নীল রঙ ছিল ভীষণ ...

সুমন সরকার

 

পেঁয়াজ কাটার সময় চোখে জল আসে , কিন্তু পেঁয়াজ কিনতেও যে এখন চোখে জল , পকেট দুর্বল । বেলার দিকে বাজারে গেলে আনাজপাতি একটু সস্তায় মেলে , কিন্তু আজ আশু বাবুর এই স্কিম ফেল । বিষণ্ণ চিত্তে বাড়ি ফেরার সময় কানে এলো সাহা বাড়ির মধু পাগলার রেওয়াজ । বেশ কয়েক বছর ধরে মধুর বেসুরো রেওয়াজ কানে আসে , কিন্তু আজ থমকে দাঁড়ালেন । মধু সুরে রেওয়াজ করছে ! কিন্তু , এ কেমন বন্দিশ - \' কচু বনে করে গেলো কালো কুকুরে \' । বাজারের থলিটি বাড়িতে রেখে হাজির হলেন মধুর কাছে । \' কি ব্যাপার মধু আজ সুরে ...? এ আবার কেমন বন্দিশ ? \' - জিজ্ঞাসা করতে মধু জানালো - \' আর বলবেন না । কুকুরের উতপাতে প্রাণ ওষ্ঠাগত । জানেন তো , আমাদের বাড়িটা হাউদাখানা , যে পারছে ঢুকে যাচ্ছে । পাড়ার কুকুর গুলো মাঝে মাঝেই এখানে মলত্যাগ করে যায় । ভ্যাটের ময়লা মুখে করে এনে এখানে ফেলে রেখে যায় । কখনো অন্য পাড়ার বহিরাগত কিছু নেড়ি অতিথি হয়ে আসে । কত তাড়াবো , কত আর গরম জল ঢালবো ! আগে জানতাম এরা নাকি পাহারাদার , আজকাল সব ফাঁকিবাজ । লাস্ট চারমাসে পাড়ায় দুটো চুরি হয়ে গেলো , ভাবতে পারছেন ? আর ভাল্লাগেনা , মনের দুঃখে তাই এই বন্দিশে মজেছি \' । মধুর কথা শুনে সায় দিলেন আশু বাবু । তিনিও কুকুরে অত্যাচারে বিরক্ত । তবে \'বহিরাগত\' শব্দটি পলিটিক্যাল বলে এড়িয়ে গেলেন । তার বাড়িটা খোলামেলা না হলেও , পাড়ায় হাঁটাচলা দায় । ডাস্টবিনে মাঝে মধ্যেই কুকুরের কুরুক্ষেত্র বাঁধে , ফলত রাস্তায় ছড়িয়ে যায় জঞ্জাল । আর যত্রতত্র মলত্যাগ তো আছেই , চলার রাস্তায় পেতে রাখা মাইন ! কথার মাঝে হাজির হলেন পাড়ার মোড়ল নাদু বাবু , প্রাক্তন সেনাকর্মী । ওনার হাতে একখানা বোতল , তাতে নীল জল । নাদু বাবু কি তবে লালজল ছেড়ে , নীল জল ধরলেন ! কৌতূহলের নিরসন হতে বেশী সময় লাগলো না । নাদু বাবু জানালেন , এই নীল জলের বোতল হল কুকুর তাড়াবার ব্রম্ভাস্ত্র । উনি অন্যান্য পাড়া থেকে খবর পেয়েছেন । বাড়ির সামনে দরজা বা জানলার গ্রিল থেকে নীল জলের বোতল ঝুলিয়ে রাখলে কুকুর আসবে না ... ।

বেশ কিছুটা সময় ধরে কলকাতা লাগোয়া শহরতলি , মফঃস্বল এর বিভিন্ন পাড়ার নাদুবাবুরা প্রয়োগ করছেন এই টোটকা । ভালই নাকি কাজ দিচ্ছে । শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় , কয়েকমাস আগে দক্ষিণ ভারতের কোচি থেকেও এমন পদ্ধতিতে কুকুর তাড়ানোর খবর পাওয়া গেছিলো । সেতো গণেশও এককালে ভালোই দুধ খাচ্ছিল , তারপর তো আর খেলো না ।

