হোকহ্যাশট্যাগ

সায়ন্তন মাইতি

 



দেখতে দেখতে যাদবপুরের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের এক বছর। সাড়া জাগানো অগ্নিগর্ভ আন্দোলন এক বছরে অতীত হয় নি, হবেও না। অদম্য যুবশক্তির দাঁত কামড়ে লড়াই করার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে ভবিষ্যতেও এই আন্দোলন একটা মাইলস্টোন হয়ে থাকবে। একবার পিছন ফিরে যদি খুঁজতে চেষ্টা করি এই আন্দোলনের সবথেকে স্থায়ী অবদানটা কী, তাহলে সবার আগেই যেটা মাথায় আসবে সেটা হল যে কোনো স্লোগানের আগে হোকযোগ।
খুব ভুল বললাম? হ্যাশট্যাগোৎপাত তো আগেই ছিল। এবার নব সংযোজন ‘হোক’। মূলত ট্যুইটার ফেসবুক থেকে আগত কাটাকুটির ছকটা এবার বোধহয় ব্যাকডেটেড হতে শুরু করেছে। এতদিনে হ্যাশের পর নো-স্পেস আর আণ্ডারস্কোর দিয়ে সেতুবন্ধন অনেক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। থেরাপিস্ট আর ‘দ্য রেপিস্ট’কে এক আসনে বসিয়েছে। তাও এবার বিপ্লবের বিবর্ধন চাই। গরমাগরম সিক্যুয়েলের মত (ভুল বললাম, প্রিক্যুয়েল) যাদবপুর থেকে আগত হোকধ্বনিটাকে হ্যাশের আগে হোক-জোড়া। যদিও উৎস ভুলে গেলে ক্ষতি নেই। সায়ন চৌধুরী অর্ণবের ২০০৬-এর অ্যালবামটা’তো ছেড়েই দিলাম, ছাত্রদের অকুতোভয় লড়াই, আমরণ অনশন, পুলিশি বর্বরতা, উপাচার্যের নোংরামি, ঘটনার রাজনীতিকরণ, ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলকভাবে একজোটে প্রতিবাদ –কোনোটাই ভুলে গেলে ক্ষতি নেই।
হোক নিয়ে সিরিজ তৈরীর কাজটা অবশ্য শুরু করেছিল কলরব-বিরোধীরা। এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে নন্দন থেকে রাজভবনের পথে দৃঢ় প্রত্যয়ে যখন প্রতিবাদী মিছিল অগ্রগামী, তখন একদল ফেসবুকে প্রচার করে চলেছে ‘হোক-ক্যালানি’ আর ‘হোক-গর্জন’। তারপর থেকে শুরু হয়ে গেল হোকছোঁড়াছুঁড়ি। হোক-প্রতিবাদ, হোক-আন্দোলন, হোক-ঘেউঘেউ সমেত অসংখ্য প্রতিবাদী ও সারকাস্টিক প্রতিবাদী প্রতিধ্বনি একের পর এক আছড়ে পড়ল।
তারপরের ঘটনাক্রম সবারই মনে আছে। স্খলিত বিদ্যুতের মত নভেম্বরে নতুন টপিক পাওয়া গেল ‘হোক চুম্বন’। কিস অফ লাভ-এর মাধ্যমে গোঁড়া রক্ষণশীল মানসিকতাকে সপাটে চড় মারার উদ্যম প্রশংসনীয়, কিন্তু তাকেও কিনা যুক্ত করা হল উপাচার্য তাড়ানোর আন্দোলনের সাথে। এতে মূল লক্ষ শুধু বেঁকেই গেল না, প্রকাশ্যে এল পশ্চিমে ঢলতে থাকা প্রতিবাদকে অন্য উপায়ে মধ্য গগনে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা। সৌভাগ্যবশত ডিসেম্বরের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের ঘটনা নতুন করে নিন্দা-নিনাদ জ্বালিয়ে দিল, তারপর ভস্মে ঘি ঢালল জানুয়ারী থেকে ছাত্রছাত্রীদের অনশন। চাপে পড়ে পালাতে বাধ্য হল উপাচার্য। নেপথ্যে ‘তিলকে তাল’ করার বয়ান বদলে প্রাণপনে মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যস্থতা, ফুটো বেলুন চুপসে যাওয়ার মত তর্জন-গর্জন ছেড়ে শিক্ষামন্ত্রীর সুর নরম করে মুখ বাঁচানো। নজিরবিহীন জয়লাভের পর হোকধ্বনির রমরমা আরো বেড়ে গেছে। এস.