অবাক হয়ে শুনি

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 



দেবব্রত বিশ্বাসের আইকনতুল্য খ্যাতির সামনে নতুন কিছু লিখতে বসার অর্থ – বোতল আর মদ দুটোই পুরোনো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। আর এ’সব ব্যাপারে নাক গলানোর এবং ভুল তথ্য দেওয়ার ফলশ্রুতি অচেনা অনেক মুখ ও মুখোশনির্গত খিস্তিসুধাপান।
তাই প্রথমেই বলে রাখি গুস্তাখি মাফ। অধমের সম্বল – উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর বানানো একটা অডিও ডকুমেন্টারি (গান আমার পড়ে পাওয়া ধন), ইউটিউবে পাওয়া একটা আধঘন্টার ইন্টারভিউ, সত্যজিত রায়ের একটা স্মৃতিচারণ আর ছোটোবেলা থেকে শোনা অনেক গানের স্মৃতি ও বিস্মৃতি। আমি ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত’ পড়িনি; নাটকটা দেখেছি – সত্যি বলতে ভাল্লাগেনি, কেন জানিনা।
মোদ্দা কথাটা এই যে – এই নামমাত্র তথ্য সম্বল করে একজন প্রায় কিংবদন্তীর সম্বন্ধে লিখতে বসা নেহাৎ ধৃষ্টতা – লেখাটা ভালো অ্যানালিসিস না হয়ে ফুল-বেলপাতা-চরণামৃত হবার প্রভূত সম্ভাবনা থেকেই যায়। সেই ঝুঁকিটা নিয়েই ফেললাম।
ভণিতা অনেক হলো। কাজের কথায় আসা যাক। বাঙলায় জন্মে, বাঙলায় লেখাপড়া শিখে, কোনো বা কোনোকোনো বাঙালি(রা) মরার আগে একবার ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ না শুনলে, এক্ষুণি তাকে বা তাদেরকে পাসপোর্ট ভিসা বানিয়ে গিনেসের দপ্তরে পাঠানো উচিৎ। আর মোটামুটি যাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেছেন – তাঁরা একবার না একবার গানটা গেয়েছেন। সম্ভবতঃ সুন্দরবনের বালিদ্বীপে আমি সপরিবারে ওখানকার গ্রামেরই এক গায়কের কাছে হারমোনিয়াম সহযোগে যে গানটা শুনেছিলাম – সেটাও ‘পুরানো সেই দিনের কথা’।
কিছুদিন যাবৎ দেবব্রত বিশ্বাসের সাথে আমার বেশ দেখাশোনা হচ্ছে। ভদ্রলোকের অ্যালবামকে অ্যালবাম এখন ইউটিউবে তুলে দিয়েছে কোনো সহৃদয় পাইরেট (তিনি কালে কালে জ্যাক স্প্যারো হবেন এই শুভেচ্ছা রইলো)। তো সেসব শুনতে শুনতে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ চালিয়ে ফেললাম। অত্যন্ত লজ্জার সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি আমি এই গানটা দেবব্রত বিশ্বাসের গলায় আগে শুনিনি। দেবব্রত বিশ্বাসের কোনো গান প্রথমবার শোনার অশিক্ষিত আনন্দের দিকটা এই যে, আগে গানটা ৭৫৭৯বার শুনে থাকলেও কিছু একটা আলাদারকমের শোনার সম্ভাবনা শতকরা সাড়ে তিরানব্বুই ভাগ।
যাই হোক, এইসব সংখ্যাতত্ত্ব ছেড়ে বেরোলে যেটা পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে – ভদ্রলোক ‘বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি’ লাইনে পৌঁছে, গান শব্দটায় কিছু একটা করলেন। কি করলেন, কিভাবে করলেন – সেটা বুঝে লেখার মতো খ্যামতা থাকলে এতোদিন আকাশে ফাকাশে উড়তাম। কিন্তু এটা বুঝলাম যে স্কটিশ ‘অল্ড ল্যাংজাইন’-এর ঋণ কাটিয়ে, দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে রবীন্দ্রনাথ কোথাও বকুলতলার গানে বাঁধা পড়ে রইলেন। আগে কখনো এম্নি হয়নি। তারপর অতীব আদেখলের মতো গানটা চল্লিশবার লুপে বাজিয়েছি। প্রাক্তন প্রেমিকা, নিজ ভগ্নী এবং প্রেমিকাদের ভগ্নীসহ (অবশ্যই কিছু অকিঞ্চিৎ পুরুষমানুষও ছিলো সেই লিস্টে) গানটা অন্ততঃ হোয়াটসঅ্যাপ ফ্রেন্ডলিস্টের শতকরা ষাটভাগ লোকজনকে পাঠিয়েছি (হারামীগুলোর একটাও রিপ্লাই দেয়নি। ওরে শোন শোন শোন, আজ বাদে কাল প্রলয় আসছে – গানটা শুনে মর) আর সেদিন থেকে আমার কলারটিউনে গানটা সেট করে সসাগরা পৃথিবীর কানের মাথা খাবার প্ল্যান করেছি।
...