মহাপ্রস্থানিক পর্ব থেকে কুকুর সেলিব্রিটি , ওই যে ভগবান ধর্ম কুকুরের ছদ্মবেশ ধারণ করে পাণ্ডবদের সঙ্গে পথের ক্লান্তি ভুলে ... । প্রভুভক্ত হিসেবে কুকুরের খুবই সুনাম । বেশ কিছু সিনেমাতেও কুকুরকে দেখা গেছে মুখ্য চরিত্রে । কিছুদিন আগে কলকাতার কঙ্কাল কাণ্ডেও উপস্থিত কুকুর । এছাড়াও \' ডগ লাভারস অ্যাসোসিয়েশন \' ও তৈরি হয়েছে । বাড়িতে পোষা বিলিতি কুকুরদের যত্ন-আত্তি খুব । কিন্তু , রাস্তার কুকুরদের জীবন বড় কষ্টের । \'প্রভুভক্ত\' ও \'পাহারাদার\' এমন দুখানা ডিগ্রী থাকলেও তারা কাঠবেকার । কাজ বলতে বেপাড়ার কুকুর\'রা যাতে নিজের পাড়ায় না ঘাঁটি গাড়তে পারে তাই জন্য পাড়ার বর্ডার আগলে টহলদারি ,আর প্রয়োজন পড়লে অনুপ্রবেশ রুখতে কামড়াকামড়ি । খাওয়া দাওয়া অনিয়মিত । পাড়ার ভ্যাট হল ফেয়ার প্রাইস শপ , তাই সেখানে ভালোই লাইন পড়ে । ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ে ভারসাম্য বেশীর ভাগ সময় থাকে না ।\' সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট \' - লড়াই করে খাবার সংগ্রহ করে বেঁচে থাকতে হয় । পাড়াঘরে যজ্ঞিবাড়ি থাকলে বেশ ভালমন্দ আইটেমও জুটে যায় সেখানে । কয়েকজনের অবশ্য কিছু গেরস্ত বাড়িতে খাতা চলে । দুপুরে ও রাতে খাবারের পর যা বেঁচে থাকে ও এঁটো কাঁটা মিলিয়ে এদের লাঞ্চ ও ডিনারটা মন্দ হয়না , স্বাস্থ্যও ফিরে যায় । ক্ষুধার্তকে ভোজন করিয়ে কিঞ্চিত এক্সট্রা পুণ্যিও অর্জন করে নেন গৃহবধূ । আর ব্রেকফাস্টের জন্য মর্নিং ওয়াকারদের বারমুডার পকেটের \'পারলে-জি\' আছে । ব্রেকফাস্ট অবশ্য স্কিপও করা যায় , রাস্তার কুকুর তার আবার ব্রেকফাস্ট । শুধু কি একটু খাবার লোভে চেনা বাড়িগুলোতে যাওয়া ? ও বাড়ির পোষা বিলিতি মডেল ঝুনু সোনাটিকে দেখতেও তো ইচ্ছে করে । হয়তো পাত্তা দেবে না , কর্কশ ঘেউ ডেকে ফিরিয়ে নেবে মুখ । সবই কপাল , মহাপ্রস্থানিক পর্বে কি ছিল আর কলিযুগে কি হল ! তবে , আইবুড়ো গানের দিদিমণি দেখা হলেই মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় , ক্রিম বিস্কুট খাওয়ায় । নরম আঙ্গুল স্পর্শে কানের পাশে বাসা বাঁধা এঁটুলিও চলে যায় শীতঘুমে । এই কুকুরগুলি কিন্তু একটা জিনিস ভীষণভাবে মেনটেন করে । যে বাড়িতে খাতা চালু সেখানে খেলো , কিন্তু হাগু পেলে - \' অন্য কোথাও চল \' ।