এস.সি. নিয়োগের দুর্নীতি নিয়ে জানুয়ারীর শেষ থেকে শুরু হয়েছে ‘হোক আলোড়ন’। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে স্লোগান উঠেছে ‘হোক বিক্ষোভ’। প্রেসিডেন্সি কাণ্ড নিয়ে হয়েছে ‘হোক প্রতিবাদ’। সবেরই উৎস ফেসবুক। যে কোনো ছোটোখাটো ইস্যু নিয়েই ফেসবুকে ‘হোক’হ্যাশট্যাগ। জাপানের দীপ ‘হোককাইডো’কে এবার না লোকজন বাঙলার সম্পদ বলে ভাবতে শুরু করে। দুদিন বাদে হয়তো শুনব মেগা-সিরিয়াল ইষ্টি কুটুমের ট্যাগলাইন বসেছে ‘হোকবিবাহ’।
গত বছর ডিসেম্বর থেকে ব্যাপারটা এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল, যে যেখানে পারত, “চলো একটু হোককলরব করে আসি”। হুঙ্কারের নতুন ফ্যাশান হিসেবে একটা হুক্কাহুয়ামার্কা হিক্কা তুলতেই হবে। আসলে আজকাল সবই নতুন ফ্যাশান, সবই অভিনব। দলবদল হচ্ছে অভিনবভাবে, তাই নিয়ে মিডিয়ায় কাটাছেঁড়া চলছে অভিনবভাবে, ট্রেনে বাসে বোদ্ধাদের জ্ঞানের ঢেঁকুর গাড়ির হুইসেলকেও হার মানাচ্ছে- সেও অভিনব। তেমনি, প্রতিবাদটাও এখন অভিনব।
প্রতিবাদ আসতে আসতে নিছক সুখচর্চা আর বারোয়ারী জিনিসে অনেকদিন আগেই পরিণত হয়েছে। অবসরযাপনের মধ্যেও প্রতিবাদ হচ্ছে, কর্মব্যস্ততার মাঝে সাময়িক মুক্তির জন্যও প্রতিবাদ হচ্ছে, বেকারত্ব কাটানোর জন্যও প্রতিবাদ, নিজেকে প্রতিবাদী হিসেবে দেখানোর জন্যও প্রতিবাদ। এখন, ইতিহাস-সচেতকরা দাবী করতেই পারেন, ‘জয় হিন্দ’ ‘বন্দেমাতরম’ বারবার ব্যবহারের ফলে জাতীয়তাবাদের নিশানে পরিণত হয়েছে, তাহলে উঠতি স্লোগানের বহুল ব্যবহারে অসুবিধা কী? যত্রতত্র হোক-ব্যবহার তো বারবার যাদবপুরের আন্দোলনকেই মনে করিয়ে দেবে!
কিন্তু ব্যাপার হল, প্রয়োগের পার্থক্যে স্লোগান মহিমান্বিতও হয়, আবার খোরাকেও পর্যবসিত হয়। কারা কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে স্লোগান দিচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে। এখন এই চলতি হোকহ্যাশট্যাগ স্লোগানের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারছে কি? আর, উৎস স্মরণ কেউ কখনো করে না। এখন তো ভোটের প্রচারে ‘বন্দেমাতরম’ চলে। ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের নীতির বিরুদ্ধে মিছিল হাঁকালেও তাতে ‘বন্দেমাতরম’ চলে। এমন কী নেতা, মন্ত্রী গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলযাত্রার পথেও ‘বন্দেমাতরম’ বলতে বলতে এগোন। এতে বঙ্কিম-স্মরণ, স্বাধীনতা সংগ্রাম স্মরণ – কোনোটা আদৌ হয় কি? সেজন্যই এখন মনে হয়, ‘বহিরাগত’ হিসেবে যে আন্দোলনের শরিক হয়ে গর্ব করেছি, একের পর এক প্রবন্ধ কবিতা লিখে জেহাদ ব্যক্ত করেছি এবং সবশেষে জয়ের আনন্দ সবার সাথে ভাগ করে নিয়েছি, তার গনগনে আগুন থেকে কি সর্বসাকুল্যে একটা গিমিক নির্যাস হয়ে বেরিয়ে আসবে?
