‘বৈষ্ণব ফ্লার্টের পদাবলী’

দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়


অভীক:এটা তোর কততম বই? এর আগের বইয়ের নাম কি?

উত্তর: বৈষ্ণব ফ্লার্টের পদাবলী আমার প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ। সাড়ে তিন ফরমার। এর আগে যখন কলেজে পড়তাম দু’ফরমার একটি চ্যাপবুক ‘ভোর রাতের এইট- বি’ বেড়িয়েছিল ২০১২ সালে। তারপর শূন্য দশকের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা সংকলন, শূন্যের পাঁচ (কৃতি- কারিগর, ২০১৪) এবং রঙ ভাঙার শব্দ (ধানসিঁড়ি, ২০১৫), এই দুটি গ্রন্থের আমি অন্যতম কবি।

অভীক: বৈষ্ণব ফ্লার্টের পদাবলী বইয়ে কটি কবিতা আছে? কতদিনের প্রস্তুতি

উত্তর: ২০১০ থেকে ২০১৫, এই সুদীর্ঘ পাঁচ বছরের টানাপোড়েন উত্থানপতনের জোয়ার ভাঁটা থেকে সংগ্রহ করে মোট ৩২টি কবিতা নিয়ে এই সংকলন। এই পাঁচ বছর আমার কলেজ- ইয়ুনিভার্সিটিতে ইংরিজি সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে কাটানোর সময়, প্রথমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, তারপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক শহর থেকে অন্য শহরে মাইগ্রেশান, এক প্রেম থেকে অন্য প্রেমে উত্তরণ, আপেক্ষিক দুনিয়ার মুহূর্তসম্বল অবয়বে চিরস্থায়ী স্বান্তনার খোঁজ আমাকে এই কাব্যগ্রন্থটি প্রস্তুত করতে বাধ্য করেছে। প্রথম অংশটি, অর্থাৎ ‘রাধিকা রিডিফাইনড’ আমার বৈষ্ণব পদাবলীর সঙ্গে আকাডেমিক এবং হৃদয়গত ডিসকোর্সের ফসল, দ্বিতীয় অংশ, ‘নিউ দিল্লিতে প্রথম চুমু’ পাকাপাকিভাবে শহর পাল্টানোর পর নিজের ডায়াসপোরিক আইডেন্টিটির খোঁজ। এদের যুক্ত করেছে আমার স্বভাবগত প্রেমে পড়ার নেশা।

অভীক: আমাদের বই শুধু মেলা উপলক্ষে বের হয় কেন? এটা কি ঠিক?

উত্তর: বই তো সারা বছর ধরে বেরোয়, মেলা সেগুলোর উদযাপন শুধু। বইমেলা একইসঙ্গে একটা প্রতিষ্ঠান এবং অনুষ্ঠান, এর সঙ্গে কবিতা লেখার বা বার করার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এত লেখক, এক প্রকাশককে একই অঙ্গনে পাওয়ার উৎসব বইকে আরেকটু পাবলিসিটি দেয়, সাধারণ পাঠকের কাছে আনতে সাহায্য করে। কারণ প্রকাশনা দিনের শুরুতে ও শেষে একটা বাণিজ্য, ক্রেতা চাই তার। এর মধ্যে ঠিক ভুল খোঁজা বাতুলতা বলে মনে হয়।

অভীক: বইটার শিরোনাম নিয়ে কিছু বল
উত্তর: শিরোনামটি এই বইয়ের শীর্ষক কবিতা ‘বৈষ্ণব ফ্লার্টের পদাবলী’ থেকে গৃহীত। সিরিজটা যারা পড়বেন, তারা বুঝবেন এটা আসলে বৈষ্ণব পদাবলীকে নতুন করে নির্মাণের একটা প্রচেষ্টা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাহিত্য পড়তে এসে আমি প্রথমেই জয়দেব- বিদ্যাপতি- চণ্ডীদাস- গোবিন্দদাসের চক্করে পড়ে যার প্রেমে আপ্লুত হই, তিনি রাধা। পদাবলীর রাধারানী। এই মিথটি কিভাবে আমার দৈনন্দিন জীবনে ঘনিষ্ঠে আসা নারীদের মধ্যে কিভাবে নিজেকে নির্মাণ ও বিনির্মাণ করে, কিভাবে বৈষ্ণব ঘরানায় একটি প্রেমের জন্ম ও মৃত্যু আবহন থেকে উপসংহার পর্যন্ত যায়, সিরিজটি তারই খোঁজ। পদাবলীর ত্রিপদী ছন্দ একটু আপডেট করে ব্যাবহার করেছি। ৭- ৭- ৭- ৫। এ ছাড়াও রাধা আমার কবিতার একটি কেন্দ্রীয় থিম। ‘অঙ্গে চন্দন গন্ধ’ কিম্বা ‘কেমন ছিল ভোরের আলোয়’- এর মতো অনেক কবিতায় সিরিজটির আফটারলাইফ রয়েছে। ‘রাধিকা রিডিফাইনড’ শীর্ষক দীর্ঘ কবিতাটি আমাদের নারীবাদ সম্পর্কে সচেতন এই সমাজে আধুনিকা রাধার কি মোনোলগ হতে পারে, তারই অন্বেষণ। পাণ্ডুলিপি তৈরি করার সময় তাই বৈষ্ণব ফ্লার্ট ছাড়া আর কিছু মাথায় আসে নি। চিরন্তন বৈষ্ণবভাবধারার সঙ্গে এখনকার নির্ভেজাল ও নিষ্পাপ ফ্লার্টবাজির কি সিন্থেসিস হতে পারে, সেটাই দেখাতে চেষ্টা করেছি।

