জুন মাসের কবি

আষিক
বরফবন্দির ডায়েরি

প্রথম পাতা

স্থির হয়ে থাকতে থাকতে পারদের চোখে
ঘুম নেমে আসে। পূর্বাভাস বলে
আরও শীত
আরও আরও শীত

স্থির হয়ে আছ। একদিন তাই
তোমাকে পেরিয়ে যাবে তোমার অতীত




মাঝের কোনও একটি পাতা

ঘুমের প্রস্তাব নিয়ে অনিদ্রা ফিরে আসে রোজ
স্বপ্নের গভীরে থাকা গ্রামটিকে প্রায়ই দেখে সে
সমস্ত কাচের বাড়ি। বাতি জ্বালা নিষেধ হয়েছে বহুদিন
নরম বালিশ ছিঁড়ে
আলোহীন শয্যাদৃশ্য অভিনীত হয়
তুলো ওড়ে। অসংখ্য স্বর্গের নিচে পড়ে থাকা বন্দিটির ঘরে
বরফের বিভ্রমে শীত নেমে আসে...




না-মানুষের কথা

বিস্রস্ত দিনের তোড়ে
ভেসে যায় আরো একটি দিন

আমাদের ভুলগুলি লরির বনেটে আঁকা চোখ
নির্নিমেষ বসে থাকে সকল দৃশ্যের কাছে
অন্ধত্ব সমর্পণ করে






সম্পর্ক

মাঝ-স্টেশনে থেমে গেছে ট্রেন।
কাটা পড়া মানুষটি দু'ভাগ হয়ে পড়ে আছে
আমরা, যারা এখনও 'বডি' হয়ে যাইনি
জানলা দিয়ে দেখছি।
ভাবছি...
তেরপল, বাঁশ, দড়ি সব জোড়ায় জোড়ায় থাকলে
সহজ হতে পারে ভেবে
দুটি ভাগ ওরা আলাদা আলাদা করে
বয়ে নিয়ে যেত কি?




গৃহী

বন্ধুরা দূরে যাবে
বন্ধুরা দূরে চলে যায়
সন্ধে নামে সাবেকি পাড়ায়
দুহাতে পকেট পুরে হেঁটে যাচ্ছে কেউ
তার বহুদিন জ্বর

ঘরের ভিতরে
আস্তে আস্তে জন্ম নিচ্ছে বন্ধুদের ঘর











'ঘুম নামের পাহাড়' কাব্যগ্রন্থ থেকে কবির সবথেকে কাছের পাঁচটি কবিতা... বইতে নেই, তবে কবিতাগুলি লিখবার স্থান, কাল আদরের নৌকার পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হল।






মাতাল পঞ্চবিংশতি

পাহাড়ি ধুন বাজছে
আজকের দু'পেগ মিলিটারি বেসক্যাম্পের সৌজন্যে।
তোমার নেশা হয় না ।
যেটা হয় সেটা আলগা আমেজ, সামান্য পা টলে

কিন্তু যেসব কথা তুমি স্বপ্নেও কাউকে বলতে পারোনি
সেগুলো চড়াই উতরাই ভেঙ্গে ধুনের বোল হয়ে যাচ্ছে
তুমি ফোন করতে চাও
তার নাম্বার ডিলিট করেছ।
বহুদিন হল

সিগন্যাল নেই, নাম্বার মনে নেই
শুধু এটুকু মাথায় থাকে
নেশা নয়-
সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থাতেই
তোমার মাঝেমধ্যে যোগাযোগ করতে ইচ্ছে হয় ...

[পেডং, জুন ২০১০]






একটি ঝুঁকিপ্রবণ কবিতা

মোটরবাইকে করে শহরে
বিক্ষিপ্ত ঘুরে বেড়ানোর দিনে
আমার পছন্দের হ্যালুসিনেসন -
রাস্তার ওপর শুয়ে থাকা বিরাট ময়াল সাপ ।
প্রতিদিন একাধিক ময়াল সাপের ওপর দিয়ে
বেধড়ক চালিয়ে দিই চাকা।
বাইকের আয়নায় আড়চোখে দেখে নিই
অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কাটাদাগ।

রাত্তিরে ঘরে ফিরে এলে নিজেকে
মনে হয় সেইসব না - হওয়া - অ্যাক্সিডেন্টের ঐশ্বরিক কারিগর,
যার একটা গোটা জীবন পড়ে আছে একটা সত্যিকারের দুর্ঘটনার জন্য।

[কল্যানী, এপ্রিল ২০০৯]