দেবব্রত বিশ্বাসকে জর্জদা লিখবোনা এহেন চিতোর রাণার পণ করে লিখতে বসেছিলাম। বিশ্বাস করুন ভদ্রলোক আমার দাদুর থেকেও বড়ো। এই জেনারেশন আফটার জেনারেশন জর্জদা, মানিকদা ডাকার প্রবৃত্তি দেখলে মনে হয় ভাগ্যিস বাঙলায় লেখেননি, নইলে বঙ্গাঁতেল মুখেমুখে দইদা হয়ে যেতেন মহাভারত রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস।
কিন্তু জর্জ বিশ্বাসের নাম জর্জ বিশ্বাস হইলো কেন?
উইকি বলছে বিশেষ কিছুই না – জর্জ বিশ্বাসের জন্ম বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার বছরে। ১৯১১ সনে, অধুনা বাঙলাদেশের কিশোরগঞ্জে। তো ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম নিলেন যেই বছর, সেবছরই পঞ্চম জর্জ দিল্লী দরবারে তার রয়্যাল বুটধূলি দিয়েছিলেন। সেই থেকেই জর্জ।
স্বয়ং জর্জ বলছেন এই ব্রাহ্মপরিবারে জন্মসূত্রেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাথে তাঁর আশৈশব ঘনিষ্ঠতা। যখন বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড দেবব্রত বিশ্বাসের একের পর এক গান নাকচ করে দিচ্ছে সেই সত্তরের শুরুর দিকে ব্রাহ্মসমাজের বার্ষিক কনফারেন্স হয় শিলংয়ে। সেখানে মিউজিক বোর্ডের পদস্থ কর্মী শ্রী পূর্ণেন্দু গাঙ্গুলির দেবব্রত বিশ্বাসের সাথে তার গান ব্যান হয়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে আসেন (ভিক্টোরিয় বাঙালিরা আলোচনা করতেন – আলোচনার নামে কন্ঠ তেষট্টিতলায় পৌঁছিয়ে চেঁচাতেন না)। জর্জ এই মর্মে সওয়াল করেন যে যেহেতু রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং জর্জ বিশ্বাস উভয়েরই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ব্রাহ্মসমাজের পরিমন্ডলে, তাই রবীন্দ্রসঙ্গীত জর্জের বড়ো ভাই। আর যে বড়ো ভাইয়ের সাথে জর্জের আলাপ মায়ের কোলে বসে, তাঁর সাথে বুড়ো বয়েসে মিউজিক বোর্ডের রুলবুক মেনে নতুন করে আলাপ করার ইচ্ছে বা প্রবৃত্তি কোনোটাই জর্জের নেই।
এসব চেনা কথার গন্ডি পেরিয়ে যেটা বলা ভালো তা হলো সত্যজিৎ জর্জের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোকপাত যে দিকটায় করেছেন – সেটা হলো দরাজ গলা। দরাজ গলার জন্য সত্যজিতের অনুরাগ সর্বজনবিদিত – অনুপ ঘোষাল, কিশোরকুমার, অমর পাল গায়কের চয়েসেই তার প্রমাণ। তো মাইকের ব্যবহার শুরু হবার পর গলাটা মিনমিনে করে নেবার যে প্রবণতা দেখা যায় – সত্যজিতের পারিবারিক সম্পর্কের জর্জদা সেই কৃত্রিম কন্ঠসম্পদের বাইরে দাঁড়ানো একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র।
জর্জ বিশ্বাসের অত্যন্ত হিট একটা অ্যালবাম আছে ঋতুরঙ্গের উপর। সেটা চালালেই ‘বৈশাখ হে’ বলে যে আহ্বানটা বেরোয় সেটাই প্রমাণ করে সত্যজিতের বক্তব্যের যথার্থতা। না শোনা থাকলে এক্ষুণি শোনেন।
এখানে বলে রাখা ভালো সত্যজিত বলেছিলেন, দেবব্রত বিশ্বাসের রবিঠাকুরের গান পরিবেশনায় যে স্বাভাবিকতা, সেটা খুব ছোটোবেলায় অনেকের মধ্যেই তিনি দেখতে পেতেন। বয়েসকালে যাঁদের গান শুনেছেন তাঁদের মধ্যে পাননি। সেই ‘তাঁদের’ নামটা অবশ্য বলে যাননি বিশপ লেফ্রয় রোডের কাজের ঘরে বসে।
...