অভীক: এই কবিতাগুলো কি অটোমেটিক পোয়েট্রি না তুই সচেতনভাবে কোনো থিম নিয়ে কাজ করেছিস?
উত্তর: দুটোই। আমার কবিতা একইসঙ্গে ওয়ার্ডসওয়ারথের ভাষায় জোরালো আবেগের মুহূর্তের বহিঃপ্রকাশ আবার এলিয়টের মতো আবেগের থেকে পলায়ন। বৈষ্ণব পদাবলী পড়ার সময় থিমটি আমার মাথার মধ্যে গ্রন্থিত হয়, পরে কাব্যিক পরিসরে দীর্ঘ রমণের পর বীর্যপাতের মতো বেড়িয়ে এসেছে। তারপর অনেক সময় কেটেছে লেখাগুলো এডিট করতে, ছন্দ আরো যথাযত করতে। আমার অবচেতনের ধারাপাতকে নিয়ে সচেতনভাবে কাজ করেছি। এই বই তারই ফলস্বরূপ।

অভীক: কবিতার কি কোনো দায় আছে? থাকলে সেই দায়বোধ কি? কার প্রতি
উত্তর: অবশ্যই আছে। কবিতার কবির প্রতি, যে সমাজের বিরুদ্ধে সে নীরব অথবা সুস্পষ্ট বিদ্রোহ ঘোষণা করছে তার প্রতি, যে ক্ষমতা তাকে অবদমন করতে চাইছে তার প্রতি দায় আছে। সৎ, নির্ভীক, নির্ভেজাল হবার দায়। নিজেকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে নতুনভাবে নির্মাণ করার দায়। আমার বইয়েরও সেই দায় আছে। যে সমাজ মুক্ত প্রেম, শরীর, সমকামিতা, নাস্তিকতা, জাতিবাদ, এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত ধ্যাস্টামি করে চলেছে, তার মুখে ছুঁড়ে মারা এক খাবলা কাব্যিক জেহাদ এই বই, এর প্রতিটি কবিতা তার সামনে যেন খোলা রাস্তায় একে- অপরকে চুমু খেয়ে তার অবদমন- স্পৃহার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে

অভীক: তোর এই কবিতার বই পাঠককে কি বলতে চায়?

উত্তর: প্রতিটি কবিতাই আসলে কবির অল্টার- ইগোর প্রকাশ। আমার এই বই তাই পাঠকের সামনে আমার জীবনের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভটাকেই একটা রূপকের মোড়কে তুলে ধরতে চায়। আমার অস্থায়ী আবেগের গতিপ্রকৃতি, সীমাহীন মাতলামি, নেশাগ্রস্ত দিনযাপন, টুকরো টুকরো সাফল্য ও ব্যর্থতা, অলিক বিপ্লবের স্বপ্ন, সুচারু মায়া এবং জাগতিক নির্লিপ্তি, এসবই পাঠককে বলতে চায় এই বইটি।

অভীক: কবিতার বই চলে না জাতীয় একটা কথা প্রচলিত আছে। এটা কি ষড়যন্ত্র?না চললে এত বই বের হবে কেন?

উত্তর: আমার প্রথম চ্যাপবুক ভোররাতের এইট- বি প্রকাশের ছ’মাসের মধ্যে আউট অফ প্রিন্ট। রঙ ভাঙার শব্দও অনেকে কিনেছেন। কিন্তু তাতে কিস্যু যায় আসে না, একটা বইয়ের বিক্রি কখনই তার গুরুত্বের নির্ধারক নয়। তাহলে চেতন ভাগত কিম্বা রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে বরেণ্য বলতে হয়। তাহলে জেরাল্ড ম্যানলি হপকিন্স, চার্লস বুকোস্কি (যিনি কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন ৪০ বছরের পর), র্যাঁ বো, জীবননানন্দ দাশ এরা কিছুই না। প্রতিটি কবিতাই আসলে জন্মমাত্র অনন্তের গহ্বরে একটা বীজ রোপণ করে, কখন তার থেকে গাছ বেরোবে, ফুল ফুটবে, কেউ জানে না! তবে বাজার এবং ক্ষমতা চিরকালই তাদের আওতার বাইরে যারা তাদের চেপে রাখার চেষ্টা করেছে, যথাসময়ে সঠিক মূল্যায়ন করেনি। এটা তো ষড়যন্ত্রই! তবু বাজারের মুখে থুতু ছিটিয়ে ক্ষমতার পশ্চাতে লাথ মেরে বহু চমৎকার কবিতা মহাকালের নিঃসীম সড়কে মাইলস্টোন হয়ে উঠেছে! হয়ত সেই অনুপ্রেরণাতেই এখনও বই বেরোয়। আরো বই বেরোয় যারা সহজে খ্যাতি চায়, তাদের! টাকা খরচ করে এলাহি রিলিজ কিম্বা পিআর স্কিলস ব্যবহার করে অনেকেই রাতারাতি কবি হতে চায় এবং হয়। তারাও এই ভিড়ে আছে। আমি অভদ্র, অসভ্য, এবং অশালীন। অনেকেরই আমাকে পোষায় না, পোষাবে না, চাইও না পোষাক। গবেষণা করে তেমন আয়ও হয় না। তাই এসব আমি পারি না।