লং উইকেণ্ড

দীর্ঘায়ত সপ্তাহশেষ-
অসংখ্য ঝাঁঝালো শব্দ ধাক্কা মারছে মগজের কোষে ।
শেষ বাস। অপেক্ষা। অচেনা শহরজোড়া রাতে -
শুধু আমি একা আর পৃথিবীর সব ছবি আশ্চর্য তফাতে
আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে এই দেখ - এরকমও ছবি হতে পারে
যে খুব স্টিলেটো-হাঁটা মুগ্ধতা দিয়েছিল বার-এ
বার থেকে বেরোতেই সেও তার জুতোজোড়া খুলে নেয় হাতে
শুধু আমি একা আর পৃথিবীর সব ছবি আশ্চর্য তফাতে
আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে কতটা আকাশ হয়ে উড়ি -
আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে
ভেসে থাকা কতটা জরুরী।

[পিটসবার্গ, সেপ্টেম্বর ২০১১]



ভয়

এই খসখস শব্দ এক সাংকেতিক ভাষা
তুমি আবছা পড়তে পারো।
আর টেবিলের এ প্রান্তে রাখা ল্যাম্প - যে এখন
দেওয়াল জুড়ে কলমের এক অদ্ভুত সিলুয়েট তৈরী করেছে -
সে পক্ষপাতদুষ্ট দোভাষী,
তোমায় ইঙ্গিত করছে -
তোমার পছন্দের অ্যান্টিডিপ্রেসান্টট ির নাম
ডাক্তারবাবু আজ লেখেননি ।

এই নাটকের শেষ চরিত্র এক অদৃশ্য কয়েন -
ওষুধ বদলানোর সময়গুলোয় একইভাবে প্রতিবার ছুঁড়ে দিয়েছ যাকে
ডাক্তারবাবু জানেন না
কেবলমাত্র টেল পড়লেই তিনি বলতে পারবেন

"এই তো, আপনি ভালো হয়ে গেছেন!"

[কালীঘাট, এপ্রিল ২০১১]


ঘুম নামের পাহাড় (শেষ কবিতা)
পাহাড়ি রাস্তা ধরে নেমে আসা জীপ জানে সব
চড়াই উৎরাইটুকু কোনও দিন রাখা যায় না নিজস্ব দখলে -
একদিন ঠিক শেষ হয়ে যায় পুরনো পরব।
অদ্ভুত নিয়ম মেনে ভিড় করে নতুন মিছিল
জার্নির সঙ্গে 'যার নেই' শব্দবন্ধের ধ্বনিগত মিল
তোমাকে ভাবিয়ে তোলে -
পুষে রাখা প্রতিধ্বনি, ইনায়াত, পর্বত সপ্তাহ
শীত হয়ে শুয়ে থাকে অনাবিল বরফের পাশে

আমরা সাধারণ - তা ক্রমশ প্রকট হয়ে আসে...

[পিটসবার্গ, ফেব্রুয়ারি ২০১২]





কবি পরিচিতিঃ
কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে কার্নেগি-মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। গবেষণার বিষয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (স্বাভাবিক মেধার অভাব থাকলে যা হয় আর কী!)। বহুজাতিক সংস্থা মাইক্রোসফট কর্পোরেশনের হেডকোয়ার্টার রেডমণ্ডে কর্মনিযুক্ত ছিলেন (না, ইনি ভিস্তা ডেভেলাপ করেননি, অতএব এনাকে গাল দেবেন না)। একটি উপন্যাসের প্রস্তুতিবাবদ মাঝে কিছু দিন স্বেচ্ছা-অবসরে ছিলেন । নানারকম পাগলামির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল একটি কল্যাণী-টু-বেনারস মোটরবাইকে রোডট্রিপ - যেটা নাকি মেথড-রাইটিং-এর অন্তর্ভুক্ত! প্রথম কবিতার বইয়ের ভালোনাম 'ঘুম নামের পাহাড়' (ডাকনাম-'ধুমধামের আহার')। দ্বিতীয় বই 'বরফবন্দির ডায়েরি'-র কাজ প্রায় শেষের দিকে। সুরকার হিসেবে পছন্দের শৈলী ফিউশন - হিন্দুস্থানি মার্গসঙ্গীতের উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু নবীন শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন। নতুনতম শখ- সাংবাদিকতা। অন্যান্য শখের মধ্যে রয়েছে - হাইকিং, ফোটোগ্রাফি, দাবা আর গীটার। যাদবপুরে পড়েননি কোনওদিন, তবে পড়িয়েছেন।