পুরানো সেই দিনের কথা শুনে নাকের জলে চোখের জলে হবার ব্যাপারটা লিখেছিলাম। সব গানে যদিও এরকম লালুভুলু হবার কথা নয়। এই প্রায় মিডলাইফ ক্রাইসিস ছুঁই ছুঁই বয়েসে সেটা হয়ও না।
আরেকটা মহাপপুলার গানের কথা লেখা যাক – ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’। চারুলতা আমার অনেক বড়ো বয়েসে কম বোরিং এবং বেশ ইন্টারেস্টিং সিনেমা লাগতে শুরু হয়েছে – তাই ছোটোবেলায় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের গার্ডেন সীনে গাওয়া ভার্সনটি শুনে মুচ্ছো গেছিলাম বললে সত্যের অপলাপ হবে। বরং এটা বলতে পারি – শান্তনু মৈত্র সুরারোপিত ‘পরিণীতা’র হিন্দী ভার্সনটির অনেক আগে বেহালায় একটা আঁকার স্কুল ছিলো – যেখানে সরস্বতী পুজোয় সব্বাইকে কান ধরে নাচ-গান-নাটক করানো হতো। কোরাসে মেইল ভয়েস লাগলে আমার মতো আজন্ম অসুররাও বঞ্চিত হতোনা (বলে রাখা ভালো, আমি যাতে স্কুলে প্র্যাকটিকালের আঁকা স্বহস্তে আঁকতে পারি তাই আঁকা শিখতে পাঠানো হয়েছিলো। এখন একদম পারিনা)। সেখানেই দুই খুকি ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ নাচবে বলে আমাদের কোরাসে গাইতে হয়েছিলো – প্রায় গণসঙ্গীত যাকে বলে।
জর্জ বিশ্বাসের সম্বন্ধে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের অসূয়ার কারণ ব্যক্তিগত কিনা জানিনা – অফিসিয়াল চিঠিতে যে কারণগুলো দেখানো হয়েছিলো তার মধ্যে একটা – অতিরিক্ত মিউজিক অ্যাকম্পানিমেন্ট বা যন্ত্রানুসঙ্গ (এখানে বলে রাখা ভালো অত্যন্ত কম যন্ত্র নিয়ে একজন গায়ক আজকাল রবিঠাকুরের গানজাতীয় কিছু একটা গেয়ে থাকেন – রোদ্দুর রায়)।
সিরিয়াস কথায় ফেরা যাক। জর্জ বিশ্বাসের রেকর্ডিং কোম্পানি হিন্দুস্তান রেকর্ডকে পাঠানো মিউজিক বোর্ডের চিঠির প্রতিলিপি তিনি নিজের কাছে রেখেছিলেন। সেই চিঠিটা পড়ে রেকর্ডও করেছিলেন (আহা ভদ্রলোক কি ইংলিশ বলতেন)। সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে – কি কি যন্ত্র বাজানো যাবে আর কি কি যাবেনা। অবশ্যই বাজানো যাবের লিস্টে স্প্যানিশ গীটার নেই, যেটা জর্জ বিশ্বাস ব্যবহার করতেন।
কিন্তু বাবাসকল, ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’র যে ভার্সনটির কথা বলা হচ্ছে সেটি স্রেফ একটা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাওয়া – সম্ভবতঃ কোনো ঘরোয়া আসরে। ভালো করে রেকর্ডও করা নয়। কিন্তু তার মধ্যেও একটি বস্তু বেরিয়ে আসে।
গানটার প্রথম তিনটে লাইন তো মোটামুটি নার্সারি রাইম – টেনেটুনে বললে প্রকৃতি বন্দনা। ফুলে হাওয়া বইছে, নদী বয়ে যাচ্ছে, পাখি ডেকে ডেকে বেড়াচ্ছে ইত্যাদি। সেখান থেকেই সটান রবীন্দ্রনাথ এনে ফেলেন ‘কি জানি কিসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়’তে। গানটা চড়াৎ করে অত্যন্ত গভীর কোথাও পৌঁছে যেতে পারে – যেখানে সাবলীল জীবন তরঙ্গিনী আর রবিঠাকুরের লালিত সদা না পাওয়ার শিল্পীবত্তা। একটা গান – যেটা নার্সারি রাইম হতে হতে – গভীর দর্শন হয়ে গেল।
কথাটা হলো এতো কথা আমার নলবনের পাড়ে অফিস বাসে বসে মনে হতোনা – জর্জ বিশ্বাসের কন্ঠে ওই থার্ডক্লাস রেকর্ডিং কোয়ালিটিতে জমিয়ে রাখা ভার্সনটা না শুনলে।
...