অভীক: তোর এই বইয়ের কতটুকু প্রচারণা ও বিক্রি আশা করিস?
উত্তর: শুনলাম তো বিক্রি ভালোই হচ্ছে। আমি দিল্লির বাসিন্দা, এখানে গবেষক হিসেবে কর্মরত, কলকাতা যেতে পারি নি। তবে ফেসবুক এবং ওয়াটস অ্যাপে প্রচারের দৌলতে অনেকেই বইটি কিনছেন। কবি নেই, কবিতা আছে, পাঠক আছেন, ক্রেতা আছে। আমি কিছুই আসা করি না, যদি কিছু আশা করি তা হল আজীবন কবিতা নির্মাণ করার মতো সৃষ্টিশক্তি ও সৃজনশীলতা। এই একটার ওপরই আমার হাত আছে, বাকিটা অদৃষ্টের আয়ত্তে।

অভীক: তোর পাঠকের জন্য কিছু বলবি?
উত্তর: সমালোচনা করুন, খিস্তি করুন, পিঠ চাপড়ান। আমি কোনোদিন আপনাদের কথা মাথায় রেখে লিখি নি, তবু আপনারা এসব লেখা আপন করে নিয়ে বইটি পড়ছেন, কিনছেন। আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কবিতাগুলো আমার হলেও বইটি আপনাদের। আপনারা পড়বেন বলেই প্রকাশক বের করেছে।

অভীক: বাংলা সাহিত্যে কবিতা তো দাদা না ধরে লেখা যায় না। বিশেষ করে প্রচার বল, পুরস্কার বল ইত্যাদি। তুই কি এক্ষেত্রে কাউকে ফলো করেছিস কোনদিন?

উত্তর: আমি এখনও অবধি কোনো পুরস্কার পাই নি। তা ছাড়া আমি দাদা-দিদিদের থেকে ১৫০০ মাইল মতো দূরে একটি শহরে থাকি। লিখি, লেখা ছাপা হয়। কোনোদিন পুরস্কার পেলে অথবা না পেলে পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়াটা সম্পর্কে আইডিয়া বাড়বে। ততক্ষণ পর্যন্ত না জেনে মন্তব্য করে লি লাভ? তবে অনেকেই যে নিজের লেখাকে কোনো না কোনো ক্ষমতার পাশে দাঁড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করে, তা স্পষ্ট। চিরকাল তা হয়ে এসেছে, যতদিন ক্ষমতা থাকবে ততদিন তাই ঘটবে।

অভীক: সমকাল এবং তার রাজনীতি, এই দুটো ব্যাপার নিয়ে কাজ করেছিস? বই লিখতে চাস না এই ব্যাপারে?

উত্তর: আমার এমফিলের কাজ চলছে বাংলা দলিত সাহিত্য নিয়ে। ২০১৭-এ শেষ হবে। এই বিষয়ের গভীরে ঢুকতে গিয়ে দেখেছি কিভাবে বিগত ৩০/৪০ বছরে বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় একজন দলিত লেখককে জায়গা দেওয়া হয় নি। এর পেছনের রাজনীতিটাও বুঝতে পারছি। আমার গবেষণা গ্রন্থাকারে কোনোদিন বেরোলে সমকাল, তার রাজনীতি, এবং সাহিত্যে তার প্রতিফলন নিয়ে অবশ্যই অনেক কথা পাঠককে জানাতে পারবো। এ ছাড়া বহু সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা, যেমন হোক কলরব, হোক চুম্বন, মৌলবাদীদের হাতে বিভিন্ন যুক্তিবাদীদের হত্যা, রোহিত ভেমুলা, এসব নিয়ে আমি কবিতা লিখেছি, রাস্তাতেও নেমেছি।


ধন্যবাদ দেবায়ুধকে। ওর বইয়ের জন্য ওকে আদরের নৌকার পক্ষ থেকে অনেক শুভেচ্ছা জানাই