কুকুর সবকিছু সাদা-কালো দেখে , দীর্ঘদিন ধরে এমন একটা ধারনা প্রচলিত ছিল । কিছুদিন আগে মুক্তিপ্রাপ্ত সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের \' নির্বাক\' ছবিতে যীশু সেনগুপ্তের বাড়িতে পোষা কুকুর বিঙ্গির দৃষ্টিকেও সাদা কালো দেখানো হয়েছিল । বেচারা বিঙ্গি মিস ইউনিভার্স সুস্মিতা সেনকেও সাদা-কালো মোডেই দেখেছিলো কিন্তু তা সত্ত্বেও যীশুর সাথে তার ইনটু মিন্টু দেখে জেলাস ফিল করেছিল । পরে সিনেমার একটি বিশেষ দৃশ্যে চলন্ত গাড়ির দরজা খুলে বিঙ্গিকে নেমে যেতেও দেখা যায় । যদিও বিদেশী বিজ্ঞানীরা কুকুরের দৃষ্টি সম্পর্কে কিন্তু এমন কথা বলছেন না । রাশিয়ার বিজ্ঞানীদের দাবী কুকুর শুধু সাদা কালো দেখে না , কিছু বর্ণ সে সনাক্ত করতে পারে । মানুষের চোখে তিনটি শঙ্কু ( cone ) থাকে ; চোখের ভিতর আলো প্রবেশ করলে নীল , লাল , সবুজ , হলুদ এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য গুলিকে সে সনাক্ত করতে পারে । কুকুরের দৃষ্টিতে মাত্র দুটি শঙ্কু থাকে , সে কেবলমাত্র নীল ও হলুদ রঙ দুটিকেই চিনহিত করতে পারে , লাল ও সবুজকে নয় । এই ধরনের বর্ণালির উপস্থিতি বর্ণান্ধ মানুষের দৃষ্টিতে মেলে । কুকুরের দৃষ্টি অবশ্য মানুষের দৃষ্টির তুলনায় অনেকটাই কম উজ্জ্বল । বিদেশের একাধিক পরীক্ষাগার থেকে উঠে এসেছে সারমেয় দৃষ্টি সংক্রান্ত এমন কিছু চমকপ্রদ তথ্য । যদিও নীল রঙটির প্রতি তার কোনও ভীতি আছে কিনা এমন কোনও তথ্য নেই । এই টোটকার কথা হয়তো এখনো বিজ্ঞানীদের কানে পৌঁছায়নি ।

এই নীল জলের বোতল বাড়ি বাড়ি ঝুলতে দেখে কুকুরগুলিও পড়েছে মহা ঝামেলায় । বাঙ্গালীতো মজে আছে কলরবে , গুজবে । নীল বোতলের টোটকা ভালোই হিট বিগত কয়েকমাস ধরে । যারা কুকুরদের উতপাতে বিরক্ত ও ভীত ছিলেন তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বদলে গেছে , এই বুঝি বাস্তিল দুর্গ ভেঙ্গে পড়লো । মানুষই মানুষকে ভয় পায় , কুকুরতো পাবেই । তাদের এই বদলে যাওয়া বডি ল্যাঙ্গুয়েজে সারমেয়কূল ভাবছে , নীল জলের বোতলের বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়াই শ্রেয় । নাহলে যতটুকু খাওয়া দাওয়া জুটত তাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে । তাছাড়া ভয়ের কারণ থাকতেও তো পারে । মানুষ তো বুদ্ধিমান প্রাণী , সেও ছোটবেলা থেকে জুজুকে কখনো না দেখেই তাকে ভয় করতে শিখে যায় । হিজ মাষ্টারস ভয়েসে কলের গান শুনেছি , এখন নয় নীল জলের বোতলের ছড়ি ঘোরানো মেনেনি । সময় তো বদলাবে একদিন না একদিন । বদল আসলে নয় বদলা নেওয়া যাবে ।

পুনশ্চ , লেখার প্রথমেই এক মধু পাগলার কথা বলেছিলুম । \' কচু বনে করে গেলো কালো কুকুরে \' - এই বন্দিশটি সে আর গাইছে না । সে ফিরে গেছে তার পুরনো বেসুরো রেওয়াজে । বাড়ির জানলা , দরজা যেখানে পেরেছে উজালা গোলা নীল জলের বোতল ঝুলিয়েছে । তার বাড়িতে পাড়ার হোক বা বহিরাগত কোনো কুকুরই উতপাত করছে না আপাতত । দেখা যাক কপালে সুখ কদিন সয় ।

আপনার মতামত জানান