দেবব্রত বিশ্বাসের ভাষায় ‘জীবন একবার বাঁয়ে ঝুঁকেছিলো’। আর সেই বাঁয়ে ঝোঁকার ফলশ্রুতি যেন এক আনন্দনিকেতন।
গণনাট্য আর দেবব্রত বিশ্বাসের ফলশ্রুতি ঋত্বিকের মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার। ‘ভুলি নাই’ চলচ্চিত্রে মুকুন্দ দাসের ভূমিকায় অভিনয়। সুচিত্রা মিত্রকে আজীবন দিদিমণি বলে ডেকে যাওয়া – এসব জানা কথা জানা গল্প।
কমিউনিস্ট পার্টির ভাগাভাগি হবার আগে অবধি এই সখ্য অটুট ছিলো জর্জের সাথে আইপিটিএর। তারপর জর্জ নিজের দুপার্টিতে ভাগ হয়ে যাওয়া সদস্যদের কার সাথে বেশি বাঁধন বুঝতে না পেরে সরে আসেন।
দুটো খুচরো গল্প লিখে এই পাট চুকোই।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় দেবব্রত বিশ্বাসকে কাকা বলতেন। কেন বলতেন জানা নেই – এহেন আদরের ডাক। সে যাই হোক, তো সেই কাকাকে নিয়ে রবীন্দ্রসদনে একটা এলাহি সম্বর্ধনার আয়োজন করেছিলেন প্রায় নিজের উদ্যোগে। এমনকি মানপত্রটাও নিজেই পাঠ করেছিলেন। জবাবে জর্জ বলেন তাঁর একটা ডিফেক্ট আছে, কিছুক্ষণ পরই তিনি কোলকাতার ভাষা ছেড়ে নিজের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন (এখানে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটা কথা বলে ফেলি, গান গাওয়ার সময় কিন্তু কোনো বাঙালোচিত ডিফেক্ট থাকতো না)। আরো বলেন তিনি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছেন – কারণ তাঁর ডানদিকে বসে আছেন শ্রদ্ধেয়া অমিয়া ঠাকুর, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের নাতবউ। আর বাঁদিকে জর্জের নিজের বউদি কণক (দাস) বিশ্বাস (যাঁর সূত্রে সত্যজিতের সাথে আত্মীয়তা, জর্জের টিপ্পনী শোনা যায় কৃষ্ণকলি কণক বিশ্বাসকে নিয়েই লেখা)। তো উদ্যোক্তারা এই যে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্টটা কেন করেছেন জর্জ জানেন না – করে যখন ফেলেছেন – জর্জ খুব খুশি হয়েছেন।
এবার আর একটু পুরোনো গল্প।
সলিল চৌধুরী ক্ষণজন্মা প্রতিভায় যেক’টা জাগরণের গান আলো করে রাখতো আইপিটিএকে – স্বাধীনতার ঠিক পর পর লেখা ‘ও আলোর পথযাত্রী’ তাদের মধ্যে খুব উজ্জ্বল একটা গান। গানটার একদম আদি একটা রেকর্ড আছে। গায়কদের মধ্যে দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্রসহ অনেকেই আছেন। এরপর গানটা সলিল নিজেই নিজের দলকে দিয়ে রেকর্ড করিয়েছিলেন। অনেক আধুনিক এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সেই রেকর্ডিংটাকে সসম্মানে রেখে বলাই যায় – বাঙলা গানে সলিল চৌধুরীর কয়ার সংয়ে অবদান সম্বন্ধে সামান্য ধারণা করতে গেলে অরিজিনালটা একবার না শুনলে ‘মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি’।
...
