে কী বলল তাতে কান দিতে যাবে কেন? তুমি নিজের মত করে চলবে।
-এগুলো বলা যত সহজ, মেয়ে জন্ম নিলে বুঝতে বাস্তবে ততটাই কঠিন। আমার নিজের বাড়ির বাবা মা-ই বাধা দিচ্ছে, সেখানে ওনারা তো একটা সম্পূর্ণ অন্য পরিবারের লোক। তারা কেন খামোখা মেনে নিতে যাবেন?
-হু।
-তুমি হলে কী করতে? দিতে বউকে নাচতে?
-অবশ্যই। যত রকম সাপোর্ট দিতে হয় দিতাম।
-ওহ। ভাল!
-আচ্ছা অনেকক্ষণ হল, এবার আমি বেরোই। ওদের কথাও হয়ে গেছে আশা করি।
-আচ্ছা।
-আসছি...
-হ্যাঁ... আচ্ছা, তাড়া আছে কোন?
-না... মানে সেরকম কিছু নেই।
-তাহলে আর একটু কথা বললে হত না? মানে তোমার অসুবিধা হলে থাক।
-আমার? না না আমার কোন অসুবিধা নেই। তুমি কি কিছু বলবে?
-না সেরকম কিছু না।
-হ্যাঁ বা না?
-আসলে একটু আফসোস হচ্ছে এখন।
-কেন বলত?
-মনে হচ্ছে বাবা মার কথা শুনে চললেই ভাল হত।
-মানে?
-একটু বেশিই বকে ফেলেছি আসলে।
-আমার কিন্তু সেটাই বেশি ভাল লাগল। অভিনয়ের থেকে যেটা তুমি আসলে, সেটাকেই তুমি আমাকে দেখিয়েছ। আমার তো তোমাকে ভাল লেগেছে বেশ... শুধু ভয়ে আছি...
-কী?
-তুমি যদি রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দাও... এই আর কী!
-তোমার কি একটু শর্ট আছে?
-মানে?
-তুমি চলে যাচ্ছ , তারপরেও একটা মেয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে তোমাকে বসতে বলল, সেটা কি রিজেক্ট লিস্টে রাখবে বলে? আচ্ছা তুমি পণ নেবে?
-নেব।
-অ্যাঁ?
-সেটা অবশ্য শর্ত হিসেবে থাকবে।
-কী?
-বিয়ের পরে তোমাকে আবার নাচটা শুরু করতে হবে।
-ধ্যাত।

অভীক দত্ত


পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আদরের নৌকার সম্পাদক। গান, গল্প আর আড্ডা ছাড়া থাকতে পারি না। আর আদরের নৌকা ছাড়া বাঁচব না, এটা তো এতদিনে আপনারাও জেনে গেছেন...

আপনার মতামত জানান