....না, আমি কখনোই বলছি না হোককলরবের সঙ্গে জোর করে একটা গোমড়া-গাম্বুস আদর্শবাদী ভাবধারা ঢোকাতেই হবে। যে শব্দবন্ধ যে পথে ধাবমান, এক্সটার্নাল ফোর্স দিয়ে তার মোড় ঘোরানো যায় না। আর কোন শব্দটা কোন বার্তা বহন করবে, সেটাও আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। বহুকাল ধরেই পাড়ায় পাড়ায় এই পার্টি-ঐ পার্টি আশ্রিত গুণ্ডাদের উপদ্রবকে ‘দাদাগিরি’ বলে অভিহিত করা হয়। তবু এই শব্দটার সাথে সৌরভ গাঙ্গুলির তুখোড় ব্যক্তিত্ব এমনভাবে মিশে আছে যে, ‘দাদাগিরি’ শুনলে সবার আগে ‘প্রিন্স অফ ক্যালকাটা’কেই মনে পড়বে। আমি এটাই দেখিয়ে দিতে চাইছি, স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা কোন কথাকে কোথায় ব্যবহার করি, সেটা অজান্তে চিনিয়ে দেয়, আমরা আসলে কোন জিনিসকে কী চোখে দেখছি। সেটা যদি মেজরিটির প্রবণতা হয়, তাহলে তাকে নিন্দা করারও কোনো অভিপ্রায় নেই। শুধু বিপ্লবীরা যেন সত্যিটা চিনতে পারেন এবং তাকে গ্রহণ করতে পারেন, এটাই আমার অনুরোধ।
এদিকে বর্ষপূর্তির দোরগোড়ায় নিউট্রাল মুখোশ পরা নীতিবাগীশদের উদ্ভব হবেই (উদ্ভব নয়, প্রত্যাবর্তন) যারা প্রতিবাদের স্টিরিওকরণকে ঠুকেই ক্ষান্ত হবেন না, সামগ্রিকভাবে এক বছর আগের আন্দোলনের মোটিভ নিয়েও কাটাছেঁড়া করবেন। প্রতিবাদ যে এখন সেনসেশনালিস্টদের হাতে ক্ষণিকের উন্মাদনা আর দেখনদারিতে পরিণত হয়েছে, সেটা তাঁদের গাঁকগাঁকানোর বিশাল একখানা অস্ত্র। স্লোগানকে প্রাচীন প্রবাদে পর্যবসিত করে এদের কিন্তু সুবিধাই করে দেওয়া হচ্ছে। এমন অনেকেই আছেন যারা হোককলরবের সময় সরব প্রতিবাদ জানান নি। তাদের আমি দোষারোপ করছি না। আবেগ প্রকাশ না পেলেই তার অস্তিত্বের মূল্যায়নে বাধা দেওয়া যায় না। কিন্তু যে কপটদের কথা এই অনুচ্ছেদের শুরুতে বললাম, তাঁরা প্রতিবাদের বিষয় নিয়ে মুখে কুলুপ আঁটেন অথচ প্রতিবাদীদের নৈতিকতা নিয়ে নিন্দায় মুখর। মুখে বলেন, ‘প্রতিবাদ’ বস্তুটির উপর এদের তিক্ততা আছে, অথচ প্রকারান্তরে পাল্টা প্রতিবাদ করতে ছাড়েন না। এদের ব্যক্তিত্ব যে চুপে চুপে শাসক স্তাবকতায় নিবেদিত সেকথা বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। এইসব কৃমিকীটদের চেঁচানোর জন্য একটা সুন্দর প্ল্যাটফর্ম তৈরী হয়ে গেল না কি?
শেষ করার আগে একটা ঘটনা বলব। তখন আমরা মাধ্যমিক পেরিয়ে সবে হাতে পাওয়া মোবাইলে নিষিদ্ধ জিনিস রাখতে শুরু করেছি। সময়টা ২০০৭। স্মার্টফোন ঢোকে নি। ফলে ভিডিও ক্লিপসের চেয়েও বেশি প্রসারিত ছিল টেক্সট মেসেজ। তার মধ্যে জনপ্রিয় একটা মেসেজ ছিলঃ মাধ্যমিকের সম্ভাব্য বাংলা রচনা- ‘স্বপ্নদোষ আশীর্বাদ, না অভিশাপ?’, ‘হস্তমৈথুনের সুফল ও কুফল’, ‘পরিবেশ পরিষেবায় কণ্ডোম’, ‘লিঙ্গশিথিলতার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ’, ‘একটি নিশিযাপনের অভিজ্ঞতা’, ‘কামসূত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা’, ‘তোমার প্রিয় পর্নস্টার’ ইত্যাদি। মাধ্যমিকের বাংলা প্রশ্নের গতানুগতিকতাকে চরমভাবে ব্যঙ্গ করে এরকম লিস্টের অবতারণা। যৌনতা সম্পর্কিত না হয়ে অন্য কিছু দিয়ে বানানো হলেও পাঠক্রমের মুদ্রণফলক ছাঁচে বাঁধা গতরকে ঠাট্টার চোখে রেখেই বানানো হত। অনেকদিন ধরে অপরিবর্তিত থাকায় আজ মুখস্থসার মাধ্যমিকের (উচ্চ মাধ্যমিকও) জাঁতাকলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও অন্তসারশূন্য হয়ে চুটকির মালমশলায় পরিণত। হোককলরবও কি সেই পথেই তাহলে এগোবে?
তাতে আপত্তি নেই। শুধু, ঐ যে বললাম, সহ-প্রতিবাদীরা যেন প্রতিবাদের গতিপথটা ঠিক ঠিক চিনতে পারেন, এবং তাকে গ্রহণ করতেও পারেন।

আপনার মতামত জানান