শেষমেষ রবীন্দ্রনাথেই ফিরি।
হয়তো দেবব্রত বিশ্বাসও সেখানেই ফিরতে চাইতেন।
এই অকিঞ্চিৎকর লেখায় রবি ঠাকুর কিম্বা দেবব্রত বিশ্বাস কারো সম্বন্ধেই চরম কথা বলার স্পর্ধা আমার কখনোই ছিলোনা। কিন্তু যেটা বলার – সেটা এই যে কেউ একজন, (সম্ভবতঃ শান্তিদেব ঘোষ) বলেছিলেন ‘ওঁর গান মূলতঃ কবিতা, কিন্তু না বুঝে গাইলে হবেনা’।
দেবব্রত বিশ্বাস কোলকাতা শহরে বেশিরভাগ সময়, একটা খানিকটা ধূলিধূসরিত বাইক নিয়ে ঘুরতেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে রীতিমতো সেলিব্রিটি একটা মানুষ, ধূতি পরে জলসায় যেতেন মোটরবাইক চেপে। আরিটায়ারমেন্ট এলআইসির চাকরি করেছেন,এদিকে ইংরিজি-সংস্কৃত, জার্মান ইত্যাদি ভাষায় রবিঠাকুরের গান গেয়েছেন। নিজের হাতে শোনা যায় ভালো রান্না করতেন, গুচ্ছের পান খেতেন, এদিকে জীবনে শরীরে অ্যালকোহল ঢোকাননি।
আসলে কোথাও একটা ব্রাহ্মসমাজের মূল্যবোধ এবং আইপিটিএর দুর্দম আনন্দনিকেতনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন ছিলেন এখন দূর থেকে দেখে মনে হয়। তাই এই ট্র্যাডিশনালিস্ট বোহেমিয়ানিজম অথবা বোহেমিয়ান ট্র্যাডিশনালিজমের মধ্যেই নিজেকে চরম বৈপরীত্যে সবচেয়ে সৎ রাখতে পারতেন – রবীন্দ্রসঙ্গীতটা রবিঠাকুরোত্তর আরোপিত বোরখার মধ্যে দিয়ে দেখতে হয়নি তাঁকে। ছেলেবেলায় স্বাভাবিক ভাবে এসেছিল, আমৃত্যু নিজের মতো স্বাভাবিক ভাবেই ছিলো। সেখান থেকেই কোথাও হয়তো তিনিই এবং সবার উপরে তিনিই রবীন্দ্রসঙ্গীতটা সবচেয়ে বুঝে গাইতেন আর বোঝাতে পারতেন – মিউজিক বোর্ডের ঘেরাটোপের বাইরে দাঁড়িয়ে। অত্যন্ত ব্যক্তিগত জায়গায় – অত্যন্ত নিজস্ব মতামত - জর্জ বিশ্বাস, এই হাঁপানিতে ভোগা মানুষটিই হয়তো আমার কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের রচয়িতার মননের কাছাকাছি পৌঁছোবার সবচেয়ে সোজা সিঁড়ি।

‘এক কূলে যাঁরা নাকি রবীন্দ্রনাথের গানের সো কল্ড এক্সপোনেন্টস অ্যান্ড এক্সপার্টস তাঁরা আমার গতিটা রুদ্ধ করবার জন্য নানা রকম কায়দা করলো। আরেকটা সাইডে বহু রবীন্দ্রসঙ্গীত ভক্ত যাঁরা, তারা আমার গতিটাকে খুব সোজা করে দিলো। সুতরাং এ’রম ভাবে দাপাদাপি করে করে আমি এখন বঙ্গোপসাগরের তলায় চলে গেছি। আমি আর নদী নেই – আমাকে আর তোমরা খুঁজেও পাবেনা’
– দেবব্রত বিশ্বাস, গান আমার পড়ে পাওয়া ধন

আপনার মতামত জানান